Advt

Advt

case-diary-story-galpo-5th-part-by-shrabani-chatterjee-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-কেস-ডায়েরি-গল্প-শ্রাবণী-চ্যাটার্জী

ধারাবাহিক   গল্প প্রতি মঙ্গলবার

case-diary-story-galpo-5th-part-by-shrabani-chatterjee-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-কেস-ডায়েরি-গল্প-শ্রাবণী-চ্যাটার্জী

পর্ব –৫

তন্ময়-বাবুর মাসির বাড়ি রামনগরে। মাসতুতো বোন ভোর রাত থেকে উঠে তার স্বামীর জন্যে রান্নাবান্না করে দেয়,সকাল ছ’টায় সে ডিউটি যাবে বলে।  হঠাৎ তার ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলো. ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে পাঁচটা।

এত ভোরবেলা ফোন বাজতেই তার মনটায় কেমন যেন কু গাইলো। তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরতে গিয়েই দেখল তন্ময়-বাবুর ফোন! চেনা নম্বর দেখেই বলল হ্যাঁ ছোড়দা,বলো। ফোনের ওপাশ থেকে ভারী গলার আওয়াজ আসলো.. আপনার দাদার বাড়িতে আমরা ডাকাতি করে এসেছি। একটু বাওয়াল হয়েছে। ভদ্রলোকের অবস্থা ভালো নয় পারলে চলে আসুন ওনার বাড়িতে। মাসতুতো বোন চিৎকার করে উঠলো কে বলছেন?আপনি কে বলছেন?....... ওপাশ থেকে ফোনটা ততক্ষণে কেটে দিয়েছে।

তন্ময়-বাবুর ছোটবোন অনেক দূরে থাকে। সকাল 5:45 মিনিট। তার মাথার ধারে ল্যান্ড ফোনটা বেজে উঠতেই ঘুম চোখে ফোনটা ধরেই বলল. হ্যালো ছোড়দা! কি ব্যাপার রে!! তুই এত ভোরে উঠেছিস কেন?নিশ্চয়ই আমাকে এখন জ্বালাবি!!

তন্ময়-বাবুর ভাইবোনদের মধ্যে খুব ভালো সম্পর্ক। আর ছোটবোনকে যখন তখন ফোন করে ঠাট্টা তামাশা করেন উনি। ছোটবোন রেগে গিয়ে বলে তুই ফোন রাখ আমি এখন তোর সঙ্গে কথা বলবো না ইত্যাদি ইত্যাদি।

 ছোড়দার গলার আওয়াজের বদলে ফোনের ওপার থেকে একজন বলল,আপনার দাদার বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। ওনার অবস্থা ভালো নয়।

তার মানে কি. কে আপনি?কে বলছেন?ওপ্রান্ত থেকে ফোনটা ততক্ষণে কেটে দিয়েছে। ফোনের রিসিভারটা হাতে নিয়েই সে বসে পড়লো। তারপর শতবার চেষ্টা করেছে,কিন্তু প্রতিবারই ফোনে ভেসে আসছে দ্য নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়াল্ড,ইজ কারেন্টলি সুইচড অফ..

পাড়ার বন্ধুদের মধ্যে কেউ একজন তন্ময়-বাবুর দাদাকে ফোন করে ডাকাতির ঘটনাটা জানিয়েছিল। ওনার দাদা ছোট বোনকে ফোন করে ঘটনাটা জানাতে গিয়ে সব শুনে বলল তুই আয়,আমরাও এখনই যাচ্ছি। ভাইবোনরা যে যত তাড়াতাড়ি পারলো তন্ময়-বাবুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হল।।

 তন্ময়-বাবু হাসপাতালে চলে যাওয়ার পর কয়েকজন পুলিশকে ওনার বাড়ি পাহারায় রেখে থানার বড়বাবু চলে যাবার আগে নির্দেশ দিয়ে গেলেন,আত্মীয়-স্বজন ও কয়েকজন প্রতিবেশী ছাড়া কাউকে যেন বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া না হয়। উনি আবার পরে আসবেন জানিয়ে গেলেন। ততক্ষণে স্টেশন চত্তর ও আশেপাশের এলাকায়,মোড়ের মাথায়,বাস রাস্তায় ঘটনাটা চাউর হয়ে গিয়েছে।  পুলিশের বড়বাবু যতক্ষণ ছিলেন ততক্ষণ ঘন ঘন ফোনে কথা বলছিলেন।

 চৈতালীদেবী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। এই চাপ নিতে পারছেন না। ঠায় বসে আছেন সোফার উপর। সকালে সামনের বাড়ির বৌদি চা করে এনে খাইয়েছিলেন। বাড়ির সমস্ত জিনিসপত্রে হাত দেওয়া বারণ,তাই রান্নাঘরে চা-টুকুও করা যাবে না।

 তখন সবে সকাল সাড়ে আটটা বাজে। চারজন লোক এলো। তাদের হাতে ক্যামেরা। ভেতরে ঢুকতে যেতেই দুজন কনস্টেবল এগিয়ে গিয়ে তাদের পরিচয় জানতে চাইলো। ওঁরা বললেন,আমরা খবরের কাগজের রিপোর্টার। বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলতে চাই। কনস্টেবল সরে দাঁড়ালো।

 রিপোর্টার একের পর এক বিভিন্ন প্রশ্ন করে চলেছেন আর নিরুপায় চৈতালীদেবী উত্তর দিচ্ছেন। কথা বলতে পারছেন না তবুও উত্তর দিতে হচ্ছে। রিপোর্টার বললেন যা যা ঘটেছে সমস্তটা ঠিক ঠিক করে বলবেন। একজন প্রশ্ন করতে লাগলেন। একজন নোট-প্যাড হাতে নিয়ে লিখেছেন আর একজন ছবি তুলছেন। চতুর্থ ব্যক্তি কথোপকথন রেকর্ডিং করছেন।

ওঁরা জিজ্ঞাসা করলেন আপনার নাম.

উঃ উনি বললেন চৈতালী চৌধুরী।

প্রশ্ন: আপনার স্বামীর নাম?

উঃ তন্ময় চৌধুরী।

প্রশ্ন: এই বাড়িতে কে কে থাকেন?

উঃ : দুজন,আমি আর আমার স্বামী।

প্রশ্ন: আপনার স্বামী কি করেন?

উঃ : চাকরি করেন।

প্রশ্ন : সরকারি না বেসরকারি?

উঃ : বেসরকারি

প্রশ্ন : অফিসের নামটা একটু বলুন প্লিজ..

উঃ: উত্তরে এবার চৈতালীদেবী বলেন,আমার স্বামীর অফিসের নামটা এই ঘটনার সঙ্গে আমি জুড়তে চাই না।

রিপোর্টার বললেন,কোন অফিস জানলে ভালো হতো।

চৈতালীদেবী বলেন এটুকু বলতে পারি,একটা রেপুটেড কোম্পানিতেই উনি আছেন।

প্ৰশ্ন:  আপনার স্বামীকে দেখছি না তো! ওনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।

উঃ: উনি এই মুহূর্তে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

প্রশ্ন: কেন?......

উঃ: ডাকাতরা ওনার নাকে ঘুষি মেরেছে। রিভলভারের বাঁট দিয়ে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। সারা রাতেও রক্ত পড়া বন্ধ হয়নি। ভোরবেলা পাড়ার ডাক্তারবাবু এসে বলেছেন ওনাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।

প্রশ্ন: গত রাতে ঠিক কখন ঘটনাটা ঘটলো?মানে কখন টের পেলেন যে বাড়িতে ডাকাতরা ঢুকেছে? তখন আপনারা কি করছিলেন?তখন থেকে শুরু করে আপনার স্বামী হাসপাতালে যাবার আগে পর্যন্ত যা যা ঘটেছে একটু গুছিয়ে বলুন তো প্লিজ।

 তারপর বলল বুঝতে পারছি,পরপর এত প্রশ্নে আপনার খুবই কষ্ট হচ্ছে উত্তর দিতে,কিন্তু উপায় নেই ম্যাডাম। এটাই আমাদের কাজ। আর দু’একটা প্রশ্ন করে আমরা চলে যাবো। ম্যাডাম একটু সহযোগিতা করুন প্লিজ।

অসংখ্য প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ করে রিপোর্টাররা চলে গেলেন। বাইরে বহুমানুষের ভিড়। সবাই ভেতরে আসতে চাইছে। পুলিশ সে সব সামলাচ্ছে।

কাগজের রিপোর্টাররা চলে যাবার পর চৈতালীদেবী মাথাটা দু-হাতে চেপে ধরে বসে পড়লেন।

 তখনই একে একে এসে ঢুকল টেলিভিশন মিডিয়া চ্যানেলের লোকজন,একটা দলে তিনজন। আর একটা দলে চারজন,তারা জানালো টি ভি নিউজ স্টার আনন্দ থেকে কভার করতে এসেছেন। সরাসরি সম্প্রচার হবে।

সব্বাই একই ধরনের প্রশ্ন করতে লাগলেন…….

আপনার নাম কি?. আপনার স্বামীর নাম?

এই বাড়িতে কে কে থাকেন?

আপনার স্বামী কি করেন?

অফিসের নামটা একটু বলুন প্লিজ..

ঘটনাটা ঠিক কখন ঘটেছে?

একজেক্টলি কি হয়েছিল????????? ইত্যাদি ইত্যাদি। তার সঙ্গে ক্যামেরার হাজারো ঝলকানি।

চৈতালীদেবী উত্তর দিতে দিতে জেরবার হয়ে গেলেন।

টিভি চ্যানেল যেতে না যেতেই আবার একদল এসে পড়লো। তাঁরা পুলিশ অফিসার। আবার সেই একই ধরনের প্রশ্ন করতে লাগলেন তাঁরাও!!! সঙ্গে যুক্ত হল আরও শতাধিক প্রশ্ন।

 আবারও উত্তর দিতে দিতে চৈতালীদেবীর নাজেহাল অবস্থা।

 চৈতালীদেবীর বাবা-মা,এবং তন্ময়-বাবুর ভাই-বোনেরাও এসে পৌঁছে গিয়েছেন ততক্ষণে। কারো মুখে কোনও কথা নেই। চৈতালীদেবীকে দেখে তারা হতভম্ব হয়ে গিয়েছেন কিন্তু কেউ কোনও কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না চৈতালীদেবীর সঙ্গে। তখন বাড়িতে কি অদ্ভুত রকমের পরিস্থিতি চলছে। এক মুহূর্তের জন্যেও ছাড় পাননি তিনি এঁদের কাছ থেকে।

 তন্ময়-বাবুর দাদা পুলিশের উচ্চপদে আসীন। সৎ এবং দক্ষ অফিসার হিসাবে পুলিশ মহলে তাঁর খুবই নামডাক। আবার ঘটনাচক্রে,লোকাল থানার বড়বাবুর রিক্রুটমেন্টটা ওনারই রেকমেন্ডেশনে হয়েছিল। তাই বড়বাবু তন্ময়-বাবুর দাদাকে বিশেষভাবে সমীহ করেন।

 তন্ময়-বাবুর বাড়িতে ডাকাতির খবরটা পেয়েই উনি সোনারপুর থানার বড়বাবুকে ফোন করে বলেন, আমার ভাইয়ের বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে কাল রাতে। সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে আপনাকেই এই কেসের তদন্ত করতে হবে। এবার এই গ্যাংটাকে ডিটেক্ট করতেই হবে।

বড়বাবু বলেছেন নিশ্চয়ই, আমি নিশ্চয়ই আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করবো স্যার। তাই উনি বারবার আসা-যাওয়া করছেন। 

 বড়বাবু আবার ফিরে এসেছেন। তাঁর সঙ্গে এসে পৌঁছল পুলিশের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা হাতে গ্লাভস পরে প্রতিটা জিনিসের উপর থেকে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিতে শুরু করলেন। রক্তে ছাপানো দেওয়াল দেখে চমকে উঠছিলেন তাঁরা। দেওয়াল, দরজা-জানলা, আলমারি, কাবার্ড…… যা যেখানে আছে সেসব কিছুর উপর থেকেই ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করলেন।

 ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশেষজ্ঞরা রান্নাঘরে গিয়ে দেখে চমকে উঠেছিলেন! নিজেদের মধ্যেই বলাবলি করছিলেন যে খুব নিখুঁতভাবে জানলার গ্রীলদুটোকে কাটা হয়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা খুব পাকা হাতের কাজ!

 একজন অফিসার তন্ময়-বাবুর “মায়ের ঘরে”, যেখানে তাদের আটকে রাখা হয়েছিল সেখানে কাবার্ডের পাশে, খাটের কোণ থেকে একটা আর কাবার্ডের উপর থেকে আরেকটা ব্যাগ হাতে করে তুলে নিলেন তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেবার জন্যে। ভীষণ শারীরিক কষ্ট, মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করেও রাতের সেই বিভীষিকাময় ঘটনার সমস্ত বিবরণ দিয়ে যেতে হচ্ছিলো চৈতালীদেবীকে।

 প্রথম থেকে এতক্ষণ পর্যন্ত ওনাদের সঙ্গে চৈতালীদেবী সমানে সহযোগিতা করে চলেছেন কিন্তু……….

 ওনাদের হাতে ব্যাগ দুটো দেখে চৈতালীদেবী আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলেন না। প্রবলভাবে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। কেউ তাকে সামলাতে পারছে না। কাঁদতে কাঁদতে দম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল।

 ওই ব্যাগ দুটোতে তার বিয়েতে বাবার দেওয়া গয়নাগুলো ভরে তিনি অনেক যত্ন করে এমন যায়গায় ঢুকিয়ে রেখেছিলেন,সেগুলো যে ওরা বার করে নিতে পারে উনি ভাবতেই পারেননি। রাতের ঘটনার পর থেকে এই প্রথম চৈতালীদেবী ব্যাগগুলো দেখে জানতে পারলেন তাঁর সাধের গয়নাগুলোও ডাকাতি হয়ে গিয়েছে!

ক্রমশ …………

৬ষ্ঠ পর্ব পড়ুন আগামী মঙ্গলবার

লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

লেখিকার পরিচিতি

লেখিকার জীবনের সঙ্গে গল্প অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে আছে যা দেখেন, যা শোনেন, যা শোনেন, যা কিছু স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে আছে মনের সাথে,তাই নিয়ে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন

লেখা শুরু স্কুল-ম্যাগাজিন, কলেজ -ম্যাগাজিন দিয়ে বর্তমানে কিছু লেখা প্রকাশিত হচ্ছে কয়েকটি মাসিক-ত্রৈমাসিক পত্রিকায়  পাখিদের নিয়ে অনেক লিখেছেন। গল্প, ভ্রমণ, ফিচার, কবিতা নিয়মিতভাবে লিখে থাকেন।  দিল্লি থেকে প্রকাশিত কলমের সাত রঙ এবং তাৎক্ষণিক ডট কম-এর নিয়মিত লেখিকা।