কয়েকদিন আগে ফেসবুকে এক লেখিকা জানিয়েছেন তাঁর একটি গল্পকে পুরোপুরি
আত্মসাৎ করে আরেকজন নামি লেখিকা আরেকটি গল্প লিখে ফেলেছেন। কিছুদিন আগে আমার
পরিচিত আরেকজন লেখিকা আমাকে জানিয়েছিলেন তাঁর লেখা একাধিক গল্পের প্লট বা আইডিয়া
চুরি করে আরেকজন লেখিকা গল্প লিখেছেন কোন নামি বাণিজ্যিক পত্রিকায়। ফেসবুকে
দু’একজন পত্রিকা সম্পাদক জানিয়েছেন তাঁদের পত্রিকায় যে লেখা জমা পড়ছে তার মধ্যে
বেশ কিছু লেখা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাহায্যে লেখা
হয়েছে। এটাকে হয়ত কুম্ভীলক বৃত্তি বা প্লেজিয়ারিসম বলা চলেনা কিন্তু কৃত্রিম উপায়ে
তৈরি এই লেখাগুলোকে মৌলিক বা নিজের লেখা বলে চালিয়ে দেওয়া অসৎ কাজের মধ্যেই পড়ে।
কনসাইজ অক্সফোর্ড ডিকশানারিতে ‘ Plagiarize’ ( যা থেকে প্লেজিয়ারিজম শব্দটি এসেছে) তার অর্থ’ to take (the work or an idea of someone
else) and pass it off as one’s own. অর্থাৎ কারও কাজ বা ভাবনাকে নিজের বলে চালিয়ে দেওয়াকে প্লেজিয়ারিজম
বলে। শিল্প-সাহিত্যে এবং অন্যান্য সৃষ্টিমূলক কাজে কুম্ভীলক বৃত্তির নিদর্শন
খুঁজতে গেলে একটি পাঁচশো পাতার বই লেখা যেতে পারে। ইংরেজি সাহিত্যের মহান কবি জেওফ্রে
চশারকে ‘prince of plagiarist’ আখ্যা দেওয়া হয় কারণ Canterbury Tales-এ
তিনি যেসব গল্প বলেছেন তার মধ্যে অনেকগুলোই তিনি ধার করেছেন ক্লাসিক ইতালিয়ান, ফরাসি
এবং ইংরেজ লেখকদের লেখা থেকে। মার্টিন লুথার কিং ১৯৫৫ সালে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে
যে doctoral
dissertation জমা দিয়েছিলেন তার মধ্যে ছিল অন্য একজন ছাত্রের রচনা।
মেলানি ট্রাম্পের ভাষণে অন্য একজনের ভাষণের অংশ চলে এলে তার জন্য তাঁকে চোর বলার
সাধ্য কার আছে। তিনি তো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের স্ত্রী!
শিল্প-সাহিত্যে চুরির ইতিহাস লিখবার কোন ইচ্ছা নেই আমার। কিন্তু
দুইজন পরিচিত লেখিকার গল্প চুরি হওয়ার দুঃখে তাদের এবং আরও যারা এই অপরাধের শিকার
হয়েছেন তাদের সান্ত্বনা দিতেই আমি গত শতাব্দের শেষ দশকে এবং এই শতাব্দের প্রথম
দশকের দুটো লেখা চুরির ঘটনা উল্লেখ করব এখানে।
প্রথম ঘটনা – গত শতাব্দের শেষ দশকে অনেক ভারতীয় লেখক ইংরেজিতে উপন্যাস
লিখতে শুরু করেছিলেন । এই অধমও তাঁদের মধ্যে একজন। ১৯৯৩ সালে পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া
প্রকাশিত ইন্দ্রানী ঐকাথ গাইয়ালতসেন (Indrani Aikath Gyaltsen) Crane’s
Morning নামের একটি উপন্যাস লিখে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত
হয়েছিলেন। এটি তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস,
প্রথম উপন্যাসের নাম ছিল Daughters
of the House. প্রখ্যাত লেখক এবং সম্পাদক খুশবন্ত সিং-এর রেকমেন্ডশেনের
ভিত্তিতেই তাঁর বইগুলো ছাপা হয়েছিল শোনা যায়। কিন্তু কিছুদিন পরেই জানা গেল
ইন্দ্রানী ইংরেজ লেখিকা এলিজাবেথ গাউজের (
Elizabeth Goudge) এর
বিখ্যাত উপন্যাস ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত ‘দ্য রোজমেরি ট্রি’ থেকে হুবহু টুকলি করে বইটি
লিখেছেন। তিনি কেবল চরিত্রগুলির নাম এবং পটভূমি পরিবর্তন করে ভারতীয় পটভূমিতে
গল্পটি সাজিয়েছেন। কানাডা এবং আমেরিকার পাঠকরা এই চুরিটা ধরে ফেলায় ভারতে এবং
বিদেশে বইটির বিক্রি এবং প্রচার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন প্রকাশকরা। এই কেলেঙ্কারি
থেকে মুক্তি পেতে ইন্দ্রানী মাত্র ৪১ বছর বয়সে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। যাঁরা গত
শতাব্দর নয়ের দশকে আমার মত স্টেটসম্যান কাগজটি পড়েছেন তাঁদের হয়ত মনে পড়বে
ইন্দ্রাণী রোববারে ওই পত্রিকায় একটি কলাম লিখতেন। পাঠকদের কলামটি ভাল না লাগায় ছ সপ্তাহের
মাথায় ওই কলাম বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ইন্দ্রানীর শেষ বইটির নাম আপনাদের চম্কে
দেবে – Hold my
Hand, I’m Dying. কিন্তু তাঁর হাত ধরবার মত আর কেউ ছিলনা তখন, এ
বইটি তাই অপ্রকাশিতই রয়ে গেছে।
দ্বিতীয় ঘটনা – ২০০৬ সালে সাহিত্য জগতের বড় ঘটনা যা খবরের কাগজের
পাতায় অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পড়েছে আমার মত তৎকালীন নবীন লেখকরাঃ আমেরিকা প্রবাসী
মাত্র আঠেরো কিংবা ঊনিশ বর্ষীয়া কাব্যা বিশ্বনাথন তার প্রথম উপন্যাসের জন্য নামি
প্রকাশক Little,
Brown & Company থেকে এ্যাডভান্স পেয়েছেন পাঁচ লক্ষ ডলার! বইটির নাম ‘ How
Opal Mehta Got kissed, Got Wild and Got a Life.’ইংরেজিতে
এই ধরণের মেয়েলি লেখাকে চিকলিট (chiclit) বলে।
কাব্যা সবে স্কুলের পড়া শেষ করে হার্ভার্ড বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, তার
মধ্যেই এই বই লিখে বিশ্ব জয় করে নিয়েছিল। কিন্তু খুব অল্পদিনের মধ্যেই জানা গেল এই
বইয়ে রয়েছে একাধিক বিখ্যাত লেখক-লেখিকাদের বই থেকে তুলে নেওয়া অংশ। মেগান
ম্যাকেফার্টি, সোফি কিন্সেলা এমনকি সালমান রুশদির ‘Haroun
and the sea of stories’ থেকেও টুকলি করেছে কাব্যা। যথারীতি এই বইটি বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। ভাল প্রকাশক কখনোই
চোরাই মাল বিক্রি করেননা কারণ বাজারে গুডউইল বলে একটা কথা আছে।
লেখা বা শিল্পকর্ম চুরি করার পিছনে কয়েকটি মনস্তাত্বিক কারণ আছে।
সেইটুকু বলেই আমি আমার এই ছোট লেখাটিতে ইতি টানব। অক্ষম লেখক-শিল্পীরা যেসব কারণে
অন্যের কাজ নিজের বলে চালায় সেগুলো হচ্ছে -
১। ব্যর্থতা
এবং সমালোচনার ভয় – সমালোচক এবং পাঠকদের মানদণ্ডে তার নিজের কাজটি মর্যাদা পাবেনা,প্রশংসা
পাবেনা এই ভয়ে ভাল লেখা বা শিল্পকর্মকে আত্মসাৎ করেন কেউ কেউ।
২। আত্মবিশ্বাসের
অভাব – আমি যা ভাবছি,লিখছি বা আঁকছি তা তত ভাল হবেনা। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে
হলে অন্যের ভাল জিনিষ তুলে আনতে হবে।
৩। আলস্য
ও অনীহা - যে বিষয় নিয়ে লিখতে চাইছে( বা লেখার বরাত পেয়েছে) সে বিষয়ের গভীরে
যাওয়ার কোন ইচ্ছা নেই,কাজেই পরিশ্রম করার কি দরকার? যাঁরা
পরিশ্রম করে ওই বিষয়ে কাজ করেছেন তাদের থেকে একটু ধার(না বলেই অবশ্য) করা যেতেই
পারে।
৪। সময়ের
অভাব - ঘরে বাইরে কাজের চাপ,টেনশন। ওদিকে পুজোর জন্য লেখার ডেডলাইন। বাজারে একটু
নামও হয়েছে,বাজে লেখা দিলে পাঠকের কটু মন্তব্য এবং তার থেকেও বড়
সম্পাদকের লিস্ট থেকে নাম কাটা যেতে পারে। অতএব চুরি পরম ধর্ম।
চেষ্টা করলে আরও কয়েকটা চৌর্যবৃত্তির কারণ দেখান যায়,কিন্তু
খারাপ জিনিষ নিয়ে বেশি লিখতে মন চাইছেনা তাই এখানেই ইতি টানছি। শুধু একটা
সতর্কবাণীঃ যাঁরা এই কাজটি এখনো করে যাচ্ছেন তাঁরা সাবধান হয়ে যান কারণ ইন্দ্রানী
গাইয়ালতসেনকে কিন্তু শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করতে হয়েছিল লেখা চুরির জন্য আর কাব্যা
বিশ্বনাথন যিনি চুরি করে রাতারাতি বড়লোক এবং বিখ্যাত হতে চেয়েছিলেন তাঁর নাম আজ আর
কেউ নেয়না,নেবেনা।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি
জন্ম এবং শিক্ষা কলকাতায়;কর্মজীবন দিল্লিতে,কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে।
গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় সাহিত্য চর্চা
করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। বাঙলায় সাতটি উপন্যাস ও দু’টি গল্পগ্রন্থ এবং
ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি থেকেও ওঁর
কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে। দেশ, আনন্দবাজার, সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, পরিচয়, কালি ও কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও
কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লেখেন নলিনাক্ষ। সাম্প্তণ।ক কালে শারদীয় আনন্দলোক ও শারদীয় দেশ
পত্রিকায় উপন্যাস লিখেছেন নলিনাক্ষ ভট্টাচার্য মহাশয় ।
.jpg)