খবরটা
শুনে আঁতকে ওঠে অতনু। স্ত্রী নিপাকে জিজ্ঞেস করতেই আসল সত্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে
গেল। যদিও কারো ব্যক্তিগত স্বাধীনতায়
হস্তক্ষেপ করার পক্ষপাতি অতনু নয়। সন্তান সাবালক হলে নিজস্ব চিন্তা ভাবনার
জগৎ তৈরি হয়ে যায়। সর্ব ক্ষেত্রেই আধুনিকতার ছোঁয়া।সেখান থেকে নড়ানো কষ্টকর। তবু
বাবার অবাধ্য হবে না বলেই তার স্থির বিশ্বাস। পারিবারিক শিক্ষার একটা মূল্য আছে
বৈকি। মনের অস্বস্তি নিরসন করার শেষ চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কি।
রাতেই সায়নকে নিজের ঘরে ডাকল অতনু। সায়ন
তাদের একমাত্র সন্তান। বি টেক, এম টেক পাশ করে পরে এম.বি.এ কমপ্লিট করে একটি
মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির চিপ এক্সিকিউটিভ। লোভনীয় বেতন শুধু নয় সুযোগ সুবিধা
প্রচুর। ছেলেকে নিয়ে তাদের খুব গর্ব। কিন্তু খবরটা কানে আসতেই একটু যেন মুষড়ে
পড়েছেন।
"
আয়, বোস। তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব। কথাটা সত্যি কিনা সরাসরি তোর কাছে জানতে
চাইছি।"
" কি কথা বাপি? হঠাৎ এমন জরুরি তলব? তুমি তো কখনও এভাবে ডাকনি তাই জিজ্ঞেস
করলাম।"
" একটা কথা তোর কাছ থেকে জানতে চাইছি। নির্মল হালদারের মেয়ের সঙ্গে কি তোর
পরিচয় আছে?"
" হ্যাঁ আছে তো। কেন বলতো? আমাদের বাড়িতেও এসেছে অনেকবার। মা সবই জানে। ওকে
আমি ভালবাসি বাপি। কামিং ইয়ারে সেটলড করব ডিসিশন নিয়েছি।"
" আসলে আমি বলতে চাইছি। ফ্যামিলিটা ভাল নয়। ওর বাবাটা ভদ্রলোক নয়। তাই একটু
ভাবতে বলছিলাম।"
কেন? প্রবলেম কি? কি করেছে ভদ্রলোক ?"
"একসময়
ভদ্রলোক তিনমাস জেল খেটেছে। আরও কিছু ঘটনা আছে। পিছিয়ে আসা যায় কিনা ভেবে
দেখিস।"
স্ত্রী
নিপা বলল," কেন জেল খেটেছে? কি এমন
করেছে?"
" সে অনেক কাহিনি। পরে তোমাকে বলব। ওই
ভদ্রলোক আমার সঙ্গে বাজে ব্যবহার করেছিল কয়েকবার।
আসলে আমি একসময় ওর বড়দার মেয়েকে পড়াতাম।
অনেক কাল আগের ঘটনা। যদিও সায়ন যাকে বিয়ে করবে বলছে সে মেয়েটি কোনও দোষ করে
নি। তবু ওই ফ্যামিলিতে আত্মীয়তা করা আমার একটু আপত্তি।"
সায়ন
বলল," তুমি যখন আপত্তি করছ নিশ্চয়ই গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। তবু একটু খুলে
বললে ভাল হয় বাপি।"
"
ঠিক আছে, সন্ধ্যের পর কারণটা বলব। তারপর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিস।এখন আয়।"
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই অতনু বিছানায় টান টান শুয়ে
পড়ল। কেমন এক অস্বস্তি সারা শরীরময়। ভাবছে অতীতের কথা। আজকের কথাতো নয়।
ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর আগের ঘটনা। স্ত্রী ছেলেকে কি বলা উচিত হবে? বললে কতটা বলবে !
ওই লোকটাকে যে সহ্য করতে পারে না সেটা বোধহয় ওদের বুঝিয়ে বলা দরকার। কে জানত,
দুঃসহ অতীত বর্তমানে এসে কড়া নাড়বে !
* * *
* *
তখন সকাল সাড়ে নটার মতো হবে। বৈশাখের শেষ।
সূর্যের তেজ দেখে মনে হয় মধ্য গগন। হাঁসফাঁস গরমে কাহিল। অতনু একটা টিউশনি সেরে
সবে বাড়ি ঢুকেছে। ঘেমে নেয়ে একশা। এবার একটু বিশ্রাম নিয়ে স্নানে যাবে। তারপর
সামান্য টিফিন করে নিজের পড়ায় মন দেবে।তখনই পাড়ার অজয় খামবন্দি একটা চিঠি দিয়ে
গেল। কে দিয়েছে জিজ্ঞেস করতেই অজয় বলল, আমার বলা বারণ, চিঠিটা পড়লেই সব বুঝতে
পারবেন। বলেই চম্পট। অতনু অবাক ! কি এমন
গুরুত্বপূর্ণ চিঠি ! অজয় এড়িয়ে গেল ! অজয় একসময় তারই ছাত্র ছিল। ইলেভেন টুয়েলভ
ক্লাসটা পড়িয়েছে। এখন যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। মুখ দেখে মনে হল সবই অবগত অথচ
বলবে না। অতনু সন্দেহ অবসানের জন্য খুলে ফেলল খামটা। অত্রিকার চিঠি। অবাক হওয়ারই
কথা।ফোন থাকতে কেন চিঠি ! কি বলতে চাইছে ? কয়েক ছত্র লেখা। লিখেছে," তুমি আজই আমার বাবার সঙ্গে দেখা
করো। স্পষ্ট ভাবে বল, আমি আপনার মেয়েকে বিয়ে করতে চাই। বাকিটা আমি ম্যানেজ করব।
তোমার টেনশনের কিছু নেই। আমি সামলে নেব। আজ না এলে কিন্তু সব নাগালের বাইরে চলে
যাবে। আমার কথা ভেবে আজই এস। -- তোমার অত্রিকা।"
অজয়
অত্রিকার কাকার ছেলে। এক বাড়িতেই থাকে। ওদের ব্যাপারটা জানে শুধু নয় সমর্থনও করে।
অতনুকে যথেষ্ট রেসপেক্টও করে। তবু দ্বিধাদ্বন্দ্ব অনেক। যাওয়া উচিত হবে কিনা
ভাবছে। নানাবিধ কারণ আছে বলেই দোনোমনা। অত্রিকার দাদাটার মুখের ভাষা অত্যন্ত
কদর্য। একসময় অত্রিকাকে বাড়ি গিয়ে পড়িয়েছে। পরে অজয়কে দু'বছর। এখন না পড়ালেও
যাতায়াতে অবারিত দ্বার। অত্রিকার মা অতনুকে খুব ভালোবাসেন। স্নেহময়ী মা যেমন হয়।
আজও তাকে যে ভাবে আপ্যায়ন করেন অতনু মুগ্ধ। কিন্তু গত সপ্তাহে ওর ছোটকাকা যে
ব্যবহারটা করল কোনও ভদ্র ছেলের পক্ষে ওদের বাড়ির ত্রিসীমানায় যাওয়ার মানসিকতা আর
থাকবে না। রীতিমতো শাসানি। এরপর কী করে যাবে অতনু !
গত সপ্তাহেই
ঘটনাটা ঘটল। সন্ধে নাগাদ ওদের বাড়িতে ঘন্টা খানেক কাটিয়ে ফিরছিল। সেদিন আবার
মাসিমাই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। স্পেশাল কোনও ডিস তৈরি করলেই তার ডাক পড়ে। অতনুকে খাইয়ে
নাকি তৃপ্তি পান। ভদ্রমহিলা রান্নায় পটু। বিশেষ করে স্পেশাল আইটেম। যা বাড়িতে
সচরাচর হয় না। সেদিনও ডিম সুজি, ময়দা, নারকেল ইত্যাদি নানা জিনিস দিয়ে অসাধারণ
একটি ডিস তৈরি করেছিলেন যা আজও মুখে লেগে
আছে। কিন্তু ফেরার সময় যা ঘটল অপ্রত্যাশিত। অকল্পনীয়। ওদের বাড়িটা অনেকটা জায়গা
নিয়ে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ওর বাবারা তিন ভাই। অত্রিকার বাবাই সবার বড়। যৌথ পরিবার।
এলাকার মধ্যে বড় ব্যাবসাদার বলে নিজেদের কেউকেটা মনে করে। একটু অহং ভাব।তবে
অতনুরাও মান-সম্মানের দিক থেকে কোনও অংশে কমতি নয়। ওর বাবা একটি নামি হায়ার
সেকেন্ডারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। অতনু ও ওর দিদি পড়াশুনায় তুখোড়। দিদি কলেজের
লেকচারার। অতনুও এম.এস.সিতে ফার্স্ট ক্লাস। বাবা বলেছিলেন পি.এইচ.ডি করতে।
অধ্যাপনার ইচ্ছে নেই বলে পিএইচডি করার
জন্য সময় নষ্ট না করে চাকরির চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই কেউ হেয় করলে সম্মানে লাগে
বৈকি।
গেট দিয়ে বের হতেই ওর ছোটকাকা রাস্তা আটকালো। কথার ধরণ দেখেই অতনুর মাথা গরম হয়ে
গিয়েছিল। শুনেছে তিন বারে বিকম পাশ করেছে। দাদাদের লেজুর ধরে ব্যবসা করে দুটো পয়সা
হয়েছে বলে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। সেদিন অবশ্য অতনুও নীরবে সব সহ্য করে নি। বাধ্য
হয়ে মুখের উপর কিছু কিছু জবাব দিয়েছিল।
কাকা
বলল," এই ছোকরা। শোন, তোকে কয়েকটা কথা বলি। এই বাড়িতে এত ঘুরঘুর করিস কেন?
তোর ধান্দাটা কি বলতো? "
অতনু
হতবাক !বলল," একটু ভদ্র ভাবে কথা বলুন। কি বলতে চাইছেন আপনি?"
" কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছিস না? যখন ভাইপোকে পড়াতিস তখনই লক্ষ করেছি তোর
কুনজর। ভাইজির সঙ্গে গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর। বুঝিনা ভেবেছিস? বড় বৌদিকে হাত করে
মনে করেছিস রাজত্ব দখল করে নিয়েছিস? তোকে সাবধান করে দিচ্ছি আর এই বাড়িতে ঢুকবি
না। ঢুকলে বদনখানা পাল্টে দেব। কথাটা মনে রাখিস।"
"
আপনি ব্যবসা করেন ঠিকই। শিক্ষাদীক্ষা এতটুকু নেই। কার সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়
সেটাও শেখেন নি। ছি ছিঃ। আপনার সঙ্গে কথা বলতেও ঘেন্নায় গা রিরি করে" বলে
হনহন করে চলে এসেছিল। ওর কাকার মুখের অবয়ব বদলে গিয়েছিল। ভাবেনি বোধহয়, আমি এমন
কথা বলতে পারি। চিৎকার করে আরও কিসব বলছিল। অতনু অবশ্য আর দাঁড়ায়নি। রুচিতে
বাঁধছিল।
ওর বড়দাটাও একদিন অভদ্র আচরণ করেছে। জানোয়ারের মতো মুখের ভাষা যা সভ্য সমাজে
উচ্চারণ করতেও বিবেকে লাগে। তারপরেও সে বাড়িতে কী যাওয়া যায় ! এমন পরিবারের একটি
মেয়েকে ভালোবেসে ফেলেছে ভাবতে নিজেরও আক্ষেপ হয়। অত্রিকাকে বলেছিল সেসব কথা।
ছোটকা, বড়দাটা ওই রকমই বলে দায় এড়িয়েছিল। শিক্ষা, সহবত, রুচিবোধ ছোট থেকে যা পেয়ে
এসেছে কিছুতেই মেলাতে পারে না।
না,
মনে মনে স্থির করে নিল অতনু, মান খুঁইয়ে নত হতে যাবে না। নিজেদের বাড়ির
আত্মমর্যাদার কথা ভাবতে হবে বৈকি। তাছাড়া সে এখন বেকার। কোন মুখে বিয়ের প্রস্তাব
দেবে? অপ্রিয় কথা বলার সুযোগ কেন দেবে?
পাগল নাকি? সঙ্গে সঙ্গে অত্রিকাকে মোবাইলে
ধরার চেষ্টা করল। না,সুইচড অফ। এরমধ্যে ফোনটাকেও বন্ধ রেখেছে। বলার কিছু নেই।
অতনু
দীর্ঘ পাঁচ বছর অত্রিকাকে পড়িয়েছে। ইলেভেন ক্লাস থেকে বিএসসি ফাইনাল ইয়ার অবধি।
কবে যে এদের মধ্যে প্রেমের আঁচ লেগেছে দিনক্ষণ বলা মুশকিল। এমন নয় যে বাইরে
মেলামেশা করেছে অনেক। তখন বাড়ির পরিবেশ, মানুষগুলো কেমন সেসবেরও ভাবার অবকাশ হয়
নি। তবু প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা মনের গভীরে আলোড়ন সৃষ্টি করে বৈকি। তাই অত্রিকাকে
স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, বিয়ের পর তোমাদের বাড়ির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখব না।
সারাদিন
পড়াশুনায় মন বসাতে না পারলেও নিজের দৃঢ় সিদ্ধান্তে অনড় ছিল অতনু।না, কোনোমতেই যাবে
না। হঠাৎ রাত সাড়ে আটটা নাগাদ অত্রিকার ফোন এল।
"
কি হল তোমাকে একবার আসতে বললাম কথাটার কোনও গুরুত্বই দিলে না? জানো, কালকেই আমার
বিয়ের দিন ফাইনাল হয়ে যাবে। পাত্রপক্ষ আসছেন পাকা কথা বলতে।"
অতনু বলল," আমি কি করতে পারি? আমি তো চাকরি না পেলে তোমাকে বিয়েও করতে পারব
না। কোন মুখে প্রস্তাব দেব? একমাত্র তুমিই পার বিয়েটা আটকাতে। তাছাড়া তুমি কি চাও আবার অপমানিত হয়ে ফিরে আসি?
মনে নেই তোমার ছোটকা কি বলেছিল? ওসব সহ্য করতে পারব না। তাই যাওয়ার কোনও প্রশ্নই
নেই। যা করার তোমাকেই করতে হবে।"
"
আরে আমি বিয়েটা আটকাব কি করে? তুমি যদি সম্মুখে এসে দাঁড়াও, নিজে মুখে বল তখন আমি
জোর গলায় বলতে পারব। একটা কথা বলি, মা তোমাকে খুব পছন্দ করে। বাবারও আপত্তি হবে
না। আর বড়দা ছোটকা যদি অপ্রিয় কিছু বলে আমি সামাল দেব। তোমার কোনও চিন্তা নেই আজই
একবার এসো প্লিজ।"
"অপমান
করলে তুমি দেখবে তো? সামাল দিতে পারবে তো?"
"
আরে বলছি তো। কথা দিচ্ছি কেউ তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না। আমাকে বিশ্বাস
করো তো? আমি থাকতে কেউ কিছু করতে পারবে না। আজই এস।"
অনেক
দ্বিধাদ্বন্ধ সরিয়ে রেখে অতনু গিয়েছিল রাত নটা নাগাদ। গিয়েই ওর মাকে প্রথমে
প্রস্তাব দিয়ে ফেলে। তারপর বাবাকে। বলতে পারাটাই শক্ত কাজ ছিল। আসল মানুষদের
প্রস্তাব দিতে পেরে নিজেকে হালকা লাগছিল। কিন্তু ওর বাবা-মা কোনও কথাই বললেন না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকলেন
শুধু। তখনই ওর ছোটকা হাজির। কি করে কানে
গেল ঈশ্বর জানেন। অতনুর কলার চেপে ধরল। " হারামজাদা, তোকে
এই বাড়িতে ঢুকতে বারণ করেছিলাম। এর মধ্যেই ভুলে গেলি? বড় বাড়ির জামাই হওয়ার শখ !
বেরো। বেরো বলছি। " বলতে গেলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিল।
অত্রিকার মা ছোটকাকে জোর ধমক দিলেও আশ্চর্য
অত্রিকা কোনও কথাই বলল না। অতনু বিস্মিত ! অপমানিত হয়ে ফিরে আসা ছাড়া কোনও
উপায় ছিল না।
* * *
দীর্ঘ পনের বছর অতিক্রান্ত। নদীর জল স্রোতের টানে বহুদূর গড়িয়ে গেছে। পরিবেশও বদলে
গেছে। অতনু এখন ইনকাম ট্যাক্স অফিসার। বাবা-মায়ের পছন্দ করা মেয়েকে বিয়ে করে সুখে
স্বাচ্ছন্দে সংসার যাপন করছে। তার একমাত্র দশ বছরের পুত্র সন্তান অত্যন্ত মেধাবী।
তাকে নিয়েই এখন ধ্যানজ্ঞান।
কথায় আছে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। কাকতলীয় ভাবে এমনটা ঘটবে অতনু স্বপ্নেও কল্পনা
করেনি। ইনকাম ট্যাক্স অফিস থেকে আচমকা রেইড হয় অত্রিকার বাবার কোম্পানিতে। কয়েক
বছর ধরেই অফিস এদিক ওদিক থেকে নানা তথ্য জোগাড় করেছে। বছরের পর বছর লক্ষ লক্ষ টাকা
ইনকাম ট্যাক্স ফাঁকি শুধু নয় নানা অবৈধ কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে ফুলেফেঁপে উঠেছে।
পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে সম্পূর্ণ রিপোর্ট করার দায়িত্ব বর্তেছে অতনুর ওপর।
ইন্সপেক্টর ও অফিস থেকে যা তথ্য পেয়েছে তার উপর ভিত্তি করে যা রিপোর্ট লিখেছে অতনু
তাতেই অবস্থা খারাপ। কঠিন জেরার পর দু'জন
অ্যারেস্টেড। আপাতত কাঠগড়ায় বন্দি। এরপর কোর্টে উঠবে।বিচার হবে। কেস যেভাবে সাজানো
হয়েছে সহজে ছাড়া পাওয়া মুশকিল। যেটা বলার, যে দু'জনকে ধরা হয়েছে তারা হল অত্রিকার ছোটকাকাএবং
অত্রিকার স্বামী। তারা দু'জনে জোট বেঁধে এই
অবৈধ ব্যবসা ফেঁদেছে।
সেই
রাতেই অত্রিকা ছুটে এসেছিল অতনুর বাড়িতে। বদ্ধমূল ধারণা তাদের প্রতি আক্রোশের বসেই অতনু প্রতিশোধ নিচ্ছে। ওর ছোটকা
নাকি বলেছে , নাটের গুরু ওই মাস্টারটা। একদিন ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে
দিয়েছিলাম তো। হাজত বাস করিয়ে উচিৎ শিক্ষা দিচ্ছে।
অতনু বোঝানোর চেষ্টা করল, ওর কোনও হাত ছিল না। ইন্সপেক্টর ও অফিস থেকে যা তথ্য
দিয়েছে তার উপর ভিত্তি করেই রিপোর্টটা তৈরি করেছে। তারও উপরওয়ালা আছে ফলে ফাঁকি
দিয়ে রিপোর্ট লেখা সম্ভব ছিল না। যদিও এক বর্ণও বিশ্বাস করল না অত্রিকা। উল্টে
প্রচ্ছন্ন হুমকির কথা শুনিয়ে গট গট করে বেরিয়ে গিয়েছিল। ভুলে গেছে অতীতের মধুর
স্মৃতি। পরিবারটাই তো তেমন।পরিবর্তন হবে কি করে !
যাইহোক,
তিন মাস জেলের ঘানি টানতে হয়েছিল তাদের। সব চেয়ে দুঃখজনক শেষকালে কোম্পানিটাই উঠে
যায়। বহু টাকা ডেমারেজ দিতে গিয়ে একপ্রকার নিঃস্ব। শোনা যায় নতুনভাবে অন্য ব্যবসা
খোলার চেষ্টা করছে। তারপর অবশ্য দীর্ঘকাল খবর পায় নি অতনু। জানার আগ্রহও নেই।
কিন্ত
তাদের একমাত্র সন্তান সায়ন যে অত্রিকার ছোটকাকার মেয়ের সঙ্গেই
বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় সেটা কি করে মেনে নেবে অতনু। ছেলেকে আরেকবার বোঝাবার
চেষ্টা করবে। না হলে ওই লোকটাকে বয়কট
করবেই করবে। তার বাড়িতে আসতে দেবে না। তার বাড়িতে প্রবেশ নিষেধ। স্পষ্ট ছেলেকে
জানিয়ে দেবে। তার এই কঠোর শর্তকে মান্যতা দিতেই হবে। অন্যথায় অতনু কিছুতেই স্বস্তি
পাবে না।
* * * * *
দিন
সাতেক পরেই একটা আলোর দিশা দেখা গেল। রাত
আটটা নাগাদ পুত্র সায়ন অতনুর ঘরে গিয়ে বসল। স্ত্রী নীপা ঘরেই ছিল। সায়ন বলল,"
বাপি, তোমার সম্মান বলতে আমারও সম্মান। ঘটনাটা তোমার কাছে শুনে অনেক ভেবে একটা
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এসেছি। চিনুকে বলে দিয়েছি, চিনু বলতে নির্মল হালদারের মেয়ের
ডাক নাম, শর্ত দিয়েছি, বিয়ের পর বাপের বাড়ির সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখা যাবে না।
অন্তত তোমার বাবা আমাদের বাড়িতে আসতে পারবেন না। শুনে চিনু মুচকি হেসে বলল, আমার
বাপিও বলে দিয়েছে, সায়নকে বিয়ে করলে তোর মুখ দর্শন করব না। বাড়ি যাওয়াতো দূরের
কথা।"
নীপা
বলল," এ আবার কেমন কথা ! ব্যাপারটা তাহলে কি দাঁড়াল?"
অতনু বলল," যা দাঁড়াল, ওদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে দাও না। আমরা ভেতরে নাই বা
ঢুকলাম।"
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি -
নিত্যরঞ্জন দেবনাথ পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়ার পানুহাটে ১৯৫৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।কাটোয়া কলেজ থেকে বাণিজ্যে স্নাতক। বর্তমানে থাকেন হুগলির চুঁচুড়ায়। পেশায় কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী ছিলেন।অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল-এর অধীন ডিভিশনাল অ্যাকাউন্টস অফিসার পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর প্রথম গল্প " চেতনা " ছোটদের পত্রিকা শুকতারায় ১৯৯৬ - এর এপ্রিলে প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ, শিলাদিত্য, কালি ও কলম,মাতৃশক্তি, তথ্যকেন্দ্র, কলেজস্ট্রিট, কথাসাহিত্য, দৈনিক স্টেটসম্যান, যুগশঙ্খ, একদিন,,সুখবর ইত্যাদি এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত তাঁর সাহিত্যকীর্তি অব্যাহত। ইতিমধ্যে পাঁচটি গল্প সংকলন ও চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক "শতানীক " পত্রিকাটি দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করে আসছেন।
