১২তম পর্ব পড়তেএখানে ক্লিক করুন।
১৩তম পর্ব শুরু
………………
( তেরো )
শনিবারের সকাল। আজ মেঘের ছিটে ফোঁটাও নেই। ঝলমলে
পরিষ্কার আকাশ। শশাঙ্কর মনটাও বেশ
ফুরফুরে। ঠিক করেছে মন ভাল হওয়া ঘরটিতেই আজ কাটাবে। এমনিতে শনি,রবি অফিস ছুটি
থাকলেও কারখানা খোলা থাকে প্রতিদিনই। ছেলেরা অ্যাটেন্ড
করলেও শশাঙ্ক এই দুটো দিন ব্যবসা থেকে
মুক্ত থাকতে চায়। অন্তত একটা দিন বাড়িতেই থাকে। রূপবতীও সংসারের টুকিটাকি কাজের
তদারকি করে। আগে অফুরন্ত সময় ছিল বলে সমস্যা ছিল না।এখন এই দুটো দিনই তার কাছে
মূল্যবান। অফিস যাওয়ার পর থেকে রূপবতী বেশ ডায়নামিক হয়ে উঠেছে। সব কাজই চটপট করে।
চটজলদি ডিসিশন নিতেও দ্বিধা করে না।এবং প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় সঠিক সিদ্ধান্তই
নিচ্ছে। শশাঙ্ক অত্যন্ত খুশি। দায়িত্ব বন্টন করে দেয়ার পক্ষে সে বরাবর। স্বাধীন
ভাবে কাজ করতে দিলে দায়িত্ববোধ বাড়ে। কাজের গতি যেমন বৃদ্ধি পায় তেমনি উৎসাহও বেশি
পায়। রবিবারটা শশাঙ্ক আশ্রমে কাটায়। সেটাও
তার কাছে শান্তির স্থান। আকাঙ্খিত স্বপ্নের সফল রূপ দেখতে কার না ভাল লাগে। আরও
কিছু পরিকল্পনা মাথায় আছে। এক এক করে তার জীবদ্দশায় চালু করে যেতে চায়। এক সময় যেন তা নিজস্ব গতিতে
চলে।
গতকালই ওই লোকটা অর্থাৎ ঊর্মিলার স্বামী বলে যিনি পরিচিত তিনি ফোন করেছিলেন। অপারেশন সাকসেসফুল। যদিও বায়োপসি করে ক্যানসার কনফার্ম করেছে। অনেকটা নাকি ছড়িয়ে গেছে। ডাক্তার বলেছেন, দু'মাস পরে আবার একটা অপারেশনের দরকার। তবেই সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। শশাঙ্ক জানিয়ে দিয়েছে, ডাক্তারের তত্ত্বাবধানে ঐ হসপিটালেই থাকুক। অর্থের চিন্তা করতে হবে না। তিনি যেন কয়েক মাসের জন্য থাকার একটি ঘর দেখে নেয়। ঊর্মিলা এখন অনেকটা সুস্থ। কথা বলছে। এমন কি চিনতেও পারছে। সেটা শুনেই শশাঙ্কর স্বস্তি। পাঠিয়ে কোনও ভুল করেনি। কিছু কিছু খবর থাকে, মনকে অনেক হালকা করে দেয়। নিমেষেই মনের সমস্ত গ্লানি দূর হয়ে যায়। আনন্দের উচ্ছাস টের পায়। তাই শশাঙ্ক বেশ ফুর্তিতে আছে। অনেক দিন বাদে সকালে ছেলেদের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করেছে, প্রাণ খুলে কথা বলেছে। দুপুরে রূপবতীকে নিয়ে এক সঙ্গে খেতে খেতে অনেক গল্প করেছে। যা ইদানিং হতো না বললেই চলে।এক সঙ্গে খেলেও কথা হত লিমিটেড। দিবা নিদ্রার অভ্যেস কোনওদিনই নেই । আজ টানা দু'ঘন্টা সাউন্ড স্লিপ হয়েছে। সবই যেন ব্যতিক্রম। বিকেল চারটে নাগাদ একটি পত্রিকা নিয়ে শুয়ে বসে পড়ছে। তাদের আশ্রম থেকে প্রতি বছর একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। মূলত সাহিত্য পত্রিকাই বলা যায়। তবে ধর্মমূলক লেখা, আশ্রমের নিয়মাবলী, আয় ব্যয়ের হিসাব সব মিলিয়ে পত্রিকাটি বেশ সম্মৃদ্ধ। সম্পাদক, অর্পিতা মুখোপাধ্যায়। অর্পিতা বিবেকানন্দের উপর একটি প্রবন্ধ লিখেছে। লেখার হাত খুব ভাল। সাবলীল গদ্য।
ঘরের লাগোয়া একটি বেশ বড় গোলাপ জাম গাছ আছে। যেমনি
ঝাঁকড়া তেমনি ফলও হয় প্রচুর। গোলাপের গন্ধে চারিদিকে ম ম করছে।খেতেও বেশ সুস্বাদু।
কয়েকটা টিয়া পাখি খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। শশাঙ্কর দৃষ্টি সেদিকেই বার বার চলে যাচ্ছে।
মাঝে মাঝে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসে। এত পাখি কোথায় থাকে কে জানে।
রূপবতী ঢুকল। গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ প্রয়োজন নিশ্চয়ই। না
হলে রূপবতীরও আসার কথা নয়।জানে শশাঙ্কর এই
ঘরে প্রবেশ নিষেধ। একান্ত নিজের মত থাকার ঘর।অবশ্য রূপবতীকে ছাড়পত্র দেওয়া আছে।তবু
শর্ত, অত্যন্ত জরুরি দরকার হলে তবেই।
শশাঙ্ক ভাবছে অন্য কথা।হঠাৎ কি হলো? আবার কি ঊর্মিলার প্রসঙ্গ তুলবে? যদি তাই করে
শশাঙ্ক দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিটির উত্তর দেবে।অপ্রিয় হলেও সত্যি কথাটা তার জানা উচিত।
ভুল মানুষই করে, ভুলের প্রায়শ্চিত্তও সেই মানুষকেই করতে হয়। সংশোধন করার সুযোগ যখন
একবার পেয়েছে তার সদ্ব্যবহার করবেই। এতে সমাজ কিছু ভাবলেও যায় আসে না। ভাবলেই কেমন
এক পাপবোধ জেগে উঠে। যদি মেয়েটি নতুন ভাবে সংসার করত তবুএকটা সান্ত্বনা পেত।
রূপবতী শশাঙ্কর পাশ থেকে আশ্রমের পত্রিকাটি নিয়ে পাশের
চেয়ারে বসল। পাতা উল্টে আয়-ব্যয়ের হিসাব দেখছে।অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যবসার
প্রতি রূপবতীর যে এত আগ্রহ ভাবা যায় না। সব কিছুতেই লাভ ক্ষতির হিসাবে নজর। এ মেয়ে
যদি প্রথম থেকেই বিজনেসে নেমে যেত এতদিনে মাস্টার হয়ে যেত নিশ্চিত। ব্যবসা তার
রক্তে।না হলে বৌমাদেরও ব্যবসায় নামাতে চায়,ভাবা যায়? শশাঙ্ক কি ভেবেছে
কোনওদিন? না হলে এত ভাল একটা মেয়েকে
একমাত্র ব্যবসার মানসিকতা নেই বলে নাকচ করে দিল? শশাঙ্ক ইচ্ছে করেই মত চাপিয়ে দেয় নি।
কারণ তারও আপত্তি নেই। বরং দুজনে একই কাজে এনগেজ হলে আয় উন্নতি বাড়বেই। দেখুক না,
মন্দ কি? আজকাল ছেলেমেয়ের যেমন তফাৎ নেই, কাজের ক্ষেত্রেই বা পার্থক্য হবে কেন?
রূপবতী বলল," তোমার সঙ্গে একটা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা
করতে এলাম। ক'দিন ধরেই ভাবছিলাম। তোমার সঙ্গে ডিসকাশন করে ফাইনাল সিদ্ধান্ত
নেব।"
শশাঙ্ক বলল," কি ব্যাপার? এনি প্রবলেম?"
"না, প্রবলেম নয়। আমি ভাবছি, আমাদের আশ্রম থেকে
মেয়ে ঠিক করে যদি ছেলেদের বিয়ে দিই, কেমন হয়?"
"হঠাৎ এই প্রশ্ন? আশ্রমের মেয়েদের ছেলেদের পছন্দ
হবে কেন?"
"হবে আমি নিশ্চিত। আমি সেদিন অনেক মেয়েদের সঙ্গে
কথা বলেছি। যেমনি ভদ্র তেমনি কর্মঠ। দেখতেও কয়েকজন সুন্দরী মেয়েকে দেখেছি। ওখানকার
যিনি মা তিনি ছেলেমেয়েদের এমন ভাবে শিক্ষা দিয়েছেন, তারা কেউ খারাপ হতে পারে
না।"
"তাই নাকি? মায়ের প্রতি এত ভরসা? এক দিনেই এতটা
কনফিডেন্ট?"
"বলতে পার। ভালকে একদিনেই চেনা যায়। ওই মহিলার যা
আত্মত্যাগ এবং নিষ্ঠা দেখেছি খুব কম মানুষই পারে। ছেলেমেয়েরা মা বলতে অজ্ঞান। এমন
কি অফিসের কর্মীরাও তাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে। এমনি এমনি তো করে না?"
"দেখো, ভাল করে ভেবে দেখ। তারপর কথা বলা যাবে।
মেয়েদেরও আমাদের ছেলেদের পছন্দ হবে কি না সেটাও ভাবতে হবে।"
"সেটাতো অবশ্যই। তবু তুমি একবার ওই মহিলার সঙ্গে
কথা বল?"
"কেন? তুমিই বলনা। তোমার সঙ্গেতো ভালো আলাপ হয়ে
গেছে। এক্ষেত্রে তোমারই বলা উচিত।"
"আমিও বলতে পারি। ভদ্রমহিলাকে যদি একবার বাড়িতে
আমন্ত্রণ জানাই, খারাপ দেখাবে?"
"খারাপ দেখানোর কিছু নেই, কথা বলে দেখো আসে
কিনা।"
"ঠিক আছে, তুমি ফোনটা ধরে দাও। তারপর আমি কথা
বলি।"
শশাঙ্ক ভাবছে অন্য কথা। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে না
আবার সাপ বেরিয়ে যায়। যা সময় চলছে,কি হবে কে জানে। "রিং হচ্ছে, নাও
ধরো।"
"ম্যাডাম, ভালো আছেন তো?আমি রূপবতী বলছি। আপনাকে
একবার আসতে বলেছিলাম, মনে আছে? কাল রবিবার।কালই আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।একটি
বিশেষ দরকারও আছে। ও তাই নাকি? দাঁড়ান, ওর সঙ্গে একটু কথা বলে জানাচ্ছি। "এই,
তোমাদের নাকি জরুরি মিটিং আছে কালকে? তাহলে উনি আসবেন কি করে?"
শশাঙ্ক বলল,"বলে দাও, মিটিংটা বিকেল পাঁচটা থেকে
হতে পারে। বারোটার মধ্যে চলে আসুক।চারটের মধ্যে ফিরে যেতে পারবে।"
রূপবতী বলল," ওর সঙ্গে কথা বললাম, শশাঙ্ক বলছে
বারোটার মধ্যে এখানে চলে আসুন।আমার বাড়িতে দুপুরে নেমন্তন্ন রইল আপনার। খেয়েদেয়ে
কিছু দরকারি কথা বলে বেলা চারটের মধ্যে আপনাকে ছেড়ে দেব। তারপর শশাঙ্ক,আপনি এক
সঙ্গেই ফিরে যাবেন।আশা করি অসুবিধা হবে না।
কি আসছেন তো? কি কথা? সেটা বাড়িতে এলেই বলব। একটু ব্যক্তিগত বলতে পারেন।ঠিক
আছে রাখছি তা হলে? কাল দেখা হচ্ছে।"
"এই শোনো, ম্যাডামের সঙ্গে ফাইনাল কথা বলে, নেক্সট
সানডে তে দুজনে চলে যাব। উনি নিশ্চয়ই মেয়েদের কে একটু বলে রাখবেন,তাহলে তারাও একটু
রেডি থাকবে।"
"কি বলছো তুমি? মেয়ে দেখার কথা বলে রাখব? এটা হয়?
না উচিত? ওসব কিছু বলার দরকার নেই। এমনি আমরা দেখবো। সঙ্গে অর্পিতাও থাকবে। সকলে
মিলে আলোচনা করবো। এরমধ্যে তোমার যদি কাউকে পছন্দ হয় আমাকে জানাবে।তারপর অর্পিতার
মাধ্যমে মেয়ের ওপিনিয়ন নিয়ে নেব।"
"ওকে। তাই হবে।এটাই বেস্ট।"
ক্রমশ ………………
১৪তম পর্ব পড়ুন আগামীকাল ।