প্রথম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন
একটি
কালো মেয়ের
গল্প
পর্ব - ২
চুঁচুড়া
কি কথার কি উত্তর। নীলিমা শুনে বিস্মিত, নির্বাক। কথাগুলো এ বয়সেও কতটা আঘাত দিয়েছিল, একমাত্র নীলিমাই জানে। এ কাটা-কাটা বাক্যবাণ অহরহ বুকের গভীরে খোঁচা মারত। কত রাত যে বিছানায় শুয়ে শুয়ে কেঁদেছে, বলার নয়। এখনও ভেবে পায় না, একই মায়ের সম্তান সব। তবে কেন এমন বিমাতৃসুলভ আচরণ। তবু মেয়েটি কিন্তু দমে যায়নি। সংসারের সমস্ত কাজকর্ম করেও বাকি সময়টা পড়াশুনার দিকে মনপ্রাণ সঁপে দিয়েছিল। জীবনে তাকে যে বড় হতেই হবে। তার তো আর কোন গতি নেই। ঘর, বর, যখন সে পাবে না, তখন তো একটা দিকে অন্তত ধ্যান দিতেই হবে। এইভাবেই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও মেয়েটি ক্লাশের মধ্যে সেরা রেজাল্ট করে এগোতে লাগল। শত বাধাতেও পিছু হটলে চলবে না। এমন লড়াকু মনোভাবই তাকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
আরেকবার বেগ পেতে হয়েছিল উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর। এইচ.এস.-এ ভালো রেজাল্ট করা সত্ত্বেও তাকে কিছুতেই কলেজে ভর্তি হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না। মা যে রাজি হবেন না, তা সে আগেই জানতো। প্রতিবারই তাই হয়। মা, ওর পেছনে অর্থ খরচ করার পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্তু এবার বাবাও মায়ের সঙ্গে যোগ দিলেন। বাবা বললেন, “দেখ মা, আমি, আর দেড় বছর বাদে চাকরি থেকে অবসর নেব। তোদের তিনজনের পড়ার খরচ চালানো আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়। সবাই তোরা এখন উচু ক্লাশে উঠে গেছিস। খরচও অনেক বেড়ে গিয়েছে। আবার তোদের বিয়ে থা আছে। তারও বিশাল অর্থের দরকার । এতকিছু কিভাবে সামাল দেব, এসব ভেবেই আমার ঘুম হয় না। তুই মা এখানেই পড়ার ক্ষান্ত দে। আর পড়তে হবে না।”
মানুষ যখন কোন কিছুর জন্য লড়াই করে, তার পাশে অনেকে না থাকলেও অন্তত এক, দুজনের সমর্থন থাকা চাই। না হলে তার সেই মনোবল থাকে না। দুর্বল হয়ে পড়ে। লড়াই করতেই পারে না। এতদিন বাবা প্রকাশ্যে না হলেও নীরবে তাকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছেন। যার ফলে তার একটা জোর ছিল। সেই জোরেই সে এতটা আসতে পেরেছে। এবার সে অথৈ জলে পড়ল। কি করবে সে ? তার কি সত্যিই আর পড়াশুনা হবে না ! এই ভেবেই মেয়েটা খুব মুষড়ে পড়েছিল। রাতে বিছানায় শুয়েও ঘুম আসতো না। কত আশা নিয়ে সে এগয়ে যাচ্ছিল। তার জীবনে আর কিছু না হোক, পড়াশুনাটা শেষ অবধি চালিয়ে যাবে-এটাই তার লক্ষ্য ছিল। সেটাও কি পুরণ হবে না!
একটা কথা আছে না - “যার কেউ নেই তার ভগবান আছেন।' বলতে গেলে ভগবানই তাকে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। রেজাল্ট বের হওয়ার দিন চারেক পরে এক বিকেলে, ওরই ক্লাসের এক বন্ধু কাকলি এল ওদের বাড়ীতে । কোন্ কলেজে ভর্তি হবে, আর কোন্ কোন্ কলেজ থেকে ফরম তুলবে, এসব জানতে। সেই দিনই বন্ধুটি সব কথা শুনে তাকে পরামর্শ দেয়, যেভাবেই হোক পড়াটা চালিয়ে যেতে । দরকার হলে টিউশানি করে পড়ার ধরচ মেটাতে হবে। টিউশানি করেও যে পড়া যায়, সেটা ওর মাথায় ছিল না। একটু আশার আলো দেখতে পেল। ক'রাত অনিদ্রার পর সে রাতেই ভালো ঘুমুতে পেরেছিল।
প্রথম টিউশানিটা কাকলিদের বাড়িতেই শুরু করে। ওর ছোট ভাই ও বোন, একজন ক্লাশ ফাইভ, আরেকজন ক্লাস সেভেনে পড়ত। সেই শুরু। ওদের বাড়ি থেকেই অ্যাডভান্স নিয়ে কলেজে ভর্তিও হয়ে যায়। এরপর আরো একটা টিউশানি ধরে নেয়। তখন থেকেই দুটো টিউশনি করে সে কলেজ,ইউনিভার্সিটির পড়া শেষ করে। বাড়িতে মায়ের আপত্তি থাকলেও বাবা পরে সম্মতি দিয়েছেলেন। মেয়ের পড়াশুনার প্রতি একাগ্রতা, তার উপর ভালো রেজাল্ট দেখে, মনে মনে বোধহয় বাবা কামনা করতেন, না আমার এই মেয়েটা পড়াশুনো চালিয়ে যাক। লেখাপড়া শিখে জীবনে কিছু একটা করুক। শেষের দিকে মা-ও কিছু বলতেন না, ভাবখানা এমন যা করছে করুক। এরমধ্যে তার বড় বোন এবং ছোট বোনেরও বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এখন বাড়িতে মেয়ে বলতে নীলিমা একা। তার দুই ভগ্নিপতি বাবার মত সরকারি অফিসের করণিক। মধ্যবিত্ত পরিবার। মোটামুটি ভালোই আছে তারা। বাবাও বছর দুয়েক আগে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। নীলিমা এম.এ পাশ করে এম.ফিল করেছে। মাস ছয়েক আগে একটা কলেজে লেকচারার পদে চাকরি পায়। বাড়ির.পরিবেশ আগের মত নেই। নীলিমার গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। এখন বাবা, মা উভয়েরই কোন সমস্যা হলে নীলিমার কাছেই পরামর্শ চায়, তার বিচারবোধ, জ্ঞান অনেক বেশি। তার সিদ্ধান্তই কার্ধ্করী হয়।
এদিকে নীলিমা তার. নিজের কলেজেরই এক অধ্যাপক বন্ধুকে ভালোবেসে ফেলেছে। বিয়ে করতে চায়। সমস্যা বাবা, মাকে নিয়ে। তাদের কে দেখবে। এই নিয়ে মনের ভিতর এক টানাপোড়েন চলছিল। কী করবে সে, শেষে তার নিকট জনেরাই এর সমস্যার সমাধান করে দেয়। বিয়েটা ঠিক হয়ে যায়।
(৩)
আজ নীলিমার বিয়ে। বিয়ে হচ্ছে বেশ ধুমধাম করে। সকাল থেকে সানাই বাজছে। আত্মীয়স্বজন, কুটুম মিলে বাড়িটা গমগম করছে। পাত্র এম.এসসি., পি.এইচডি। কলেজের অধ্যাপক। নাম অনিমেষ গুপ্ত। স্থায়ী নিবাস শিলিগুড়ি। বয়স ছত্রিশ, উচ্চতা পাঁচ ফুট নয়। সুদর্শন। আর কি চাই। :. এত জীকজমক করে বিয়ে করার ইচ্ছে নীলিমার একদম ছিল না। এর প্রধান
উদ্যোক্তা নীলিমার দুই বোন এবং দুই ভগ্নিপতি । তারাই গত ছ'মাস ধরে দু পক্ষের মধ্যে আলোচনা, কথা চালাচালি করে একটা পাকাপাকি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছে। এতে সকলেই খুশি। জামাইবাবাদের ব্যবস্থাটা মা, বাবার খুব মনঃপৃত হয়েছে। এর থেকে ভালো আর হয় না।
এতদিন নীলিমাদের বাড়িটা ছিল একতলা। এই ছয়মাসের মধ্যে কিচেন, বাথরুম সবই করা হয়েছে । গত দুদিন.:আগে
পুরো বাড়িটা রং করা শেষ হল। সিদ্ধান্ত হয়েছে অনিমেষ বিয়ের পর ভাড়া.বাঁড়িতে
না থেকে নীলিমাদের বাড়িতেই থাকবে। বাস্তব পরিস্থিতি. এবং মানবিক দায়িত্বের কথা উপলব্ধি
করেই অনিমেষ এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। অতএব আর সয়স্যা রইল না। অনিমেষের একটা দাবি
ছিল যে বিয়ের পরদ্বিন সে শিলিগুড়ি ফিরে যাবে । ফুলশয্যা নিজের বাড়িতেই হবে এবং শিলিগুড়িতে
পঁচিশ দিন থাকবে। স্ত্রীর সঙ্গে বাড়ির আপনজনদের সাথে ঘনিষ্ঠতা যাতে বৃদ্ধি পায়, তার জন্যই এই দাবি।
তথাস্তু । তাতেই রাজি। ঠিক হয়েছে, এ সময়টা নীলিমার দু'বোন মা-বাবার কাছে থাকবে। জামাইবাবাদের ব্যবস্থামত বিয়েটা সুন্দরভাবে সম্পন্ন
হয়।
শিলিগুড়ি থেকে ওরা ফিরে আসার একদিন পরের ঘটনা । রাত আটটা নাগাদ ওরা তিন বোন একত্রিত হয়েছে। অনেকদিন বাদে একসঙ্গে বসে খোশমেজাজে গল্পে মশগুল। পাঁশে বিছানায় বাবা, মা দু'জনেই বসে আছেন। ছোটবোন তনিমা নীলিমাকে বলল “মেজদি, তোর কপালটা কিন্তু খুব ভালো। এত ভালো লাগছে, কী আর বলবো। যেমন রাজপুত্রের মত বর পেয়েছিস, তেমনি জামাইবাবুর ব্যবহারও অমায়িক।” বড়বোন চন্দ্রিমা '
বলল, সত্যিরে নীলি, ভগবান
তোকে দুহাতে উজার করে দিয়েছেন। এতটুকু কার্পণ্য করেন নি। তোকে দেখে আমারই হিংসে হচ্ছে।” বাবা বললেন, “ভগবান কী এমনি এমনি দিয়েছেন-রে। আমাদের
নীলিমা ভগবানের কাছ থেকে জোর করে আদায় করে নিয়েছে। ওর এতদিনের পরিশ্রম, একনিষ্ঠ অধ্যাবসায় বিফলে যেতে পারে কখনো?”
মা বললেন, “ও আমার ছেলের কাজ করে যাচ্ছে রে। গতবারে
আমি যেকঠিন অসুখে পড়লাম, নীলিমা যদি সঙ্গে সঙ্গে নার্সিংহোমে
ভর্তি করিয়ে ভালো ডাক্তার না দেখাতো, আমি আজ বেঁচে থাকতাম ?
কবেই মরে যেতাম। ছোট থেকে ও যা করে আসছে, তার তুলনা
হয় না। এমন মেয়ে লাখে একটা হয় না কিনা সন্দেহ। আমি বলে দিচ্ছি, ঈশ্বরের কৃপা ও সারা জীবন পাবে। তার উপর আমাদের আশীর্বাদ তো আছেই।”
এ সমস্ত কথা নীলিমার শুনতে ভালোই লাগছিল। কিন্তু মায়ের শেষ কথাগুলো শুনে সে যেন আরো উচ্ছসিত। মায়ের এমন প্রাণখোলা আশীর্বাদ আগে কখনও পেয়েছে কিনা মনে করতে পারছে না।ওর জীবান আর কিছু হোক বা না হোক, এতেই নিজেকে ধন্য মনে করছে। মায়ের আশীর্বাদ ওর জীবনে বড় পাওনা । এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছুহয় না। (সমাপ্ত)
লেখক পরিচিতি:
জন্ম পৈত্রিক
বাড়ি বর্ধমান জেলার কাটোয়া-র পানুহাট-এ। পড়াশুনা কাটোয়া কলেজ। বর্তমান নিবাস হুগলী
জেলার চুঁচুড়ায়। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন। তাঁর প্রথম গল্প---চেতনা।
প্রকাশিত হয় ছোটদের পত্রিকা "শুকতারা"য়, ১৯৯৬ এপ্রিল সংখ্যায়। তারপর
বড়দের পত্রিকা--দেশ, কালি ও কলম, শিলাদিত্য,
শুভমসাময়িকী, তথ্যকেন্দ্র, উৎসব, কথাসাহিত্য, কলেজ স্ট্রিট, দৈনিক স্টেটসম্যান, যুগশঙ্খ, একদিন,সুখবর, সংবাদ নজর, খবর ৩৬৫ দিন এবং লিটল ম্যাগাজিন-এ
নিয়মিত লেখেন। তিনটি গল্প সংকলন ও একটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। "
শতানীক" (ষাণ্মাসিক) সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন।

