Advt

Advt

mayar-biye-story-galpo-by-nityaranjan-debnath-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-মায়ার-বিয়ে-গল্প-নিত্যরঞ্জন-দেবনাথ

 

mayar-biye-story-galpo-by-nityaranjan-debnath-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-মায়ার-বিয়ে-গল্প-নিত্যরঞ্জন-দেবনাথ

মেয়েটা এমন একটা কান্ড করল  পরিবারের সকলের মাথায় হাত। মান সম্মান বলে কিছু থাকল না। এডুকেটেড ফ্যামিলি বলে এলাকায় যথেষ্ট সুনাম। এক ধাক্কায় সব শেষ হয়ে যাওয়ার জোগাড়।  সুনাম নষ্ট হতে কতক্ষন? এই গূঢ় সত্যটা অনুধাবন করাতেই হবে। না হলে মানুষের কাছে মুখ দেখাবে কি করে?

ওরা তিন ভাই এক বোন। বড়দা নিলেশ হাই কোর্টের নামকরা অ্যাডভোকেট। মেজদা তাপস ডাবলু.বি.সি. এস  অফিসার। ছোড়দা কলেজের অধ্যাপক। সকলেই এক একটা রত্ন। বাবা ছিলেন আই. এ.এস অফিসার। সবাই  উচ্চ শিক্ষিত। একমাত্র ছোট মেয়ে মায়া। ওকে নিয়েই পরিবারে যত অশান্তির মূলে। ফাঁকিবাজ। তারউপর গায়ের রঙ কালো। কোনও রকমে টায়ে টায়ে বি.এ পাশ । পড়ায় মন  নেই ভাল রেজাল্ট করবে কি করে?

তবে মায়া সংসারী মেয়ে। সংসারে একা হাতে বহু কাজ করে। রান্নার হাত অপূর্ব। তাই দাদারা রাঁধুনিকে বসিয়ে রেখে বোনের হাতের রান্না খাওয়ার আবদার প্রত্যহদিন। মায়াও রান্নাটা খুব ভালবাসে। ফলে হেঁসেলের দায়িত্ব সম্পূর্ণ মায়ার হাতেই ছেড়ে দেওয়া আছে। মেয়েটির যেমন দায়িত্ববোধ তেমনি কাজের প্রতি নিষ্ঠা তারিফ করার মতো। সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি সংসারের কাজেই লিপ্ত থাকে। এতে তার কোনও আলস্য নেই। মনের খুশিতেই করে। ফলে আজও যৌথ পরিবারটিতে ভাঙ্গন ধরেনি। বাড়িতে তিনজন বউ আছে। তারা রান্নাঘরে উঁকি দিয়েও দেখে না কি কি আইটেম হচ্ছে।। কিন্তু হঠাৎ পরিবারটিতে অশনি সংকেত দেখা দিল। মায়া ছাড়া চলবে কী করে?

এক সকালে দিবাকর সেন বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে দৈনিক পেপারটা পড়ছিলেন। তিনি পরিবারের সর্বময় কর্তা। রাশভারী। বয়স সত্তর হলেও যথেষ্ট শক্তসমর্থ। পরিবার বন্ধনের সুতোটি এখনও শক্ত হাতে ধরে আছেন তিনি। তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার সাহস আজও  কারোর নেই।

সকাল সাড়ে সাতটা। শীতকাল।কুয়াশা কেটে গিয়ে ঝলমলে রোদ উঠেছে সারা আকাশ জুড়ে। তিনি সোনালী রোদ মেখে আয়েশ করে চা খাচ্ছিলেন। তখনই বছর ত্রিশেকের এক যুবক সম্মুখে এসে দাঁড়াল। দেখেই দিবাকর চিনতে পারলেন। বছর খানেক আগে বইয়ের আলমারি এবং আরও ছোটখাটো কিছু কাজ করিয়ে ছিলেন এই যুবককে দিয়েসুচারু কাঠের কাজ জানা ছেলে। প্রায় মাস খানেক বাড়িতে এসে নাগাড়ে কাজ করে গেছে। বহু বই এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল। সেগুলো সৌষ্ঠব ভাবে রাখা গেছে। ছেলেটির নাম মন্টু।

দিবাকর বললেন," কি ব্যাপার মন্টু। কিছু বলবি?"

মন্টু বলল," আপনার কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছি বাবু। আপনার সম্মতির অপেক্ষায় আছি।"

" কি প্রস্তাব বল? "

মন্টু বলল," আপনার ছোট মেয়ে মায়াকে আমি বিয়ে করতে চাই। এই মাঘ মাসেই দুটো বিয়ের তারিখ আছে। আপনি রাজি থাকলে আমরা প্রস্তুতি নিতে শুরু করব।"

হঠাৎ ভূমিকম্প হলেও এতটা অবাক হতেন না তিনি। একটা সাধারণ কাঠের মিস্ত্রি তাঁর মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে ! এতটা সাহস কি করে পেল ভেবে বিস্ময়ে হতবাক তিনি।

মন্টু আবার বলল," মায়ার কথা মতো আপনার সম্মতি নিতে এসেছি। ও বলল, যাও বাবার অনুমতি নিয়ে নাও। তাই এসেছি।"

তখনই মায়া এসে পাশে দাঁড়াল। হয়তো আশেপাশে কোথাও দাঁড়িয়ে ছিল।
মায়া বলল," হ্যাঁ বাপি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা বিয়ে করব। তুমি ওকে অনুমতি দিয়ে দাও।"

দিবাকর সেন সরকারি দপ্তরে অনেক কঠিন সমস্যা দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন। মাথা ঠান্ডা রেখে কিভাবে সমস্যার মোকাবিলা করতে হয় সে সুনামও তার আছে। এই মুহূর্তে মুখের অভিব্যক্তিতে তা বুঝতে দিলেন না।  ঠান্ডা মাথায় বললেন, " ঠিক আছে, আমি একটু ছেলেদের সঙ্গে আলোচনা করি, তারপর সিদ্ধান্ত জানাচ্ছি।"

রাতে এক বিন্দু ঘুমোতে পারেন নি তিনি। একই কথা বারবার ভাবছেন। এক সাধারণ কাঠের মিস্ত্রি সেন বাড়ির জামাই হবে ভাবতেই শিউরে উঠছেন।

পরদিন মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে ফিরলেন তিন ঘন্টা পর। সাধারণত এক ঘন্টা ঘুরে সাড়ে ছ'টার মধ্যে ফিরে আসেন। আজ ফিরলেন নটার পর। ফিরেই স্ত্রীকে একান্তে ডেকে গতকালের ঘটনাটা বললেন। স্ত্রী শুনে বোবা। কোনও কথাই বলছেন না।

দিবাকর বললেন," কি হল চুপ করে আছো কেন? কিছু বলো?"

স্ত্রী ছলছলে চোখে  বললেন," কি বলবো? আট বছর হয়ে গেল বিএ পাশ করেছে। এরমধ্যে আমরা ওর বিয়ের চেষ্টাই করলাম না। এখন মেয়ে নিজেই ঠিক করে নিয়েছে বলার কিছু নেই।"

" তাই বলে সাধারণ এক কাঠের মিস্ত্রি ! যে বাড়ি বাড়ি কাজ করে বেড়ায় ! ভাল একটা ঘরবাড়িও নেই। কি দেখে পছন্দ করল আমার মাথায় এখনও ঢুকছে না।"

উত্তরে স্ত্রী কোনও কথাই বললেন না। চোখ দিয়ে টস টস করে জল পড়ছে তার।

                                                  ( দুই )

ইতিমধ্যে ঘটনাটা পরিবারে রাষ্ট্র হয়ে গিয়েছে। সকলে এক বাক্যে ছি ছি করে যাচ্ছে।মায়াকেও কটু কথা শোনাতে ছাড়ছে না কেউ কেউ। রুচিবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

এদিকে দিবাকর সেন ছেলে বৌমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, রাত নটায় একটি জরুরি পারিবারিক আলোচনায় বসবেন। সকলকেই উপস্থিত থাকতে হবে।
নানা জনে নানা কথা বললেও মায়ার কোনও প্রতিক্রিয়া বোঝা যাচ্ছে না। সংসারের কাজ যেমন করত কোনও খামতি নেই। বড়দের কারও কটু মন্তব্যে মুখে কুলুপ। কোনও রা নেই।

মেজ বউমা একটু বেশি লম্ফঝম্প করছে। স্বামীকে যা নয় তাই বলে রুঢ় কথা শোনাচ্ছে। রাস্তার কাঠের মিস্ত্রীকে বিয়ে করলে ফ্যামিলির প্রেস্টিজ থাকবে? স্বামীকে বলল,"  রাধুনির হাতের রান্না মুখে রুচবে তো? ভাল চাও তো বিয়েটা যেনতেন প্রকারে আটকাও।"

অনেকের অনেক রকম সমস্যা থাকবেই। সমাধান কি ভাবে হবে সেটাই বড় কথা। মায়ার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দিবাকর সেন নিজে। এখন দেখার, তিনি কি রায় দেন।

রাত নটা। ড্রইংরুমে পাশাপাশি সকলে এসে বসেছে। তিন ছেলে এবং তিন বউমা। পাশেই বসেছেন দিবাকর সেনের স্ত্রী। মায়াকে দেখা যাচ্ছে না। আড়ালে থেকে শুনছে কিনা বলা মুশকিল। তবে দিবাকর সেনকে আজ অনেকটা সপ্রতিভ মনে হচ্ছে। গতকালও যেমন চিন্তাক্লিষ্ট অবয়ব ছিল আজ তা উধাও।

তিনিই শুরু করলেন। বললেন, " তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ তোমাদের একমাত্র বোন একটা প্রস্তাব পেশ করেছে।  এবং সেটা সরাসরি আমার কাছেই দিয়েছে। আমি জানিয়েছি, তোমাদের সঙ্গে আলোচনা করে ফাইনাল সিদ্ধান্ত জানাব। এই কারণেই তোমাদের ডেকেছি। এবার এক এক করে তোমরা তোমাদের মতামত জানাও তারপর  আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসব।"

"মেজ ছেলে বলল,"এ প্রস্তাব কোনও মতেই মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের শিক্ষাদীক্ষা, সর্বোপরি স্টেটাসের ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে। বিয়ে হলে মান-সম্মান বলে কিছু থাকবে না।"

মেজ বউমা বলল," এ বিয়ে হলে আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে বাবা।আগে থেকে বলে রাখছি। কারণ আমি নিজেই বাপের বাড়িতে মুখ দেখাতে পারব না।"

বড় বউমা বলল," ওর বিয়েটা আগেই হওয়া  উচিত ছিল বাবা। আমাদের গাফিলতি অনেক ছিল। এখন দেখুন, আপনি যা সিদ্ধান্ত নেবেন তাইই আমি মেনে নেব।"

বড় ছেলে বলল," ছেলেটি সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিয়ে আপনিই সিদ্ধান্ত নিন বাবা।"

ছোট ছেলে বলল," বড়দা বড়বৌদি ঠিক কথাই বলেছেন বাবা। এতদিন বিয়ের চেষ্টা না করে আমরা খুব ভুল করেছি। আপনি খোঁজখবর নিন । মায়া যখন পছন্দ করেছে বুঝেশুনেই নিয়েছে। দেখে আপনি সিদ্ধান্ত নিন।"

এবার দিবাকর বলতে শুরু করলেন," তোমাদের সকলের কথা শুনলাম। আমাদের গাফিলতির জন্যই এতদিনেও বিয়েটা হয় নি সত্যি কথা । তবে সেসব ভাবনা না ভেবে সম্মুখে কি করতে পারি সেটাই আলোচনা করা উচিত। যাই হোক, আমি খবর নিয়েছি, ছেলেটি বি.এস.সি পাশ,  ভদ্র পরিবারের ছেলে। বাবা প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক ছিলেন। ছেলেটিও উদ্যোগী এবং কর্মঠ। মায়া যখন পছন্দ করেছে ওর সঙ্গেই বিয়েটা হোক আমি চাই। তবে যেহেতু বাড়িঘর ভাল নয়। তাই আমি স্থির করেছি আমার সঞ্চিত অর্থ থেকে ওকে একটি ফ্ল্যাট কিনে দেব এবং ছেলেকে একটি ফার্নিচারের দোকান করে দেব। বুদ্ধিমান ছেলে ফার্নিচারের শোরুম করে দিলে চড়চড় করে উন্নতি করবে বলে আমার বিশ্বাস। তখন স্টেটাস নিয়ে কেউ কথা তুলতে পারবে না।যেহেতু আমাদের একমাত্র মেয়ে এবং তোমাদের ছোট বোন। আমার ইচ্ছে ওর বিয়েটা ধুমধাম করে হোক। তোমাদের কাছে অনুরোধ, ওর বিয়ের খরচটা তোমরা দেবে। বাকিটা আমি সামলে নেব।

কথা শুনে মেজ ছেলে মেজ বউমা উঠে চলে গেল। বড় ছেলে বলল," আমাদের কত দিতে হবে বলবেন বাবা, আমরা দিয়ে দেব।"

ছোট ছেলে বলল," আমিও চাই মায়ার বিয়েটা ধুমধাম করে হোক। যা টাকা লাগে বলবেন বাবা, দিয়ে দেব।"

দিবাকরের স্ত্রী বললেন," আমার পঁচিশ- ছাব্বিশ ভরি গহনা আছে। সব আমি মেয়েকে দিয়ে দেব। মেয়ে সুখী হোক এটাই শুধু কামনা করি। "

দিবাকর সেন বললেন,"তাহলে কাল থেকেই  বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করছি। "

মায়া বোধহয় আশেপাশেই কোথাও ছিল। হঠাৎ ধূমকেতুর মতো উদয় হয়ে বলল," তোমাকে অত খরচ করতে হবে না বাবা। মন্টু নিজেই একটা ফ্ল্যাট কিনেছে। আর ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে দোকান ঘরও পাকা করে ফেলেছে। তাছাড়া তোমাদের কাছ থেকে কিছু নেবে না বলেছে। তোমরা শুধু বিয়েটা দিয়ে প্রাণভরে আশীর্বাদ করো তাতেই আমরা সুখী হব।"

দিবাকরবাবু মন্টুর মনোভাব শুনে মনে যেন শক্তি পেলেন। আবেগ বিহ্বল হয়ে মেয়েকে কাছে টেনে মাথায় হাত রাখলেন।

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

লেখক পরিচিতি -

নিত্যরঞ্জন দেবনাথ পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার পানুহাটে ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।কাটোয়া কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। বর্তমানে থাকেন হুগলির চুঁচুড়ায়। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন।অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল-এর অধীন ডিভিশনাল অ্যাকাউন্টস অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম গল্প " চেতনা " ছোটদের পত্রিকা শুকতারায় ১৯৯৬ - এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ, শিলাদিত্য, কালি ও কলম,মাতৃশক্তি, তথ্যকেন্দ্র, কলেজস্ট্রিট, কথাসাহিত্য, দৈনিক স্টেটসম্যান, যুগশঙ্খ, একদিন,,সুখবর ইত্যাদি এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর সাহিত্যকীর্তি অব্যাহত। ইতিমধ্যে পাঁচটি গল্প সংকলন ও চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক "শতানীক " পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করে আসছেন।