‘মহাকাশ’ তো আর ‘ইণ্ডিয়া-গেটের’ বা ‘গেট-ওয়ে-অব ইণ্ডিয়ার’ আঙন নয়। এই বিশাল আঙনে ‘ঝাড়ু’ লাগানো এক সুবিশাল খরচের ব্যাপার।কয়েক কোটি ডলারের কাজ।
প্রশ্ন উঠতে পারে,এত টাকা খরচ করে মহাকাশে ময়লা পরিষ্কার করার কি দরকার,কেননা মহাকাশ তো অসীম। ঠিক কথা, কিন্তু ১৯৯৬ সালের ২৪শে জুলাই হয়েছিল মহাকাশে প্রথম অ্যাকসিডেন্ট-সেরিজ (Cerise) নামক একটি কর্মরত ফরাসি কৃত্রিম উপগ্রহ আর কোন একটি মহাকাশযানের পরিত্যক্ত টুকরোর মধ্যে। সেরিজ এর ক্ষতি হলেও কাজ করে যাচ্ছিল। এর পরে ছোটখাটো ঠোকা-ঠুকি হলেও বড় কোন অঘটন ঘটেনি।কিন্তু ২০০৯ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি ঘটল এক বড় দুর্ঘটনা: বিখ্যাত আমেরিকান দূরসঞ্চার পরিষেবা কোম্পানি মোটোরোলা’-র একটি বড় উপগ্রহ, ইরিডিয়াম-৩৩ একটি রাশিয়ান পরিত্যক্ত সামরিক সঞ্চার-প্রণালির উপগ্রহ ,’কসমস-২২৫’ এর সঙ্গে ধাক্কা খায়। এই দুর্ঘটনা ঘটে সাইবেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে পৃথিবীর ৭৬০ কিলোমিটার উপরে;ফলে দুটি উপগ্রহই সমূলে বিনষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনারও দু’বছর আগে,মহাকাশে সবচেয়ে ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটেছিল ১১ই জানুয়ারি,২০০৭ তারিখে যখন চীনা সামরিক বাহিনী উপগ্রহ রোধক (Anti-Satellite System) সামরিক পরীক্ষার অংশ হিসাবে ‘ফেঙ্গুইন-১সি’ নামক আবহাওয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষক উপগ্রহকে ধ্বংস করে দেয়। সাত’শ পঞ্চাশ (৭৫০) কিলোগ্রাম ওজনের এই ‘পোলার অরবিটিং’ (POS-Polar Orbitting Satellite) উপগ্রহটি পৃথিবীর ৮৬৫ কিলোমিটার ওপরে দুই মেরুর উপর দিয়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতো। উলটো দিক থেকে প্রচণ্ড বেগে (সেকেন্ডে ৮ কিলোমিটার) ধেয়ে আসা মারণাস্ত্র ইচ্ছাকৃত ভাবেই আবহাওয়া উপগ্রহটিকে ধ্বংস করে। এই ধ্বংসের ফলে মহাকাশে ৩০০০ টুকরোরও বেশি মহাকাশ-আবর্জনা যোগ হয়ে গেল। মহাকাশের বর্তমান ‘আবর্জনা’-র ২০ শতাংশই এই ঘটনার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল। দু’বছরের মধ্যেই এই ‘আবর্জনা’ উপগ্রহটির প্রাথমিক স্থান থেকে ছড়িয়ে গিয়ে পুরো পৃথিবীর উপরের মহাকাশে ছড়িয়ে পড়েছিল আর এইসব জঞ্জাল আগামী ক’য়েক দশকেও নেমে আসবেনা বলেই বৈজ্ঞানিকদের বিশ্বাস। সম্প্রতি,২০১৩ সালের ২২শে জানুয়ারি রাশিয়ার একটি লেজার-রেঞ্জিং উপগ্রহ ব্লিটজ (BLITZ) হঠাৎ তার উচ্চতা আর ঘূর্ণনের গতির পরিবর্তন লক্ষ করার পরে ওই প্রকল্প মাঝপথেই বর্জন করতে বাধ্য হয়। ওদের বিশ্বাস,ব্লিটজ ফ্যাঙ্গুউন এরই পরিত্যক্ত কোন অংশের সঙ্গে ধাক্কা লেগে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। হিসাব করে দেখা গেছে ফেঙ্গুউন-১সি, ইরিডিয়াম-৩৩ আর কসমস-২২৫১ এর ধ্বংস-প্রাপ্ত অংশই পৃথিবীর ১০০০কিলোমিটার নিচের মোট ‘আবর্জনা’র অর্ধেক।
তাই
মহাকাশ-পরিষ্কারের কাজ আজ অতি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। এ কাজ আর ফেলে রাখলে ভবিষ্যৎ
বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কাজ,এমনকি পৃথিবীকে মহাকাশের বিপদ থেকে রক্ষা
করার কাজও ব্যাহত হবে।
এই
মহাকাশ পরিষ্কার করার মানসেই ‘এলসা-ডি’(ELSA-d) নামের একটি বাণিজ্যিক সংস্থা
মহাকাশ বিশেষ করে,নিন্ম-মহাকাশ(LEO) পরিষ্কার করার জন্য
পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চলেছে-কিভাবে কম খরচে এই ‘সাফাই’ এর কাজ সম্পন্ন করা যায়।
ওদিকে
ইয়োরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি(Eoropean Space Agency) বা
ই এস এ (ESA)একটি
নতুন ক্লিয়ার-স্পেস-১ (Clear Space-1) নামের একটি সংস্থা গঠন করেছে।
এর কাজ হ’ল মহাকাশের ‘ময়লা’
পরিষ্কার করা। এই বিশেষ কাজের শুরু হবে ২০২৫সালে। এই উদ্দেশ্যে ই এস এ (E S A) একটি
নতুন সুইস কোম্পানির সাথে ৮৬০ লক্ষ (€86 Million) ইওরো মূল্যের একটি কন্ট্রাক্ট
সই করেছে যাতে ওরা এক একটি করে ঘূর্ণমান মহাকাশ ‘ময়লা’ সাফ করবে। এই সুইস কোম্পানিটির নাম হ’ল “ক্লিয়ার স্পেস,এস.এ (Clear Space S.A )”। ক্লিয়ার
স্পেস তিনভাবে এই ‘ময়লা’ সাফ
করবে-মহাকাশ-রোবট ছেড়ে ‘ময়লা’র
সাথে ‘র্যান্দোভা’ বা জুড়ে
যাওয়া, রোবটের লম্বা লম্বা হাত
বাড়িয়ে ‘ক্যাপচার’ বা
‘পাকড়ে-ধরা’ আর ‘কান-ধরে’ টেনে নামিয়ে এনে পৃথিবীর আবহাওয়া
মণ্ডলে জ্বালিয়ে দেওয়া। এই তিন উপায়েই অবশ্য,“ছেলে-ধরা” রোবট মহাকাশ যানটি কিন্তু নিজেও নষ্ট হয়ে যাবে।
মহাকাশ
বিজ্ঞানীরা রীতিমত চিন্তিত এই ভেবে যে ক্রমবর্ধমান কৃত্রিম উপগ্রহের সংখ্যা আর
তাদের দুর্ঘটনার ফলে একটি ভয়ানক ‘চেইন-রি-একশন’(Chain Reaction) সুরু হয়ে যাবে; অর্থাৎ
একটি দুর্ঘটনার ফলস্বরূপ যে পরিত্যক্ত আবর্জনার সৃষ্টি হবে তারাই আবার আরও
আবর্জনার জন্ম দিয়ে আরও দুর্ঘটনার সৃষ্টি করবে। এই নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল বিশেষ
চিন্তিত-ওরা ভয় পাচ্ছেন যে এভাবে চলতে থাকলে একদিন এমন আসবে যখন বৈজ্ঞানিক গবেষণার
জন্য নিন্ম-উচ্চতা বিশিষ্ট পরিক্রমণের (LEO-Low earth Orbit) জায়গা
আর পাওয়াই যাবেনা। এই ভীষণ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা
মনস্থির করেছেন যে ভবিষ্যৎ উপগ্রহ উৎক্ষেপণের সময় এমনভাবে পরিকল্পনা করা হবে যাতে
করে রকেটের শেষ পর্যায়েই সমস্ত জ্বালানী পুড়িয়ে দেওয়া চাই, যাতে করে পরে ওই রকেট ফেটে না যায় অথবা রকেটে
এত বেশি করে জ্বালানী ভরা হবে যাতে করে কাজ শেষ করে উপগ্রহটি আবার পৃথিবীর
আবহাওয়ায় ফিরে আসতে পারে।
‘রেমুভ
ডেব্রিজ (Remove
DEBRIS)’ নামের
একটি ব্রিটিশ উপগ্রহ ২০১৮-তে আই এস এস (ISS) বা আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন
থেকে ছাড়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল দুই ভাবে মহাকাশ ‘আবর্জনা’ পরিষ্কার করার:
এক, মাছ
ধরার মত জাল ব্যবহার অথবা তিমি শিকারের মত ‘হারপুন’
ব্যবহার করা। এই প্রকল্পে আরও একটি চেষ্টা করা হয়েছিল যাতে ওইসব
ভাসমান ‘ময়লা’গুলিতে কোনরকম ‘পাল’ বা সেইল (Sail) লাগিয়ে দিতে,যাতে করে
ওদের গতি কমে গিয়ে ধীরে ধীরে পৃথিবীর আবহাওয়ায় নেমে আসবে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও
‘পাল’ খাটাতেই পারা যায়নি।
ঊর্ধ্বাকাশে
অর্থাৎ ৩৬হাজার কিলোমিটার বা তারও উপরে যেখানে ‘পৃথিবীর সাপেক্ষ স্থির (Geo-Stationary)’ উপগ্রহগুলি
কাজ করে,সেখানের
অকেজো উপগ্রহগুলির ‘জঞ্জাল’ সাফ করে স্থান খালি করা তুলনামূলক ভাবে অনেকটা সহজ- কর্মজীবনের শেষ
প্রান্তে পৌঁছালে ওদের বিশ্রাম দিয়ে ‘টেনে’ আরও ৩০০ কিলোমিটার উপরে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে ওদের ‘কবর’ দেওয়া হয়। এ অনেকটা আমাদের পুরানো যুগের
বৃদ্ধ/বৃদ্ধাদের “গঙ্গা-যাত্রা’ ধরণের।
ওই গঙ্গা-যাত্রা থেকে ওরা আর ফিরে আসতে পারেনা।অনন্তকাল
ধরে ওখানেই ঘুরতে থাকে।
এইভাবে
মহাকাশকে মুক্ত রাখার এক মহা যজ্ঞ চলছে সারা পৃথিবীব্যাপী যা প্রায় ‘কল্প-বিজ্ঞানে’র কাহিনী মনে হতে পারে-কিন্তু
তা মোটেই ‘কল্প-বিজ্ঞান’ নয়।
এ
যেন ‘মর্জিনা’র “ছিঃ,
ছিঃ, ইত্তা জঞ্জাল” বলে ঝাড়ু ঘোরানো।
লেখক পরিচিতি –
ড. তুষার রায়-এর স্কুলে থাকতেই
শুরু হয়েছিল গল্প আর মহাকাশের উপর প্রবন্ধ লেখা। ওই সময়েই “শুকতারা”তে “অসীমের অন্বেষণে” প্রকাশিত হয়েছিল। সীমাহীন বলেই বুঝি মহাকাশের আকর্ষণ ছিল অসীম।
জ্যোতিঃশাস্ত্রের ছোটখাটো বই পড়ে কম দামী বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে চলতে লাগল
নক্ষত্রদের সংগে নীরব বার্তালাপ। ইচ্ছা ছিল জ্যোতিঃশাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনা করা।
কিন্তু “Need to have and Nice
to have” এর কলহে সেটা
হতে পারেনি। কিন্তু নেশা আর পেশায় দ্বন্দ্ব কখনও হয়নি। তাই এখন এই পরিণত বয়সেও
মহাকাশের আর বিজ্ঞানের অনন্ত রহস্য নতুন করে জেনে ও জানিয়ে সহজ সরল ভাষায় পরিবেষণ
করে আনন্দ পান।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর আই. আই. টি, দিল্লি থেকে পড়াশুনা ও গবেষণা,কিছুদিন অধ্যাপনা,তারপর সরকারী বৈজ্ঞানিক
দপ্তরে কার্যকালে পৃথিবীর কয়েকটি দেশেও কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে।
পঞ্চাশটিরও বেশি প্রবন্ধ
নামী বৈজ্ঞানিক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে (ইন্দোর)
আমন্ত্রিত প্রবন্ধ পাঠ করার গৌরবও ভাগ্যে ঘটেছে। বিগত দেড় বছর করোনার প্রকোপে ছাপাখানা
বন্ধ থাকার কারণে অনেক ই-ম্যাগাজিনে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ও
হচ্ছে।
দিল্লি থেকে প্রকাশিত বহুল জনপ্রিয় ই-ম্যাগাজিন, “তাৎক্ষণিক”এর ‘জানা-অজানা’ কলমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ টি জনপ্রিয়-বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি “দেশ” ওয়েব-সাইটে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং বিশেষ প্রশংসিত হয়েছে।