মধ্য
বয়সে এসে হঠাৎ চাকরিটা চলে গেল অখিলের। হিসেব মতো আঠারো বছর চাকরি করেছে। কোম্পানি
ফেল। দেউলিয়া ঘোষণার নোটিস ঝুলিয়ে দিয়েছে। তার এখন বেয়াল্লিশ। এই বয়সে নতুন করে
চাকরি কোথায় পাবে? হন্যে হয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত। কলকাতার বেহালায় লোন
নিয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনেছিল। ভাগ্যিস গত মাসে শেষ কিস্তির টাকা শোধ করে ব্যাংক থেকে
দলিল ফেরত পেয়েছে। ভেবেছিল এবার ইচ্ছেগুলো পূরণ করবে। মনের গভীরে লালন করা সুপ্ত
বাসনা। বউ মেয়েকে সারপ্রাইজ দেবে। সব তছনছ করে দিল। সাত মাসেই ব্যাংকের পাসবুক
তলানিতে। সংসার চালানোর চিন্তায় অস্থির। মাস গেলেই ইলেকট্রিক বিল, গ্যাস, ঠিকেঝি
-- থোক টাকা। পাবে কোথায়? বাড়িতে সুন্দরী স্ত্রী ও ফুটফুটে এক কন্যা। তাদের
ব্যবহারও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। স্ত্রী অপর্ণাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। একদিন না
দেখলেই চোখে হারাত। দুর্বার আকর্ষণ। সেই অপর্ণার নিত্য খিটিমিটিতে বাড়িতে টেকা
দায়। শুন্য হাতে পৃথিবীটাই শুন্য। বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন উপলব্ধি তার।
মায়া মমতা প্রেম ভালোবাসা সব আপেক্ষিক। সবই নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ। ভালোবাসার
মানুষটার এমন কদর্য ব্যবহার তার মনকেও বিষিয়ে তুলল। ক্ষোভে দুঃখে দু'রাত্রি বাড়ি
ফেরেনি সে। না, তাতেও হেলদোল নেই কারো। অর্থাৎ তার থাকা না-থাকা সমান। জানে বাড়িতে
সামান্য যা গয়নাগাটি আছে তার বিনিময়ে গ্রাসাচ্ছাদন চলছে। কিন্তু তাকে যেন চিনতেই
পারে না। যা অন্তর গভীরে গিয়ে বারবার
আলোড়ন তুলছে। তাহলে তার থেকে লাভ কি? তখনই বড় সদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল।
এক
বন্ধুর সহযোগিতায় দুবাই পাড়ি দিল। এর আগেও কয়েকবার প্রস্তাব দিয়েছিল। স্ত্রীকে
ছেড়ে ভিন দেশে ইচ্ছে করেনি। ভিসা,
পাসপোর্ট বন্ধুই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। স্কুল জীবনের বন্ধু। প্রথমে তার ডেরাতেই
আশ্রয়। কারখানার শ্রমিকের কাজ দিয়ে শুরু হলেও প্রমোশন হতে বেগ পেতে হয়নি। সে ছিল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার। ভাগ্যক্রমে
এক বছরের মধ্যে ভদ্রস্থ চাকরিতে থিতু হল।
দোদুল্যমান
মন হলেও দায়বদ্ধতার কথা ভেবে অপর্ণার অ্যাকাউন্টে নিয়মিত টাকা পাঠাতে লাগল। একবার
মাত্র অপর্ণাকে ফোন করে জানিয়ে রাখল সে কথা। তারপরেই সেই সিম নষ্ট করে ফেলল। না,
আর যোগাযোগ রাখার ইচ্ছেটাই নেই। মরে গেছে সব। নিয়মিত অর্থ যোগান দিয়ে গেলেও এজীবনে
আর মুখদর্শন নয়। একরকম প্রতিজ্ঞা করেই ফেলল। বন্ধু বলেছিল, "আর যখন দেশে
ফিরবি না বলছিস, তাহলে একটা বিয়ে করে ফেল। নতুন ভাবে জীবন শুরু কর।" না, সে
পথেও যাওয়ার মানসিকতা নেই। অতীত তাকে কঠিন শিক্ষা দিয়েছে। পিছুটান থেকে মুক্ত
থাকতে চায় সে। বিদেশ বিভুঁইয়ে নানা দিক ম্যানেজ করে থাকতে হয়। তাছাড়া চাকরি আজ আছে
কাল নাও থাকতে পারে। দ্বিতীয় বার ফাঁসিকাঠে ঝুলতে
রাজি নয় সে। আর বোকামি নয়। ছোট্ট জীবন। বিনোদনের অভাব নেই। মনকে সেভাবেই
বোঝাল সে।
মানুষের
জীবন বৈচিত্রময়। ভালো মন্দ মিশিয়েই জীবনের চরাচর।
জীবনদর্শন অনেক শিখিয়েছে তাকে। এবার একমাত্র নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার
চেষ্টা। তারপরেও যদি আঘাত আসে। সামাল দেওয়ার চেষ্টা করবে। একা তো। হয় এসপার নয়
ওসপার। কৈফিয়ত দেওয়ার দায় তো নেই।
দেখতে
দেখতে পনের বছর অতিক্রান্ত। ইতিমধ্যে চাকরিতে প্রভূত উন্নতি করেছে। মোটা টাকা
স্যালারি। আসলে প্রথম থেকে মনপ্রাণ দিয়ে কাজের মধ্যেই ঢুকে গেছে সে। আন্তরিক
চেষ্টা, একাগ্রতা এবং তাঁর দক্ষতা দেখে কর্তৃপক্ষ খুশি হয়েই পরপর প্রমোশন দিয়ে গেছেন।
ভাবতে অবাক লাগে এখন তার বন্ধুরও উপরওয়ালা সে। না, তারজন্য কোনও রেষারেষি নেই।
বন্ধুর প্রতি সে কৃতজ্ঞ। কিন্তু অত টাকা
নিয়ে কি করবে। তাই অপর্ণার অ্যাকাউন্টে অর্ধেক টাকা পাঠাতে লাগল। জানে এর
সিকিভাগেই অপর্ণার সংসারে ঢের। তবু সেই বা এত অর্থ নিয়ে কি করবে? হ্যাঁ, খরচ করার
বহু প্রলোভনের দিক আছে ঠিক কথা। চোখের সম্মুখেই বিনোদনের নানা উপকরণ। হাত বাড়ালেই
মুহূর্তের মধ্যেই খরচ হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু সে তো প্রথম থেকেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এখন চাইলেও দু'হাত প্রসারিত করতে পারে না। মানসিকতায়
বাধছে।
কোম্পানির
ফ্ল্যাটে রাত্রি যাপন। অন লাইনে প্রয়োজনীয় সব কিছু আনিয়ে নেয়। অর্থাৎ হাতের কাছেই
সব। বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচিতি নেই বললেই চলে। ইচ্ছে বা আগ্রহ প্রথম থেকেই নেই।
ফ্ল্যাটবাড়ি এবং কর্মস্থল -- এইটুকুই তার পৃথিবী। একটা ঘোরের মধ্যে ব্যস্ততায়
দিনগুলো কাটে। সবাই বলে কাজ পাগল।
ইদানিং
একাকীত্ব তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। রাতে ঘুমের দফারফা। শুধু অতীত নিয়ে কাটাছেঁড়া। যে
মনোবল, উদ্যম এবং অদম্য জেদ নিয়ে কাজে বের হত সেটাও যেন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে আসছে।
ভাবছে কি লাভ ? কি পেলাম জীবনে ! যা এই পনের বছর যাবৎকাল মাথা থেকেই উবে গিয়েছিল ।
হঠাৎ যেন সেই সময়কালটা মস্তিষ্কে ঢুকে কড়া নাড়ছে। কি করছিস তুই? মাঝেমধ্যে
দিশেহারা অবস্থা।ভাবে অপর্ণাকে ফোন করলে কেমন হয়। পরক্ষণেই সারা শরীর কাঁপতে থাকে।
না কক্ষনো নয়। তবুও তাদের কথাই শয়নে
স্বপনে। তার ফুটফুটে কন্যাটি হয়তো কলেজের গন্ডি পার করে ফেলেছে। দেখে চিনতেও পারবে
না।
তিন
মাসের ছুটির আবেদন করল। মঞ্জুর হবে নিশ্চিত। কারণ পনের বছরে একদিনও ছুটি নেয় নি।
উল্টে ছুটির দিনেও কাজে গিয়েছে। দ্বিধাদ্বন্দ কাটিয়ে ফ্লাইটের টিকিটও কেটে ফেলল।
মনের কথা মনে থাক। বন্ধুকে বলল, "দেশের জন্য মন আঁকুপাকু করছে। কটা দিন
জন্মভূমিতে কাটিয়ে আসি। কোথায় উঠব এখনও সিদ্ধান্ত নিইনি। দেশের বাড়ি বর্ধমানে এক
কাকা থাকেন। অনেকদিন যোগাযোগ রাখিনি, সেখানেও যেতে পারি।" একজনকে চার্জ
বুঝিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত।কাজ থেকে আপাতত মুক্ত। দুটো দিন ফ্ল্যাটেই কাটাল। দু'দিনেই
টের পেল একাকীত্বের জ্বালা। অসলগ্ন ভাবনাই তাকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এর চেয়ে
মৃত্যুর পথ সহজ বলেই মনে হয়েছিল। বাধা পেয়ে দৈবাৎ বেঁচে গেল। না হলে হয়তো ...।
বেলা
একটা। দমদম বিমান বন্দর থেকে নেমে বাইরে বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরল। চৈত্রের শেষ। মাথার
উপর সূর্যদেবের অগ্নিশিখা। আগুনের হলকা চারিদিকে। বেহালার কমপ্লেক্সের ভেতর ঢুকে
ট্যাক্সি থেকে নামতেই টের পেল। তপ্ত সেঁকা। পনের বছরে আমূল বদলে গেছে সব। ঢোকার
মুখেই এক শপিংমল। বেশ কিছু দোকানপাট। ঝকঝক তকতক করছে সব। একমাত্র ফ্ল্যাট
বিল্ডিংগুলো ম্যারম্যারে বিবর্ণ। তিনতলার ওর ফ্ল্যাট। লিফটে না গিয়ে সিঁড়ির দিকে
এগিয়ে গেল।
কলিং
বেলে হাত ছোঁয়াতেই দরজা খুলে গেল। সম্মুখে অপর্ণা দাঁড়িয়ে। বয়স বাড়লেও অপর্ণা যেন
একই রকম আছে। বরং জেল্লা বেড়েছে। আরও সুন্দরী হয়েছে। আশ্চর্য চুলেও পাক ধরেনি। নাকি কলপ করেছে! অপর্ণা অবাক
বিস্ময়ে তাকেই দেখছে। মুখে টু শব্দটি নেই। মিনিট খানেক পর দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। সেও
নীরবে নিজের রুমে ঢুকে গেল। ফ্ল্যাটে দুটি বেডরুম। একটিতে মা মেয়ে থাকে আরেকটি তার
নিজস্ব। এখন সেটা ব্যবহৃত হয় কিনা জানে না। তবে বিছানাপত্র টিপটপ গোছানো। পাশেই
চেয়ার টেবিল। টেবিলের বইগুলো সম্ভবত মেয়ের।
সে বলল," এক গ্লাস জল দাও।" অপর্ণা জল এনে দিল। ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে
তাকেই দেখছে। এখনও বোবা। কথা নেই। সে ঢক ঢক করে জল খেল। ফুল স্পিডে ফ্যান চলছে তবু
কলকল করে ঘামছে। এসি নেই কেন ভেবে পায় না। বলল, স্নান করব। বাথরুমে ঠান্ডা জল আছে?
এই প্রথম অপর্ণার মুখে বোল ফুটেছে। বলল," ট্যাংকির জল গরম হয়ে আছে। তবে বড় এক
বালতি জল তোলা আছে তাতেই স্নান করে নাও।"
স্নান
সেরে ফ্রেস হয়ে এসে দেখে ডাইনিংয়ে অপর্ণা ভাত বেড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডাল ভাজা তরকারি
মাছের ঝোল। বলল," এস খেয়ে নাও।"
চনমনে খিদেও পেয়েছে। কথা না বলে বসে পড়ল। অনেকদিন বাড়ির খাওয়া পায় নি।
গোগ্রাসে খেতে লাগল। তখনই তার কন্যাটি পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অনেক বড় হয়ে গেছে।
সুন্দরী হয়েছে। অপর্ণা বলল," ইনি তোর বাবা। এতদিন খোরপোশ পাঠাতেন যিনি। আজ
হঠাৎ দেখতে ইচ্ছে হল বলে এসেছেন।"
সে বলল," তোমাদের কাছে টাকাটাই তো সব। আমার প্রয়োজন তো নেই। সেটা বুঝেই তো
টাকা পাঠিয়ে গেছি।"
অপর্ণা
বলল," বাজে কথা একদম বলবে না। খাওয়ার সময় বেশি কথা বলতে চাই না। পরে বোঝাপড়া
হবে। এখন খেয়ে নাও।"
কি
বোঝাপড়া হবে সে জানে না। তবে তার মন এখনো ভেজে নি। পনের বছরের আগের ঘটনা সহজে কী
ভোলা যায়?
সে খুব
ক্লান্ত। এতটা জার্নি করে এসেছে। একটা লম্বা ঘুম দিতে পারলে ভাল হতো। মেয়ের সঙ্গে
কথা বলে তৃপ্তি পেল। ইংলিশে এম.এ করে বিএড করেছে। একটি স্কুলে শিক্ষকতাও করছে।
খাওয়ার পরেই বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কিন্তু অপর্ণা শুরু করে দিয়েছে তার পনের বছরের
পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। এমন ভয়াবহ রূপ আগে সে দেখেনি কোনোদিন। কথার পর কথা। থামার কোনো
লক্ষণই নেই। আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে চাকরি চলে যাবার পর তার প্রতি যে কদর্য ব্যবহার
করেছিল কিছুতেই স্বীকার করছে না । নিজের কথাই বলে যাচ্ছে শুধু। এরপর তার প্রতি দরদ
কতটুকু থাকতে পারে !
রাতে
অবশ্য আর কোনো কথা হয় নি। পরদিন সকালে চায়ের টেবিলে বসে অপর্ণা বলল, " বৈশাখ
মাসের এগারো তারিখে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছি। ছেলেটি কলেজে পড়ায়। মেয়েই অবশ্য ছেলে
পছন্দ করেছে। বিয়েটা হয়ে গেলে আমি চলে যাব।"
সে
বলল," কোথায় যাবে?"
অপর্ণা
বলল," কেন? তোমার সঙ্গে তোমার কর্মস্থলে !"
সে
কিছু বলল না। হ্যাঁও না নাও না। এক পলক মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল শুধু।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি -
নিত্যরঞ্জন দেবনাথ পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার পানুহাটে ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।কাটোয়া কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। বর্তমানে থাকেন হুগলির চুঁচুড়ায়। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন।অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল-এর অধীন ডিভিশনাল অ্যাকাউন্টস অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম গল্প " চেতনা " ছোটদের পত্রিকা শুকতারায় ১৯৯৬ - এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ, শিলাদিত্য, কালি ও কলম,মাতৃশক্তি, তথ্যকেন্দ্র, কলেজস্ট্রিট, কথাসাহিত্য, দৈনিক স্টেটসম্যান, যুগশঙ্খ, একদিন,,সুখবর ইত্যাদি এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর সাহিত্যকীর্তি অব্যাহত। ইতিমধ্যে পাঁচটি গল্প সংকলন ও চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক "শতানীক " পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করে আসছেন।
.jpg)