Advt

Advt

shibshankar-paler-banger-luptapray-lokshlok-by-tarun-kumar-karmar-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-বঙ্গের-লুপ্তপ্রায়-লোকশ্লোক

 

shibshankar-paler-banger-luptapray-lokshlok-by-tarun-kumar-karmar-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-বঙ্গের-লুপ্তপ্রায়-লোকশ্লোক

হারাতে বসা বা হারিয়ে যাওয়া লোকশ্লোক, লোকপাঁচালি, লোককথা পাওয়া যাবে লোক সেবা শিবির থেকে সদ্য প্রকাশিত ‘বঙ্গের লুপ্তপ্রায় লোকশ্লোক’ গ্রন্থে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নানা জনজাতির লুপ্তপ্রায় লোককথাকে সংগ্রহ করেছেন শিবশঙ্কর পাল। সেসবকে বিন্যস্ত করেছেন। এবং রেখেছেন স্বল্পবাক্যের বিশ্লেষণ। বইটির গুরুত্ব এখানেই যে, তা থেকে বাঙালির নৃতত্ব, সংস্কৃতি, খওয়া-দাওয়া, জীবনযাত্রার অতীত ইতিহাস জানা যায়। যা বাঙালির হারাতে বসা মুখের ভাষাকেও সংরক্ষণ করেছে। বইটির কথামুখে লেখক জানিয়েছেন— ‘শ্লোকের অভ্যন্তরে থাকে কোনো একটি ঘটনা বা পরিস্থিতির মূলকথা। সেখানে থাকে নীতিকথা, জনশিক্ষা, তত্ত্বকথা, পরামর্শ, সতর্কতা, সাবধানতা, শঠতা, ব্যঙ্গ, উপহাস, হেঁয়ালি প্রভৃতি। এ সব জনপ্রবাদ বা জনশ্লোক থেকে বুঝে নেওয়া যায় নানা অঞ্চলের ভাষাবৈচিত্র, উচ্চারণ-বিবিধতা, ঘরে-বাইরের কাজকর্ম, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় আচরণ, ঠিক-ভুল, মানবধর্ম, সংসারজীবন, উপকারিতা, সাহায্য-সহানুভূতি, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনীতি, নৃতত্ব, ইতিহাস, প্রকৃতি প্রভৃতি। আবার এদের নানা গোত্রেও ভাগ করা যেতে পারে। যেমন— মানবচরিত্রকেন্দ্রিক, সংসারকেন্দ্রিক, আচার-আচরণ-সংস্কারকেন্দ্রিক, খাদ্যাভ্যাসকেন্দ্রিক, নারীকেন্দ্রিক, চাষবাসকেন্দ্রিক প্রভৃতি।’ অন্যদিকে বইটিতে আছে বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষামালা। বাংলাদেশ ছাড়াও আছে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গের শ্লোকগাথা।

    শিবশঙ্কর পালের ক্ষেত্রসমীক্ষাভিত্তিক কাজ প্রশংসার দাবি রাখে। এই কাজ প্রত্যন্ত জনজাতিকে একে একে তুলে এনেছে তাদের ভাষা, তাদের শ্লোকধারার হাত ধরে। লেখক মেচ, রাভা, টোটো, রাখাইন, লিম্বু, মেচ, ডুকপা, সাদরি জনজাতির যেসব শ্লোক সংগ্রহ করেছেন তা সংস্কৃতি সংরক্ষণের কাজ করে। তারই কয়েকটি উদাহরণ না তুললেই নয়—

পুড়ল সতী উড়ল ছাই

তবুও সতীর কলঙ্ক না যায়।’

এই শ্লোকে নারীকে চিরকলঙ্কিত রূপে অবমাননা করেছে সমাজ। লেখক তার যথোপযুক্ত ও সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণও করেছেন। পূর্ববঙ্গের একটি শ্লোকে অলস ব্যক্তিদের ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে—

আকাইম্যার আছে হোওন

খয়রাইত্যার আছে খুতির টান।’

অর্থাৎ কুঁড়ে মানুষ শুয়ে (হোওন) দিন কাটায়। ভিক্ষুকের থাকে ছোট থলির (খুতির) দিকে নজর। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যে ভাষাবৈচিত্রের বিবিধতা তাও তুলেছেন লেখক। এনেছেন বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, নদীয়া, কলকাতা, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা প্রভৃতি বিভিন্ন অঞ্চলের লোকশ্লোক। পুরুলিয়ার একটা শ্লোকে বলা হচ্ছে—

রেংখা মরে শীতে আর পীতে' এর অর্থ লোককে দেখাতে গিয়ে নিজের ক্ষতি বা নিজেকে কষ্ট দেওয়া। মেচ জনাজাতির নানা শ্লোকের মধ্যে একটিতে বলা হয়েছে—

খোগা চিবাই আং মুং দাংঙ্গি যাবাই গুবুন।’

অর্থাৎ মূল কাজটি করল একজন আর প্রশংসা পেল অন্যজনে। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার রাভা জনজাতিরা বলে—

মায় কেনছা তংচা ভাণ্ডার হামা।’

অর্থাৎ ঘরে ধান নেই অথচ আগে থেকে ভাণ্ডার তৈরী করে রাখা। পূর্ববঙ্গের রাখাইন জনজাতির একটি লোককথায় বলা হয়েছে—

ছেং কা ছেং

ফ্যাক ছেং সি তাক।’

অর্থা সঙ্গদোষে লোহাও ভাসে।  

লেখক শিবশঙ্কর পাল এসব করতে গিয়ে সারা বাংলার লোকভাষার মেলা বসিয়েছেন। যা পাঠক ও ভাষাবিদদের গবেষণামূলক কাজে বিশেষ উপযোগী হতে পারে। অনেকটা গবেষণার আদলে লেখকও লোকশ্লোকের নানাদিক তুলে ধরে দেখিয়ে দিয়েছেন লোকসংস্কৃতির হারাতে বসা একটা বিষয়কে সংরক্ষণের গুরুত্ব কোথায়? কেন? বা কতটা?

শেষ