Advt

Advt

pargacha-galpo-story-by-nityaranjan-debnath-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-পরগাছা-গল্প-নিত্যরঞ্জন-দেবনাথ

pargacha-galpo-story-by-nityaranjan-debnath-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-পরগাছা-গল্প-নিত্যরঞ্জন-দেবনাথ

অনলের বিয়েটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। হুট করে এভাবে বিয়ে করতে হবে ভাবে নি কোনও দিন। বন্ধুরা বলে ললাটের লিখন। কথায় আছে জন্ম মৃত্যু বিয়ে তিন বিধাতাকে নিয়ে। সেসব নাকি আগেই স্থির হয়ে থাকে। শত চেষ্টাচরিত্র করলেও নড়চড় হওয়ার নয়। যদিও অনল এসব বিশ্বাস করে না। কম্পিউটার, ইন্টারনেটের যুগে আদ্যিকালের ভাবনা আজকাল অচল।  কর্মের প্রতিই তার আস্থা বেশি। দৃঢ়চেতা পুরুষ। যা করার মানুষই করে। ললাটের লিখন, ভাগ্য নিয়ে মাথা ঘামায় না। সে না চাইলে কী বিয়েটা হতে পারত? সকলে জোর করেছে বলেই যে বিয়েটা করে ফেলেছে তা কিন্তু নয়। নিজের বিবেকবোধ থেকেই প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।

ঘটনাটা বলি। অনলের বন্ধু কাকন। স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে পড়েছে। আন্তরিক বন্ধু না হলেও বন্ধু। দু'জনের অ্যামবিশন অবশ্য আলাদা। অনল চায় বড় অফিসার হবে। সরকারি আধিকারিক। কাকন হতে চায় বিজনেস ম্যাগনেট। বাবার বড় ব্যবসা। সেই ব্যবসার ভবিষ্যৎ কর্ণধার হবে কাকন। কর্পোরেট ভাবনাচিন্তা সারাক্ষণ মাথায় ঘোরপাক খায়।  চাকরি করবে কি? মানুষজনকে চাকরি দেবে সে নিজেই। অবশ্য মেধার দিক থেকে অনল অনেকটা এগিয়ে। পড়াশুনায় সব ক্ষেত্রেই টপার। সরকারি আমলা যে হতেই পারে তাতে কোনও দ্বিধা নেই। ইতিমধ্যে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের গ্রুপ এ গ্রেডের একটি চাকরি পেয়েও গেছে।

সেই কাকনের বোনের বিয়েতে ঘটনাটা ঘটল। বন্ধুর বোনের বিয়েতে বন্ধু আমন্ত্রিত থাকবে এটাই স্বাভাবিক। শিল্পপতির মেয়ের বিয়ে বলে কথা। বিশাল জাঁকজমক। এলাহি আয়োজন। মন্ত্রী আমলা থেকে শুরু করে বহু ভিআইপি উপস্থিত। রাত আটটা নাগাদ বর ঢুকেছে। হ্যান্ডসাম, টল, সুদর্শন। সেও আরেক হবু শিল্পপতি।  নটা নাগাদ সবে বিয়ের আসরে ঢুকতে যাবে তখনই বিপত্তি। হঠাৎ  হট্টগোল। বিশ্রী রকমের শোরগোল যা কাঙ্ক্ষিত নয়। পনের-ষোলজন পুলিশ বরকে পাকড়াও করতে এসেছে। সঙ্গে বিশ-পঁচিশ জন অনাহূত পাবলিক। এদের কথাবার্তায় শালীনতার বড় অভাব। প্রথমটা রহস্য মনে হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল। বর ভদ্রলোকটি নাকি বিবাহিত। একটি কন্যা সন্তানও আছে। সেই স্ত্রীও এখানে হাজির। স্ত্রীটি অপূর্ব সুন্দরী। চলনে বলনে একেবারে চৌকস যাকে বলে। একটা কথাও বাংলায় বলছে না। সবই ইংলিশ। ওসি কে অর্ডার করছে, একে আগে অ্যারেস্ট করে থানায় নিয়ে চলুন তারপর অন্যকথা। যেভাবে আদেশ  করছে নিশ্চয়ই এও এক হোমরা চোমরার কন্যা। না হলে একজনকে অ্যারেস্ট করতে পুরো থানা তুলে নিয়ে চলে আসে কখনো!

খাওয়া-দাওয়ার দিকটাতে কোনও ব্যাঘাত না ঘটলেও বিবাহ আসরে যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কাকনের পিতৃদেব যথেষ্ট বিত্তবান হলেও সেই মুহূর্তে তাঁকে নিঃস্ব কন্যাদায়গ্রস্থ অসহায় পিতার মতো লাগছে। অবস্থা দেখে অনেকেই ভয় পেতে লাগল। তিনিই কন্যাদান করবেন বলে ধূতি পাঞ্জাবি পরে বসে ছিলেন। একটু আগেও যেমন সপ্রতিভ ছিলেন হঠাৎ এতটাই মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন চিন্তার ব্যাপার। মাথায় শুধু ঘুরছে একমাত্র কন্যা লগ্নভ্রষ্ঠা হবে ! সেই ভাবনাই তাকে নিস্তেজ করে দিয়েছে। শিল্পপতির মেয়েকে তো যারতার হাতে তুলে দেওয়া যায় না !

এই আবহে কাকন অনলের হাতটা শক্ত করে ধরে টানতে টানতে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাল। কোনও ভূমিকা না করেই বলল," একমাত্র তুইই পারিস আমার বোনকে বাঁচাতে। আমি পর্ণার সঙ্গে কথা বলেছি। বাপির মতামতও নিয়ে এলাম। তুই আর অমত করিস না বন্ধু।"
অনল হতবাক ! " কি বলছিস তুই? এটা অসম্ভব। তোরা যে স্টেটাসে বিলং করিস সেখানে আমরা কোথায়? আমরা ছাপোষা মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির অতি সাধারণ মানুষ। কিছুতেই অ্যাডজাস্ট হতে পারে না। এর পরিণতিও ভাল হবে না। তুই অযথা জোর করিস না।

কাকন বলল," কেন? আমার বোন কি তোর উপযুক্ত নয়? কোন দিকে খামতি আছে বল?"
" আমি তো সে কথা বলিনি। আমার কথাটাই বুঝতে পারছিস না। পর্ণা যথেষ্ট সুন্দরী, স্মার্ট, এডুকেটেড মেয়ে। আমার থেকে অনেক অনেক ভাল ছেলে পাবি। যে বিলাসিতায় সে বড় হয়েছে আমি তার সিকিভাগও দিতে পারব না। তখনই শুরু হবে অশান্তি।মাঝখান থেকে ওর লাইফটাই স্পয়েল হয়ে যাবে। একটু প্র্যাকটিকেল হওয়ার চেষ্টা কর।"

কাকন বলল," তুই বোধহয় জানিস না মেয়েরা মায়ের জাত। অনেকটা জলের মতো। যে পাত্রে রাখা হয় সে আকার ধারণ করে। অর্থাৎ যে ফ্যামিলিতে যাবে সেই পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সেটা কোনও সমস্যাই নয়। তুই কি চাস বোনটা লগ্নভ্রষ্টা  হোক"?
অনল বলল," আজকের যুগেও তোরা মান্ধাতার আমলের ভাবনা মাথায় নিয়ে বসে আছিস? তুই না বিজ্ঞানের ছাত্র। কি করে এসব মানিস বলতো?"

কাকন বলল," আমি মানি না। কিন্তু বাপি মামণি খুব মানেন। তাঁদের বিশ্বাসকে মর্যাদা দিতেই  তোকে এত অনুরোধ করছি। তুই আর অমত করিস না। আমি ধূতি পাঞ্জাবি পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই ঘরেই থাক তুই।" বলেই কাকন বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল।
ইতিমধ্যে কাকনের বাবা-মা এসে অনলের হাত ধরে কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন।  "তুমি বাবা এই বিপদের হাত থেকে আমার মেয়েটিকে রক্ষা করো। একবার লগ্নাভ্রষ্টা হলে সে মেয়ে কিছুতেই সুখী হয় না। বাবা-মা হিসেবে কি করে সহ্য করি বলো? ফুলের মতো মেয়েটি আমার এতবড় ধাক্কা খেল। ভাবতেই পারছি না। আমি জোর গলায় বলতে পারি তোমরা খুব সুখী হবে কথাটা মিলিয়ে নিও।"

 অনল দৃঢ়চেতা হলেও এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মানবিক বোধ প্রাধান্য পেল বেশি। সে বলল, " আমাকে আধ ঘন্টা সময় দিন। প্রথমত আমি পর্ণার মুখোমুখি হয়ে কিছু বলতে চাই। তারপর আমার বাবা-মাকে ফোন করে জানানো কর্তব্য মনে করি। তাঁদের আশীর্বাদ সবার আগে কাম্য।"
পর্ণার মা বললেন," ঠিক আছে পর্ণাকে এখানেই ডাকছি। তুমি বস বাবা। একান্তে কথা বলে নাও।"

পর্ণা আসতেই বাবা-মা উঠে গেলেন। অনলের সব কিছু যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া নিজের আপনজন ব্যাতিত জীবনের এতবড় সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে কেমন অসহায় বোধ করতে লাগল। পর্ণাকে তার ফ্যামিলির পরিষ্কার চিত্রটা তুলে ধরাই মূল উদ্যেশ্য। এই অবস্থায় পর্ণার মানসিক বিপর্যয় হওয়া স্বাভাবিক। সুচিন্তিত মতামত আশা করাও বৃথা। সব শুনে  বিমর্ষ পর্ণা বলল, "আমি সব মানিয়ে নিতে পারব। আজও মেয়েরা বড় অসহায়। পরগাছার মতো যত্রতত্র মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়।"
অনল দ্বিধায় পড়ে গেল। তাহলে কী বাধ্য হয়ে মেনে নিচ্ছে?  তাই আবার জিজ্ঞেস করল," তোমার কি আমাকে পছন্দ? নাকি বাবা-মা জোর করছেন বলেই বাধ্য হচ্ছ?"
পর্ণা বলল," কথাটা ইমম্যাটেরিয়াল। আপনি বিপদ থেকে উদ্ধার করছেন এটাই বড় কথা। আপনার মহানুভবতা কে সম্মান করি। চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকব।"

অনল যা জানতে চায় তার যথাযথ উত্তর পেল না। মানসিক বিধ্বস্ত একটি মেয়েকে বারবার প্রশ্ন করতেও দ্বিধা। তার একটাই প্রশ্ন,  মন থেকে পছন্দ না হলে তারা কী সুখী হবে ! মহানুভবতা দেখিয়ে কর্তব্য করা কী ঠিক?  সে আর ভাবতে পারছে না। এদিকে কাকন বর পোশাক নিয়ে হাজির। উভয়সংকট। কিছুতেই স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারছে না।

বাড়িতে প্রথমে বোনকে ফোন করল। বোনই পারবে সমাধানের রাস্তা দেখাতে।কলকাতার যাদবপুরে তার বাড়ি। বাবা-মা এবং ওরা ভাই বোন মিলে সংসার। বোন সবে ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছে। ইংলিশে এম.এ পড়ছে। বাবা কলেজের অধ্যাপক। মাও হিস্ট্রিতে এম.এ করে এমফিল করেছেন। সংসার ভালবাসেন বলে চাকরির চেষ্টা করেন নি। এককথায় হ্যাপি ফ্যামিলি। মা আজও নিজে হাতে রান্নাটা করেন। অন্যান্য কাজের লোক থাকলেও রান্নার দায়িত্ব কাউকে দিতে নারাজ। ফলে প্রতিদিনই খাওয়ার সময়  ভালবাসা, আন্তরিকতার ছোঁয়া স্পষ্ট টের পাওয়া যায়। এর থেকে বড় তৃপ্তি আর কি হতে পারে।

বোন শুনে এক্সটাইটেড ! " দারুন ব্যাপার দাদা! আমি পর্ণাকে দেখেছি। যেমন স্মার্ট তেমনি সুন্দরী। তোর সঙ্গে মানাবে ভাল। রাজি হয়ে যা। আমি এক্ষুনি যাচ্ছি। চিন্তা করিস না। "
অনল বলল," বাবা-মাকে ঘটনাটা বুঝিয়ে বল। যদি আসতে পারেন খুবই ভাল হয়।"
" হুট করে এত তাড়াতাড়ি কি যেতে পারবেন? বলে দেখছি। না হলে আমি যাচ্ছি। সব ম্যানেজ করে নেব। তুই কোনও চিন্তা করিস না দাদা।"

* * * * *
অনল ও পর্ণার বিবাহিত জীবন পঁচিশ বছর অতিক্রান্ত। অনল এখন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। আই.এ.এস। ডি এমের বিশাল বাংলো বাড়ির মতো কোয়ার্টার। পর্ণাকে  মেমসাহেব বলে সকলে সম্মোধন করে। একমাত্র ছেলে দিল্লি ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে সবে।অনলের বাবা-মা গত হয়েছেন। একমাত্র বোন কলেজে পড়ায়। হাজবেন্ডও অধ্যাপক।
ছেলে এসেছে। বাবা-মায়ের কাছে মাস খানেক থাকার ইচ্ছে। তারপর আবার দিল্লি ফিরে যাবে। রাত তখন দশটা। ডাইনিং টেবিলে তিন জনেই খেতে বসেছে। পর্ণা জিজ্ঞেস করল," এবার কি পড়বি ডিসিশন নিয়েছিস?"

ছেলে বলল," পি.এইচ.ডি কমপ্লিট করব আগে। তারপর অন্য কথা ভাববো।"
অনল বলল," রাইট ডিসিশন।"

পর্ণা বলল," মোটেই রাইট ডিসিশন নয়। তোকে পিএইচডি করতে হবে না। এম.বি.এ পড়বি।"
অনল অবাক ! "এমবিএ করে কি করবে? তুমি কেন ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে বলছ?"
পর্ণা বলল," ওর এখন বয়স কম। ওর ইচ্ছের কি মূল্য আছে? এমবিএ করে বিজনেস করবে।"
"বিজনেস ? কি বলছ তুমি? ক্যাপিটাল কোথায় পাবে?"

পর্ণা বলল," সে হয়ে যাবে। আগে এমবিএ কমপ্লিট করে আসুক। মনে রাখিস তোর মামার মতো বিজনেস ম্যান হতে হবে। বিশাল টাকার মালিক। চাকরি করে ক'টাকা রোজগার করবি? অ্যামবিশন রাখবি ভবিষ্যতে বড় বিজনেসম্যান হব। সরকারের গোলামী করব না।"
অনল হতবাক ! সে ভাবছে অন্য কথা। তাহলে কী পর্ণা তাকে পেয়ে সুখী হয় নি ! এতদিন ভুল ভেবে আসছে? শুধু কী পরগাছার মতো মানিয়ে নিয়েছে !

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।