Advt

Advt

case-diary-story-galpo-6th-part-by-shrabani-chatterjee-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-কেস-ডায়েরি-গল্প-শ্রাবণী-চ্যাটার্জী

ধারাবাহিক   গল্প প্রতি মঙ্গলবার

case-diary-story-galpo-6th-part-by-shrabani-chatterjee-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-কেস-ডায়েরি-গল্প-শ্রাবণী-চ্যাটার্জী
পর্ব –৬

সারারাতের ক্লান্তি,ঘটনার শোক,সারাদিন তার পেটে দানাটুকুও পড়েনি। সারাদিন পুলিশ, রিপোর্টার  বিশেষজ্ঞ,বন্ধু-প্রতিবেশী ইত্যাদি নানা আগন্তুকের ভিড়ে তিনি চা ছাড়া মুখে কিছুই তুলতে পারেননি। তারওপর এতক্ষণ ধরে নাজেহাল করা প্রশ্নোত্তর পর্ব চৈতালীদেবী আর নিতে না পেরে জ্ঞান হারালেন। ডাক্তার এসে দেখে বললেন ওনাকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দিতে হবে। গতরাতের ঘটনায় উনি একদম ট্রমাটাইজড হয়ে আছেন তার উপর এপর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনার চাপে ওনার এই ব্রেকডাউনটা হয়েছে। এই বিপর্যস্ত অবস্থায় আরও চাপ দিলে অন্য কিছু হয়ে যেতে পারে।

 সেদিন স্টার আনন্দে সন্ধে সাতটার খবরে হেডলাইন দেখানো হল “সোনারপুরে দম্পতিকে মুখ-হাত বেঁধে দুর্ধর্ষ ডাকাতি করে পালিয়ে গেল ছ’জন ডাকাতের একটি দল”।

পরদিন সকালে প্রথম শ্রেণীর দৈনিক সংবাদপত্রের খবর “সোনারপুরে মাঝরাতে জানলার গ্রিল কেটে দুর্ধর্ষ ডাকাতি,বাড়ির কর্তা হাসপাতালে”।

 গতরাতে তন্ময়-বাবুর বাড়ির ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনায়,পুলিশের ওপর মহলের চাপে পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বিভিন্ন শাখার সবাই একটু নড়ে চড়ে বসেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইনভেস্টিগেশন শেষ করে দুষ্কৃতীদের ধরতেই হবে।

 সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। স্বজন-পরিজন,কয়েকজন প্ৰতিবেশী তন্ময়-বাবুর বাড়িতে বসে রয়েছেন। চৈতালীদেবী একটু সুস্থ বোধ করছেন। একটু চা ও সামান্য কিছু খাবার তাঁকে এনে দেওয়া হয়েছে। সেটুকু খাওয়ানোর জন্যে সবাই খুব পীড়াপীড়ি করছে ওনাকে।

সি আই ডি অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে থানার বড়বাবু আবার এলেন। এসে বললেন ম্যাডাম, আমরা আপনাকে কোনও বিরক্ত করবো না। এখানে আমাদের কিছু কাজ আছে সেগুলো সেরে নিয়ে আমরা চলে যাবো। ভয় পাবেন না,রাতে দুজন পুলিশ এখানে পাহারায় থাকবে।

 সি আই ডি অফিসারেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করতে লাগলেন। পুরো বাড়িটার বিভিন্ন জায়গার মানে একদম মূল গেট থেকে শুরু করে রান্নাঘর,ঠাকুরঘর,শোবার ঘর,ছাতের সিঁড়ি দিয়ে চিলে কোঠা অবধি সব ঘুরে দেখলেন,ছবি তুললেন। এবার নমুনা সংগ্রহ করতে শুরু করলেন যেখানে যেখানে রক্ত পড়েছিল।

 দেওয়ালে রক্তের দাগের নমুনা সংগ্রহ করতে করতে একজন অফিসার বললেন,এতদিন ধরে যতগুলো ডাকাতির কেস স্টাডি করা হল তার সব কটার সঙ্গেই এই কেসটার মিল রয়েছে। সব ক্ষেত্রেই বাড়ির পিছনের জানলা,দরজার গ্রিল বা গেট কেটে দুষ্কৃতীরা ঢুকেছে। সব ক্ষেত্রেই বাড়িটাকে অক্ষত রেখেছে। তারা গ্যাস কার্টার ব্যবহার করেছে। মুখ-হাত-পা বেঁধে,রিভলভার দিয়ে ভয় দেখিয়ে অথবা বাড়ির কর্তাকে মারধর করে লুটপাট করেছে। কিন্তু এখানেই দেখা গেল যে বাড়ির কর্তাকে রক্তাক্ত করেছে।

 অন্য একজন অফিসার তাঁকে মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, শুধু তাই নয় প্রতিটা কেসের বয়ান অনুযায়ী তারা বাড়ীর লোকজনকে মারধর করলেও বাড়িতে ঢোকার সময় থেকে চলে যাবার মুহূর্ত পর্যন্ত তারা খুব মার্জিত আচরণ ও ভদ্র ব্যবহার করেছে। এক্ষেত্রেও তন্ময়-বাবু হঠাৎ ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে ওদের ঘুষি মেরেছেন। পাল্টা, নিজেদের সেভ করার জন্যে অর্থাৎ তন্ময়-বাবুকে থামানোর জন্যে ওরা মরিয়া হয়ে রিভলভারের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করেছে।

 আগের অফিসার বললেন ঠিক তাই। এটাই আমাদের প্লাস পয়েন্ট। এবার ওরা ধরা পড়বেই। তবে অবাক হলাম,তন্ময়-বাবুর নিজের বাড়ির নিরাপত্তা বেষ্টনী দেখে। খুব সুন্দর ব্যবস্থা। কিন্তু ওদের কাছে এসব ধোপেও টেঁকে না।

ওনাদের কথাগুলো বাড়িতে উপস্থিত সকলেই শুনেছে এবং তন্ময়-বাবুকে বলেছে।

 সব ইনভেস্টিগেশন করে দেখেশুনে ওঁদের ফিরে যেতে সেদিন বেশ দেরি-ই হয়েছিল। যাবার সময় সি আই ডি অফিসার বললেন ম্যাডাম আমরা কাল আবার আসবো। জিনিষপত্র যেমন পড়ে আছে থাক,কেউ হাত লাগাবেন না। তন্ময়-বাবু তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠুন,আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা আছি।

 এদিকে তন্ময়-বাবু হাসপাতালে ভর্তি হবার সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় পাঁচ-ছ’টা সেলাই হয়েছিল। হাসপাতালের ডাক্তারবাবু এক্সরে করে বললেন নাকের হাড়েও বড়ো ধরনের চিড় ধরেছে। সময় লাগবে সারতে। ওষুধ ইনজেকশন দিয়ে রক্তটা বন্ধ হয়েছে কিন্তু মাথার যন্ত্রণা কমেনি।

 বিকেলবেলা তন্ময়-বাবুর দাদা মৃন্ময়-বাবু হাসপাতালে ভাইকে দেখতে গেলেন। বাড়ির কি পরিস্থিতি সেটা জানার জন্যে উদগ্রীব হয়ে বেডে বসেছিলেন তন্ময়-বাবু।

 দাদার কাছে বাড়ির খবর জানতে চাইলেন। দাদা সবটা বলতে চাইছিলেন না। কিন্তু তন্ময়-বাবু নাছোড়বান্দা। পুঙ্খানুপুঙ্খ জানতে চাইলেন। মৃন্ময়-বাবু পুলিশ,কাগজের রিপোর্টার, টিভি চ্যানেল, ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞ সকলের আসার খবর এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্বের সমস্ত কথা ভাইকে জানালেন। সব শুনে তন্ময়-বাবু তাঁর দাদাকে বললেন আমি খুবই চিন্তায় আছি। বাড়িতে আমার দরকারি কাগজপত্র,অফিসের ফাইল,ভাইটাল ডকুমেন্ট’স সব ছড়াছড়ি হয়ে পড়ে আছে। চৈতালীর জন্যেও খুবই চিন্তা হচ্ছে।

 হাসপাতালের ডাক্তার বলেছেন দিন-চারেকের আগে ওনাকে ছাড়া যাবে না। সারা শরীরে অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছিলো। ডাক্তার ঘুমের ওষুধ দিয়েছিলেন তবুও গত রাতের আতঙ্ক,সেই-সঙ্গে স্ত্রীর জন্য চিন্তা তাঁকে দুচোখের পাতা এক করতে দেয়নি। রাতেই নার্সকে জানিয়ে রেখেছিলেন তাঁর বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা,কিন্তু নার্স সে কথার কোনও গুরুত্ব দেয়নি।

 সকাল হতেই তন্ময়-বাবু বেড থেকে নেমে সোজা রিসেপশনে গিয়ে জানিয়ে দেন তিনি তখনই বাড়ি চলে যাবেন। রিসেপশন থেকে জানালো সরি স্যার, ডাক্তারবাবু না বললে আমরা পেশেন্টকে ছাড়তে পারবে না। তাছাড়া এই অবস্থায় ছাড়তে হলে বন্ড লাগবে।

 তন্ময়-বাবু বলেন,আমি সেলফ বন্ড দেবো। রিসেপশন থেকে আবার বলা হল বিল না মেটানো পর্যন্ত পেসেন্টকে ছাড়া যাবে না।

তন্ময়-বাবু বলেন আপনারা বিলিং করুন,আমি আমার কোম্পানি’র সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি। আমার কাছে নম্বর নেই। দয়া করে আমার কোম্পানির মেডিকেল ডিপার্টমেন্টকে ফোন করে আমায় দিন, আমি ডেস্কে কথা বলে নিচ্ছি। আপনাদের অসুবিধা হবে না।

অফিসেও তন্ময়-বাবুকে সবাই খুব খাতির করে, ভালোবাসে। উনি অফিসের মেডিকেল ডিপার্টমেন্টেই কাজ করেন। তাই নিয়মকানুন সবই জানেন।

 বাড়ীর সমস্ত পরিস্থিতির কথা জানিয়ে তন্ময়-বাবু অফিসের মেডিকেল ডিপার্টমেন্টের ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে রাজী করালেন। আর রিসেপশনে বলে দিলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিল সাবমিট করুন। পেমেন্ট হয়ে যাবে। সেলফ বন্ডের পেপারটা দিন আমি সই করে দিচ্ছি।

 শীতকালের বিকেল কাটতে না কাটতেই ঝুপ করে সন্ধ্যে নেমে আসে। কিন্তু গতরাতের ওই ভয়ঙ্কর ঘটনার পরেরদিন তন্ময়-বাবুর বাড়িতে সকাল দুপুর সন্ধ্যে রাত্তির সবই মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। যখন তখন পুলিশ আসছে বাড়িতে বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করতে।

 তন্ময়-বাবু বাড়িতে ফিরে দেখলেন,বাড়ির সেই একই ছড়ানো ছিটানো অবস্থা। বাড়ির সবাই বলল বড়বাবু এবং সি আই ডি অফিসার এসে কোনও জিনিসে হাত দিতে বারণ করে গিয়েছেন।

 কিছুক্ষণ বাদে দুজন সি আই ডি অফিসার এবং থানার বড়বাবু আবার এলেন। কুশল বিনিময় করে তন্ময়-বাবুর ওই অবস্থা দেখে জিজ্ঞাসা করে সব জানলেন।

এবার সিআইডি অফিসার বললেন এই কেসটা স্টাডি করতে হলে আমাদের কিছু ইন্টারোগেশন করতে হবে। তার আগে জানিয়ে রাখি এখান থেকে আমাদের প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করা হয়ে গিয়েছে, আপনারা এবার আপনাদের জিনিসপত্রে হাত দিতে পারেন।

 তন্ময়-বাবু বলেন হ্যাঁ, ইন্টারোগেশনের ব্যাপারে কি যেন বলছিলেন?

অফিসার বললেন হ্যাঁ,কতদিন আগে আপনার বাড়িতে রঙ হয়েছে?

তন্ময়-বাবু বলেন এই মাস চারেক হল।

অফিসার বলেন রঙ-মিস্ত্রিরা কোথায় থাকে?

তন্ময়-বাবু বলেন ওরা এখানকার লোকাল ছেলে।

প্রশ্ন : আর আপনার মেড?

তন্ময়-বাবু বলেন হ্যাঁ, সেও কাছাকাছি কটা স্টেশন পরেই থাকে।

প্রশ্ন : কিভাবে আসে?

তন্ময়-বাবু : ট্রেনে করে।

এবার তন্ময়-বাবু অফিসারকে প্ৰশ্ন করেন কিন্তু ওদের খোঁজ করছেন কেন?

অফিসার বলেন আপনার মেড এবং রঙের মিস্ত্রিদের একটু ইন্টারোগেশন করতে হবে।

তন্ময়-বাবু খুব ঠাণ্ডা মাথায় বলেছিলেন স্যার,আমার একটা জিজ্ঞাস্য আছে।

অফিসার বলেন হ্যাঁ নিশ্চয়ই,বলুন কি জানতে চান।

তন্ময়-বাবু বলেন আপনারা কি আমাদের আত্মীয়-পরিজনদের ইন্টারোগেশন করবেন?

অফিসার : না না।

 তন্ময়-বাবু বলেন স্যার তাহলে আমার কিছু কথা বলার আছে,অনুমতি দিলে বলবো।

অফিসার বলেন বলুন।

ক্রমশ …………

৭ম পর্ব পড়ুন আগামী মঙ্গলবার

লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

লেখিকার পরিচিতি

লেখিকার জীবনের সঙ্গে গল্প অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে আছে যা দেখেন, যা শোনেন, যা শোনেন, যা কিছু স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে আছে মনের সাথে,তাই নিয়ে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন

লেখা শুরু স্কুল-ম্যাগাজিন, কলেজ -ম্যাগাজিন দিয়ে বর্তমানে কিছু লেখা প্রকাশিত হচ্ছে কয়েকটি মাসিক-ত্রৈমাসিক পত্রিকায়  পাখিদের নিয়ে অনেক লিখেছেন। গল্প, ভ্রমণ, ফিচার, কবিতা নিয়মিতভাবে লিখে থাকেন।  দিল্লি থেকে প্রকাশিত কলমের সাত রঙ এবং তাৎক্ষণিক ডট কম-এর নিয়মিত লেখিকা।