Parichay , Upannyas (Novel), 12th Part, by Nityaranjan Debnath,  Tatkhanik digital, bengali online, bangla web, e magazine, পরিচয়, উপন্যাস, ১২তম পর্ব

 

১১তম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

১২তম পর্ব শুরু ………

(  বারো  )

বেলা সাড়ে দশটায় ঘুম থেকে উঠল শশাঙ্ক। ঘুমটা খুব দরকার। তাই বাধ্য হয়ে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে শুতে হয়েছিল। তাকে এখন স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতেই হবে। এখনো অনেক কাজ বাকি । হঠাৎ কিছু ঘটে গেলে সব পরিকল্পনা পণ্ড হয়ে যাবে। বংশ পরম্পরার ঐতিহ্য যদি নষ্ট হয়ে যায় মরেও শান্তি পাবে না। অনাথ আশ্রম নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। তিনি চান,আশ্রম একদিন নিজেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠুক। তারজন্য চাই উপযুক্ত পরিকাঠামো  ও দক্ষ পরিচালক। শশাঙ্ক দায়িত্ব নিয়েই যোগ্য ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষার ছাড়পত্র দিয়ে দেয়। প্রাথমিক খরচ বেড়েছিল ঠিকই, আস্তে আস্তে তা সামাল দেওয়াও গেছে। এই পঁচিশ-ত্রিশ বছরে বহু ছেলেমেয়ে উচ্চ শিক্ষা পেয়ে ভাল ভাল পোস্টে চাকরি করছে। কেউ কেউ বিদেশেও পাড়ি দিয়েছে। বেশ কয়েকজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারও হয়েছে। তারা নিয়মিত একটা ভাল অর্থ আশ্রমকে ডোনেট করে। আরেকটি ইচ্ছে আছে আশ্রমের বুদ্ধিমান ছেলেমেয়েদের নিয়ে একটি বড় ধরনের ব্যবসা স্টার্ট করা। নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তাদের ব্যবসা শেখাবে। লাভের অর্ধেক অর্থ আশ্রমের ফান্ডে জমা পড়বে। এর জন্যই নিজের কোম্পানির দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায়। এবার তার সন্তানেরাই দেখভাল করুক। মাথার উপর রূপবতী থাকুক। রূপবতী বুদ্ধিমতী,আশা করা যায় ট্যাকল করতে পারবে। তাছাড়া চালু ব্যবসা, গুড উইল ভাল, তা সহজে ধসে পড়বে না।এরপর শশাঙ্ক তো আছেই।

বেলা বারোটার মধ্যেই স্নান খাওয়া সেরে নিল শশাঙ্ক। অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।

রূপবতী বলল,"অফিস আজ নাই বা গেলে। আমি  বরং একাই ঘুরে আসি। তুমি ক্লান্ত। সারারাত তো একটুও ঘুমোয় নি, জানলায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটার পর একটা সিগারেট ধ্বংস করেছ। ডাক্তার যা নিষেধ করবে তা তুমি বেশি বেশি করবে। তোমার শরীর ভাল হবে কি করে? কত করে বললাম, হসপিটালে যেও না, গিয়ে কোনও লাভ হয়েছে কি শুনি? নিজের দোষে ওই মেয়ের আজ এই পরিণতি। মরণাপন্ন মানুষটাকে আবার মুম্বাই পাঠালে। কিছু অর্থ দিয়ে ওর স্বামীর উপর সব ছেড়ে দিতে পারতে। কেন তুমি ঝামেলায় জড়াচ্ছ বুঝতে পারি না। যাকগে, তুমি আজ বাড়িতে থেকে রেস্ট নাও। আমিই ঘুরে আসি।"

শশাঙ্কর মাথাটা আবার গরম হয়ে উঠছে। যতই ভাবে উত্তেজনা থেকে দূরে থাকবে কিন্তু পারছে কই? তবু নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করল। ভাবছে, রূপবতীর স্থানে সে থাকলে হয়তো এমনই আচরণ করত। যার যেমন ভাবনা।

বলল,"না না, অফিসেই যাব। কাজের মধ্যে থাকলে বরং ভাল থাকব।"

অফিসে এসেও কাজের কোনও মুড নেই শশাঙ্কর। নিজের চেম্বারে মাথাটা পেছন দিকে হেলিয়ে চেয়ারে বসে আছে। রূপবতী গেছে অমলেন্দুর কারখানায়। সেখানে বেশ কিছু গাড়ির অর্ডার আছে। কতটা কি হল দেখতে গেছে। শশাঙ্কর  ভেতরটা এখনও তোলপাড় করে চলেছে। ভাবছে ঊর্মিলার কথা। মেয়েটা জীবনটাকে এই ভাবে কেন নষ্ট করল? জেদের বসে কী কেউ এই ভাবে জীবনটাকে শেষ করে? অবশ্য কিই বা করত? পৃথিবীতে তার পাশে কেউই তো ছিল না ।শশাঙ্ককেও  বিশ্বাসও করতে পারল না। সেটাই তার মস্ত ভুল।

বেলা দুটোর সময় মেয়ের বাড়ি থেকে ফোন, এর আগে বৃষ্টির জন্য ক্যানসেল করেছে। আজও যে আকাশ পরিষ্কার বলা যাবে না। তবে বৃষ্টি নেই। দেখে মনে হয় সম্ভাবনাও নেই। অমলেন্দুর জন্য মেয়ে ঠিক না করতে পারলে ছোটটাকে আগে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। রূপবতীকে ফোন করতেই বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, বলে দাও, আজই চারটের সময় যাব। নানা ঝামেলায় আসল কাজটাই দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি এক্ষুনি ফিরছি। টিফিন করে একটু ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে যাব।

শশাঙ্করও টিফিন হয়নি। ইচ্ছে করছে না, তাছাড়া খিদেও নেই। অবশ্য বেলা করে খেয়েছে খিদে না পাওয়াই স্বাভাবিক। রূপবতীর সঙ্গে সামান্য কিছু খেল। অমলেন্দুর কাজ দেখে রূপবতী খুব প্লিজড। খুশিতে টগবগ করছে। এক সঙ্গে পঞ্চাশটি গাড়ি সাপ্লাই হচ্ছে। কম বড় কৃতিত্ব নয়। শশাঙ্কও স্বস্তি পেল, ছেলে তাহলে উপযুক্ত হয়ে গেছে। আর আঁকড়ে ধরে রাখার কোনও মানে হয় না। এক সময় সব ছাড়তে হয়। দায়িত্ব ছেড়ে দিতে হয়। না হলে স্বাবলম্বী হবে কী করে? তাকেও বাবা এক সময় সমস্ত ভার তার হাতে সঁপে দিয়েছিলেন। নিজে কিছুই দেখতেন না। ব্যবসা নিয়ে ভাবতেনও না। তাতেই না স্বাধীন চিন্তা-ভাবনা করে একটি কারখানা বাড়াতে পেরেছিলেন? সুখের কথা বাবা তা দেখেও গিয়েছিলেন।

বাড়িটা উত্তরপাড়া স্টেশন থেকে  এক কিলোমিটারের মত ভেতরে। পুরোনো শহর। মেইন রাস্তা ছেড়ে একটি গলির ভেতর ঢুকল ওরা। দু'পাশে কয়েকশ বছরের আগের তৈরি সারি সারি বাড়ি। বাইরের দেয়াল দেখেই অনুমান করা যায় সাবেক কালের বাড়ি।রাস্তাও খুব সরু। একটা গাড়ি ঢুকলে লোক চলাচলের স্পেস থাকে না। কি প্ল্যান নিয়ে যে করে মাথায় ঢোকে না। অবশ্য দেড়-দুশো বছর আগে অত গাড়ি-ঘোড়া ছিল না বলে হয়ত মাথায় রাখে নি। তবু শশাঙ্কর মতে দূরদর্শিতার অভাব ছিল। মানুষ দিন দিন উন্নতি করবেই, সে চিন্তাটা করবে না? যে বাড়িতে যাচ্ছে বনেদি পরিবার। পাঁচ পুরুষের বাস উত্তরপাড়াতেই। বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করে। মেয়েটি ইংলিশে অনার্স পাশ করে এখন বাড়িতে বসে গান, আঁকা শিখছে। যদিও কোনোটাই তাদের কাজে লাগবে না। তবু মানুষের নিজের মূল কাজ ছাড়া কিছু কিছু হবি থাকা ভালো।এক্সট্রা কোয়ালিফিকেশন। জীবনের কিছু কিছু মুহূর্তে মনের পুষ্টি যোগায়,যার মূল্য অসীম। অমলেন্দুর সঙ্গে কতটা মিল খাবে সেটাই দেখার। বনেদি পরিবার, বংশ---এসব শশাঙ্ক আর বিশ্বাস করে না। ফ্যামিলি এবং মেয়েটি কেমন সেটাই দেখার।

বাড়িটা তিন তলা। টপ ফ্লোরের বাইরেটা প্লাস্টার বেরিয়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে ইটগুলো হাঁ করে আছে। অথচ একতলা দোতলা নতুন প্লাস্টার করে রঙ করিয়েছে। নিশ্চয়ই তিন তলার জন আর্থিক দিক থেকে দুর্বল। ভাইয়ে ভাইয়ে বোধহয় বিবাদ। শশাঙ্কর স্বভাবটাই এমন, এক জন মানুষকে দেখে সার্বিক বিচার করতে চায়। সব জায়গায়ই যে কারেক্ট হয় তা নয়,তবে বেশির ভাগই মিলে যায়।

মেয়ের বাবা এবং কাকা বেরিয়ে এলেন তাদের রিসি করতে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে গাড়িটা রাখার মত স্পেস কোথাও নেই। গলিতে রাখলে মানুষজনের যাতায়াতের অসুবিধা না হলেও রিকশা,অটো,টোটো পাস করা মুশকিল। ভাগ্যিস ড্রাইভার নিয়ে এসেছে। শশাঙ্ক সাধারণত নিজেই ড্রাইভ করে স্বস্তি পায় বেশি। আজ অন্যরকম ব্যাপার বলে নিজে স্টিয়ারিং ধরে নি। তাই ড্রাইভারকে বলল, বড় রাস্তায় কোথাও গ্যারেজ করতে।

সাবেকি আমলের সিঁড়ি। মেয়ের বাবা দোতলায় থাকেন। এক তলায় কাকা। উপর তলায় জ্যাঠা মশাই। বছর পাঁচেক আগেই তিনি গত হয়েছেন।দুই ভাইপো পরিবার পরিজন নিয়ে উপরটায় আছে। ঘরগুলো বেশ বড় বড়।পনের ইঞ্চি করে দেয়াল। যে ঘরে বসতে দিয়েছেন সম্ভবত বেড রুম।এক ধারে বিশাল বড় খাট। ছয় বাই সাতের থেকেও অনেকটা বড়। তবে বেশ মজবুত। শাল কাঠ অবশ্যই। এছাড়া সব সাদামাটা আসবাব পত্র। দেশ এগিয়ে গেলেও এ বাড়িতে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে নি। সবই সাবেকি আমলের। তবে আপ্যায়নের ত্রুটি নেই। প্রথমেই কাঁসার গ্লাসে জল,শরবত। পিতলের রেকাবিতে ফল মিষ্টি সাজিয়ে দিয়েছে। যদিও ইদানিং ওরা মিষ্টি খায় না বললেই চলে।

শশাঙ্ক বলল, "এবার মেয়েকে নিয়ে আসুন। মেয়ের সঙ্গে একটু গল্প করি।"

ভদ্রলোক কথাটা কানে না দিয়ে ফ্যামিলির পরিচয় দিতেই ব্যস্ত। বিশেষ করে পূর্ব পুরুষের কাহিনী। ব্রিটিশ আমলে বাবা,ঠাকুরদাএবং ঠাকুরদার বাবা কি করতেন---বলে খুব গর্ব বোধ করছেন। অথচ নিজে সরকারি অফিসের কেরানি ছিলেন।

মেয়েটি সত্যিই খুব ভাল। প্রথম দেখাতেই শশাঙ্কর পছন্দ হয়ে গেল। নম্র,ভদ্র একেবারে লক্ষীমন্ত মুখ। কথাও বলে খুব আস্তে আস্তে। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল, একেই বউমা করবে।

বাবা বললেন, "আমার মেয়ে বলে বলছি না। সমস্ত রান্নাই জানে। এমন সুস্বাদু রান্না, সবাইকে তাক লাগিয়ে দেবে। ছোট ফ্যামিলি, বড় ফ্যামিলি  একাই সামলে নেবে। সেলাই-ফোঁড়াই সুক্ষ কাজে ওস্তাদ। এছাড়া গান জানে, ভালো ছবি আঁকে,একটুও বাড়িয়ে বলছি না, সর্ব গুনে গুণান্বিতা আমার মেয়ে।"

রূপবতী বলল,"হেঁসেলে তোমাকে ঢুকতে হবে না মা। সে আমাদের রান্নার লোক থাকে বরাবর। সেলাই ফোঁড়াই বা ছবি আঁকাও কাজে আসবে না। আমি চাই তুমিও ছেলের সাথে ব্যবসায় জয়েন কর। যাতে দুজনে মিলে বিজনেসের উন্নতি করতে পার। সবটাই অবশ্য নিজের তাগিদে স্বাধীন ভাবে করবে। কারো কথায় নয়। কোনও দিন হয়তো ইচ্ছে করছে না বলে গেলে না সেদিন বাড়িতেই রেস্ট নিলে। মোট কথা দশটা ছটা অফিস করবে সেই মানসিকতা রাখতে হবে। কি পারবে তো?"

মেয়ে কাঁচুমাচু করে বলল," না, আমার ব্যবসা ভাল লাগে না। চাকরি করারও ইচ্ছে নেই। আমি রান্না-বান্না ঘরের কাজই পছন্দ করি।"

এরপর আর কথা এগোয় নি। পছন্দ হয়েও শেষ রক্ষা হল না। ভদ্রতা বিনিময় করে বিদায় নিতে হল।

ক্রমশ ………………

১৩তম পর্ব পড়ুন আগামীকাল ।