ছেলেবেলার
বন্ধু সজল এল বিকেলের দিকে। রবিবার। আমি দোতলার ঘরের স্টাডিতে শুয়ে শুয়ে একটি
উপন্যাস পড়ছিলাম। থ্রিলার। গেটের আওয়াজ শুনে শোয়া থেকে বসলাম। জানলা দিয়ে সব দেখা যাচ্ছে।
সজল
বলল," ম্যাডাম, কাঞ্চন আছে?"
সুলতা
বলল," আছে। কিন্তু ওতো ঘুমোচ্ছে।"
"
সূর্যদেব চলে গিয়ে সন্ধে হতে চলল এখনও ঘুমোচ্ছে? ডাকুন ডাকুন অবেলায় ঘুমানো ঠিক নয়।"
বউ বলল," আসলে গতকাল সারারাত জেগে মাধ্যমিকের খাতা দেখেছে। আজও বেলা দুটো
পর্যন্ত খাতা কমপ্লিট করে জমা দিয়ে এসে দুপুরের খাওয়া সেরে সবে শুয়েছে। এখন ডাকা
ঠিক হবে না। আপনি বরং কাল আসুন।"
আমি
ভাবছি আমার বউটা এমন চাবুক অভিনয় করল কি করে! বোর্ডের খাতা তো গত সপ্তাহেই জমা
দিয়ে এসেছি। আসলে সুলতা চায় না আমি সজলের সঙ্গে মিশি। এর যুক্তিযুক্ত কারণও আছে। সুলতার দিক থেকে সেন্ট
পার্সেন্ট পারফেক্ট। সে কথায় পরে আসছি। অনেকক্ষণ ধরে নাগাড়ে বই পড়ছি। এখন একটু
হালকা আড্ডায় মজে যেতে মন চাইল। তাই উঠে গিয়ে গ্রিল বারান্দার সম্মুখে দাঁড়ালাম।
চোখাচোখি হতেই সজল বলল," কিরে নিদ্রাদেবী বিদায় নিয়েছে? উপরেই যাচ্ছি
আমি।"
জানি
আড্ডাটা জমবে না। প্রথম দৃশ্যেই সুলতার মুড অফ করে দিয়েছি। চা ছাড়া কি আড্ডা হয়?
সে আশায় জল ঢেলে দিলাম নিজেই । বউয়ের মেজাজ যে সপ্তমে উঠে থাকবে সেটা আমার থেকে
ভাল কে বুঝবে? সে মেজাজ ধীর গতিতে নামতে রাত কাবার হয়ে যাবে নিশ্চিত। বোধকরি রাতের
খাবারটাও নিজেকেই বেড়ে খেতে হবে। তা হোক সেসব অভ্যেস হয়ে গেছে। এমন মান অভিমান মাঝে মধ্যেই হয়। আজ তো রীতিমতো
অপমান করলাম। উনি সজলকে চলে যেতে বলল আর আমি স্বাগত জানালাম। কম অপমান? মানা যায়! ঝড়
উঠবে না? এখন এসব নিয়ে ভাবি না তেমন। বিবাহিত জীবন বিশ বছর কেটে গেছে। প্রথম প্রথম
ভীষণ প্রতিক্রিয়া হত। ঘুমের ব্যাঘাত হত। এখন মনে পুষে রাখি না। ফুৎকারে উড়িয়ে দিই। মাঝে মধ্যে নিজের
এলেম দেখাতে কার না ইচ্ছে করে ! তবে সজল আড্ডা দিতে আসেনি সেটাও জানি। এক নম্বরের
ধান্দাবাজ। স্কুল লাইফ থেকে বন্ধুত্ব বলে একটু দুর্বলতা বলা যায়। সেই দুর্বলতার
সুযোগটাকে সজল ব্যবহার করে। রাগ হয় খুউব। তবু মুখের উপর কথা বলতে পারি না। ওটাই
আমার সমস্যা। এর জন্য মাশুলও গুনতে হয়। বউয়ের তো কঠিন কঠিন ঠেস দেওয়া কথা। যা নয়
তাই বলে আমাকে গাল দেয়। সেসব শোনাতে চাই না কাউকে। একান্ত ব্যক্তিগত। ঘরের মধ্যেই
থাক। পাঁচ কান হলে প্রেস্টিজ নিয়ে টানাটানি। যা বলছিলাম। এই যে সজল এল। এসেই
ভূমিকা শুরু করে দিয়েছে। সমস্যা আর সমস্যা। কি বলব? রাগ হয় কিনা? এমনিতে ছেলেটির
কিন্তু কোয়ালিটি ছিল। পড়ালেখায় খারাপ ছিল না। মাস্টার্স কমপ্লিট করে ইচ্ছে জেগেছে
সাংবাদিক হবে। লেখার হাতটা বরাবরই ভাল। অসাধারণ ফিচার লেখে। নজরকাড়া খবর করে।
সাংবাদিকতার একটা কোর্সও করল। এম.এ কমপ্লিট করে আমার মতো যদি এসএসসিতে বসত নিশ্চিত
মাস্টারিটা পেয়ে যেত। যোগ্যতা ছিল। ঐযে, অ্যাম্বিশন নামি সাংবাদিক হবে। শিক্ষকতার
ওর কাছে নাকি কোনও ভ্যালু নেই। আরও আরও বড় হতে চায়। হতেও পারত। স্থিতধী নয় যে।
চঞ্চল মতি। একটা বড় হাউসে ঢুকেও ছিল। দু'বছর যেতে না যেতেই শুনি চাকরি ছেড়ে
দিয়েছে। হঠাৎ? শুনলাম মালিক নাকি অপমান করেছে। বুদ্ধুরামকে কি বলব ! যিনি আহার
জোগাছেন তিনি তো দুটো কথা শোনাতেই পারেন। তারজন্য চাকরি ছাড়তে হবে। আমরা কি ঘরের
লোকের কাছে কম কথা শুনি? নিজে রোজগার করেও মারাত্মক হুল ফোঁটানো কথা শুনতে হয়। তাই
বলে বউ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছি কি? এ জগতে নিজের ঘরেই
কত সাংঘাতিক কথা যে হজম করতে হয়
একমাত্র অন্তর্যামী জানে। সজলটা অন্য ধাতুতে গড়া। বেশি বললে বলবে, শিরদাঁড়া বাঁকা
করতে পারব না। এরপরেও পাঁচটা সংবাদপত্রের অফিসে কাজ করেছে। শিরদাঁড়া সোজা রাখতে
গিয়ে এখন ফুল বেকার। মাঝেমধ্যে দু'চারটে
ফিচার লেখে মাত্র। ওতে কি পেটের ভাত হয়?
সজল
বলল," এবার তোকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে কাঞ্চন। না পেলে সুইসাইড করা ছাড়া
রাস্তা নেই।" বলেই এমন সব জটিল
সমস্যার কথা উত্থাপন করল মনটাই বিষাদে ভরে গেল। যা বলছে তার ফিফটি পার্সেন্টও যদি
সত্যি হয় চিন্তার ব্যাপার। আমি আবার অল্পতেই দুর্বল হয়ে পড়ি। মানুষকে অবিশ্বাস
করতে কষ্ট হয়। বউ শুনলে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নেবে। প্রতি ক্ষেত্রেই করে। নিটফল, ওয়ান
পার্সেন্ট সত্যি আর নাইনটি নাইন পার্সেন্ট গুল। তোমাকে বোকা হাদারাম পেয়ে টুপি
পড়াচ্ছে।
আমি বললাম," মাসের শেষে অত টাকা কোথায় পাব? মেরেকেটে হাজার টাকা দিতে পারি।
তুই অন্য কোথাও ব্যবস্থা কর। "
সজল
বসে বসে কাঁদছে। মুখে কোনও কথা নেই। এমন স্মার্ট ডাকাবুকো ছেলের চোখে জল! আমি
হতভম্ব! পুরুষ মানুষের এমন ছিচকাঁদুনে মানায়? রাগও হয়। এক আধুনিকা সুন্দরীকে বিয়ে করেছে। সেও বিগ হাউসে কাজ করত। সজলের
বুদ্ধিতে চাকরি ছেড়েছে। এখন নাকি এক মাসিক পত্রিকা অফিসে যায়। সামান্য
রেমুইউনারেশন। হাত খরচটুকু হয় কিনা সন্দেহ। একমাত্র মেয়ে নামি কনভেন্টে পড়ে।
কিভাবে সামাল দেয় ভাববারই কথা। এইভাবে লোকের কাছে চেয়েচিন্তে কতদিন চালানো যায় !
আমার কাছে না হলেও পঞ্চাশ বার ধার নিয়ে গেছে। সেটা অবশ্য হয় এক হাজার বা দু'হাজার।
তার বেশি নয়। এবারই পাঁচ হাজার চেয়ে বসল। আজ পর্যন্ত একটা পয়সাও ফেরত দেয় নি। আশাও
করি না। বাবা বলতেন, সাধ্য থাকলে ধার দিবি কিন্তু ফেরত পাওয়ার আশা করবি না। মনে
করবি টাকাটা দিয়েই দিলাম। এতে তোর দুটো সুবিধা হবে। এক, ফেরত না পেলে কষ্ট হবে না।
দ্বিতীয়ত, টাকা শোধ না করে আবার ধার চাইতে সাহস পাবে না। বিবেকে বাঁধবে।"
সজলের অবশ্য সেই চক্ষু লজ্জাটুকুও নেই। এদিকে শিরদাঁড়া সোজা রাখার কথা বলে।
বিচিত্র মনুষ্য চরিত্র। বউ কী এমনি এমনি বিরাগভাজন হয় !
শেষমেষ
তিন হাজারে রফা হল। এমন আকুল আবেদন অগ্রাহ্য করি কি করে! মনের গহভরে আক্ষেপ কিন্তু
থেকে গেল। আবার ভুল করলাম। টাকার প্রয়োজন হয়তো সত্যি। টাকার কার না প্রয়োজন।
স্কুলে পড়িয়ে কি রাজার হালে থাকা সম্ভব! বাধ্য হয়ে আমাকেও তো ছাত্র পড়াতে হয়। সকাল
বিকেল দুটো-দুটো চারটে ব্যাচ পড়াই। ভাল থাকার তাগিদেই তো নাকি? ভুখা থাকলেও সজলের
মতো মেকি অভিনয় আমি পারব না। উভয়সংকটে পড়ে যাই। যাকে বলে দৃঢ়তার অভাব। দিয়েও আফসোস
না দিলেও আফসোস। মন খচখচ, সারাক্ষণ অস্বস্তি অন্তত একটা দিন থাকেই।
বিকেল
সন্ধ্যেটা আর নিচে নামিনি। ফলে চা টিফিন করা হল না। কড়া ডোজের প্রতিক্রিয়া জানতাম।
স্বাভাবিক কারণেই কেউ চা দিতে আসবে না। আমার মেয়েটি অবশ্য খুব ভাল। শান্ত। মেধাবী।
ক্লাস ইলেভেনে পড়ে। বাপির প্রতি আলাদা টানও আছে। তবু মায়ের অনুমোদন ছাড়া চা দিয়ে
যাওয়ার সাহস নেই। অবশ্য একবেলা চা না খেলে কি এমন ক্ষতি হবে ! চায়ের এমন নেশা নেই
যে না খেলে মাথা যন্ত্রণা করবে। খেতে খেতে একটা অভ্যেস -- ঐটুকুই। এর বেশি কিছু
নয়।
উপন্যাসটা শেষ করতে করতে রাত দশটা বেজে
গেল। খিদেটাও চাগার দিয়ে উঠেছে। এবার নামতেই হবে। আমি আবার খিদে সহ্য করতে পারি
না। রাগ-অভিমান হলেও খাওয়ার ক্ষেত্রে আপোস করি না।
নিচে
নেমে অবাক ! সব অন্ধকার। যেন ভূতুড়ে বাড়ি। ডাইনিং কিচেনের লাইট অফ। মেয়ে দরজা
ভেজিয়ে পড়া করছে। বউ লাইট অফ করে বিছানায় সুখনিদ্রার চেষ্টা। মেয়ে অন্য ঘরে
পড়াশুনা করলেও রাতে মায়ের সঙ্গেই শোয়। পাঁচ বছরের উপর হয়ে গেল আমি দোতলাতেই থাকি।
যত বয়স বাড়ছে অবসর সময়ে নিরিবিলি বই পড়তেই ভাল লাগে। সংসারের কিছু ব্যাপারে উদাসীন
থাকি। অহেতুক উটকো ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকা যায়। প্রতিবছর বইমেলা থেকে বিভিন্ন
স্বাদের বেশকিছু বই কিনি। শুধু আলমারিতে সাজিয়ে শোভাবর্ধনের জন্য নয়। প্রতিটি বইই
পড়ব। সংসারের জটিল আবর্তে না ঢুকে বইগুলো শেষ করার ইচ্ছে। সুলতা অবশ্য ঘোর সংসারী।
ভালওবাসে। দক্ষতার সঙ্গে সবদিক সামাল দেয়। যথেষ্ট হিসেবি। বেতন পেয়ে নির্দিষ্ট
একটা অ্যামাউন্ট ওর হাতে তুলে দিই। তাতেই হেসেখেলে পুরো মাস চালিয়ে নেয়। বেহিসেবি
হলে সম্ভব হতো না। ওর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য ব্যাংকে রেকারিং করা
আছে। সেখানে কার্পণ্য করি না। কথা প্রসঙ্গে আমার এক স্যার বলেছিলেন, কখনোই স্ত্রীর
হাতে বেতনের পুরো প্যাকেট তুলে দিও না। তাহলে কিন্তু সারাজীবন মেনি বেড়াল হয়ে
থাকতে হবে। ভেবে দেখলাম সবার না হলেও কারও কারও ক্ষেত্রে সত্যি। বাজার করে এসে পাই
টু পাই হিসেব বুঝিয়ে দেওয়া আমার ধাতে নেই। কাকে কত ধার দিলাম। কেন দিলাম? সে
কৈফিয়ত দেওয়া সহ্য হবে না। জানি মঙ্গলের জন্যই বলে। তবুও না।
মেয়ের
পড়ার ঘরে গিয়ে বললাম," খেয়েছিস?"
মেয়ে
বলল," না বাপি। তুমি খেয়ে নাও। আমি পরে খেয়ে নেব। তোমার খাবারটা কি গরম করে
দেব?"
আমি বললাম," সে আমিই গরম করে নিচ্ছি। তুইও চলে আয়। এক সঙ্গে খেয়ে নিই।"
মাইক্রোওভেনে পটাপট গরম করে মেয়েকে নিয়ে খেতে বসে গেলাম। সুলতাকে ডাকিনি ইচ্ছে
করেই। অভিজ্ঞতা আছে। একবার বিছানায় গা এলিয়ে দিলে কারও সাধ্য নেই তোলা। মেয়ে আমার
বুদ্ধিমতী। পড়াশুনার ব্যাপারে দু'একটা প্রশ্ন করলাম। সাবলীল উত্তর দিল। কিন্তু
বিকেলের ঘটনা নিয়ে কোনও উচ্চারণ করবে না জানি। আমিও তাই চাই।
পরদিন
যথারীতি হাতমুখ ধুয়ে চা বিস্কিট খেয়ে পড়াতে বসলাম। সাড়ে ছ'টার মধ্যে ছাত্রছাত্রীরা
এসে যায়। পরপর দুটো ব্যাচ। সাড়ে নটার মধ্যে শেষ করতে হয়। তারপরেই ব্যস্ততা। রোবটের
মতো বাথরুম, স্নান সেরে খেতে বসি। প্রতিদিনের মতো বউ দেখলাম খাবার সাজিয়ে বসে আছে।
আমি গম্ভীর। দ্রুত খাওয়া সারছি। কথা বললে বাক্য বিনিময় হবে। মস্তিষ্কের
প্রতিক্রিয়া সুখকর নাও হতে পারে। নীরব থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
খাওয়া
সেরে ড্রেস পড়ে বাইক নিয়ে বেরোলাম। তখনই বউ বলল, যাওয়ার সময় শংকরের দোকানে চালের
কথাটা বলে যেও। কালকেই কিন্তু চাল লাগবে।" আমি বললাম," ঠিক আছে।"
স্বস্তির নিঃশাস ফেলে বাইক স্টার্ট দিলাম।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি -
নিত্যরঞ্জন দেবনাথ পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার পানুহাটে ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।কাটোয়া কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। বর্তমানে থাকেন হুগলির চুঁচুড়ায়। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন।অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল-এর অধীন ডিভিশনাল অ্যাকাউন্টস অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম গল্প " চেতনা " ছোটদের পত্রিকা শুকতারায় ১৯৯৬ - এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ, শিলাদিত্য, কালি ও কলম,মাতৃশক্তি, তথ্যকেন্দ্র, কলেজস্ট্রিট, কথাসাহিত্য, দৈনিক স্টেটসম্যান, যুগশঙ্খ, একদিন,,সুখবর ইত্যাদি এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর সাহিত্যকীর্তি অব্যাহত। ইতিমধ্যে পাঁচটি গল্প সংকলন ও চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক "শতানীক " পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করে আসছেন।
.jpg)