“এভারেস্ট, কুষাং এবং এক অসমাপ্ত বন্ধুত্ব”
দেবব্রত চক্রবর্তীর পুরনো দিনের স্মৃতি থেকে বিশেষ
প্রতিবেদন
১৯৫৩ সালের ২৯শে মে—মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে প্রথম সফলভাবে পদার্পণ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের মহান পর্বতারোহী Sir Edmund Hillary এবং দার্জিলিং তথা সমগ্র হিমালয়ের গর্ব শেরপা সম্প্রদায়ের কিংবদন্তি Tenzing Norgay। সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখতে আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক মাউন্ট এভারেস্ট দিবস।
এভারেস্ট শুধুমাত্র একটি পাহাড় নয়—এটি মানুষের সাহস, আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন এবং আত্মজয়ের প্রতীক। হাজারো কষ্ট, অক্সিজেনের অভাব, বরফঝড়, তুষারধস এবং মৃত্যুভয়কে সঙ্গী করেও প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য অভিযাত্রী ছুটে যান এই শুভ্র পর্বতমাতার আহ্বানে। কেউ বিজয়ীর হাসি নিয়ে ফিরে আসেন, আবার কেউ চিরনিদ্রায় শায়িত হন হিমালয়ের বুকে।
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত
এভারেস্টে প্রায় ১৩,৭৩৭ বার সফল সামিট সম্পন্ন হয়েছে এবং ৭,৫৬৩ জন পৃথক মানুষ পৃথিবীর
সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। মৃত্যুবরণ করেছেন অন্তত ৩৩৯ জন পর্বতারোহী ও শেরপা। অথচ এই
সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কারণ বর্তমানে এভারেস্ট অভিযান অনেকাংশেই বাণিজ্যিক রূপ
নিয়েছে। বিপুল অর্থের বিনিময়ে অনেক এজেন্সি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা ছাড়াই
অভিযাত্রীদের এভারেস্টে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে বাড়ছে দুর্ঘটনা, অক্সিজেন সংকট এবং মৃত্যুর
মিছিল। তবুও পাহাড়প্রেমীরা থেমে থাকেন না। কারণ পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা এক অদ্ভুত
নেশা—যেখানে ফিরে এসেও আবার নতুন অভিযানের স্বপ্ন দেখা শুরু হয়।
প্রথম এভারেস্ট অভিযানের রোমাঞ্চ ও মৃত্যুর মুখোমুখি
লড়াই :
১৯৫৩ সালের সেই ঐতিহাসিক অভিযানে Sir Edmund
Hillary এবং Tenzing Norgay-কে অতিক্রম করতে হয়েছিল গভীর হিমবাহের ফাটল, প্রাণঘাতী
বরফধস, মাইনাস তাপমাত্রা এবং তথাকথিত “ডেথ জোন”। ৮,০০০ মিটারের ওপরে অক্সিজেনের মাত্রা
এতটাই কম যে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে। প্রবল ঠান্ডা ও ১০০ কিলোমিটারের
বেশি গতির ঝড়ো হাওয়ার মধ্যে প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। আজও খুম্বু
আইসফল, লোৎসে ফেস, হিলারি স্টেপ এবং সামিট রিজ পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক পর্বতারোহণ
পথ হিসেবে পরিচিত।
ভারতীয় পর্বতারোহীদের গৌরবগাথা :
ভারতবর্ষ থেকেও বহু কিংবদন্তি পর্বতারোহী এভারেস্ট
জয় করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য— Tenzing Norgay
Bachendri Pal — প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে এভারেস্ট
জয় (১৯৮৪)
Santosh Yadav — বিশ্বের প্রথম মহিলা যিনি দু’বার
এভারেস্ট জয় করেন
Arunima Sinha — কৃত্রিম পা নিয়ে এভারেস্ট জয়ী প্রথম
মহিলা
Malavath Purna — অল্প বয়সে এভারেস্ট জয়ী ভারতীয়
কিশোরী
এবং পশ্চিমবঙ্গ ও দার্জিলিংয়ের বহু অজানা সাহসী পর্বতারোহী,
যাঁরা নীরবে হিমালয়ের বুকে নিজেদের ইতিহাস লিখে চলেছেন।
পশ্চিমবঙ্গ ও দার্জিলিং : ভারতীয় পর্বতারোহণের প্রাণভূমি
:
ভারতের পর্বতারোহণ ইতিহাসে দার্জিলিংয়ের অবদান চিরস্মরণীয়।
Himalayan Mountaineering Institute শুধুমাত্র একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নয়—এটি স্বপ্নবাজ
তরুণদের সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তোলার এক তীর্থস্থান। এখান থেকেই
তৈরি হয়েছেন বহু আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিযাত্রী।এই প্রতিষ্ঠান থেকেই উঠে এসেছিলেন
ভারতীয় পর্বতারোহণ জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র—কিংবদন্তি Kushang Dorjee Sherpa।
কুষাং দোরজি শেরপা — হিমালয়ের এক অমর কিংবদন্তি
:
পাঁচবার এভারেস্ট জয়ী কিংবদন্তি Kushang Dorjee
Sherpa পৃথিবীর প্রথম মানুষ হিসেবে এভারেস্টকে তিনটি ভিন্ন দিক থেকে জয় করার বিরল
কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন। তাঁর সাহস, অভিজ্ঞতা এবং পাহাড়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ তাঁকে
পর্বতারোহণ জগতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। কিন্তু কুষাং শুধুমাত্র একজন সফল
পর্বতারোহী ছিলেন না—তিনি ছিলেন অত্যন্ত সহজ, আন্তরিক এবং হৃদয়বান একজন মানুষ। তাঁর
সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে গভীর আবেগ জাগায়।
কুষাং শেরপার সঙ্গে আমার পরিচয় — এক আত্মিক সম্পর্কের শুরু :
সালটা ১৯৯০। কর্মসূত্রে আমার প্রথম পোস্টিং হয় উত্তরবঙ্গ
ক্ষেত্রীয় গ্রামীণ ব্যাংকের দার্জিলিংয়ের ৬ মাইল শাখায়। বয়স তখন অল্প। নতুন শহর,
নতুন জীবন, নতুন স্বপ্ন।
আমি যে বাড়িতে থাকতাম, তাঁদের পরিচিত ছিলেন
Himalayan Mountaineering Institute-এর বড়বাবু প্রেম ছেত্রী । একদিন তাঁর সূত্রেই
HMI-তে ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ হয়। সেখানে পরিচয় হয় নওয়াং গম্বু স্যার এবং লাটু দর্জৈ
শেরপা স্যারের সঙ্গে।
সেই সময় HMI-তে একটি প্রশিক্ষণ কোর্স শুরু হচ্ছিল।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তরুণ-তরুণীরা তাদের প্রশিক্ষণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
সেই দৃশ্য দেখে আমার ভেতরেও অদ্ভুত এক আগ্রহ জন্ম নেয়। প্রেম দাজু আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—
“তুমি কি এই প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী?”
আমি সম্মতি জানাতেই তিনি আমাকে নিয়ে যান তৎকালীন
HMI ডিরেক্টর Namang Gombu স্যারের কাছে। দার্জিলিংয়ের স্থানীয় যুবক হিসেবে তিনি
আমাকে সম্পূর্ণ স্কলারশিপের মাধ্যমে HMI-এর বেসিক কোর্স করার সুযোগ করে দেন। সময়টা
ছিল ১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর মাস। সেই সময় প্রিন্সিপাল ছিলেন কর্নেল এ.কে. দত্ত এবং
নওয়াং গম্বু স্যার ছিলেন ডিরেক্টর অফ ফিল্ড
ট্রেনিং।“১৯৯০ সালের সেপ্টেম্বর HMI Darjeeling-এর সেই Basic Mountaineering Course
আজও আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায় হয়ে রয়েছে। সেই কোর্সেই প্রথম পরিচয় হয়
কিংবদন্তি কুষাং দোরজি শেরপার সঙ্গে।” নেপালি ভাষা জানার সুবাদে তার সাথে সখ্যতা গড়ে
ওঠে।
প্রথম পরিচয় থেকেই কুষাং-এর সহজ-সরল ব্যবহার আমাকে
মুগ্ধ করেছিল। পরবর্তীকালে শিলিগুড়িতে কোনও কাজে এলেই সে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত।
ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্ব ছাড়িয়ে পারিবারিক সম্পর্কে পরিণত হয়।
ভারত সরকার তাঁকে ২০০৩ সালে “Tenzing Norgay
National Adventure Award” তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিত করে।
“আমাদের সংগঠন ‘Siliguri Green Environment
Preservation Society’-এর পক্ষ থেকে কিংবদন্তি পর্বতারোহী Kushang Dorjee Sherpa-এর
নাম পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে বিশেষ সম্মাননার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে
মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী Mamata Banerjee-র আমলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর অসামান্য পর্বতারোহণ
কৃতিত্ব ও হিমালয় অভিযানে অবদানের জন্য তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিত করে।”
“এভারেস্ট অভিযানে অসামান্য সাফল্য ও ভারতীয় পর্বতারোহণে
অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে শিলিগুড়ির উত্তরণ এলাকায়
কুষাং দোরজি শেরপাকে বাড়ি নির্মাণের জন্য জমি প্রদান করা হয়েছিল। সেই জমির বাউন্ডারি
নির্মাণের দায়িত্ব কুষাং নিজেই আমাকে দিয়েছিল। সেই কাজের মধ্য দিয়েই আমাদের সম্পর্ক
আরও গভীর ও আত্মিক হয়ে
কুষাং যখনই শিলিগুড়িতে আসত, আমার বাড়িতে না এসে
ফিরত না। আবার আমরাও সুযোগ পেলেই ওর বাড়িতে যেতাম। আমাদের সংগঠনের একাধিক নেচার ক্যাম্পে
সে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিল। তরুণ প্রজন্মকে পাহাড়, পরিবেশ এবং প্রকৃতি
সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ।
গল্পে গল্পে পাহাড়ের পাঠ :
কুষাং-এর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা।
হয়তো শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে তিনি খুব প্রতিষ্ঠিত ছিলেন না, তাঁর বাচনভঙ্গিও খুব
পরিশীলিত ছিল না—কিন্তু পাহাড় সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ।
যখন তিনি এভারেস্ট বা অন্যান্য অভিযানের গল্প বলতেন, আমরা যেন চোখের সামনে দেখতে পেতাম সেই বরফঝড়, সেই ডেথ জোন, সেই মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। তাঁর প্রতিটি অভিজ্ঞতা আমাদের শেখাত—
“পাহাড়কে জয় করতে নয়, পাহাড়কে সম্মান করতে হয়।”
এক অপূরণীয় শূন্যতা :
আজ কুষাং আমাদের মধ্যে নেই। তাঁর চলে যাওয়ার দিনটি
আমাদের কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যেন হিমালয়ের বুক থেকে এক সাহসী অধ্যায় হারিয়ে
গেল।
কিন্তু মানুষ চলে গেলেও তাঁর স্মৃতি, তাঁর শিক্ষা,
তাঁর সাহস এবং তাঁর ভালোবাসা আজও আমাদের হৃদয়ের মনিকোঠায় অমলিন হয়ে রয়েছে।
হয়তো আজও কোনও বরফঢাকা শৃঙ্গের ওপারে কুষাং দাঁড়িয়ে
আছে, নতুন প্রজন্মকে আহ্বান জানাচ্ছে—
“ভয়কে জয় করো, পাহাড়কে ভালোবাসো, প্রকৃতিকে সম্মান
করো।”
লেখক পরিচিতি :-
দেবব্রত চক্রবর্তী পেশায় ব্যাংক কর্মচারী হলেও মন তাঁর নিবেদিত পরিবেশ ও সমাজসেবায়। তিনি “Green Environment Preservation Society (GEPS)”-এর সঙ্গে যুক্ত থেকে পরিবেশ সচেতনতা, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রকৃতি-শিক্ষা শিবির,অ্যাডভেঞ্চার ট্রেকিং ও খেলাধুলা সম্পর্কিত কর্মসূচির মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অভিযানের প্রতি গভীর ভালোবাসাই তাঁকে এই ভ্রমণকাহিনী রচনায় উদ্বুদ্ধ করেছে।
.jpg)