না, আমি
আমাদের দেশের বড় বড় শহর গুলোর জঞ্জালের কথা
শোনাবার জন্য বসিনি। বলছি মহাকাশ,মহাশূন্যের পুঞ্জীভূত
জঞ্জালের কথা। হ্যাঁ, শুনতেই মহাকাশ, মহাশূন্য
আসলে ‘জাঙ্ক’ বা
আবর্জনায় ভর্তি করে ফেলেছি আমরা অর্থাৎ মানুষেরা। মহাকাশ
কারও একার নয়,সীমাহীন গভীর সমুদ্র যেমন কোনও এক দেশের বা জাতির নয়,তেমনি অসীম মহাকাশের
উপরও আছে সকল মানব-জাতির অধিকার,আর তার শাসনও চলে আন্তর্জাতিক
আইন অনুসারে। অথচ এই নিয়ম কানুন বহাল থাকা স্বত্বেও আজ সেই মহাকাশ ছেয়ে গেছে
মানুষের বানানো ‘জঞ্জালে’। তাই
আজ, আরব্য উপন্যাসের আলি-বাবা আর
চল্লিশ চোর কাহিনীর নায়িকা, ‘মর্জিনা’-র মত কোমরে হাত দিয়ে মাথার উপর ঝাড়ু ঘুরিয়ে আধুনিক যুগের মহাকাশ
বিজ্ঞানীরাও অবাক হয়ে বলছেন,”ছিঃ,ছিঃ,এত জঞ্জাল”!
কত
রকমের আবর্জনা। একে তো ঊর্ধ্ব মহাকাশে
জন্মগত-ভাবে অর্জিত আবর্জনার বিশাল পাহাড়-প্রাকৃতিক গ্রহাণুপুঞ্জের বা অ্যাস্টরেয়েডের
ছড়াছড়ি,বিশেষ করে মঙ্গল আর বৃহস্পতির মাঝখানে রয়েছে বিশাল
গ্রহাণুপুঞ্জের বলয় (Asteroid Belt),আর নিন্ম মহাকাশে যাকে এল ই ও
(LEO) বা লোয়ার আর্থ অরবিট (পৃথিবীর
২০০০কিলোমিটার উপরে) বলে,তাতে ভরা রয়েছে মানুষের তৈরি উপগ্রহ (মৃত
বা জীবিত) আর তাদেরই ভগ্নাংশ, অকেজো
রকেট বা তার অংশ, মহাকাশ-যান বা ভগ্নাংশ অথবা
মহাকাশ-যান থেকে ছিটকে পড়া নাট-বল্টু এমন কি জমে যাওয়া রঙ ইত্যাদি। উপরের স্তরে
অর্থাৎ নিরক্ষ রেখার ৩৫,৭৮৬ কিলোমিটার উপরেও যেখানে দূরসঞ্চার
প্রণালীর (ফোন,টিভি,রেডিও) ‘জিও-ষ্টেশনারী’(Geo Stationary) উপগ্রহগুলি
ঘোরে সেখানেও রয়েছে অনেক ‘মৃত’ বা ‘অর্ধ-মৃত’ উপগ্রহের
কঙ্কাল।
আমেরিকার
মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’ বলছে, লক্ষ-কোটি
এইসব ‘জাঙ্ক’-এ, বিশেষ
করে, নিন্ম মহাকাশ ছেয়ে রয়েছে।
আমেরিকার মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ২০২১-এ আকারে চার
ইঞ্চির চেয়ে বড় জঞ্জাল পেয়েছে ১৫ হাজার টুকরোরও বেশি। ওরা মনে করেন যে ০.৪ থেকে ৪
ইঞ্চি মাপের ‘জঞ্জাল’-ই
ঘুরে বেড়াচ্ছে কমসে-কম ২লক্ষ টুকরো,আর ওর থেকে ছোট টুকরো ঘুরছে
আরও কয়েক’শ লক্ষ। মনে রাখতে হবে যে মাধ্যাকর্ষণ
বা অন্য বাধা-বন্ধনহীন মহাকাশে প্রচণ্ড গতিতে (সেকেন্ডে প্রায় ৮ কিলোমিটার বেগে) ঘূর্ণমান
একটি ছোট স্ক্রু-ও অন্যান্য যানের ভীষণ ক্ষতি করতে পারে।
এদের আঘাতের সম্ভাবনার কারণেই মহাকাশের আই এস এস (আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন) এর
অবস্থান মাঝে মাঝে বদলে উপর নিচে করতে হয়েছে আর মহাকাশ যানের জানালার ভাঙা কাঁচও
কয়েকবার পাল্টাতে হয়। এই বছরের নভেম্বর মাসেই আই এস এস যখন রাশিয়ান উপগ্রহের
ভগ্নাংশের ‘মেঘে’-র মধ্য দিয়ে
যাচ্ছিল তখন আই এস এস এর সমস্ত ‘ডকিং’ দরজাগুলি পুরা বন্ধ করে মহাকাশচারীরা নিজের নিজের জায়গায় বন্ধ হয়ে ছিল। এই কারণেই আই এস এস এ (ISS) আসা-যাওয়া করার ‘সাট্ল’যান পেছন দিক
থেকে চলে (যেমন মালগাড়ির ইঞ্জিন কখনও কখনো উলটো মুখো চলতে দেখা যায়) যার
ফলে যাত্রী অ্যাসট্রোনটদের কোন ক্ষতি না হয়। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল,অ্যাস্ট্রোনটরা থাকে মহাকাশ
যানের সামনের দিকে। এই কারণেই এই সতর্কতা অবলম্বন। এমন সব সর্বনেশে আঘাত থেকে
বাঁচার জন্যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে সমুদ্র-গামী জাহাজের ন্যায় “লাইফ-বোট”ও লাগানো আছে যাতে গম্ভীর বিপদের
সম্ভাবনার সময়ে আই এস এস এর নভচরেরা এই সব “সয়ুজ
মহাকাশ-যানে” চড়ে আই এস এস ত্যাগ করে নিজেরদের বাঁচাতে
পারবেন।
মহাকাশের
এই অসংখ্য ‘অকেজো’ বস্তু
কতদিনে নেমে আসবে তা নির্ভর করে বস্তুটা কত ওপরে আছে আর
তা কত বড়। যদিও কিছু ‘আবর্জনা’ আমাদের
পৃথিবীর আবহাওয়ায় নেমে এসে জ্বলে ছাই হয়ে যায় তবুও কিছু কিছু জঞ্জাল অক্ষত
অবস্থায়ও পৃথিবীর উপরে নেমে আসে। সাধারণত, ছ’শো কিলোমিটারের নিচে থাকা বস্তুগুলোর নেমে আসতে কয়েক বছর সময় লাগে আর
যেগুলি এক হাজার কিলোমিটারের বেশি উপরে রয়েছে তাঁরা ওখানেই ঘুরবে কয়েক শতাব্দী
পর্যন্ত! তাই ৩৬ হাজার কিলোমিটার উপরে ঘূর্ণমান আপাত স্থির (Geo-Stationary) উপগ্রহগুলি শতাব্দীর পর
শতাব্দী ওখানেই ঘুরতে থাকবে,যদিনা কোন উপায়ে ওদের নামিয়ে নিয়ে আসা যায়
বা ওখানেই ধ্বংস করা যায়। আমেরিকার মহাকাশ-বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা ‘নাসা’র মতে
নিন্ম-মহাকাশে অবস্থা এতই খারাপ যে কিছুদিন পরে নতুন উপগ্রহ নিক্ষেপ করার সময়
মন-মত স্থান পাওয়াও মুস্কিল হয়ে পড়বে। এই কারণেই বিমান-বন্দরের হাওয়াই জাহাজ চলাচল
নিয়ন্ত্রনের জন্য যেমন ‘এ টি সি’(ATC)বা
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল অফিস থাকে তেমনিই একটি আন্তর্জাতিক সরকারী সংস্থা এই কাজ
করে চলেছে। আবার একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, আই
এ ডি সি (IADC-Inter
Agency Space Debris Coordination Committee) গঠন
করা হয়েছে যারা মহাকাশে ‘জঞ্জাল’ অপসারণ আর উন্মুক্ত মহাকাশ তৈরি করার কাজ করবে।
এই
বছরের (২০২১) ১লা জানুয়ারির হিসাব অনুসারেই মোট ৩৩৭২টি উপগ্রহ আকাশে ‘চরে’ বেড়াচ্ছে। এদের মধ্যে ১৮৩২-টিই সঞ্চার-প্রণালির,৯০৬টি পৃথিবীর ‘পর্যবেক্ষণ’,৩৫০টি টেকনিক্যাল উন্নতির প্রয়োজনে,১৫০টি জি
পি এস এর জন্য ১০৪টি মহাকাশ-বিজ্ঞান আর পর্যবেক্ষণের জন্যে আর ৩০ টি আর্থ-সাইন্স
বা মহি-বিজ্ঞান জাতিয় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেবল মাত্র সন ২০২০-তেই ১২৮৩টি নতুন উপগ্রহ ছাড়া হয়েছিল। আর এই বছরে (২০২১)-এ তো উপগ্রহ ছাড়ার সব রেকর্ড ভেঙে এপ্রিল
পর্যন্তই ৮৫০ টি উপগ্রহ ছাড়া হয়েছে। তাহলেই বোঝা যাচ্ছে মহাকাশ উপগ্রহ, গ্রহাণুপুঞ্জ,মানুষের
পাঠানো রকেট,মহাকাশ-যান
আর ওদের ভগ্নাংশে কেমন ‘খচাখচ’ ভরে গেছে। তিমত ‘যান-জট’ বলা চলে। অবস্থা এমনই খারাপ হয়েছে যে গত ৩০শে নভেম্বর (২০২১)- এ নাসা আই এস এস এর মহাকাশচারীদের একটি পরিকল্পিত
জরুরী মহাকাশ-ভ্রমণ বাতিল করতে হয়েছে-দু’জন
অ্যাস্ট্রোনট বেরিয়ে এসে আই এস এস এর একটি অ্যান্টেনা রিপেয়ার করার কাজ স্থগিত
করেছে,কারণ
ওরা জানতে পেরেছে একটি ঘূর্ণমান ‘জাঙ্ক’ আই এস এস এর বিপদজনক রকম কাছে এসে পড়েছে। কত কাছে তা নির্ণয় করার সময়
না থাকায় ওরা বাধ্য হয়ে নভ-চরদের নির্দেশ দিয়েছেন নিজের নিজের ‘ক্যাপসুলে’-ই বন্দী
হয়েই থাকতে কিছু দিন। এই পপ্রথম বারের মত হল যখন অ্যাস্টোনটদের জরুরী রিপেয়ার
কাজের জন্যও বাইরে আসা বন্ধ করতে হল। মহাকাশের ‘ভিড়’
আরও বেড়ে যাচ্ছে বেসরকারি কতকগুলো সংস্থা যেমন ‘স্পেস-এক্স’ ,’ওয়ান-ওয়েভ’ ইত্যাদি। এরা সারা পৃথিবী-ব্যাপী দ্রুত ইন্টারনেটের জন্য এক বিশাল ‘কৃত্রিম উপগ্রহের তারকা-মণ্ডলী’ বানাচ্ছেন (Mega-Constellation of Internet
Satellites)। এরই
প্রয়োজনে ওঁরা অসংখ্য উপগ্রহ ছেড়ে যাচ্ছেন মহাকাশে।
তাই
এখন খুব জরুরী প্রয়োজন হলোঃ মহাকাশে মর্জিনার “ঝাড়ু”।
(ক্রমশ)
২য়
পর্ব প্রকাশিত হবে আগামী রবিবার (১৯.১২.২০২১)
লেখক পরিচিতি –
ড. তুষার রায়-এর স্কুলে থাকতেই শুরু হয়েছিল গল্প আর মহাকাশের উপর প্রবন্ধ লেখা। ওই সময়েই “শুকতারা”তে “অসীমের অন্বেষণে” প্রকাশিত হয়েছিল। সীমাহীন বলেই বুঝি মহাকাশের আকর্ষণ ছিল অসীম। জ্যোতিঃশাস্ত্রের ছোটখাটো বই পড়ে কম দামী বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে চলতে লাগল নক্ষত্রদের সংগে নীরব বার্তালাপ। ইচ্ছা ছিল জ্যোতিঃশাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনা করা। কিন্তু “Need to have and Nice to have” এর কলহে সেটা হতে পারেনি। কিন্তু নেশা আর পেশায় দ্বন্দ্ব কখনও হয়নি। তাই এখন এই পরিণত বয়সেও মহাকাশের আর বিজ্ঞানের অনন্ত রহস্য নতুন করে জেনে ও জানিয়ে সহজ সরল ভাষায় পরিবেষণ করে আনন্দ পান।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর আই. আই. টি, দিল্লি থেকে পড়াশুনা ও গবেষণা,কিছুদিন অধ্যাপনা,তারপর সরকারী বৈজ্ঞানিক দপ্তরে কার্যকালে পৃথিবীর কয়েকটি দেশেও কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে।
পঞ্চাশটিরও বেশি প্রবন্ধ নামী বৈজ্ঞানিক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসে (ইন্দোর) আমন্ত্রিত প্রবন্ধ পাঠ করার গৌরবও ভাগ্যে ঘটেছে। বিগত দেড় বছর করোনার প্রকোপে ছাপাখানা বন্ধ থাকার কারণে অনেক ই-ম্যাগাজিনে বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ও হচ্ছে।
দিল্লি থেকে প্রকাশিত বহুল জনপ্রিয় ই-ম্যাগাজিন, “তাৎক্ষণিক”এর ‘জানা-অজানা’ কলমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ টি জনপ্রিয়-বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি “দেশ” ওয়েব-সাইটে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে এবং বিশেষ প্রশংসিত হয়েছে।