Advt

Advt

case-diary-story-galpo-8th-part-by-shrabani-chatterjee-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-কেস-ডায়েরি-গল্প-শ্রাবণী-চ্যাটার্জী

ধারাবাহিক   গল্প – প্রতি মঙ্গলবার ।

case-diary-story-galpo-8th-part-by-shrabani-chatterjee-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-কেস-ডায়েরি-গল্প-শ্রাবণী-চ্যাটার্জী
পর্ব –৮

চিঠিটা গেটের ভেতর দিয়ে হাত গলিয়ে চৈতালীদেবীর হাতে গুঁজে দিয়ে একজন বললো,দেকুন মা,ভোলাকে পুলিশ ধরার খপর পেয়ে যতজনের কাচে গিচি,সব্বাই বলেচে ভোলা কুনও খারাপ কাজ কত্তে পারে না। আমাদে পাড়ার চেলেরা এই চিটি লিকে সই ক’দিয়েচ (করে দিয়েছে)। নিন মা,একবার চিটিকান দেকুন (চিঠিখানা দেখুন)।

সবে চৈতালীদেবী চিঠিটা হাতে নিয়েছে,তখনই তন্ময়বাবু বাড়ির খবরাখবর নেওয়ার জন্য স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। ফোনের ভেতর থেকে কয়েকজনের আওয়াজ পেয়ে জিজ্ঞাসা করতেই চৈতালীদেবী ঘরের ভেতরে ঢুকে এসে ওনাকে সব জানালেন। শুনে তন্ময়বাবু বললেন,তুমি ফোনটা ছাড়ো, আমি অফিসারের সঙ্গে কথা বলে ব্যাক করছি।

স্ত্রীকে ফোনব্যাক করে তন্ময়বাবু বললেন,অফিসার বলেছেন বিভিন্ন কথা বলে,প্ৰশ্ন করে করে ওদের ব্যস্ত করে আটকে রাখো। একটু পরেই পুলিশ এসে ওদের তুলে নিয়ে যাবে। আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরছি। তুমি চিঠিটা নিজের কাছে রেখে দাও। গিয়ে চিঠিটা জেরক্স করে নেবো,তার আগে ওটা কাউকে দেবে না,কাউকে বলবেও না।

 কিছুক্ষণ পর কয়েকজন পুলিশ এসে তিনজনকেই তুলে নিয়ে চলে গিয়েছিল।

 সোনারপুর পুলিশ লকঅপে তিনজনকে ধরে বেদম পেটানোর পর আসল কথা সামনে আসে। পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে যাওয়া ভোলা দাস দুষ্কৃতীদের অস্ত্রশস্ত্র সাপ্লাই করে। এদেরকে ওই পাঠিয়ে ছিল। ওরা ভোলার এজেন্ট হয়ে কাজ করে।

 তন্ময়বাবু সেদিন অফিস থেকে ফিরে এসে চৈতালীদেবীর কাছ থেকে ওই লোকগুলোর দেওয়া চিঠিটা জেরক্স করে নিয়ে কপিটা নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন,আর আসলটা ডিক্যুমেন্টস হিসাবে থানায় জমা দিতে হয়েছিল।

 সোনারপুরের লোকাল থানা কোর্টের সম্মতিতে সাতদিনের জন্যে দুষ্কৃতীদের সেল্ফ কাস্টডিতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করার অনুমতি পেয়েছিল।

তাদের বয়ানও রেকর্ড করা শুরু হলো।

দুষ্কৃতীদের চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি উঠে এলো … টেলিভিশনের খবরে,প্রথম শ্রেণির কাগজের পাতায় পাতায়।

 দুষ্কৃতীরা এসেছিল বাংলাদেশ থেকে। তারা বাংলাদেশ থেকে আসার সময় বসিরহাট হয়ে একটি সরু,হাঁটুজল সমান নদী অক্লেশে হেঁটে পেরিয়ে এপারে চলে এসেছিল। সেখান থেকে ট্রেনে-বাসে সোজা চলে এসেছিল সল্টলেকের মহিষবাথান অঞ্চলের একটা বস্তিতে,যে বস্তিটা সবরকমের অপরাধীদের বাসস্থান।

এই বস্তিতে এসে তারা দুটো ঘর ভাড়া নিয়েছিল। সেখানে ভোলা দাসের সঙ্গে দুষ্কৃতীদের যোগাযোগ হয়। ভোলা দাস সব রকমের অস্ত্রশস্ত্র জোগান দিতো। এক ডাকে ভোলা দাসকে সবাই চেনে ওখানে। ওদের গ্যাস-কার্টার,রিভলভার,চাকু সবই জোগান দিয়েছিল ভোলা দাস।

পুলিশ একটা করে প্রশ্ন করছে আর উত্তর দিতে দেরি হলেই বেদম প্রহার। যতগুলো জায়গায় ওরা ডাকাতি করেছিল,সেগুলো যে যে থানার আন্ডারে,সে সব থানার অফিসারেরা দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে। এই কদিনে তাদের পেট থেকে জিভ টেনে বার করে আনার মতোই,কথা বার করে আনা হয়েছিল। আর সেই সঙ্গে তাদের স্বীকারোক্তির প্রতিটা বয়ান রেকর্ডিং করা হয়েছিল।

এবার সোনারপুর থানার অফিসার ওদের নিজের জিম্মায় নিয়ে প্রশ্ন শুরু করলো,বল কি ভাবে, কোথায় কোথায় তোরা ডাকাতির ছকগুলো কষেছিলি?

বলছি,বলছি…..

আমরা দুজন করে ভাগ হয়ে গিয়ে আগে জায়গাগুলো রেইকি করে এসেছিলাম। তারপর নানা অছিলায় সেখানে রোজ গিয়ে গিয়ে পথ-ঘাট,বাড়ির পজিশন,বাড়িতে ঢোকা-বেরোনোর দরজা কতগুলো, পালানোর পথ কতগুলো,সেই বাড়ির চারপাশের জায়গা, আশে-পাশের বাড়িগুলো ঘন ঘন নাকি ছাড়া ছাড়া।

কিছুটা বলে সে একটু থামতেই তাকে ছেড়ে আবার অন্যজনকে কষিয়ে থাপ্পড় মেরে প্রশ্ন করেন, এবার তুই বল…..

 বলছি,বলছি…

 আমরা দুজন একেক জায়গায় এক একেকরকম সেজে এসে পাড়ার খবরাখবর নিতাম। বাড়িতে কতজন থাকে,কজন ব্যাটা ছেলে,কজন মেয়েছেলে, ব্যাটাছেলেটা কখন বাড়িতে ঢোকে-বেরোয় । বাস পথ,ট্রেনপথ ধারে কাছে থাকলে সেই বাড়িটা আগে নিতাম। সব খবর জোগাড় করে দিন দেখা হতো।

প্রশ্ন : কিসের দিন দেখতিস?

আঁধার রাত খুঁজতুম। পাঁচদিনের চাঁদের পর থেকে আমাবস্যের পাঁচ দিন অব্দি।

 আবার দুজনকে প্রশ্ন …

 সোর্সকে চিনলি কি করে? ভোলার কটা নাম জানিস?

 ভোলা নাম … 

আবার গুঁতুনি খেয়ে …

ভোলা ওরফে বিল্লু ওরফে বেচু ওরফে পটাশ। ভোলা গুন্ডা-গড়দি করতো। ওই অঞ্চলে সবাই ওকে ভয় খায়। ওর কটা মেয়েছেলে ধরা আছে। ওরাও অনেক খবর এনে দিতো পয়সা নিয়ে। ভোলার সঙ্গে অনেক নেতা-মন্ত্রীর ভাবসাব আছে। ওরাও দরকারে ভোলাকে ডাকে। একদিন ভোলা ঠেকে এসে একজনের সঙ্গে পরিচয় করে দিলো। তার নাম কালুয়া। বললো,একে চিনে রাখ। ওর নাম কালুয়া ওরফে জগ্গু ওরফে দীলু। ও পুলিশের ভেতরের সব খবর আমাদের দেয়। তোরা চাইলেই ও অনেক খবর দিতে পারবে। আমরা ওকে নিলাম। আমরা ডাকাতি করার পর পুলিশ কি বলছে,কোথায় কোথায় আমাদের খুঁজতে যাচ্ছে তার সব খবর দিতো সে।

 একদিন কালুয়ার সঙ্গে পয়সা নিয়ে ক্যাচাল হলো। তখন ও বললো বেশি বাওয়াল করলে পুলিশকে তোদের খবর দিয়ে দেবো। তোদের থেকে বেশি মাল্লু পাবো। ও দুদিকেই পয়সা পেত।

এইভাবে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ, তার সঙ্গে বেদম মারের চোটে আস্তে আস্তে সব খবর বেরিয়ে এলো। এই সুযোগে অপরাধ জগতের অনেক রথী মহারথীর নাম এবং গোপন খবরও পুলিশের খাতায় জমা হলো।

 অফিসার প্রশ্ন করলো,লুটের মালগুলো কোথায়?

উত্তর : সেসব কিছুই নেই। সব পাচার হয়ে গিয়েছে। কিছু পড়ে আছে একটা ঠেকে। পুলিশ সঙ্গে গেলে এনে দিতে পারবো।

প্রশ্ন : সোনা-গয়নাগুলো কোথায় বল? আবার সপাটে মার পড়তেই ছিটকে পড়ে গিয়ে বললো, ওগুলো সোনার দোকানে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। ওরা নিয়েই গলিয়ে ফেলেছে।

প্রশ্ন : আর টাকা পয়সা?

উত্তর : সেগুলো আর নেই। ভাগাভাগি হয়ে সবাইকে দিয়ে থুয়ে অল্পই ছিল কদিন খেয়ে শেষ হয়েছে।

আবার চড়…..

এভাবে জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব চলতেই থাকলো।

 চোদ্দদিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দিতেই হবে!

কেসটা আর ব্যক্তিগত জায়গায় রইলো না। স্টেট ভার্সেস দাগি আসামি। পুলিশ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কেস ফাইলের আর্জি জানালো।

দুস্কৃতীরা ধরা পড়ার দু-দিন বাদে থানার বড়োবাবু আবার অনুরোধ করলেন তন্ময়বাবুকে থানায় আসার জন্য। টাকা পয়সা, গয়নাগাটি বাদে কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার হয়েছে,সেগুলো শনাক্তকরণের জন্যে।

তন্ময়বাবু গেলেন কিন্তু অফিস থেকে পাওয়া একটি ঘড়ি ছাড়া আর তেমন কিছুই ফেরত পাননি তিনি। যে জিনিসগুলো পাওয়া গিয়েছিল,সেগুলোর মধ্যে তাঁর বাড়ির ডাকাতি করা কিছুই ছিল না!

ডাকাতির চক্করে পড়ে তন্ময়বাবুর ক্ষয়-ক্ষতি যা হবার তা তো হয়েই ছিল। তার উপর বিভিন্ন সময় থানায় ডাক পড়েছে,নয়তো গুরুত্বপূর্ণ কেস হিসাবে প্রয়োজনীয় নথি থানায় জমা করতে যেতে হয়েছে। এইসব বিভিন্ন কারণে প্রচুর ছুটি চলে গিয়েছে। তাই তন্ময়বাবু ভাবলেন কোনও কারণে আর অফিস কামাই করা ওনার সম্ভব পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া,এই পুরো ব্যাপারটাই তাঁর কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। তবুও,অপরাধীরা যখন ধরা পড়ে গিয়েছে তবে এবার কিছুটা স্বস্তি মিলবে।

এই ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনায় তন্ময়বাবু অনেককিছু হারালেও তা সমাজের অনেক গলি-ঘুঁজির কথা তাঁকে জানিয়েছিল। জানতে সাহায্য করেছিল অনেক অন্ধকার জগতের মানুষের জীবন কাহিনি। চিনিয়েছিল নেতা-মন্ত্রী,থানা,কোর্ট-কাছারি। সর্বোপরি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল, অর্থের লালসা আর তার জন্য গায়ে শাপলা চাপানো কিছু মানুষের সত্যিকে মিথ্যে করে দেবার প্রবল প্রচেষ্টা।

দিনটা ছিল 9th মার্চ 2008 সাল।

তন্ময়বাবু  সবে অফিস থেকে ফিরেছেন। সোনারপুর থানার বড়োবাবু ফোন করলেন …

হ্যালো …  তন্ময়বাবু?

হ্যাঁ, বলছি।

আপনি বাড়িতে আছেন তো?

হ্যাঁ, আছি।

আমরা এক ঘটার মধ্যেই আসছি।

 ঠিক আছে স্যার, আসুন।

বড়োবাবু : বিশেষ দরকারে আমরা যাচ্ছি,বাড়িতে কেউ নেই তো?

 না,আপাতত নেই,কিন্তু আসতেও পারে।

বড়োবাবু : দয়া করে কাউকে আসতে বারণ করবেন। ব্যাপারটা খুবই কনফিডেনশিয়াল। কেবল আপনারা দুজনই থাকুন।

তন্ময়বাবু: ঠিক আছে স্যার,আসুন।

 তন্ময়বাবুকে চা-জলখাবার দিয়ে চৈতালীদেবীও নিজের এক কাপ চা নিয়ে সামনে বসতেই চিন্তিত মুখে স্ত্রীকে বড়বাবুর বলা কথাগুলো বললেন?সব শুনে  চৈতালীদেবীর মুখেও চিন্তার ভাঁজ পড়লো। ভাবলেন,ডাকাতগুলো তো ধরা পড়েই গিয়েছে,এবার ওদের শাস্তির ব্যবস্থা করলেই তো  মিটে যায়! আর যেন ঘটনাটা নেওয়া যাচ্ছে না। 

ক্রমশ …………

৯ম পর্ব পড়ুন আগামী মঙ্গলবার

লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

লেখিকার পরিচিতি –

লেখিকার জীবনের সঙ্গে গল্প অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে আছে। যা দেখেন, যা শোনেন, যা শোনেন, যা কিছু স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে আছে মনের সাথে,তাই নিয়ে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন।

লেখা শুরু স্কুল-ম্যাগাজিন, কলেজ -ম্যাগাজিন দিয়ে। বর্তমানে কিছু লেখা প্রকাশিত হচ্ছে কয়েকটি মাসিক-ত্রৈমাসিক পত্রিকায়।  পাখিদের নিয়ে অনেক লিখেছেন। গল্প, ভ্রমণ, ফিচার, কবিতা নিয়মিতভাবে লিখে থাকেন।  দিল্লি থেকে প্রকাশিত কলমের সাত রঙ এবং তাৎক্ষণিক ডট কম-এর নিয়মিত লেখিকা।