Advt

Advt

ganona-galpo-story-by-bama-chakraborty-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-গণনা-গল্প-বামা-চক্রবর্তী

ganona-galpo-story-by-bama-chakraborty-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-গণনা-গল্প-বামা-চক্রবর্তী

বিষ্ণুদত্ত শাস্ত্রী একজন বিখ্যাত জ্যোতিষবিধ ছিলেন,ওনার গণনা কখনো ভুল হয় না সবাই জানত। ওনার স্ত্রী সন্তানকে জন্ম দেবেন যেদিন সেদিন উনি দাইমাকে ডেকে বললেন, বাচ্চার যখন জন্ম হবে তখন তুমি প্রসূতি ঘর থেকে একটা লেবু উঠানে গড়িয়ে দিও,আমি উঠানে বসে থাকব। দাইমা বলল,ঠিক আছে, তারপর সন্তানের জন্ম হল,দাইমা প্রসূতি ঘর থেকে একটা লেবু উঠানে গড়িয়ে দিল, উঠানে লেবু দেখে সেই সময় বাচ্চার বাবা ঠিকুজি গণনা করতে লাগলেন,গণনা করতে করতে দেখলেন এই সময় যে বাচ্চার জন্ম হয়েছে তার ঠিকুজিতে পিতৃহত্যার যোগ রয়েছে। উনি ছেলের পিতৃহত্যার যোগ রয়েছে দেখে অস্থির হয়ে গেলেন, ভাবলেন আমার মতো এতবড় জ্যোতিষীর হত্যা তার ছেলের হাতে হবে? না না এতো বড় লজ্জার কথা! তারপর উনি কাউকে কিছু না বলে বাড়ি ছেড়ে কোথাও চলে গেলেন,কেউ জানতে পারল না। ওনার স্ত্রী আতুর ঘর থেকে বেরিয়ে স্বামীকে অনেক খোঁজার চেষ্টা করলেন কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না।

তারপর এদিকে ছেলে একটু একটু করে বড় হতে লাগল,তার মা একা লালন পালন করার সঙ্গে সঙ্গে নানা রকম শিক্ষা দিয়ে বড় করার পাশাপাশি যত টুকু নিজে জ্যোতিষ বিদ্যা জানত তার সবটুকু ছেলেকে শিখিয়ে দিল। ছেলে প্রায় মাকে তার বাবার কথা জিজ্ঞেস করে এবং জানতে চায় তার বাবা কোথায়। মা বলে,জানি না কোথায়,তোর জন্মের দিন,উনি কোথায় যে কি কারণে চলে গেলেন তা আজও বুঝতে পারলাম না,আমাকে কিছুই বলে যাননি, কোথায় যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন,আমার কাছে এর সবটাই অজানা। এই অবস্থায় ছেলের তার বাবার কথা বিশেষ কিছুই জানা হল না।

ছেলের বয়স যখন ষোলো, তখন ঐ রাজ্যে খরা দেখা দিল। অনেকদিন বৃষ্টি হচ্ছে না,যার ফলে রাজ্যের সবাই চিন্তিত ও ভীত। তখন সেই রাজ্যের রাজা ঘোষণা করলেন,‘যে আমাদের রাজ্যে কবে বৃষ্টি হবে,তা সঠিক গণনা করে বলতে পারবে,তাকে যথাযোগ্য পুরস্কার দেওয়া হবে আর যদি গণনা ভুল হয়,তাহলে গণককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।

বিষ্ণুদত্তের ছেলে ততদিনে ভালো গণনা করতে শিখে গিয়েছিল,সে ভাবল,যাই রাজার কাছে এবং গণনা করে বলি বৃষ্টি কবে হবে,তাহলে রাজার কাছে কিছু পুরস্কার পাব,এবং সেইমত রাজ সভায় গেল,গিয়ে দেখল,ওখানে একজন বৃদ্ধ জ্যোতিষী রাজার সঙ্গে বসে বৃষ্টি কবে হবে তার গণনা করছিলেন। ছেলেটিও সেখানে গিয়ে দাঁড়াল এবং ওনার গণনা দেখতে লাগল,বৃদ্ধ জ্যোতিষী রাজাকে বললেন,রাজামশাই,আজকে ৩টা ৩০ মিনিটে মেঘ করবে এবং ৪টার সময় বৃষ্টি হবে। তখন ঐ ছেলেটি বলল,না রাজা মশায়, ৪টার সময় নয়, ৪ বেজে ২ মিনিটে বৃষ্টি হবে। বৃদ্ধ জ্যোতিষী ছেলেটির কথায় রেগে গেলেন,এই প্রথম কেউ নার মতের বিরুদ্ধে কথা বলল। উনি বললেন,রাজা বলল। মশাই,৩০ মিনিট থেকে শিলা বৃষ্টি হবে এবং এক ৪টা শিলের ওজন ৫০ গ্রাম করে হবে। তখন ছেলেটি আবার বলল,রাজা মশাই শিল পরবে। কিন্তু সেটা পরবে,৩২ মিনিট থেকে এবং এক একটা শিলের ওজন ৪৭ বা ৪৮ গ্রাম করে হবে।  শুনে বৃদ্ধ জ্যোতিষী খুব রেগে গেল। রাজা নিজের দলবল নিয়ে বাইরে গিয়ে বসলেন আর প্রখর রোদে সবাই অপেক্ষা করতে লাগল,ঠিক যখন সাড়ে তিনটা বাজল তখন আকাশে কালো মেঘ উড়ে এল,সবাই চুপ করে দেখতে লাগল,চারটা বাজল কিন্তু বৃষ্টি হল না,রাজা বৃদ্ধ জ্যোতিষীর দিকে তাকালেন,তবে ৪ টা ২ মিনিট হতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল, রাজা দলবল নিয়ে সভায় গিয়ে বসলেন। সাড়ে চারটার জায়গায় ৪ টা ৩২ মিনিটে শিলা বৃষ্টি হতে লাগল। রাজা দারোয়ানকে আদেশ দিলেন ‘যাও,শিল নিয়ে এসো’, দারোয়ান অনেকগুলো শিল নিয়ে এল এবং ওগুলোকে একটা একটা করে ওজন করে দেখা গেল, কোনটা ৪৭ গ্রাম, কোনটা ৪৮ গ্রাম। এবার আবার প্রমাণিত হল যে বৃদ্ধ জ্যোতিষীর গণনা ভুল। প্রমাণিত এবং ছোট ছেলেটির কথা সঠিক হল । রাজার আদেশ অনুযায়ী বৃদ্ধ জ্যোতিষীর গণনা ভুল হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঘোষণা করা হল। সেই সঙ্গে ছেলেটিকে রাজা বললেন,তোমার গণনা সঠিক হয়েছে,এবার বল তোমার কি চাই? তখন ছেলেটি বলল,মহারাজ, ওই বৃদ্ধ জ্যোতিষীর মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে নিন,এটাই আমার পুরস্কার।  রাজা বললেন,ঠিক আছে।

বৃদ্ধ জ্যোতিষী রাজপ্রাসাদ থেকে আগে বেরিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ছোট জ্যোতিষী বাইরে বেরিয়ে লে উনি বললেন,তুমি তো অন্য পুরস্কার চাইলেও পারতে, আমার প্রাণ  রক্ষা করলে কেন? তখন ছেলেটি বলল,আপনি সঠিক গণনা করেছিলেন বৃষ্টি পরা ও শিলের ওজনের। বৃদ্ধ জ্যোতিষী বলল,সেটা কীভাবে! ছোট জ্যোতিষী বলল,বৃষ্টি ৪টার সময় শুরু হয়েছিল কিন্তু পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছাতে ২ মিনিট সময় লাগে আর শিলগুলো ৫০ গ্রাম করে ছিল, কিন্তু রাজসভায় আনতে আনতে সেগুলো একটু গলে গিয়েছিল,তাই ওজন কমে গিয়েছিল। প্রত্যেকটা জিনিসের জন্য ধৈর্য ধরতে হয় কারণ ছোট জ্যোতিষী বুঝতে পেরেছিল এই বৃদ্ধ জ্যোতিষই তার বাবা। তখন সে বলল,আপনার পুত্র যখন জন্ম নিয়েছিল সে অনেক ক্ষণ কাঁদছিল না,তাই দাইমা ওর পিঠে কিছুক্ষণ মারে এবং তারপর ছেলেটা কেঁদে উঠে,এরপর তাকে স্নান আদি করিয়ে মায়ের কাছে দিয়ে কিছুক্ষণ পর আতুর ঘর থেকে লেবুটা উঠোনে গড়িয়ে দিয়েছিল। আপনার পুত্র যখন জন্ম নিয়েছিল তখনকার গ্রহ নক্ষত্র সব ঠিক ছিল,যখন লেবু গড়িয়ে দেওয়া হয় তখন সে সব বদলে গিয়েছিল,আর আপনি আপনার ছেলেকে পিতৃহন্তা ভাবলেন,আপনার ছেলে পিতৃহন্তা ছিল না,সে পিতার প্রাণ রক্ষা কর্তা ।

এই গল্পের সারমর্ম একটাই,সব কাজে তাড়াহুড়ো করতে নেই। যারা আমার মতো এই সব গণনায় বিশ্বাস রাখে তাদের বুঝতে হবে,বড় বড় জ্যোতিষীর গণনাও ভুল হতে পারে।  

লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।  

লেখিকার পরিচিতি ঃ-    

জন্ম বিহারের কিশানগঞ্জ । প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর কিষানগঞ্জেই । আঞ্চলিক বার্ষিক পত্রিকা, ই-ম্যাগাজিন তাৎক্ষনিক.কমে অণুগল্প, ছোট গল্প, প্রবন্ধ লেখালেখি করেন । ওনার প্রথম গ্রন্থ ‘নবরত্ন’(গল্পগুচ্ছ) । বই পড়া, ভ্রমণ ও আধ্যাত্মিকতায় রুচিশীল এবং কুসংস্কার বিরোধী ।