ধারাবাহিক গল্প – প্রতি মঙ্গলবার ।
তন্ময়বাবু
খুব শৌখিন মানুষ। ক্যাডলক দেখে নয়,নিজেই রঙের কম্বিনেশন করে করে মাত্র মাস চারেক
আগেই ঘরগুলো রঙ করিয়েছেন। একেকটা ঘরে একেক রকম রঙ হয়েছে। রঙ মিস্ত্রি ছেলেগুলোও
খুব ভালো ছিল। ওরা বলতো কাকু আপনি নিশ্চিন্তে অফিসে যেতে পারেন। আমরা আছি,কাকিমার
কোনও অসুবিধে হবে না। সত্যিই তাই। চৈতালীদেবীর কোনও অসুবিধে হয়নি বরং দরকার পড়লে
দোকান বাজারও ওরা করে এনে দিতো। প্রায় একমাস ধরে সারাবাড়ি রঙ করেছে ওরা।
ডাইনিং-এ ফিস ফিস শব্দ শুনে কোনও চিন্তা ভাবনা
না করেই তন্ময়বাবু নিমেষে দরজা খুলে বেরিয়েই রাতে জ্বেলে রাখা নাইট বাল্বের হলুদ
আলোয় দেখতে পেলেন জনা ছয়েক ছেলে সেখানে ঘোরাঘুরি করছে! বয়স অনুমান পঁচিশ-ছাব্বিশের কাছাকাছি হবে।
কালো মুখোশে ঢাকা মুখ। শুধু চোখ দুটো আর চোখের চারপাশটা খোলা। গায়ে কালো জ্যাকেট।
তন্ময়বাবু কে দেখতে পেয়ে দুজন এগিয়ে আসতেই
তন্ময়বাবু কোনদিন না দেখে সজোরে ঘুঁষি চালালেন একজনকে। অন্যজন তন্ময়বাবুকে মারতে
এগিয়ে এলো। উনি তাকেও সজোরে আরেকটা ঘুঁষি মারতে যেতেই,সে মাথাটা সরিয়ে নিয়ে উল্টো
ঘুঁষি মারলো ওনার তলপেটে।
ততক্ষণে চৈতালীদেবী বেরিয়ে এসে ডাইনিং-এর
টিউবলাইটটা জ্বালাতে যেতেই ওরা তার হাতটা চেপে ধরে থামিয়ে দিলো। তন্ময়বাবু বুঝতে
পারলেন বাড়িতে ডাকাত পড়েছে। খেয়াল করলেন পাশের ঘরে আরও দুজন আলমারি খুলে লুটপাট
করছে! ডাইনিং-এর শোকেস তছনছ করছে আরও দুজন!
যে কোনও হলিউড-বলিউড সিনেমাকেও হার মানাতে পারে
সেই মুহূর্তের ঘটনা।
তলপেটে ঘুঁষি খেয়েও তন্ময়বাবু তাঁর চওড়া পাঞ্জা
দিয়ে এই দুজনকে ঠেসে ধরে সিঁড়ির নীচে অবধি ঠেলে নিয়ে গেলেন। হাত ছাড়িয়ে একজন
তন্ময়বাবুর নাকে ঘুঁষি মারতেই ঝুঁঝিয়ে রক্ত পড়তে লাগলো নাক থেকে। তবুও একজনের কলার
তখনও ওনার হাতে ধরা রয়েছে।
চৈতালী দেবী চিৎকার করে উঠলেন, নাঃ! ওকে মেরো না
তোমরা। ওরে বাবা কত রক্ত পড়ছে গো! ছেড়ে দাও, তোমরা ওকে ছেড়ে দাও।
অসহায় স্ত্রীর দিকে তাকানোর সুযোগে ওঁর হাতটা
কলার থেকে নামিয়ে দিয়ে দুজনে টানতে টানতে নিয়ে এসে তন্ময়বাবুকে ঘরের ভেতরে ঢোকাবার
চেষ্টা করছে,কিন্তু উনিও আবার শক্তি সঞ্চয় করে ঠেলে উঠতে গেলেন। তখনই তিন নম্বর
ব্যক্তি এসে রিভলবারের বাঁট দিয়ে তন্ময়বাবুর মাথায় সজোরে মারলো। মুহূর্তে
মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে গিয়ে সদ্য রঙ করা ঘরের দেওয়ালটাকে ছাপিয়ে দিলো।
তখন আর দাঁড়াবার শক্তি নেই ওঁর। ওরা তন্ময়বাবুকে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে বিছানায়
বসিয়ে, একটা মাফলার দিয়ে মুখটা বেঁধে দিলো। আর দড়ি দিয়ে হাতদুটোকেও বেঁধে দিলো।
তখন অঝোরে নাক দিয়ে রক্তের ধারা নামছে,সেইসঙ্গে মাথার ফাটা অংশটা থেকে রক্ত বেরিয়ে
এসে বুক-পিঠ দিয়ে বয়ে সারা শরীর ভাসিয়ে দিচ্ছে। বিছানার তোষকে সেই রক্ত শুষে
নিচ্ছে। এবার ওদের নজর পড়লো চৈতালীদেবীর দিকে।
চৈতালী দেবীর মুখ-হাত বাঁধার আগে ওরা খুব
সংযতভাবে বললো মা,আমরা আপনার গায়ে হাত দেবো না। দয়া করে অলঙ্কারগুলো খুলে দিন।
দেরী করবেন না। কথাটা বলেই তাঁর সামনে রিভলবার উঁচিয়ে ধরে রইলো।
চৈতালীদেবী একে একে সব গয়নাগুলো খুলে দিলেন।
কিন্তু নাকচাবিটা অনেক চেষ্টা করেও যখন খুলতে পারলেন না,ওরা বললো থাক ছেড়ে দিন
ওটা।
এবার একজন খাটের তোষকের কোণ সরিয়ে আলমারির
চাবিটা তুলে নিলো! ওদের দেখে মনে হচ্ছিলো এই বাড়ির সবকিছু যেন ওদের ভীষন রকম চেনা!
বছর কয়েক হলো তন্ময়বাবু বেশ কিছু শারীরিক সমস্যায়
ভুগছেন। একটু উত্তেজিত হলেই তাঁর শ্বাসকষ্ট
শুরু হয়,প্রেসার বেড়ে যায়। এক্ষেত্রেও
তেমনটাই হলো। চাবিটা
নিচ্ছে দেখে প্রতিবাদ স্বরূপ তন্ময়বাবু মুখে গোঙানির আওয়াজ করতেই অন্যজন বিছানার
ওপরে ভাঁজ করে রাখা চাদরটা টেনে নিয়ে ওনার মাথার ওপর দিয়ে চোখদুটোকে ঢেকে দিলো। একে
নাক দিয়ে, মাথা দিয়ে রক্ত পড়ছে, তার উপর মাথাটা চাদরে
ঢাকা পড়তেই, তন্ময়বাবু আর দম নিতে পারছেন না। সেই দেখে চৈতালীদেবী বললেন, এভাবে তো
মানুষটা মরে যাবে বাবা!......দয়া করো তোমরা….. তোমাদের পায়ে পড়ি…..ওঁর মুখ থেকে চাদরটা তোমরা সরিয়ে দাও। তন্ময়বাবু ততক্ষণে কেমন
যেন ঝিমিয়ে গিয়েছেন। শুধু
মনের জোরে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করলেন।
ভাবলেন নাঃ,অন্ততঃ চৈতালীর জন্য শরীরে মনে জোর রাখতেই হবে।
ওরা চাদরটা মাথা থেকে নামিয়ে দিলেও,মুখ বাঁধা
অবস্থায় নাকের রক্ত গড়িয়ে গোঁফের ভেতর দিয়ে পুরো ঠোঁট ভেসে যাচ্ছে। তাতেও স্বামীর
দম নিতে কষ্ট হচ্ছে দেখে চৈতালীদেবী বললেন, তোমরা যেখানে যা পাও,সবকিছু নিয়ে যাও। শুধু আমার সিঁদুরটা কেড়ে নিও না বাবা! তোমরা ওর মুখের
বাঁধনটা খুলে দাও। খুব কষ্ট হচ্ছে মানুষটার।
আমি কথা দিচ্ছি,আমাদের মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোবে না।
চৈতালীদেবীর কথায় ওরা কর্ণপাত করলো না। উল্টে
চৈতালী দেবীর মুখটাও একটা স্কার্ফ দিয়ে বেঁধে দিলো,আর শোকেস থেকে পাওয়া দড়িগুলো
দিয়ে ওনার হাতদুটো পিছনে করে বেঁধে দিলো।
ঘন অন্ধকারে মোড়া অমাবস্যা তিথির জমাটি অন্ধকার। নিস্তব্ধ
শীতের রাত। পৌষমাসের সংক্রান্তি তাই হাড় কাঁপানো ঠান্ডাও পড়েছে সেদিন।
কম্বলের তলা থেকে বেরিয়ে শীতবস্ত্রটুকুও গায়ে দেওয়ার সুযোগ পাননি ওঁরা। এমনিতেই
কাঁপুনি দিচ্ছে তার সঙ্গে এমন বিভীষিকাময় পরিবেশ দেখে ভয়েতে থত্থরিয়ে ওঠা সারা
শরীরের কাঁপন রোধ করতে পারছেন না কিছুতেই। ডাকাতগুলোর দাপাদাপিতে সারা ঘরে
মধ্যরাত্রির নীরবতা ভেঙে খান খান হয়ে গেলেও তা বাড়ির বাইরে প্রকাশ হলো না। ঘুমে
অচেতন মানুষ জন,পাড়াপ্রতিবেশী কেউ শুনতে পেলো না অসহায় দুটো মানুষের কান্না।
তন্ময়বাবু খুবই মিতব্যয়ী। অনাড়ম্বর জীবন যাপন
করেন। নিজেদের প্রতিদিনের জীবন ধারণে যদিও কোন বাহুল্যতা নেই কিন্তু কেউ প্রয়োজনে
কিছু চাইলে হাত বাড়িয়ে দেন।
আলমারী খুলে দেখে দেখে গুণে গুণে যা কিছু ছিল সব
একটা একটা করে ব্যাগে ভরে নিয়েছে ওরা। একে একে সবকিছু টেনে বার করে ফেলে ছড়িয়েছে!
বাকি সবকিছুও ব্যাগে ভরছে। যদিও নেবার মতো তেমন কিছুই ছিল না। তবুও ঘর করতে জরুরী
প্রয়োজনে যতটা দরকার তা বাড়িতেই থাকতো। তার মধ্যে গিন্নির পোশাকি কিছু গহনা,মাস
মাইনের অর্ধেক টাকা ছাড়াও আরও কিছু টাকা যা তিনি বাড়িতে মজুত রাখতেন হঠাৎ
বিপদ-আপদের সঞ্চয় হিসাবে,তাও ওরা নিয়ে নিলো! মনে হলো আরও
কিছু ওরা খুঁজছিল!নিজেদের মধ্যে বলাবলিও করলো। ঘরের
আলমারী,ওয়ার্ডব,কাবার্ড কিছুই
বাদ দেয়নি। এমনকি,আতিপাতি করে ঘরের কোণে কোণেও কিছু একটা খুঁজে চলেছে।
সেটা ওদের কথা শুনেই বুঝতে পারছিল তন্ময়বাবু।
এছাড়াও
আলমারীর লকারে গোটা কয়েক শৌখিন পেন ছিল। তারমধ্যে একটা পেন ছিল যেটা তাঁর বহুদিনের
স্মৃতি। বাবার গুরুদেব তন্ময়বাবুর বড়দাকে সেই কোন ছোট্টবেলায় উপহার দিয়েছিলেন।
পেনের নিবের বলটা ছিল সোনার।
তন্ময়বাবুর খুব পরিপাটি করে সব কিছু গুছিয়ে
রাখার অভ্যাস। বহু স্মৃতি-সম্ভার তিনি সযত্নে গচ্ছিত রেখেছেন তাঁর কাছে। তেমনি খুব
সুন্দর দেখতে ওই সোনার নিব-বল পেনটা ওনার দাদা ওনাকে দিয়েছিলেন সংগ্রহে রেখে দেবার
জন্যে। সেই পেনটাও ওরা নিয়ে নিলো। একজন জিনিষপত্র টেনে বের করছে, অন্যজন ব্যাগে
ভরছে। নির্বাক হয়ে বসে তন্ময়বাবু দেখছেন মধ্যরাতে মুখহাত বেঁধে এই চরম
দস্যুবৃত্তি!
চৈতালীদেবী বিশাল বড়ো একটা মাটির লক্ষ্মীভাঁড়ে পাঁচটাকার
কয়েন জমাতেন,সেটা দেওয়ালের কাবার্ডে যেখানে চৈতালিদেবী দৈনন্দিন ব্যবহারের বালিশ
মশারী সব গুছিয়ে রাখেন সেখানে রাখা থাকতো।
ওদের মধ্যে একটা ছেলে ওই
মাটির ভান্ডারটা বার করে এনে মোটা চাদরের ভিতরে সেটাকে রেখে রিভলবারের বাঁট দিয়ে
ভাঙলো। তারপর একটা বালিশের কভার খুলে সব কয়েনগুলো ভরে নিয়ে হাতজোড় করে
তন্ময়বাবুদের বললো আমাদের ক্ষমা করবেন। আমরা শিক্ষিত ছেলে। চাকরি-বাকরি পাইনি। তাই
বাধ্য হয়ে এই পথে নেমেছি।
আমরা আপনাদের কোনও ক্ষতি করতাম না,যদি আমাদের
সঙ্গে সহযোগিতা করতেন। আমরা নিজেদের মুক্ত করতে আপনাকে আঘাত করতে বাধ্য হয়েছি।
ক্রমশ …………
৩য় পর্ব পড়ুন আগামী মঙ্গলবার
লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখিকার পরিচিতি –
লেখিকার জীবনের সঙ্গে গল্প অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িয়ে আছে। যা দেখেন, যা শোনেন, যা শোনেন, যা কিছু স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে
আছে মনের সাথে,তাই নিয়ে লিখতেই বেশি পছন্দ করেন।
লেখা শুরু স্কুল-ম্যাগাজিন, কলেজ -ম্যাগাজিন দিয়ে। বর্তমানে কিছু
লেখা প্রকাশিত হচ্ছে কয়েকটি মাসিক-ত্রৈমাসিক
পত্রিকায়। পাখিদের নিয়ে অনেক লিখেছেন।
গল্প, ভ্রমণ, ফিচার, কবিতা নিয়মিতভাবে
লিখে থাকেন। দিল্লি থেকে
প্রকাশিত কলমের সাত রঙ এবং তাৎক্ষণিক ডট কম-এর নিয়মিত লেখিকা।
.jpg)