সুনীতা
চেয়েছিল মনের মতো বর ও ভাল একটা ঘর। যেখানে কোনও বিভেদ নেই মনোমালিন্য নেই আছে
শুধু শান্তির বাতাস। ভালবাসাই পারে শান্তির নীড় গড়তে। গুছিয়ে সংসার করার স্বপ্ন
ছোট থেকেই। স্বামী বড় চাকরি করবে বা বৃহৎ অট্টালিকা থাকবে -- সেসব আকাঙ্খা
কোনোদিনই ছিল না। অভাব অনটন থাকলেও ক্ষতি
নেই , একমাত্র বরের ভালবাসা টুকু পেলেই তার কাছে স্বর্গসুখ। মানুষের সুপ্ত
ইচ্ছেগুলো সম্ভবত সমাজ, বাড়ির পরিবেশ, অর্থাৎ ছোট্ট থেকে দেখে দেখে বোধের জন্ম
নেয়। সে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। জ্ঞান হওয়া থেকেই বাবা-মাকে দেখছে যেন একে
অপরের পরিপুরক। একজনের অনুপস্থিতিতে অপরজন অচল।
মনে হয় তাদের ভালবাসার বন্ধন যেন জন্ম জন্মান্তরের। তাদের দেখেই হয়তো
কল্পনার জগতে বিচরণ। সুনীতার জীবনের
আদর্শ পুরুষ তার বাবা। মানুষটাকে কখনও বিচলিত হতে দেখে নি।যদিও প্রচলিত প্রথা
অর্থাৎ চিরাচরিত সুখের বিছানায় থাকেন নি কোনওদিন।তবু সুখের বাতাস পরিবারে স্বমহিমায় বিরাজ করত। অসুখ বিসুখ অভাব
অনটনেও কখনও মুহ্যমান হয়ে পড়তে দেখে নি বাবাকে। বলতেন, শত বাধার মধ্যেও মনকে শান্ত
রাখাটাই জয় করার আসল শক্তি। অস্থির, চঞ্চল মস্তিষ্কে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা
কঠিন।
সুনীতা
এম.এ পাশ করার পরই আচমকা বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। মায়ের এক দূর সম্পর্কের কাকা
পাত্রের সন্ধান আনেন। তিনিই অভিভাবকের মতো বিয়ের প্রস্তাব দেন। মায়ের এক কথা, মেয়ে
ডাগর হয়ে বড় পাশ দিয়ে ফেলেছে আর বাড়িতে রাখা নয়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাত্র দেখে
বিদেয় কর।
কনে দেখা সম্পন্ন হওয়ার পর বাবা-মা গিয়েছিলেন ছেলের বাড়ি। ছেলে সরকারি অফিসের আপার
ডিভিশন ক্লার্ক। একতলা পুরোনো ছোট বাড়ি। বাপের একমাত্র সন্তান। বাবা প্রাইমারি
স্কুলের শিক্ষক।সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার। যদিও সুনীতা এর বেশি আশাও করেনি। কিন্তু
বাবার মনে বোধহয় সংশয় । মা বারবার পরিবার এবং ছেলের প্রশংসা করলেও বাবা মুখ ফুটে
একটা কথাও বলেন নি। শুধু বললেন, তোকে লেখাপড়া শিখিয়েছি নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার
জন্য। প্রাণপণ চাকরির পরীক্ষাগুলো দিয়ে যা। আমার বিশ্বাস নিশ্চিত চাকরি পেয়ে যাবি।
আজকের দিনে মেয়েদের স্বাবলম্বী হওয়াটা খুব জরুরি। বিয়েটা জীবনের একটা বড় অধ্যায়
হলেও তাড়াহুড়োর ব্যাপার নয়। তবু তোর মায়ের
ইচ্ছেকে সম্মান দিতেই আমি রাজি হয়েছি। মনে রাখিস মেয়েদের বিয়েটা সম্পূর্ণ ভাগ্য।
তবে মেয়েরাই পারে সংসারে সুখ আনতে। প্রাণপণ চেষ্টা করেও যদি না হয় তখন ভাগ্যকে মেনে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায়
থাকে না। তবে ভেঙে পরিস না কোনও অবস্থাতেই। ভাগ্য মানুষই তৈরি করে আবার মানুষই
ভাঙে। মানুষ মাত্রই ঝড় বৃষ্টি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে যেমন মোকাবেলা করতে হয় তেমনি
নিজের জীবনেও নেমে আসে অলিখিত নানা দুর্যোগ -- তারজন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখা
আবশ্যক।
বিয়ে
হয়ে গেল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ওদের দাম্পত্য জীবন এক বছরও টিকল না। পেটে সন্তান নিয়ে সাত মাসেই বাপের
বাড়ি পদার্পণ। প্রাণপন চেষ্টা করেছিল সুনীতা। কিন্তু কিছুই হওয়ার নয়। অফিসের এক
কলিগের সঙ্গে এমন মেলামেশা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল তা রোধ করার ক্ষমতা
সুনীতার ছিল না। মেয়েটি নাকি চার মাসের গর্ভবতী। ভাবা যায় ! ইমিডিয়েট রেজিস্ট্রি
ম্যারেজ না করলে থানা পুলিশ করতে বাধ্য। শেষ কালে চাকরিটা তো যাবেই এমন কি
হাজতবাসও হতে পারে। এসব দেখেশুনে সুনীতা আর জলঘোলা করে নি। নিজেরই রুচিতে বাঁধছে।
যে ছেলে বিয়ের পরেও অন্য মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতে পারে তার সঙ্গে থাকার
প্রবৃত্তি নেই। ভাবতেই কুঁকড়ে উঠছে ওই দুশ্চরিত্রের সন্তান তার গর্ভে তিল তিল করে
বাড়ছে।
তারপর
থেকেই শুরু হয় কঠিন লড়াই। বাবা-মা ছিলেন
বলে বল ভরসা অটুট থাকলেও স্বামী সুখ অধরা
থাকার আক্ষেপ থেকে গেল সারা জীবন। আজ উপলব্ধি করতে পারে বাবা কেন আপত্তি করেও মেনে
নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেন বারবার তাড়াহুড়ো করতে বারণ করেছিলেন।
বাবা বললেন," আমি তো বলতে পারছি না তুই অন্য পাত্রের সঙ্গে বিয়ে হলে সুখী
হবি। তাই জোর করে বাধা দেব কোন যুক্তিতে?
তবু বলব, ভেঙে পরিস না। ইচ্ছে করলে জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করতে পারিস।
সে স্বাধীনতা তোর আছে। সিদ্ধান্ত তোর একান্তই ব্যক্তিগত। আমরা তোর পাশে আছি এইটুকু
জানবি।"
না,
সুনীতা আর নতুন পথে গমন করে নি। ফুটফুটে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়ে তাকে নিয়েই
যাপন করার সিদ্ধান্ত বাকিটা জীবন। সন্তানের নাম দিয়েছে উজ্জ্বল। ঈশ্বরের আশীর্বাদ
না থাকলে সব আশা পূরণ হয় না এমনই বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গিয়েছে। পুনরায় বিবাহের সুপ্ত
ইচ্ছে থাকলেও বিড়ম্বনা যে কম নেই সেটা ভেবেই ইতি টেনে দিয়েছে। ইতিমধ্যে একটি হাই স্কুলে শিক্ষিকার চাকরিও পেয়ে গিয়েছে।
এখন সন্তানটিকে মনের মতো মানুষ করাই জীবনের ব্রত।
বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানেই উজ্জ্বল স্কুল-কলেজের পাঠ শেষ করেছে। পৃথিবীতে মা
দিদা,দাদু-ই হল তার সবচেয়ে নিকটজন। তাঁদের
স্নেহ,আদর,ভালবাসায় বড় হয়েছে। ফলে পিতার
অভাববোধ তাকে অতটা কাবু করতে পারে নি। বরং বাবার প্রতি একরকম ঘৃণাই পোষণ করে আসছে।
যদিও সামাজিক কারণে স্কুল কলেজে বাবার নামটা নথিভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে । ঐটুকুই।
তাকে দর্শন করার স্পৃহা এতটুকু নেই। দিদার কাছে তার যা গল্প শুনেছে এরপর তার
মুখদর্শন করাও পাপ।
দেখতে
দেখতে সময় এগিয়ে চলেছে। আবহমান কাল ধরে যা চলবে। বিশ্ব চরাচরে যাই ঘটুক সময়ের চলার
বিরাম নেই। উজ্জ্বল ইংলিশে এম.এ পাশ করে এম ফিল কমপ্লিট করে একটি কলেজের লেকচারার হয়েছে। এবার তার জন্য
সুনীতা পাত্রীর সন্ধান করছে। বাবা-মা দুজনেই গত হয়েছেন। বেঁচে থাকলে তারাই দায়িত্ব
নিয়ে করতেন। একটা ব্যাপার ভেবে ভাল লাগছে উজ্জ্বলের যেমন সুনীতা একাধারে মা,অভিভাবক তেমনি বন্ধুও। মায়ের
কথা যেমন কখনও অমান্য করে না তেমনি তার মনের কথা অকপটে প্রকাশ করতেও দ্বিধা করে
না। আজ রবিবার। বিকেলে একটি পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা। মেয়েটির যা খবরাখবর পেয়েছে
আশা করছে পছন্দ হয়ে যাবে। হলে আজই কথা পাকা কথা দিয়ে আসবে। তারা সুন্দরীর থেকে মেয়ের ব্যবহার, বাড়ির
পরিবেশ এবং শান্ত শিষ্ট একটি মেয়ে চাইছে। উজ্জ্বল ও মায়ের পছন্দের দিক থেকে
অনেকটাই মিল। ফলে সুবিধা অনেক। তাদের পছন্দই মুখ্য।
সকালের
দিকে হঠাৎ এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। বেলা তখন দশটার এদিক ওদিক। আগেই বলেছি রবিবার।
ছুটির দিন। সবে জলখাবার খেয়ে সুনীতা রান্নার তোড়জোড় করছে। উজ্জ্বল দৈনিক পেপার
নিয়ে বসেছে। তখনই কলিং বেলটা বেজে উঠল। উজ্জ্বল
গিয়ে দরজা খুলতেই দেখে এক মধ্য বয়স্কা মহিলা দাঁড়িয়ে।
উজ্জ্বল
বলল," কি ব্যাপার বলুন। কাকে খুঁজছেন?"
মহিলা
বললেন," এটা কি সুনীতা স্যানালের বাড়ি। তিনি কি বাড়িতে আছেন?"
"
হ্যাঁ, আছেন। কি দরকার বলুন?"
"
তুমি কি তার ছেলে? ভেতরে যেতে পারি? একটু
জরুরি কথা ছিল।"
"
হ্যাঁ আমি তার ছেলে। ভেতরে আসুন।"
বাইরের
ড্রইংরুমে মহিলাকে বসিয়ে মাকে ডেকে নিয়ে এল উজ্জ্বল। মাকে দেখেই মহিলা হাতজোড় করে
বললেন," নমস্কার। আপনি আমাকে চিনবেন না। আমার নাম নিয়তি রায়। স্বামীর নাম
আলোকেশ রায়। আপনার সঙ্গে দু'একটা কথা বলা দরকার বলে এসেছি।"
নামটা
শুনেই চড়াম করে মাথাটা গরম হয়ে গেল সুনীতার। বেহায়া মহিলা আবার এই বাড়িতে ঢুকেছে
কোন উদ্দেশ্যে! বলল," আপনার সঙ্গে আমার কোনও কথা নেই। আপনি আসুন।"
মহিলা বলল," দেখুন আপনার রাগ হওয়া স্বাভাবিক। যা অন্যায় করেছি জানি তার ক্ষমা
হয় না। বলতে পারেন, প্রায়শ্চিত্ত করতে এসেছি। আমার কথাটা একটু বলতে দিন
প্লিজ।"
সুনীতা বলল," আপনার কোনও কথাই আমি শুনতে চাই না। বেরিয়ে যেতে বলেছি, বেরিয়ে
যাবেন এক্ষুনি। না হলে কিন্তু ভদ্রতা দেখাতে পারব না।"
উজ্জ্বল
বলল," মা, একটু শান্ত হও। উনি কি বলতে এসেছেন শোনাই যাক না। বলুন কি বলতে
এসেছেন।"
মহিলা বললেন," আলোকেশ অসুস্থ। মরণাপন্ন। মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো
সময় প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে। শেষ ইচ্ছে মৃত্যুর আগে তার সন্তান ও বিবাহিত স্ত্রীকে
একবার দেখে যেতে চায়। আপনাদের কাছে অনুরোধ একবার হসপিটালে এসে ওর শেষ ইচ্ছেটা পূরণ
করুন। আপনার পায়ে ধরে অনুরোধ করছি।"
" বিবাহিত স্ত্রী বলে কোন মুখে ? আমাদের
ডিভোর্স হয়ে গেছে বহু আগে। আমি কারও স্ত্রী নই। যাওয়ার কোনও প্রশ্নই আসে না।"
মহিলা
বলল," দিদি আমি নিঃস্ব। সব হারিয়েছি। আজ বলতে আর দ্বিধা নেই। ভগবানই আমাকে
শাস্তি দিয়েছেন। তাই অকপটে সত্যি কথাটা বলে যেতে চাই। আলোকেশ আমাকে কোনওদিনই
ভালবাসে নি। আজও নয়। আমরা একই অফিসে চাকরি করেছি। পাশাপাশি টেবিল। আলোকেশ না
বাসলেও আমি কিন্তু ওকে খুব ভালবাসতাম। ওর যখন বিয়ে ঠিক হয়ে যায় তখন থেকেই আমার জেদ
চেপে গেল। যে করেই হোক ওকে পেতেই হবে। আপনাদের বিয়ের ঠিক দু'মাস পর আমার জন্মদিন
ছিল। আমি পরিকল্পনা করেই একা আলোকেশকে বাড়িতে আমন্ত্রণ করেছিলাম। সে জানত তার মতো
অনেকেই আমন্ত্রিত। কিন্তু আমি আর কাউকেই বলিনি। সেদিন ইচ্ছে করেই পানাহারের
ব্যবস্থা রেখেছিলাম। জানতাম, আলোকেশ মাঝেমধ্যে মদ্যপান করে। রাত নটায় আমার নিজের রুম বন্ধ করে পানাহারে বসি।
আলোকেশ বলেছিল দু'পেগের বেশি খাবে না। আমি তাতেই সম্মতি দিয়ে শুরু করি। জানি তখন
আপনি বাপের বাড়ি ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই বাড়ি ফেরার তাড়া থাকবে না। একটু একটু খেতে
খেতে নেশাও চড়তে থাকে। তখন আর আলোকেশ
আপত্তি করেনি। পর পর দিয়ে গেছি সম্ভবত
সাত-আট পেগ তো হবেই। নেশায় চুর। বিশ্বাস
ছিল একটু সাহসী হতে পারলে নিশ্চিত সফল হব। যেহেতু আমিও নেশা করেছিলাম লাজ-লজ্জার
উর্ধে উঠতে অসুবিধে হয় নি। আজ বলতে দ্বিধা নেই সে রাতে আলোকেশকে বেআব্রু করে আমিও
নগ্ন হয়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিলাম সারারাত। ভোরের দিকে ওর হুশ ফেরে। আমাকে এক ঝটকায়
সরিয়ে দিয়ে দ্রুত ড্রেস পরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। আমি ক্যামেরা ফিট করে কিছু
ছবিও তুলে রেখে ছিলাম। যাতে অস্বীকার করতে না পারে। তারপর চারমাস পরের ঘটনা তো
আপনি নিজেই জানেন। আপনিই ওকে ছেড়ে গেলেন।
ডিভোর্সের নোটিস দিলেন। আমার রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেল।
সুনীতা নির্বাক! সন্তানের সম্মুখে এমন নোংরা কথা কী করে উচ্চারণ করতে পারল?
সাংঘাতিক মহিলা ! এতো মানুষকে খুন করতেও দ্বিধা করবে না।
মহিলা
হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল। কান্নার সুরে বলল," এর জন্য ঈশ্বর আমাকে চরম শাস্তি দিয়েছে
দিদি। অনেক আশা পোষণ করলেও সন্তানের মা
হতে পারলাম না। বিয়ের পরই আলোকেশ যখন বুঝতে পারে আমি ব্ল্যাকমেল করেছি, তারপর থেকে
শুধু ঘৃণা অবজ্ঞাই জুটেছে কপালে। চালাকির
দ্বারা মহৎ কাজ যে হয় না বাস্তবিক সত্য। রন্ধ্রে রন্ধ্রে টের পাচ্ছি। তবু আজও
কিন্তু আলোকেশকে সমান ভালবাসি। আমার জন্যই অতিরিক্ত নেশা করে করে মারণ রোগ
বাধিয়েছে। আঠারোটা কেমো নিয়েও কোনও উন্নতি নেই।
সঞ্চিত অর্থ শেষ করে সমস্ত গহনা বিক্রি করে চিকিৎসা করিয়েছি। গতকাল ডাক্তার
বললেন, আর কেমো নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই।
লাস্ট স্টেজ। ঈশ্বরকে ডাকুন। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। আপনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
মাঝে মধ্যেই বলত, সুনীতার মতো মেয়ে হয় না। সত্যিকারের লক্ষীমন্ত বুদ্ধিমতী, সংসারি
মেয়ে ছিল। ভালই হয়েছে নিজেই ডিভোর্সের নোটিস পাঠিয়েছে। ওর মতো মেয়ের যোগ্য পাত্র
ছিলাম না। ওর আরো ভাল ছেলের সঙ্গে বিয়ে হবে। দেখে নিও। ছ'মাস আগে থেকেই বায়না ধরেছে আপনাদের একবার
চোখের দেখা দেখতে চায়। আমি আমল দিইনি। এখন ভাবলাম, মানুষটাই তো থাকবে না। অনেক পাপ
করেছি। একটা কথা যদি রাখতে পারি মানুষটা অন্তত শান্তিতে যেতে পারবে। হসপিটালের
ঠিকানা, বেড নাম্বার রেখে গেলাম। পায়ে ধরে
অনুরোধ করছি, একবার অন্তত বিকেলে দেখা দিয়ে আসবেন। আসছি দিদি।" বলেই মহিলা
বেরিয়ে গেলেন।
সুনীতা
নিশ্চল, নীরব, বাক্যহারা। পাথরের মতো স্থির বসে আছে। দু'চোখ দিয়ে টস টস করে জল
পড়ছে। যেন শরীরের শক্তি নিঃশেষ। ভারাক্রান্ত পরিবেশ। উজ্জ্বলের মুখেও কোনও কথা
নেই। তারও বোধহয় কথা হারিয়ে গেছে।
বেশ
কিছুক্ষণ পর উজ্জ্বল বলল," মা, ওদেরকে ফোন করে বলে দাও আজ মেয়ে দেখতে যাচ্ছি
না। পরের রবিবার যাব।"
সুনীতা
বলল," না, কথা দিয়েছি। আজই যাব। অন্য কোথাও যাব না। আমি সব মন থেকে মুছে
ফেলেছি।"
উজ্জ্বল
মাকে দেখে ভয় পেয়ে গেল। শরীর খারাপ করছে কি ! তবু বলল, সে ঠিক আছে। এটা নিয়ে তোমার
সঙ্গে পরে আলোচনা করছি। তুমি আপাতত জানিয়ে দাও, আজ মেয়ে দেখতে যাচ্ছি না।
সুনীতা
হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। উজ্জ্বল বসেই আছে। মায়ের কাছে গেল না। একটু কাঁদুক।
কাঁদলে শরীর মন হালকা হবে।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি -
নিত্যরঞ্জন দেবনাথ পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার পানুহাটে ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।কাটোয়া কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। বর্তমানে থাকেন হুগলির চুঁচুড়ায়। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন।অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল-এর অধীন ডিভিশনাল অ্যাকাউন্টস অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম গল্প " চেতনা " ছোটদের পত্রিকা শুকতারায় ১৯৯৬ - এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ, শিলাদিত্য, কালি ও কলম,মাতৃশক্তি, তথ্যকেন্দ্র, কলেজস্ট্রিট, কথাসাহিত্য, দৈনিক স্টেটসম্যান, যুগশঙ্খ, একদিন,,সুখবর ইত্যাদি এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর সাহিত্যকীর্তি অব্যাহত। ইতিমধ্যে পাঁচটি গল্প সংকলন ও চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক "শতানীক " পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করে আসছেন।
.jpg)