সুরেশ বলল, " খুব বনভোজন করতে ইচ্ছে করছে। চল না বউ,আজ আমরা বনভোজন খাই।"
বউ বলল," পোলাপানের মতো বায়নাক্কা
করো নাতো ?, রান্না হইয়া গেছে। আসো। খাইতে বসো।"
সুরেশ কেমন গুম হয়ে রইল। কথা কয় না। চাঁদপানা মুখ খানা শ্রাবণ মাসের কালো মেঘে ঢাকা। বোধকরি ফোঁটা ফোঁটা পড়তেও পারে।
বউটার মায়া হল। যে দিনরাত এত সোহাগ করে তার আবদার না রাখলে হয় ! বলল," কোথায়
বনভোজন করবা। এইখানে জায়গা কই?"
সুরেশের মুখে আলো দেখা দিল," কেন? চাঁপাদের পুকুর পাড়ে বসি। কত হাঁস ! প্যাক
প্যাক ডাকে। কি সুন্দর। তাছাড়া মাছেদের লম্পঝম্প দেখতে মজা লাগে না?"
"
দূর ! পুকুর পাড়ে বনভোজন করে কেউ? বনভোজন নাম হইছে কেন? বনে বাদারে করতে হয়।
এইখানে তেমন বন কোথায় পাবা?"
"
ও, তাইতো । তাইলে অতীন পালের বাগানে চল। তুই হাঁড়ি, ডাইল তরকারি বাইন্দা পুটুলি
কইরা ল। আমি সাইকেলটা বাইর করি।"
"
সেতো মেলা দূর ? অতীন পালের বাগান এই খানে? কম কইরা তিন মাইল তো হইবই। এদিকে খিদায়
পেট ডুকুর ডুকুর করতাছে। আজ থাহুক। পরে একদিন হইব।"
" না না বউ, অমত করিস না। আজই মনে চাইছে। মনেরে ধোঁকা দিতে নাই। সাইকেলে দশ-পনের মিনিটের মামলা। চল চল।"
অগত্যা
বউকে সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে চাপিয়ে চলল বনভোজন করতে। সুরেশের ফুর্তি না দেখলে
বিশ্বাস করা শক্ত। জিওল মাছের মতো খলবল করে লাফাচ্ছে। মুখে খই ফুটছে।
স্বামীর আনন্দ উচ্ছাস থাকলেও বউ মাঝে মধ্যে একটু বিরক্ত বোধ করে। বয়স হচ্ছে।সবসময়
কী ছেলেমানুষি ভালো লাগে। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার স্বামীকে যত দেখছে ততই অবাক হচ্ছে। বিয়ের আগে তিন বছর
প্রেম করেছে। ভেবেছিল বিয়ে হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। দিনরাত বউ কাছে থাকলে আদেখলাপনা
দু'দিনেই ফুৎকারে উবে যাবে। ওমা ! কোতায় কি ! দিন দিন পাগলামি আরও বাড়ছে। বউকে
কাছছাড়াই করতে চায় না।যেন অবোধ শিশু। এরপর কি বলবে !
তবে একটা ব্যাপার ভাবলে খুব আশ্চর্য হয়।
যখন কাজে যায় তখন কিন্তু মানুষটা পাল্টে যায়। এক নামি কোম্পানির কারখানায় কাজ করে।
সকল ছটা থেকে দুটো পর্যন্ত ডিউটি। কোনও ফাঁকি নেই। কাজের প্রতি এমন নিষ্ঠা,
একাগ্রতা কম মানুষকেই দেখা যায়। ফলে কোম্পানিতে ওর খুব সুনাম। বেতন ছাড়া পুজোয়
মোটা টাকা বোনাস। একদিন বউ জিজ্ঞেস করেছিল, এর রহস্যটা কি? সুরেশ বলল, কাজের সুইচ
তখন খোলা রাখি আর বাকি সব বন্ধ। ওর মস্তিষ্কে নাকি দুটো সুইচ আছে। একটা কাজের এবং
অন্যটা হৃদয়ের। কাজ শেষ হলেই সেটা বন্ধ করে হৃদয়ের সুইচ চালু করে দেয়। হৃদয়ের সুইচ
থেকেই বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পায়। না হলে কবেই অক্কা পেয়ে যেতাম টেরও পেতি না।
অতীন
পালের বাগানে আগের মতো ঝোপ জঙ্গল নেই। বড় বড় গাছই বেশি। মাথার উপর সূর্যদেব। ফাঁক
ফোকর দিয়ে সোনালী কিরণ উকি দিচ্ছে এদিক ওদিক। গ্রীষ্মকাল হলেও সবুজ গাছেদের
সমাহারে একটা শীতল ভাব বেশ আরামদায়ক। একটা বড় বটগাছ আছে।অনেকটা জায়গা জুড়ে তার
শাখাপ্রশাখা। ঝুরি নেমেছে চারিদিকে। মাটির সঙ্গে মিশে আছে। ওরা ছায়া দেখে একটা
জায়গায় জুত করে বসল। বসেই বউ আচমকা চিৎকার করে পাঁচ হাত দূরে সরে গেল।
সুরেশ বলল," কি হইল বউ? এমন লাফ দিলি কেন? এহানে বাগ বাল্লুক নাই।"
বউ বলল," তোমার ডাইন দিকে তাকাইয়া দেকো।"
সুরেশের
চক্ষু স্থির। এক বিশাল চন্দ্রবোড়া বটের
ঝুরিতে পেঁচিয়ে নিশ্চিন্তে স্থির হয়ে আছে। কম করে ছ'হাত তো হবেই। সুরেশ কিছুক্ষণ
দেখে বলল," আরে ও আছে ওর মতো, আমাগো কিছু করবো না। ভয় নাই। আয়তো !"
বউ
বলল," কও কি? করুক না করুক শরীলে বয়ডর নাই নাকি। এইখানে বসুম না। অন্য জায়গায়
দেখো। "
আর
একটু ভেতরের দিকে ঢুকল ওরা। মাঝারি মাপের একটি নিম গাছ। পাতা কম। ফল ধরেছে অনেক।
ছায়াও কম। রোদ বিছিয়ে দিয়েছে চারদিকে। অসুবিধা নেই। রোদ মাখামাখি না থাকলে কিসের
বনভোজন ! বাবু হয়ে আরাম করে বসল। আজ রান্না হয়েছে। প্রথম শাকভাজা, মুরগির মাংস, আম
দিয়ে টক ডাল, আলু চোকা আর আমড়ার চাটনি। ছুটির দিন প্রতি রবিবারেই মাংস হয়। মাংস
হলে দুজনেরই একটু ভাত বেশি লাগে। তাই হাঁড়ি শুদ্ধ নিয়ে চলে এসেছে। টিফিন কৌটায় মাংস, ডাল, বাকি সব। শালপাতা
বাড়িতে মজুত থাকে। পাগলা স্বামীকে জানে তো। উঠল বাই তো কটক যাই। মদত না দিলে মুখ
কালো করে বোবা হয়ে থাকবে। তখন মনটা কেমন লাগে। স্বস্তি থাকে !
বউ শালপাতায় ভাত বাড়ছে। তখনই সুরেশ বলল," দেখ দেখ বউ, শালিক দুইটা কেমন
প্রেমে মজেছে।কিরকম চুমা খাচ্ছে। কত আনন্দে আছে। " বউ ঘাড় ঘোরালো। নিম গাছের
ডালে বসে দুটো শালিক ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে
পরম তৃপ্তিতে খুনসুটি করছে। বউ বলল," ওসব দেখতে নাই। ওগোও শরম লাগে।"
"
ওরাই আসল সুখের সাগরে ভাসে। কাম কাজ নাই শুধুই সুখ। এমন যদি মানুষও হতে পারত কি
আনন্দটাই না হতো।"
বউ
বলল," মেলা পূণ্যি কইরা মানুষ হয়। এইডা কি কও তুমি।"
" হাছা কথাই কইছিস। জ্যেয় যেমুন
ভাবে।"
ওরা
খাওয়া শুরু করেছে। শাকভাজার পরেই মাংস দিয়ে ভাত মাখছে। তখনই এক ভিখিরির আবির্ভাব।
তেল চিটে নোংরা জামা প্যান্ট। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। বয়স বোধ করি পঞ্চাশের এদিক ওদিক।
এক দৃষ্টিতে ওদের খাওয়া দেখছে।
সুরেশ
বলল," হাঁ করে গিলছ কেন? বইয়া পড়। বউ শালপাতা আছে না? ওর লাইগা বাইড়া
দে।"
বউ হাত ধুয়ে শালপাতায় ভাত মাংস দিয়ে এগিয়ে দিল। ভিখিরির সবুর সইছে না। বসেই গপ গপ
করে খাওয়া শুরু করে দিল। দণ্ডের মধ্যে শেষ করে বলল, " আরও ভাত দাও, মাংস
দাও।" আবার দিল। সুরেশ দেখল সেটাও সাবাড় করে ফেলেছে। নিজের পাতের পুরো
মাংসগুলোই ভিখিরির পাতে ঢেলে দিল। বলল," নে খা। তুই আজ অতিথি। তোর খাওয়ার
বরাদ্দ এইখানেই ছিল।" ভিখিরি বলল," চাটনি।" সুরেশ বলল," দিয়ে
দে বউ। আমার আর লাগবে না।"
সূর্য
চলে যাওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে এল ওরা। বাগানে গাছ-গাছড়ার দাপটে আগেই আলো নিভে
গিয়েছিল। বউ জানে আজ ছুটির দিন। স্বামী তাকে কিছুতেই কাছ ছাড়া করবে না। সংসারের
কোনও কাজই করতে দেবে না। হৃদয়ের সুইচ খোলা আছে যে। এরমধ্যেও যে এক পরম সুখ মুখ
ফুঁটে বলতে পারে না।
দেখতে
দেখতে ওদের একটি মেয়ে হল। তখন বউকে ছেড়ে সুরেশ মেয়েকে নিয়ে খাবলা খাবলি। বাড়িতে
যতক্ষণ থাকে মেয়েই ওর সব। দিনরাত মেয়ের সঙ্গেই খেলা। মেয়েকেই নিয়েই যত খুনসুটি।
সেই মেয়েও বড় হয়ে গেল। বাপ সোহাগী মাইয়া
বাপকে ছাড়া এক দন্ড চলে না। সব বায়নাক্কা বাবার কাছেই। মানুষটা কোনওদিনই সংসারি হল
না। অথচ রোজগার করে ঈর্ষা করার মতো। বেতন পেয়ে সবই বউয়ের হাতে তুলে দেয়। বউ সব
হিসেব করে ব্যাংকে রেকারিং ডিপোজিট থেকে শুরু করে নানা খাতে জমা দিয়ে আসে। মেয়ের
বিয়ের টাকা, হায়ার এডুকেশনের টাকা তারপর কিছু বাড়িতেই জমিয়ে রেখে মেয়ের গয়না
বানানোও সারা।
মেয়ে
বড় হয়ে গেল। বিএ, এমএ পাশ দিয়ে ফেলল। তবু মেয়েই ওর বন্ধু। কোথায় কোন মেলা হয় সব
ওদের নখদর্পণে। প্রতিটা মেলাতেই যাওয়া চাই। একটা স্বস্তি বউ না গেলে আগের মতো মুখ
কালো করে গোসা করে বসে থাকে না। মেয়েকে নিয়েই চলল। বইমেলাতেও যায়। বহু টাকার বই
কেনে। মেয়ে আবার বইয়ের পোকা। বাপের সঙ্গে ঘুরবে ফিরবে আর বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে
থাকবে। সেই মেয়ে স্কুলে চাকরি পেয়ে গেল। দিদিমণি। আশ্চর্য ! একেবারে বাপের ধারা
পেয়েছে। যখন স্কুলে পড়ায়, অন্য মানুষ। নিষ্ঠা, ব্যক্তিত্ব দেখে মেলানো মুশকিল। কে
বলবে এই মেয়ে মেলা দেখার জন্য শিশুর মতো লাফায় !
পরিবারের
তিনটে প্রাণী যেভাবে দিন যাপন করছে এমন সুখের জীবন কম মানুষের জীবনেই আসে। সমুদ্রের
উচ্ছ্বাস ঢেউয়ে নিজস্ব গতিতে বেশ এগিয়ে চলছিল। প্রবল ধাক্কাটা খেল
মেয়ের বিয়ের সময়। বিয়ের অনুষ্ঠান হল বেশ জাঁকজমক করে। খরচের কার্পণ্য করে নি। বহু
মানুষ আমন্ত্রিত ছিল। বাপের ফুর্তি ছিল যেন একটু বেশিই। পরদিন সেই বাপের কি
কান্না। মেয়ে স্বামীর ঘরে চলে যাচ্ছে। বাপ মেয়ে দু'জনেরই হাউমাউ কান্না।কিছুতেই
থামানো যাচ্ছে না। পাড়া প্রতিবেশী জানে বাপ সোহাগী মেয়েকে। তাই কেউ বাধা দেয় নি।
মেয়ে
চলে যাওয়ার পর সুরেশ গুম মেরে থাকল দুটো দিন। মেয়ের ফুলশয্যার অনুষ্ঠানেও গিয়েছিল
বউকে নিয়ে। ফিরে আসা থেকেই সুরেশ অন্যরকম। মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেছে। ছুটি নিয়েছিল
একমাস। একটু আরামে শুয়ে বসে ফুর্তিতে কাটাবে। অবশ্য চাকরিও শেষ হয়ে এল। আর চার মাস
পর পুরোপুরি অবসর। তখন তাকে আর পায় কে? তখন হৃদয়ের সুইচ সারাক্ষণ খোলা। অন্য ভাবে
জীবনটা কাটাবে। কিন্তু সুরেশ ঘর থেকেই বের হচ্ছে না। বউ ভাবছে দু'দিন গেলেই
স্বাভাবিক হয়ে যাবে। মেয়ে শ্বশুর বাড়ি চলে গেলে সব বাবা-মায়েরই কষ্ট হয়। সুরেশেরও
হচ্ছে। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
দুপুরের
দিকে ঘটনা। সুরেশ হঠাৎ চিৎকার করে উঠল। বউ তখন রান্না ঘরে। খাওয়ার পর বাসনপত্র
গুছিয়ে রাখছিল। এসে দেখে সুরেশ এপাশ ওপাশ করছে আর কাতরাচ্ছে। বউ বারবার জিজ্ঞেস
করছে, কি হয়েছে। কোনও উত্তর নেই। বউ ভয় পেয়ে পাড়ার দু'একজনকে ডাকল। সঙ্গে সঙ্গে
অ্যাম্বুলেন্স ডেকে স্ট্রেট হসপিটাল । ডাক্তার ভাল করে পরীক্ষা করে বললেন, হার্ট
ফেল করেছে। সব শেষ। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। খবর পেয়ে কারখানা থেকে বহু লোক এসেছিল।
ম্যানেজারও এলেন। মেয়েতো বাবাকে জাপটে ধরে হাউমাউ করে কান্না। সে এক বীভৎস দৃশ্য।
কোনও ভাষাতেই তা প্রকাশ করা শক্ত।
পারলৌকিক
ক্রিয়াকর্ম মিটে যাওয়ার পর বউ কেমন পাথর হয়ে গেছে। ভেতরে ভেতরে অনবরত রক্ত ক্ষরণ হয়ে চলেছে।
সুরেশকে না জানিয়ে গোপনে ত্রিশ বছর ধরে তিল তিল করে বহু
টাকা জমিয়েছে। স্বামী ঘুরতে বেড়াতে ভালবাসে। অনেকবার বলেছে, বউ বলেছে এখন টাকা নেই। স্বামী
জানে, দোতলা বাড়ি হয়েছে, মেয়ের বিয়ের মোটা খরচ। সুপ্ত ইচ্ছে ছিল অবসরের পর
স্বামীকে সারপ্রাইজ দেবে। তখন সারাদেশ ঘুরে বেড়িয়ে স্বাদ পূরণ করবে। কিন্তু কী হল?
এখন এত টাকা নিয়ে কি করবে বউ? যে মানুষটা একদন্ড কাছছাড়া করতে চাইত না। তাকে ছাড়া
বাঁচবে কি করে? আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে অতল গহবরে যেন তলিয়ে যাচ্ছে ।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি -
নিত্যরঞ্জন দেবনাথ পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার পানুহাটে ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।কাটোয়া কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। বর্তমানে থাকেন হুগলির চুঁচুড়ায়। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন।অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল-এর অধীন ডিভিশনাল অ্যাকাউন্টস অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম গল্প " চেতনা " ছোটদের পত্রিকা শুকতারায় ১৯৯৬ - এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ, শিলাদিত্য, কালি ও কলম,মাতৃশক্তি, তথ্যকেন্দ্র, কলেজস্ট্রিট, কথাসাহিত্য, দৈনিক স্টেটসম্যান, যুগশঙ্খ, একদিন,,সুখবর ইত্যাদি এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর সাহিত্যকীর্তি অব্যাহত। ইতিমধ্যে পাঁচটি গল্প সংকলন ও চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক "শতানীক " পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করে আসছেন।
.jpg)