ধারাবাহিক গল্প – প্রতি মঙ্গলবার ।
তন্ময়বাবু
বলেন আমার বাড়ির মেড বহু বছর এই বাড়িতে কাজ করছে। এই
পাড়ার বেশ কয়েকটা বাড়িতেও সে কাজ করে এবং অত্যন্ত
বিশ্বাসী। নামেই মেড,কিন্তু বহু বছর থাকতে থাকতে বাড়ির একজন হয়ে উঠেছে। সে
আমাদের কাছে আত্মীয়ের মতোই।
আর রঙের মিস্ত্রীরাও ওই একইরকম বিশ্বাসী। তারাও
আমার বাড়ি হওয়া থেকেই আমার কাছে কাজ করে। আমি
কোনও কারণে না থাকলে তারাই আমার বাড়ি দেখাশুনা করে।
অতএব স্যার আমার অনুরোধ,খামোখা কতকগুলো গরীব মানুষকে ধরে ইন্টারোগেশন করবেন না। ওদেরও
মান-সম্মান আছে। তাছাড়া
ওদের ধরে টানাটানিতে আসল দুষ্কৃতীরাই আড়ালে থেকে যাবে।
অফিসার বলেন আপনি চিন্তা করবেন না।
তন্ময়বাবু
বলেন স্যার,আমার যা গিয়েছে যাক। কিন্তু
মিথ্যা প্রহসনে এই মানুষগুলোকে আমি হারাতে পারবো না। আমাদের
ওরা ভুল বুঝবে। পুলিশকে
সবাই ভয় পায়। আপনারা
ওদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে চারিদিকে সে কথা রটে যাবে। ওরা
আর কাজ পাবে না। স্যার,কাজ ওদের খুব দরকার। গরীব
মানুষগুলোকে আর ভয় দেখাবেন না। দরকার
হলে আমি এফআইআর তুলে নেবো।
অফিসার বলেন ঠিক আছে,আমরা স্যারের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলবো।
তাছাড়া,আপনি এফআইআর তুলে নিলেও পুলিশের
তরফ থেকে কেস বহাল থাকবে। আমরা আপনারদের
দুটো ফোন নম্বরই অলরেডি ট্র্যাক করেছি। তাতে
বার বার সুইচ অফ বলছে। ওরা
ফোন খুললেই আমরা ওদের নিশানা পেয়ে যাবো।
এরপর,অফিসার বলেন আচ্ছা ভালো কথা,আপনি আপনার সমস্ত জিনিসপত্র
খুঁটিয়ে দেখে নিন। তারপর
একটা লিস্ট করে জানাবেন কি কি খোয়া গিয়েছে। লিস্টটা আমাদের
কাছে ফাইলে থাকবে। আপনি বিশ্রাম
করুন,খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন। অনেক
ধকল গিয়েছে আপনাদের ওপর দিয়ে। এখন
আমরা চলি। প্রয়োজন হলে
আরও কয়েকবার আমাদের এখানে আসতে হতে পারে।
তন্ময়বাবু বলেন নিশ্চয়ই স্যার,নিশ্চয়ই। একশো বার আসবেন।
আতঙ্কের রঙ ফিকে হতে শুরু করেছিল।
তারপরও কয়েকদিন পুলিশ এবং সিআইডি অফিসাররা এসেছিলেন তন্ময়বাবুর
বাড়িতে। অপরাধীদের
ধরবেন বলে আশ্বাসও দিয়েছেন।
ডাকাতি হবার পর বাড়িতে একটা কানাকড়িও
ছিল না। ওই
অবস্থায় বন্ধু প্রতিবেশী আত্মীয়রা কয়েকজন চৈতালীদেবীর হাতে কিছু টাকা দিয়ে গিয়েছেন। তবে
চৈতালীদেবীর বিশেষ অনুরোধ,সেই টাকা তিনি কিন্তু ফিরিয়ে দেবেন
তন্ময়বাবু বাড়ি ফিরলে।
তন্ময়বাবু একা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে
একটা ট্যাক্সি ধরেছিলেন বাড়ি ফেরার জন্য। মাথায়
ব্যান্ডেজ,নাকে প্লাস্টার নিয়ে ট্যাক্সিতে বসে ড্রাইভারকে
বললেন,ভাই আপনি কিন্তু গাড়িটা রেখে আমাকে একটু বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে
আসবেন দয়া করে। তারপর
খুব ছোট করে ঘটনাটা ড্রাইভারকে বলেন এবং সেই সঙ্গে এও বলেন যে ওনার কাছে গাড়ি ভাড়া
দেওয়ার জন্যে একটাও টাকা নেই।
বাড়ির সামনে
এসে তন্ময়বাবুকে এক প্রতিবেশী বন্ধুর কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে ট্যাক্সি ভাড়া মেটাতে
হয়েছিল। পরে দেখা গিয়েছিল শুধু একটা স্টীলের
২৫ পয়সাই সম্বল যেটা শো-কেশের মাথার উপর পড়েছিল।
বাকি সব ডাকাতরা নিয়ে গিয়েছে।
ফোন ছাড়া যোগাযোগ মাধ্যম একেবারে
অসম্ভব। তাই,তন্ময়বাবু দুদিন পরে এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুলেছিলেন
সংসার খরচের জন্যে আর সেই সঙ্গে দুটো ফোনও কিনে এনেছিলেন।
সেই ফোন নম্বর থানায় নথিভুক্ত করতে হয়েছিল। তখনও
আ্যনড্রয়েড ফোন চালু হয়নি। তাই নকিয়া’র ছোট ফোনই কিনেছিলেন।
বাড়ির আত্মীয়-পরিজন যে যার বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। পাড়া-প্রতিবেশীরা সবসময় আসা-যাওয়া করছিল,খবরাখবর নিচ্ছিল। তন্ময়বাবু
দিন কুড়ি পর থেকে অফিসে যাওয়া শুরু করেছিলেন।
এতদিন চৈতালীদেবী সারাক্ষণ একাই থাকতেন। ভয়
বলে কিছুই ছিল না। কিন্তু
এই ভয়ঙ্কর ঘটনার পর থেকে তিনি প্রথম প্রথম একা বাড়িতে থাকতে ভয় পাচ্ছিলেন। তন্ময়বাবু
অফিসে চলে গেলে আত্মীয়-পরিচিত কেউ না কেউ এসে চৈতালীদেবীর
কাছে থাকতেন। কিন্তু
সময়ের ব্যবধানে সেই ভয়ও কাটিয়ে উঠেছেন তিনি।
ওই ঘটনার পর প্রায় দু-মাস অতিবাহিত হতে চলেছে। পুলিশ
পাহারা বন্ধ হয়েছে। তন্ময়বাবুদের
পাড়াটা ছাড়াও ওই এলাকার বাসিন্দা, দোকানদার এবং ব্যবসায়ীরা
মিটিংয়ে আলোচনা করে রাতে ডিফেন্সপার্টি বসিয়েছেন। রাতপাহারা
দিয়ে মাস গেলে চার-ছ’টা বেকার ছেলের সামান্য
হলেও রোজগারের ব্যবস্থা হয়েছে।
একদিন সন্ধ্যেবেলা তন্ময়বাবু
অফিস থেকে ফেরার কিছুক্ষণ পরে থানার বড়বাবু ফোন করলেন…….
হ্যালো…… তন্ময়বাবু,আমি থানার বড়বাবু
বলছি।
তন্ময়বাবু
বলেন,বলুন স্যার…….
দাদার সুবাদে
তন্ময়বাবুর সঙ্গে বড়বাবুর একটু সখ্যতা গড়ে উঠেছে।
বড়বাবু বললেন
আপনি এখনই একবার থানায় আসুন প্লিজ। একটা
সুখবর দিতে পারবো।
থানায় যেতেই,বড়বাবু বললেন আসুন,আসুন বসুন।
তন্ময়বাবু
চেয়ারে বসার পর বড়বাবু বললেন, আপনার পুরোনো ফোনটা
ট্র্যাক করা গিয়েছে। ওরা
আপনাদের দুটো ফোনই এতদিন বন্ধ করে রেখেছিল। দুজনের
কাছে ওই দুটো ফোন আছে। আজ
আপনার মিসেসে’র চুরি যাওয়া ফোনটা থেকে আপনার ফোনে একজন আরেকজনকে
ফোন করে কথা বলছিল। আমাদের
ট্র্যাকারে ধরা পড়ে গিয়েছে ওদের কথপোকথন। সেটা
ধরেই ওদের ট্রেস করতে পারা গিয়েছে। আশা
করছি কালকের মধ্যেই দুষ্কৃতীরা ধরা পড়ে যাবে। তবে
এখনই খবরটা কাউকে জানাবেন না।
সব শুনে তন্ময়বাবু
খুব খুশি হয়ে বললেন, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই খবরটা দেওয়ার জন্য।
তবে এ ব্যাপারে
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, এ কথা কেউই জানবে না।
উনি বললেন
এটা আমাদের কর্তব্য। দেখুন,এখানে চাকরি করেই বলছি,পুলিশ চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে!
তন্ময়বাবু
শুভরাত্রি জানিয়ে ফিরে এসেছিলেন।
তন্ময়বাবুর
বাড়িতে ভয়ঙ্কর ডাকাতি হয়েছিল ১৪ই জানুয়ারি ২০০৮ সালে। আর
ডাকাতরা যেদিন ধরা পড়েছিল…..
সেইদিনটা ছিল ৬ই মার্চ ২০০৮ সাল।
সেদিন সন্ধ্যের পর পুলিশ হানা দিয়ে
সাতজন ডাকাতকে তাদের ডেরা থেকে তুলে এনেছিল। ওইদিন
নিউজ চ্যানেলে 10’টার খবরের হেডলাইন ছিল “সোনারপুর ডাকাতি কাণ্ডে পুলিশের জালে ধৃত সাত দুষ্কৃতী”।
তাদের ভ্যানে তোলার সময় পুলিশের হাত ছাড়িয়ে পালিযে গেল একজন। ধৃত
ছ’জনকে চোদ্দদিন পুলিশ হেফাজতে রাখা হবে জিজ্ঞাসাবাদের
জন্য। তারপর
চার্জসিট গঠন করে ধৃতদের কোর্টে তোলা হবে।
টিভির খবরটা শুনেই
তন্ময়বাবু নিজেই ফোন করে বড়বাবুকে জানালেন।
ডাকাতগুলো
যে ধরা পড়েছে,এটা তন্ময়বাবুদের কাছে খুবই স্বস্তির খবর। কিন্তু
তারা ধরা পড়ার পর আবার যে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁদের যা সারাজীবনেও
ভোলার নয়।
দুষ্কৃতীরা ধরা পড়ার দুদিন বাদে…….
তন্ময়বাবু
অফিসে চলে গিয়েছিলেন। চৈতালীদেবী
বাড়িতে নিজের কাজে ব্যস্ত। একটু
বেলার দিকে হঠাৎ বাড়ির গেট খোলার শব্দ পেয়ে মুখবাড়িয়ে দেখেন দুটো বউ আর একটা লোক গেটের
সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পর্দা
সরিয়ে চৈতালীদেবী জিজ্ঞাসা কে তোমরা? কি চাই এখানে?
এখনই চলে যাও এখান থেকে। নইলে
আমি লোক ডাকবো।
একটা বউ একেবারে কেঁদে পড়লো,মাগো আপনিই পারেন আমার সোয়ামীকে বাঁচাতে। আমার
সোয়ামী ভোলা কুনও (কোনও) দোষ করেনি গো। ওরা
শুদু শুদু তাকে ফাঁইসে দেচ (ফাঁসিয়ে দিয়েছে)। আমার
দুটো বাচ্চা আচে। আমি
ডাক্তারবাবুর বাড়িতে কাজ করি,বলেই আবার কান্না শুরু
করলো।
চৈতালীদেবী
রেগে গিয়ে বললেন,আমি কোনও কথা শুনতে চাই না। তোমরা
চলে যাও বলছি।
তখন আর একটা বউ কাঁদতে কাঁদতে বললো
মাগো,সত্যি বোলতিচ (বলছি) আমার দাদার কুনও দোষ নেইকো। ও
খুব ভালো চেলে। এ
দেকুন, আমার স্বামীও এয়চে।
বলেই লোকটার দিকে ফিরে বললো,তুমি মাকে বলো একবার। লোকটাও
বলতে শুরু করলো মাগো,দয়া করেন। ভোলা
দাস আজ (রাজ) মিস্তিরির কাজ করে। সব্বাই
ওকে চেনে। পুলিশ ভুল
করে ওকে ধরে এনেচ (এনেছে)। এবার
তিনজনেই একসঙ্গে হাত জোড়া করে বলে উঠলো মাগো ভোলাকে আপনি বাঁচান।
ক্রমশ …………
৮ম পর্ব পড়ুন আগামী মঙ্গলবার
লেখিকার
অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখিকার পরিচিতি –
লেখিকার জীবনের সঙ্গে গল্প অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে আছে। যা দেখেন, যা শোনেন, যা শোনেন, যা কিছু স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে
আছে মনের সাথে,তাই নিয়ে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন।
লেখা শুরু স্কুল-ম্যাগাজিন, কলেজ -ম্যাগাজিন দিয়ে। বর্তমানে কিছু
লেখা প্রকাশিত হচ্ছে কয়েকটি মাসিক-ত্রৈমাসিক
পত্রিকায়। পাখিদের নিয়ে অনেক লিখেছেন।
গল্প, ভ্রমণ, ফিচার, কবিতা নিয়মিতভাবে
লিখে থাকেন। দিল্লি থেকে
প্রকাশিত কলমের সাত রঙ এবং তাৎক্ষণিক ডট কম-এর নিয়মিত লেখিকা।
