হঠাৎ একটা খবর পেয়ে বিপ্রদাস চঞ্চল হয়ে উঠল। সত্যতা যাচাই করতে উঠেপড়ে লেগে গেল। জানাটা খুব জরুরি। এর উপর জীবনের অনেকটা নির্ভর করছে। সুখ দুঃখ ভাল মন্দ সব। বিপ্রদাস সদ্য চাকরি থেকে অবসর নিয়েছে। সরকারি অফিসে কনিষ্ঠ কেরানির পদে যোগ দিয়েছিল। প্রমোশন পেয়ে আপার ডিভিশন ক্লার্ক, একসময় ধাপে ধাপে শেষ তিন বছর হেড ক্লার্কের কাজ করে অবসর গ্রহণ। বিপ্রদাস গ্রাম থেকে এসে কলকাতার অফিসে চাকরি করলেও আজও আধুনিক হতে পারে নি। মন এখনও সেই আদিযুগেই পড়ে আছে। কবে সেই যুবক বয়সে প্রেমে প্রত্যাঘাত হয়েছে বলে জীবনে আর বিয়েই করল না। অন্তরে তাকেই লালন করে চলেছে। মনে নাকি গেঁথে আছে। তার জীবনের অর্থ নাকি আরও গভীর। বোঝাতে গেলেই বলবে সে প্রাচীন পন্থী। মনের প্রসার ঘটে নি। এরপর বলার কিছু থাকে না। জীবনটা যখন তার ভাবনাটা তারই।তবে বিপ্রদাস সৎ, পরোপকারী, কাজের প্রতি নিষ্ঠার কোনও তুলনা নেই। অফিসে একদিনের জন্যেও কারও সঙ্গে মনোমালিন্য হয়নি। আধিকারিক থেকে শুরু করে সকল কর্মচারীর অফুরান ভালবাসা পেয়ে এসেছে। ফলে তার বিদায় সংবর্ধনা এমন জাঁকজমক হয়েছে কল্পনাতীত। বিশেষ করে আধিকারিক ও সহকর্মীদের বক্তব্য শুনে বিপ্রদাস চোখের জল ধরে রাখতে পারে নি। জীবনের বড় প্রাপ্তি। যা আমৃত্যু স্মরণে থাকবে।
অবসর গ্রহণের পর ভাবতে বসল। কী করা উচিত। কিছু একটা করার আকাঙ্খা প্রবল। কী করবে?
সিদ্ধান্ত নিতে মাসাধিক কাল কেটে গেল। তবু চূড়ান্ত করতে পারেনি। উচ্চাকাঙ্ক্ষা
একসময় ছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সে আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে। কলকাতার এক
বস্তি এলাকায় ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে সে। প্রথম দিকে অর্থের অভাবে ভদ্রস্থ
এলাকার বাড়ি দেখার সাহস হয় নি। পরে প্রমোশন পেয়ে উপার্জন বৃদ্ধি পেলেও এলাকার গরিব
বস্তিবাসীদের প্রতি একধরনের মায়া পড়ে গিয়েছিল। অদৃশ্য এক টান যাকে বলে। মানুষগুলোর
ঘরের ছাদ নেই, ভাল পোশাক নেই , শিক্ষাদীক্ষা নেই, একটু-আধটু নেশা টেশাও করে,
নিজেদের মধ্যে ঝগড়া,চুলোচুলিও করে তবু এরা কেউ খারাপ নয়। সেও তো ওই মাটি থেকে উঠে এসেছে সে কথা ভুলে যায়
কি করে? তাছাড়া তাকে যথেষ্ট সম্মানও করে।
ঘরের লোক মনে করে। জ্বরজারি হলে এরাই দেখভাল করে। ঔষধপত্র এনে দেয়। আত্মীয়র থেকেও
বেশি। এদের ছেড়ে যায় কি করে? এইতো বেশ আছে। স্বহস্তে রন্ধন। অবসর সময়ে বইপত্র পড়ে।
তবে চাকরি থেকে একেবারে ছুটি হওয়ার পর এতবড় দীর্ঘ সময়টা নিয়ে সমস্যায় পড়েছে। ইচ্ছে
করলে চাকরিতে আবার ঢুকতে পারে। রি-এমপ্লয়মেন্টের সুযোগ আছে। আধিকারিকরা
আশ্বাসও দিয়েছেন। বিপ্রদাস চাইছে না। কি
হবে? অর্থের প্রতি তার কোনও মোহ নেই। ইতিমধ্যে বহু টাকা জমিয়ে ফেলেছে। একা মানুষ।
স্বল্পহারি। কত আর খরচ। শখ শৌখিনতা কোনও দিনই ছিল না। বিলাসিতা একেবারেই নেই। ফলে
প্রথম থেকেই মাসে মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত রাখছে।
অবসরকালীন থোক যা পেয়েছে সেটাও তার কাছে বিশাল। ইচ্ছে করলে কলকাতার বুকে সুন্দর
একটি ফ্ল্যাট কিনতে পারে। ইচ্ছেটাই নেই। আশা থাকলে তো ইচ্ছে জাগবে? যদি তার পরিকল্পনা মতো আকাঙ্খা পূরণ হত একটা
সার্থকতা ছিল। তার আসার
কথা ছিল কিন্তু এল কৈ? এরমধ্যেই হঠাৎ দেশের বাড়ির এক ভাইপোর সঙ্গে
দেখা। ভাইপো বলতে পাড়াতুতো। আত্মীয়তার লেস নেই। ব্যাংকে আলাপ। কথা প্রসঙ্গে জানল
তার জন্মভিটের পাশেই তার বাড়ি। ওর বাবাকে বিপ্রদাস খুব ভাল চেনে। এক ক্লাসে না
হলেও একই স্কুলে পড়ত। তার কাছেই জানল কমলা বিধবা হয়ে গেছে বিশ বছর আগে। শ্বশুর
বাড়ি থেকে বিতাড়িত। তার স্বপ্নের নারী।
এখন সে মায়ের আশ্রয়ে দিনাতিপাত করছে। সে বিশ্বাস করে হৃদয়ের টান কখনো বিফল
হয় না। খবরটা শুনেই বিপ্রদাস উতলা হয়ে উঠেছে। মনের কোণে উজ্জ্বল আলোর রেখাটা যেন
স্পষ্ট দেখল।কারণ শয়নে স্বপনে আজও কমলা বিরাজমান। তারজন্যই সে আর বিয়ে করল না।
মনের কুটিরে আছে বলেই বিপ্রদাস এখনো নিশ্বাস নিচ্ছে। না হলে হয়তো এতদিনে ...।
( দুই )
পূর্ব বর্ধমান জেলার শ্রীখণ্ড থেকে তিন কিলোমিটার ভেতরের এক গ্রামে বিপ্রদাসের
জন্ম। জন্মভূমি হলেও নিজস্ব ভিটেমাটি ছিল না কোনও দিন। পৃথিবীর আলো দেখার পর থেকেই
দারিদ্র তার নিত্য সঙ্গী। অবহেলা, অভাব, অনটন নিয়ে তার দিন যাপন। সেসব থেকে বঞ্চিত
হলেও ঈশ্বর তাকে মনের শক্তিটুকু দিয়েছেন। সেই শক্তি ও জেদ থেকেই অপ্রীতিকর পরিবেশ
থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। জন্ম থেকেই ভাড়া বাড়িতে থেকে পড়ালেখা। কায়িক পরিশ্রমের
মধ্যে দিন যাপন। শুনেছে শিলিগুড়ির হাকিমপাড়ায় বাবা-মায়ের পৈতৃক বাড়ি। বাবা-মা
স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। প্রেম করে বিয়ে করার অপরাধে বাড়ি থেকে বিতাড়িত।
দু'জন্যেই অনার্স গ্র্যাজুয়েট। শিক্ষিত।
রাগের বসে বাবা বাড়ি থেকে বেরিয়ে
যাওয়ার কথা বলতে জেদ দেখিয়ে সঙ্গে সঙ্গে
চলে এসেছিলেন। অবিবেচকের মতো কাজ নিশ্চয়ই। কিছু অর্থকড়ি সঙ্গে নিলেও স্কুল কলেজের
মার্কশিট, সার্টিফিকেটগুলো নেওয়া যে একান্ত জরুরি একবারও ভাবেননি। ভাগ্যদেবীর
সাক্ষাৎ পেতে গেলে যে ঐগুলো জরুরি সেই মুহূর্তে মাথা কাজ করে নি। সাধারণত বাবা-মা
আর্থিক ভাবে সবল হলে সন্তানও দুধেভাতে থাকে। এক্ষেত্রে ভাগ্য বিড়ম্বনায় চরম
দুর্গতি। শিলিগুড়ি থেকে বাসে কলকাতায় এসে নামেন। একটি হোটেলে দু'দিন থেকে বোধোদয়
হয় কলকাতা থাকা অসম্ভব। যেটুকু অর্থ সম্বল করে এসেছেন অচিরেই নিঃশেষ হয়ে যাবে। চলে
আসেন বর্ধমান। স্বল্প মূল্যে বাড়ি ভাড়া প্রয়োজন। বর্ধমানেও বাড়িভাড়া তাদের আয়ত্তের
বাইরে। এক স্বহৃদয় ব্যক্তির সাহায্যে বর্ধমান থেকে প্রায় চল্লিশ কিমি দূরে
শ্রীখণ্ডের এক গ্রামে ছোট্ট একটি বাড়ি নিয়ে সংসার পাতেন । আবারও ভুল করে বসলেন। কাজকর্ম
পেতে হলে শহরই উপযুক্ত জায়গা। গ্রামে কি কাজ করবে? আগেই বলেছি বাবা অবস্থাপন্ন
ঘরের সন্তান। বাড়িতে গাড়ি ছিল। ড্রাইভিং লাইসেন্স শুধু নয় নিজে দক্ষতার সঙ্গে
গাড়িও ড্রাইভ করতে পারতেন। যে বাড়িতে ভাড়া থাকেন সেই বাড়িওয়ালার গাড়ি আছে। তাদের
বিভিন্ন ব্যবসা। প্রায় প্রতিদিনই ব্যবসার কাজে বর্ধমান, দুর্গাপুর, কলকাতা ছুটতে
হয়। বাবা পাকাপাকি ড্রাইভার হয়ে গেলেন। বেতন বলার মতো না হলেও দু'বেলা দু'মুঠো
ডাল-ভাতের ব্যবস্থাটা নিশ্চিত হল। মাও বসে থাকার মেয়ে নন। বাড়িতে বসেই এলাকার কিছু
ছেলেমেয়েদের পড়াতে লাগলেন। গ্রাম্য এলাকায় টিউশন ফিস খুবই নগণ্য তবু মন্দের ভাল।
এরমধ্যেই বিপ্রদাস পৃথিবীতে এল। স্বাচ্ছন্দ্য না হলেও যত্নের অভাব ছিল না। তাকে
নিয়ে মায়ের বহু স্বপ্ন। অনেক বড় করবেন তাকে। কিন্তু ভাগ্যদেবী সহায় না হলে সব আশা
পূরণ হয় কী? সে যখন ক্লাস সেভেনে পড়ে তখন বাবার হঠাৎ মৃত্যু। গাড়ির সঙ্গে একটি
লরির ধাক্কা লেগে বিশাল অ্যাক্সিডেন্ট। গাড়িতে আগুন লেগে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে।
ভেতরে মালিক বসে। তিনিও স্পট ডেড। বাবাকে আধমরা অবস্থায় দুর্গাপুরের একটি নার্সিং
হোমে নিয়ে যাওয়া হয়। দু'দিন পর তারও প্রাণ বায়ু বেরিয়ে যায়।
একটি মানুষের মৃত্যুতে কারও কারও ক্ষেত্রে পৃথিবীটাই আমূল বদলে যায়। প্রশ্ন জাগে
ক্ষনিকের জন্য কেন আসা? না এলে কী খুব ক্ষতি হত? ডালপালা ছড়িয়ে বসার থেকে জন্ম না
নিলে মঙ্গল হত নাকি? বিপ্রদাসের বারবার প্রশ্নগুলো জাগে। বাবার মৃত্যুতে মায়ের
অদ্ভুত পরিবর্তন। একটা মানসিক রুগীতে পরিণত হয়েছেন। ভাল মন্দ আশা আকাঙ্খার
বোধগুলোই উবে গেছে। যাকে অবলম্বন করে বিশাল ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছেন
তিনিই যদি ফাঁকি দিয়ে চলে যান তাঁর থাকে
কী? বেঁচে থাকার সার্থকতা কী? বিপ্রদাস বিপাকে পড়ল। সেভেন ক্লাসে পড়ে। কতটুকুই বা
বয়স। এদিকে বাড়িওয়ালা বলছে এক মাসের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। বড় মালিকের মৃত্যুর
জন্য নাকি বাবাই দায়ী। শোকাহত পুরো এলাকাবাসী। অথচ ড্রাইভারের জন্য কারও হৃদয় ভেজে না। যত হাহাকার ওই মালিকের জন্য। যদিও
ব্যবসায় তেমন ক্ষতি হয় নি। কারণ মালিকের ভাই, ছেলে আগে থেকেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
তারাই হাল ধরেন। তবু মৃত্যু সর্ব ক্ষেত্রেই দুঃখজনক। পার্থক্য শুধু ধনী ও গরিবের
মধ্যে। তারতম্য শোকতাপেরও। এই ভাবনাগুলো
বিপ্রদাসের কিশোর বয়সেই নাড়া দিত। আশ্চর্য ! তার বাবার মৃত্যুতে কারও মনে সামান্যতম রেখাপাত করে নি। অথচ মালিকের বিশাল
স্মরণসভা হল। বহু মানুষ তাকে স্মরণ করে বক্তব্য রাখলেন। বাবার কথা কেউ উচ্চারণও
করল না। বিপ্রদাসকে ওই বয়সেই মানুষের
মূল্যায়নের প্রকারভেদ কষ্ট দিত।
এক বন্ধুর দাদার সহযোগিতায় এলাকায় বাড়ি বাড়ি দৈনিক পেপার বিলির কাজ পেল। স্কুল
থেকে ফিরে তাদের পত্রিকা স্টলেও বসত। তারাই একটি থাকার আস্তানাও দিল। ছোট্ট একটি
মাটির ঘর। বিপ্রদাস রাত জেগে পড়াশুনাটা
চালিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু মাকে নিয়ে নাজেহাল।
রান্নাটাও ঠিক মতো করতেন না। শুধু বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদতেন। বিপ্রদাসই
চালডাল ফুটিয়ে ভাত মেখে মাকে খাইয়ে দিত। নিত্যদিন ভাতও জুটত না। সামান্য মুড়ি খেয়ে
স্কুলে ছুটত। নিদারুণ কঠিন সংগ্রামের মধ্যে দিন যাপন। দেখতে দেখতে বিপ্রদাস
ফার্স্ট ডিভিশনে মাধ্যমিক পাশ করল। ততদিনে মা শয্যাশায়ী। নার্ভ ছাড়াও নানা রোগ
শরীরে বাসা বেঁধেছে। অর্থের অভাবে স্পেশালিস্ট দেখানোর সামর্থ ছিল না। পাড়ার এক
ডাক্তারবাবু ছিলেন। তিনি বিপ্রদাসকে ভালবাসতেন। তিনিই মাঝেমধ্যে এসে দেখে যেতেন।
কিছু শ্যাম্পেল ঔষধও দিয়ে যেতেন। বিপ্রদাস যখন ইলেভেন ক্লাসে ভর্তি হল তখনই মা
হঠাৎ চলে গেলেন। একদিন স্কুল থেকে ফিরে
দেখে মা মেঝেতে পড়ে আছেন। হাত দিতেই বুঝল মা আর নেই। সে হতভম্ব ! বিপ্রদাস মাকে
জাপটে ধরে সে কি কান্না। বিপ্রদাস কল্পনাও করতে পারে নি মা মরে যাবেন। আসলে এই
মানুষটাই ছোটবেলায় ভেতরের সলতে তে. আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সলতের আঁচে মনে
শক্তি যোগাত। পৃথিবীতে মা ছাড়া আর কে আছে? মায়ের অনুষ্পস্থিতি তাকে দীর্ঘকাল কষ্ট
দিয়েছে।
মায়ের
মৃত্যুর পর তার জীবনে নেমে এল আরেক বিপর্যয়। বন্ধুর দাদা যিনি থাকার ঘর দিয়েছিলেন,
তিনি বললেন," এবার তোকে ঘরটা ছেড়ে দিতে হবে। আমাদের অন্য কাজে লাগবে। আর
পেপার বিলির কাজটা আমরা নিজেরাই করব। তুই বাড়ি ছেড়ে দিয়ে অন্য কাজ দেখে নে। এক মাস
সময় দিলাম।"
এর জন্য অবশ্য বিপ্রদাস চিন্তিত নয়। মা নেই। একা মানুষ। যে ভাবেই হোক চালিয়ে নিতে
পারবে। পরে জানল, যে বন্ধু তার সঙ্গে মাধ্যমিক দিয়েছিল সে পাশ করতে পারে নি বলে
রাগের কারণ।
ইলেভেন ক্লাস থেকে ছাত্র পড়ানো শুরু।
আস্তে আস্তে টিউশনিতে একটু সুনাম হতে লাগল। পাশের পাড়ায় একটি বাড়িতে ঘর ভাড়া নিল।
তারা স্বামী স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে কমলা।কমলা তখন
নবম শ্রেণীতে পড়ে। সেও বিপ্রদাসের ছাত্রী। মধ্যম মেধা। প্রথম থেকেই
কমলা বিপ্রদাসের রান্নায় সহযোগিতা করত। একসময় কমলাই দু'বেলা রান্না করে
দিত। কমলা মাধ্যমিক পাশ করার পর বিপ্রদাস অনুভব করল কমলা ছাড়া তার জীবন অচল। কমলার
গায়ের রং ফর্সা না হলেও নাক,চোখ, মুখের গড়ন মন্দ নয়। কমলাও যে ওকে খুব ভালবাসে
বিপ্রদাসের বুঝতে বাকি নেই। ফলে গল্পগুজব, মেলামেশা আরও নিবিড় হল। মাঝে মধ্যে
মধ্যরাতে বাবা-মায়ের অগোচরে বিপ্রদাসের দরজায় ধাক্কা দিত কমলা। ঘন্টার পর ঘন্টা চলত প্রেমালাপ।
বিপ্রদাস তখন হিস্ট্রিতে অনার্স নিয়ে বি.এ পাশ করে গেছে। হঠাৎ শোনে বাবা-মা কমলার জন্য পাত্র স্থির করে ফেলেছেন। কমলা তখন সবে কলেজে ভর্তি হয়েছে। কমলা বলল," তুমি আজই বাবাকে গিয়ে প্রস্তাব দাও। না হলে কিন্তু গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ব বলে দিলাম।" বিপ্রদাস আর দেরি করে নি। সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে গিয়ে তাদের ইচ্ছের কথাটা জানাল।
বাবা বললেন," বামুন হয়ে চাঁদে হাত দেওয়ার চেষ্টা করো না। টিউশনি করে ক'টাকা
পাও? আমার মেয়েকে বিয়ে করার সাহস দেখাও? যা বাজার চাকরি কোনও দিনই পাবে না আমি
লিখে দিতে পারি। টিউশনিটা করছ মন দিয়ে কর। এরপরও যদি বাড়াবাড়ি করো বাড়ি থেকে বের
করে দিতে বাধ্য হব।"
কমলার বিয়ে হয়ে গেল। বিপ্রদাস সারারাত দরজা বন্ধ করে শুধু বালিশ ভিজিয়েছে। কমলা
শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার আগে বিপ্রদাসকে একটি চিরকুট দিয়ে গেল।," তুমি চাকরি পেলে
নতুন ঠিকানা জানিয়ে মাকে চিঠি দিও। আমি ঠিক তোমার কাছে চলে যাব।"
ঈশ্বরের
কি লীলাখেলা। কমলার বিয়ের দশ দিনের দিন বিপ্রদাসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার এসে
হাজির। এইচ.এস পাশ করার পর থেকে নিয়মিত চাকরির পরীক্ষাগুলো দিয়ে যাচ্ছিল। যদি
একমাস আগে আসতো জীবনের চাকা অন্যদিকে বইতো। চাকরিতে জয়েন করার পর কমলার মাকে নতুন
ঠিকানা জানিয়ে পর পর চারটি দিয়েছে বিপ্রদাস। তারপর শুধু অপেক্ষা। প্রতিদিনই ভাবে
এই বুঝি কমলা এসে চমকে দেবে।
( তিন )
বহু
কাল পর বিপ্রদাস শ্রীখণ্ডে পৌঁছল। সূর্যদেব তখন মধ্যগগনে। নভেম্বরের শেষ। ঠান্ডার
আমেজ চারিদিকে। রাস্তাঘাটের প্রভূত উন্নতি হয়েছে।বেশির ভাগই মাটির পরিবর্তে ইটের দালান। দোকান হাট বাজারের জৌলুসও
বেড়েছে। কমলাদের বাড়ি পৌঁছতেই মন আনন্দে লাফিয়ে উঠল। বাড়ির কোনও পরিবর্তন নেই।
কমলার বিয়ের আগে বাড়ি রং করা হয়েছিল। তারপর বোধহয় আর হাত দেননি। কেমন বিবর্ণ,
রুগ্ন রুগ্ন লাগছে। নক করতেই কমলার মা দরজা খুলে সম্মুখে দাঁড়ালেন। বয়সের ছাপ
স্পষ্ট। সিঁথিতে সিঁদুর নেই। অর্থাৎ মেসো পরলোকে চলে গেছেন। বিপ্রদাস একটি মিষ্টির
প্যাকেট হাতে দিয়ে প্রণাম করল," কেমন আছেন মাসিমা?"
মাসিমা
বললেন," এতদিন পর মাসিমার কথা মনে পড়ল? সেই যে গেছ আমাদের কোনও খোঁজ নেওয়ারও
প্রয়োজন বোধ করনি? এস, ঘরে এসে বসো।"
এতদিন
পর তাকে যে চিনতে ভুল করেন নি তাতেই বিপ্রদাস আপ্লুত। কমলা বোধকরি রান্না ঘরে ছিল।
কথাবার্তা শুনেই চলে এসেছে। বিপ্রদাস যেমনটা কল্পনা করেছিল তার থেকেও অনেকটা
উজ্জ্বল হয়েছে কমলা। বয়স কত হবে? পঞ্চাশ-বাহান্ন ! বয়সটা বোঝাই যায় না। তাকে নিয়ে
ঘর বাঁধার স্বপ্ন সার্থক হতে চলেছে। কথায় বলে যার শেষ ভাল তার সব ভাল।
কমলা বলল," বৌদিকে আনো নি? তাকে কি
বাপের বাড়ি রেখে এসেছ?"
বিপ্রদাস হতবাক ! যার জন্য অপেক্ষা করে করে অস্থির হয়ে উঠেছে তার মুখে একী কথা !
বলল," বৌদি আবার কোথা থেকে এল? আমি তো তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। তোমাকে নিয়ে
যেতে এসেছি। বিয়ে তো আমাদের আগেই হয়ে গেছে। এবার মন্দিরে গিয়ে সিঁদুর পরিয়ে
কলকাতায় নিয়ে যাব। মাসিমা আপনাকেও বলে রাখলাম। একমাত্র ওকে নিতেই আমি এসেছি।"
মাসিমার মুখের অবয়ব পড়া গেল না। কমলা বলল," রসিকতা এখন ছাড়ো। দুপুর বেলায়
এসেছ। হাতমুখ ধুয়ে এস। রান্না
হয়ে গেছে খাবার বাড়ছি।"
খিদেটা
অবশ্য লেগেছে। কোন সকালে বেরিয়েছে। শ্বশুর বাড়িতে প্রথম আহার করবে। তবে জানিয়ে এলে
আরও ভাল হত।
খাওয়ার
পরেই কমলা বলল," গ্রামঘরে দুটি মেয়েমানুষ থাকি। তুমি আর এখানে থেকো না। পাঁচ
জনে নিন্দেমন্দ করবে। তুমি রাত্রি বাস করলে পাড়ায় ঢি ঢি পড়ে যাবে। বেলাবেলি এখুনি
বেরিয়ে পড়। কলকাতা ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।"
বিপ্রদাস
বলল," তোমাকে না নিয়ে যাব না। চিরকুট লিখে জানিয়েছিলে চাকরির খবর পেলেই চলে
যাবে। কেন গেলে না? আজ আমি একা কিছুতেই ফিরব না। এখনও তোমাকে আগের মতোই
ভালবাসি।"
কমলা চিরকুটটা কেড়ে নিয়ে কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলে বলল," ভালবাসা। তোমাকে চেনা
হয়ে গেছে। কাপুরুষ কোথাকার। বাড়িতে প্রস্তাব দিতে এসে বাবা কি বলল, অমনি চোরের মতো
পালিয়ে গেলে। এই তো ভালবাসার নমুনা। আবার এত বছর পর ভালবাসা উতলে উঠেছে। এতগুলো
বছর কেটে গেল একবার খোঁজ নেবারও প্রয়োজন বোধ করনি। তার মুখে বড় বড় কথা। বুড়ো বয়সে
বিয়ে করবে? নাটক করে লোক হাসাবে! স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি, আমার মনে তোমার কোনও স্থান
নেই। ছিলও না কোনোদিন। কিশোর বয়সে অনেকের অনেক ঘটনা থাকে। সে সব কেউ মনে ধরে রাখে
না। আমিও রাখিনি। অপমানিত হওয়ার আগে তুমি বেরিয়ে পড়। আমার খিদে পেয়েছে। খেতে
গেলাম।"
বিপ্রদাস নির্বাক! কমলার বাক্যবানে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বোধবুদ্ধিও
নিঃশেষ। কি করণীয় বুঝে উঠতে পারছে না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শুধু। কমলা রাগ
দেখিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। তার নাকি খিদে পেয়ে গেছে। তাড়াতে চাইছে? বিপ্রদাস এত সহজে হেরে যাবে? এতদিনের অপেক্ষা,
হৃদয়ে লালন করে আসা -- ফুৎকারে অবলীলায় উড়িয়ে দিতে পারে? খেয়ে আসুক, তারপর বোঝাপড়া
হবে।
শেষ
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি -
নিত্যরঞ্জন দেবনাথ পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার পানুহাটে ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।কাটোয়া কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। বর্তমানে থাকেন হুগলির চুঁচুড়ায়। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন।অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল-এর অধীন ডিভিশনাল অ্যাকাউন্টস অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম গল্প " চেতনা " ছোটদের পত্রিকা শুকতারায় ১৯৯৬ - এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ, শিলাদিত্য, কালি ও কলম,মাতৃশক্তি, তথ্যকেন্দ্র, কলেজস্ট্রিট, কথাসাহিত্য, দৈনিক স্টেটসম্যান, যুগশঙ্খ, একদিন,,সুখবর ইত্যাদি এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর সাহিত্যকীর্তি অব্যাহত। ইতিমধ্যে পাঁচটি গল্প সংকলন ও চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক "শতানীক " পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করে আসছেন।
.jpg)