ধারাবাহিক উপন্যাস – প্রতি বৃহস্পতিবার ।
পর্ব – ১২৪
And if, O
my love, my heart is breaking, please
neglect my
cries and I will spare you. Deep
in, Time's
grave,you lie still.
রম্যানিকে এয়ারপোর্টে ছেড়ে
দিয়ে একাই ড্রাইভ করে বাড়ি ফিরছিল
বাভ্রবি--। রম্যানি আর ভাইদার জীবন এভাবে,জীবনের
শেষ প্রান্তে এসে মোড় নেবে কোনও দিন ভাবতে পারেনি বাভ্রবি। রম্যানি সেপারেশনে,থাকতে
চাইছে--। আলাদা একটি বাড়িতে--। ভাইদা কি এতেও নিজের সেক্রেটারিকে দত্তক নেওয়ার
ব্যাপারে মত পালটাবে না? মানুষ চরিত্র সত্যিই অগম্য,অবোধ্য।রম্যানি
এই শেষ বয়সে এসে একা একা থাকতে পারবে? ফিনানশিয়েলি
সি ইজ সাউন্ড। কিন্তু এই বয়সে এসে এরকম,একাকিত্ব--।রম্যানির জন্য
বাভ্রবির মনটা বিষণ্ন হয়ে যায়--। ও আর রম্যানি পিঠোপিঠি দুই
বোন--গ্রামের বাড়িতে, প্রতিবার বাড়ির দুর্গাপুজোর
সময় ওরা মা বাবার সাথে সেখানে যেতো। রাঙামাটি--বরাক উপত্যকার সেই গ্রামটির বাড়ির পুজোর সাথে মিশে আছে শিউলি
ফুলের ভোর,গর্জন, তেল
মাখানো প্রতিমা--ষষ্ঠীর দিনে পুরোহিত দাদুর মায়ের প্রাণসঞ্চারের সেই ছবি। দিদি
বরাবরই ছিল ভীষণ ভক্তি পরায়ণ।বাভ্রবির
কাছে পুজো ব্যাপারটা থেকে উৎসব হিসেবেই বেশি প্রাধান্য পেতো। পুজোর বিজয়া
দশমীর দিন বিসর্জনের আগে ,দর্পণ, বিসর্জনের
পর,দেবীকে বরণ করার সময় সিঁদুর খেলার অংশটুকু বাভ্রবির একেবারেই নাপসন্দ ছিল। অথচ রম্যানি সেটা ভীষণভাবে এনজয় করতো--না
ঠিক এনজয় করতো বলা ঠিক হবে না,ও
ভক্তিভাবে সেই সিঁদুর কপালে পরতো--। বাভ্রবি একদিন ঠাম্মি কে এই সিঁদুর খেলা নিয়ে
প্রশ্ন করেছিল। যতদিন দাদাই বেঁচেছিলেন,ঠাম্মি
আস্ত কপাল জুড়ে একটি লাল সিঁদুর টিপ পরতেন--আর ছুটিতে রাঙামাটির এই বনেদি বাড়িতে
এলে সেই টিপ দেখতে দেখতে বাভ্রবির
সকালবেলার সূর্য কে মনে পড়ত। দাদাই হঠাৎই হার্ট এটাকে চলে যাবার পর
ঠাম্মির কপাল থেকে সেই ভোরের সূর্যের মতো লাল মতো গেল--টিপ মুছে আর । ঠাম্মি খেলেন
না--দেবী বরণে অংশ নেন না--সিঁদুর খেলা । মাকে, মা
জিজ্ঞেস করেছিল, মুছে চোখের জল-- : বরণ আর
সিঁদুর খেলায় শুধুই এয়োস্ত্রী রা অংশ নেন, বাবি
।"বাভ্রবি তখন ক্লাস টেনথে পড়ে। স্টাবার্নের মতো প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে
যেতো—
-- : এয়োস্ত্রী
কাকে,বলে?"
--:"যে নারীর
স্বামী বিদ্যমান,--"
--"বাহ্।বাহ্।
তাহলে এয়ো পুরুষ ও নিশ্চয়ই তাকে,বল যাদের
বউ বিদ্যমান? যাঁদের স্বামী নেই তারা
সিঁদুর পরতে পারে না,তারা দেবী।
বরণ করতে পারে না--। তাহলে
আমাদের পুরুত দাদুর ও তো বউ নেই, তিনি কি
করে দেবী পুজো করেন?"পাশে বসে দুব্বো বাছছিলেন,মাদের ন
কাকিমা--গা ভর্তি গয়না আর মুখ ভর্তি পান। পানের ডাবরে পিক ফেলে সেই ন কাকিমা অবাক বিস্ময়ে বললেন--"বাবা।
বাবা।সুপু (ওদের মার নাম সুপর্ণা),তোর ছোট
মেয়েটা তো ট্যাকাস ট্যাকাস করে কথা বলে রে--। তোর বড়ো মেয়েটা কিন্তু খুব লক্ষ্মী, মন্ত। কি
সুন্দর পুজোর কাজটাজ করে, মুখে কথাটি
নেই--। বলি, এই মেয়ে কি সাহেবদের স্কুলে,পড়ে রে
সুপু?"
ওদের মা কিছু বলার আগেই
বাভ্রবি আবার মার ন কাকিমার ভাষায় ট্যাকোস ট্যাকোস করে বলে উঠল।
--:"দিদি ও
আমার মতো সাহেবদের স্কুলে পড়ে--। আমরা দু বোন একই স্কুলে পড়ি।"
ন কাকিমা গালে হাত রেখে
বোধহয় কথা বলতেই ভুলে গিয়েছিলেন।
বাভ্রবি তখন আরো বিজ্ঞের মতো
ওর পনী টেলে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছিল--"এই যে ন দিদা আছেন,কই, ন দিদাকে
তো তোমরা কোনও দিন বরণে ডাকো না--"
ন দিদা ম্লান হেসে,বলে
ছিলেন--"দিদি ভাই, আমি যে বালবিধবা রে--। আমার
তো এসব কাজে যেতে নেই রে--"
বাভ্রবি একটু থেমে ভুরু
কুঁচকে
বলেছিল--"বাল বিধবা
মানেটা কি?"
ন দিদা এবার হেসেই জবাব দিয়েছিলেন--"বাল বিধবা মানে আমার বিয়ে
হয়েছিল ১২ বছর বয়সে--"
--::হোয়াট?"বাভ্রবির
মুখে যেন আর কথা সরছে না
--:"১২ বছরে?১৮ বছরের
আগে তো মেয়েদের বিয়ে দেওয়া ইললিগ্যাল--তোমার মা বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়নি?"এবার
সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল। রম্যানি
তাড়াতাড়ি বলল--"এই বাবি,কি বলছিস, সব আবোল
তাবোল--"
বাভ্রবি রম্যানির হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ন দিদার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
বলল--"ইলিগ্যাল কাজের জন্য জন্য শাস্তি তো হওয়াই উচিত।"ন দিদা ম্লান
হেসে বললেন,--:"দিদিভাই, তখনও এই
আইন পাশ হয়নি।"
বাভ্রবি একটু থিতিয়ে গিয়ে
বলল--"আচ্ছা বেশ--কিন্তু বিধবা বিবাহ আইন তো পাস হয়েছিল। ঈশ্বর চন্দ্র
বিদ্যাসাগর তো তোমাদের মতো যারা বালবিধবা তাদের আবার বিয়ে দেবার জন্য লড়াই করে
আইন পাশ করেছিলেন। তুমি আবার বিয়ে করলে না কেন?"
বাভ্রবির এই প্রশ্ন যেন চাবুকের মতো উপস্থিত মহিলা মহলের
উপর আছড়ে পড়েছিল। সবাই চুপ করে
গিয়েছিল।
বাভ্রবি কঠিন হেসে
বলেছিল--"জানি তোমাদের মুখে এ প্রশ্নের জবাব মিলবে না--। যেমন একটা মানুষের
বেঁচে থাকার উপর কোনও মহিলার দেবী বরণের
অধিকার জন্মায় না। এ ভুল। "
বাভ্রবি কোনও দিন সিঁদুর
খেলায় অংশ নেয়নি। এটা একেবারেই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কুফল বলে মনে হয়
ওর।
উড়াল পুলে উঠবার মুখে
প্রচণ্ড ভিড়--। গাড়ি থামিয়ে একজন বাইক আরোহীকে দেখে জানালার কাচ নামিয়ে
জিজ্ঞেস করল--"ক্যা হুয়া ভাইসাব?ইতনি ভিড়, কিউ হ্যাঁয়?"
বাইক আরোহী হাত উলটে জবাব
দিল
--"পতা নেহি
ম্যাডাম জি--শোনা হ্যায় অ্যাক্সিডেন্ট
হুয়া হ্যাঁয়--এস ইউ ভি নে এক
বাইক কো ধাক্কা মারকে ভাগ গয়া--"
--"ওহ্
গড--কোঈ কেজুয়ালটি তো হুয়া নেহি হসপিটাল,--"
বাইক আরোহী তেমনই হাত উলটে,জবাব দিল।
--"পুলিশ কো
খবর নেহি মিলা--কোঈ জিম্মেদাররি নেহি লেনা চাহতে--"
বাভ্রবির মুখ আবার কঠিন হয়ে
উঠল। সেই একই কাহানি। এই দেশ কবে জাগবে?বাভ্রবি
নিজের মোবাইল খুলে ডায়াল করে--"হ্যালো, পুলিশ
স্টেশন--।"
ক্রমশ …………
১২৫তম পর্ব
পড়ুন আগামী বৃহস্পতিবার
লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখিকার পরিচিতি
–
জন্ম-কলকাতায় । আসামের বরাক উপত্যকায় বড় হয়ে ওঠা ।
প্রকাশিত
গ্রন্থ
১--সাপ শিশির
খায় (গল্প গ্রন্থ)
২--দেবী দহন--(কবিতা গ্রন্থ)
.jpg)