ধারাবাহিক গল্প – প্রতি মঙ্গলবার ।
পর্ব – ১
অপ্রয়োজনীয়
কিছু কাগজপত্র অপসারণ করার জন্য তন্ময় বাবু
বেশ কিছু ফাইল-পত্র নিয়ে বসেছিলেন। একটা একটা করে কাগজ খুলে বাছতে বাছতে হঠাৎ তাঁর
হাতে উঠে এলো একটা খাম। খামটা খুবই পরিচিত তাঁর কাছে। খামের ভেতর একটা চিঠি আছে,যেটা তিনি
সযত্নে রেখে দিয়েছেন এতকাল। চিঠিটা খাম থেকে বার করে হাতে নিতেই সারা শরীরটা শিহরিত
হয়ে উঠলো তন্ময়-বাবুর। আজও সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা মনে করলে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা রক্তের স্রোত
বয়ে যায়।
সুন্দর হাতের
লেখায় ঝরঝরে চিঠিটা।
মহাশয়,
সেদিন রাতে আপনার মতো নিরীহ মানুষকে আঘাত করে খুব খারাপ লেগেছে। কিন্তু উপায় ছিল না। বাঁধা সময়ের মধ্যেই অপারেশনটা করে আমাদের ফিরে যেতে হয়। তাই বাধা পেয়ে,একপ্রকার বাধ্য হয়েই আঘাত করতে হয়েছে। …………………….
বলতে লজ্জা
লাগলেও আমি শিক্ষিত বেকার। বেকারত্বের যন্ত্রণা মৃত্যু যন্ত্রণার থেকেও কম কিছু নয়।
ছ’মাসে আমরা ৩৭টা অপারেশন করেছি কিন্তু আপনার এখানে এসেই ঠেকে গেলাম। খবরে দেখলাম পুলিশের
বড় কর্তারা নড়েচড়ে বসেছে। সোর্স মারফত জানলাম আপনার দাদা পুলিশের পদস্থ কর্তা।
এতক্ষণে পুলিশ
হয়তো হন্যে হয়ে আমাদের খুঁজছে,খবরে দেখলাম টিভি চ্যানেলগুলোতে বারবার
ব্রেকিং নিউজ হচ্ছে। এখন থেকে আবার আমাদের কুত্তার মতো পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানো শুরু হল।
আমি রাতের
অন্ধকারে লুকিয়ে পালিয়ে একবার অন্তত: মায়ের মুখটা দেখে আসবো শেষবারের মতো। আমার বাবা
অত্যন্ত রাগী মানুষ। আমি জানি আমাদের আইডেন্টিফিকেশন হয়ে গেলে,ছবি দেখেই
আমার বাবা আমার মাথার উপর থেকে তাঁর পিতৃ-পরিচয়টাও সরিয়ে নেবেন!
কিন্তু,উপায় ছিল না
জানেন। আমার বাবার কারখানা বন্ধ,মা জরায়ুতে বীভৎস টিউমার বয়ে চলেছেন,অপারেশনের
টাকা নেই। দুবেলা মুখে ভাত তুলতে গিয়ে এমনই অজস্র কটু কথার বর্ষণ হয় যে,তা আর গলাধঃকরণ
হয় না। মায়ের অপারেশনের টাকাটা পাঠিয়ে দিয়েছি। বাবাকে মিথ্যে কথা বলে এসেছিলাম,নতুন চাকরির
জন্য আমাকে বাইরে বাইরে থাকতে হবে।
আপনাকে চিঠিটা লিখলাম দয়া পেতে নয় মার্জনা চাইতে। আমি এই পথে আনকোরা। অপূর্ব সুন্দর আপনার ঠাকুরঘরখানা। সেখানে আমরা কেউই প্রবেশ করিনি। শুধু বাইরে থেকে দেখেছি। এখন কুখ্যাত অপরাধীদের মধ্যে আমিও একজন। জানি,ধরা তো পড়বোই কিন্তু কোথাও যেন একটা অপরাধবোধ আমাকে কেবলই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। তাই ইচ্ছার বসে অপরাধ কনফেস করতে আপনাকেই চিঠিটা লিখলাম।
“প্রণাম নেবেন”
চিঠিটা হাতে
নিয়ে তন্ময়-বাবু একবার নয়,আরও একবার পড়লেন। তারপর সেই বিভীষিকাময় রাতের ঘটনায়
ডুব দিলেন।
সেদিন রাত
দেড়টা নাগাদ তন্ময়-বাবুর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বাথরুমে যাবেন বলে বিছানা থেকে এক পা নামিয়েই
থেমে গেলেন! স্ত্রীকে ঠেলে ডাকলেন। চৈতালী দেবীও উঠে বসলেন বিছানায়। দুজনেই শুনতে পেলেন
ডাইনিং হল এ কারা যেন ফিসফিসিয়ে কথা বলছে,হাঁটা-চলা করছে।
ভয়ঙ্কর সেই
রাতের কথা লেখার অনুষঙ্গে তন্ময়-বাবুর সামান্য পরিচয়টুকু বলে রাখি।
তন্ময়-বাবু
এবং তাঁর স্ত্রী চৈতালী দেবী নিঃসন্তান হলেও ভাইপো-ভাইঝি,ভাগ্নে-ভাগ্নিদের
নিয়েই সেই অভাবটুকু ভুলে থাকেন। মানুষ হিসেবে ভালো এবং পরোপকারী বলে পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব,আত্মীয় পরিজন
সকলেরই পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।। ভালো লিমিটেড কোম্পানিতে চাকরি করেন। বাড়ি
ষ্টেশন থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। ট্রেনের ঘোষণা শুনে তবে তিনি বাড়ি থেকে বেরোন। সড়কপথ
থেকেও বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি হলে মিনিট-খানেক হবে।
বছর আটচল্লিশের
তন্ময়-বাবু সুঠাম গঠন,চওড়া হাতের পাঞ্জা,সাহসী এবং
স্পষ্টভাষী। স্ত্রী চৈতালী দেবীর বয়স প্রায় পঁয়তাল্লিশ ছুঁই ছুঁই। ষ্টেশন পেরিয়ে এসে
বাইলেনে ঢুকলেই সুদৃশ্য একতলা বাড়িটা সকলের নজরকাড়ে তার গঠনগত বিচারে। এককথায় বাড়িটা
খুব সুন্দর। বাড়িতে ঢোকা এবং বেরোনোর দরজা আছে চারটে। বাড়ির মূল গেটের সামনে রাস্তার
উল্টো দিকে পাঁচিলে ঘেরা একটা বিশাল বাগান আছে,তবে তা ঝোপ
জঙ্গলে ঘেরা। বাগানের ভেতর দিয়ে মানুষজন আসা-যাওয়া করতে করতে পায়ে চলা সরু রাস্তা তৈরি
হয়ে গিয়েছে। সেখান দিয়ে খুব সহজেই রেললাইন,ষ্টেশন এবং বাস রাস্তায় চলে
যাওয়া যায়। আবার বাগান থেকে সোজা এসে যে কোনও গলি দিয়ে যেকোনও পাড়ার মধ্যে ঢুকে পড়লে,তাকে খুঁজে
পাওয়া সম্ভব নয়।
তন্ময়-বাবুর
বাড়ির মেন গেটের পাশ দিয়েও বাড়িতে ঢোকা যায়। সেখান দিয়ে কাজের লোক যাতায়াত করে। রাস্তার
সামনে বাড়িতে ঢোকার মেন গেটটা তালাবন্ধ রাখেন সুরক্ষার জন্য। তাই নিজেরাও বাড়ির পাশ
দিয়েই যাতায়াত করেন। বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালের একপাশে বিশাল জলবাদাসহ দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত
একটা বাড়ির ভীতটুকুই গড়া আছে। সেখানে বাড়ির আবর্জনা,উচ্ছিষ্ট ফেলা
হয়। এছাড়া পুজো হয়ে যাওয়া বাসি ফুল-বেলপাতা,সবজির খোলা,চায়ের পাতা
আরও সাত সতেরো সবই ওখানে ফেলা হয়! ফলে এমন ঘরোয়া সার পেয়ে পেয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে
হিংচে, কলমি,সুষণীশাক,বেতো শাক,কুলেখাড়া,কচুগাছ আর
জংলা ঘাস।
রোজই কুড়ানীরা সেখানে আসে ময়লা কাগজ,প্লাস্টিক
আর ফেলে দেওয়া কিছু জিনিস পত্রের সন্ধানে। আর যারা শাকপাতা বিক্রি করে তারাও আসে শাক
তুলতে,কচু
পাতা কাটতে। রান্নাঘরের জানলা দিয়ে চৈতালীদেবী তাদের দেখতে পান। তিনি না দেখতে পেলেও
তারা সবাই তাকে দেখতে পায়। জংলা ভীতের জমি থেকে রান্নাঘরের জানলা দিয়ে কুড়ি ফুটের ডাইনিং
হল ঘেরা দুটো ঘরের আলমারি খোলা-বন্ধ করলেও তা স্পষ্ট দেখা যায়।
চৈতালী দেবী খুব ভালো রান্না করেন,শখ করে নিত্য
নতুন পদ রান্না করেন,আর তা সকলকে খাওয়াতে ভালোবাসেন। তাই রোজই সন্ধেবেলা
কেউ না কেউ আসেন চা খেতে,গল্প করতে। তাতে সময়টাও ভালোই কাটে।
মকর সংক্রান্তির
আগের দিন অর্থাৎ ১৪ই জানুয়ারি ২০০৮ সাল….. তন্ময়-বাবুর বাড়িতে ঘটে গেল এক দুঃসাহসিক ঘটনা।
সেদিনও সন্ধেবেলা
কয়েকজন প্রতিবেশী-বন্ধু এসেছিল তন্ময়-বাবুর বাড়িতে। তাদের উপরি পাওনা চা’এর সাথে টা’
মানে,বৌদির
বানানো খাবার। বন্ধুরা যারা এসেছিল তারা তন্ময়-বাবুর বাড়ির চৌহদ্দির আশেপাশেই থাকেন।
সামনে পিছনে মিলিয়ে যাকে বলে “নেক্সট ডোর নেবার”। শীতের
রাত হলেও গল্পগুজব করতে করতে দশটা পার হয়ে গিয়েছিল। সেদিন রাত সাড়ে ন’টায় তন্ময়-বাবুর
মাসতুতো বোন ফোন করে কয়েক মিনিট কথা বলেছিল ওনার সঙ্গে। আর নিজের ছোট বোনও সেদিন সন্ধেবেলা
ফোন করেছিল,দুজনের
সঙ্গেই অল্প সময় কথা হয়েছে। তারপর আর কারুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়নি।
স্মার্টফোন
সেইসময় ছিল না। ছিল না এখনকার মতো কোনও আন-লিমিটেড ডেটা প্যাক। কারুর কাছে একটা বা
দুটো ছোট নোকিয়া ফোন থাকলে লোকে বেশ একটু সমীহ করে তাকাতো তার দিকে। প্রতি মিনিটে কল
চার্জ হতো ৬০ পয়সা। তাই একটু রেখে ঢেকে খরচ করতে গিয়ে অল্প কথাতেই সারতে হতো।
তন্ময়-বাবু
খুব সাবধানী মানুষ। গিন্নিকে নিয়ে একাই থাকেন বলে,বাড়িতে ঢোকার
প্রতিটা দরজার সঙ্গে একটা গ্রিলের গেট ছাড়াও একটা করে কোলাপ্সিবল গেটও করে নিয়েছেন।
দিনকাল ভালো নয়। কখন কি হয় তার থেকে সুরক্ষা রাখা ভালো এই ভেবে।
দীর্ঘদিনের
অভ্যাসবশত: তন্ময়-বাবুরা সাধারণত: রাত বারোটার পরেই ঘুমোতে যান। অত রাতে শোবার পরেও
বার-দুয়েক তিনি উঠে সবদিক ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে বাথরুম ঘুরে গিয়ে আবার শুয়ে পড়েন। স্বামীর
সঙ্গে চৈতালীদেবীও ওঠেন। ক’দিন ধরেই যাদবপুর,বাঘাযতীন ও সোনারপুরের বেশ কিছু
জায়গায় বড়সড় রকমের ডাকাতি হয়েছে বলে ইদানীং তিনি রাতে আরও সতর্ক হয়ে থাকেন।
ক্রমশ …………
২য় পর্ব পড়ুন আগামী মঙ্গলবার
লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখিকার পরিচিতি –
লেখিকার জীবনের সঙ্গে গল্প অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে আছে। যা দেখেন, যা শোনেন, যা শোনেন, যা কিছু স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে আছে মনের সাথে,তাই নিয়ে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন।
লেখা শুরু স্কুল-ম্যাগাজিন, কলেজ -ম্যাগাজিন দিয়ে। বর্তমানে কিছু লেখা প্রকাশিত হচ্ছে কয়েকটি মাসিক-ত্রৈমাসিক পত্রিকায়। পাখিদের নিয়ে অনেক লিখেছেন। গল্প, ভ্রমণ, ফিচার, কবিতা নিয়মিতভাবে লিখে থাকেন। দিল্লি থেকে প্রকাশিত কলমের সাত রঙ এবং তাৎক্ষণিক ডট কম-এর নিয়মিত লেখিকা।
.jpg)