একদিন নারদমুনি ডুমুরিয়া নামক এক
গ্রাম দিয়ে যাচ্ছিলেন । যেতে যেতে এক সময় দেখলেন যে দূরে একটা গাছের নীচে বসে কেউ
ভগবানের নামগান করছে । সেই আওয়াজ শুনতে
পেয়ে সেই দিকে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন একজন মুচি বসে জুতো সেলাই করছে এবং নিজের মনে
ভগবানের নামগান করছে।
নারদমুনি জিজ্ঞেস করলেন,কিরে তুই ভগবানের নাম নিচ্ছিস! মুচি নারদ মুনিকে দেখে
দাড়িয়ে নমস্কার জানাল ও বলল,মুনিবর আপনি এখানে! মুনিবর বললেন হ্যাঁ,এই দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম তোমার গান শুনে চলে এলাম।
মুচি বলল- মুনিবর আপনি
বসুন।
নারদ মুনি দেখলেন চারদিকে ধুলা,নোংরা কয়েকটা ছেঁড়া জুতো পড়ে রয়েছে,মুচির পোশাক ও অপরিষ্কার।
তখন মুচি নারদ মুনিকে বলল - আমি শুনেছি আপনি নাকি গোলকে যখন
তখন যেতে আস্তে পারেন,আপনার ওখানে যাওয়া আসায় কোন নিষেধ নেই।
মুনিবর বললেন - হ্যাঁ ঠিক শুনেছো।
তখন মুচি বলল, এবার যখন আপনি প্রভুর ওখানে যাবেন, তখন প্রভুকে জিজ্ঞেস করবেন, প্রভু আমকে কবে দেখা দেবেন ।
নারদমুনি ব্যঙ্গাত্মক ভাবে বললেন, প্রভু তোমাকে দেখা দেবেন?
মুচি বলল হ্যাঁ ।
নারদ মুনি বললেন- ঠিক আছে প্রভুর
ওখানে গেলে জিজ্ঞেস করব প্রভু কবে তোমাকে দেখা দেবেন ।
মুচি মুনিবরকে নমস্কার জানাল,নারদ মুনি মনে মনে হাসলেন, এই অধমকে দেখা দেবেন,প্রভুর আর যেন কোন কাজ নেই! এই কথা ভাবতে ভাবতে হাঁটতে
লাগলেন এবং ভাবলেন সাত জন্মের আগে দেখা দেবেন বলে তো মনে হয় না।
তারপর একটু এগিয়ে যেতেই ওই গ্রামের
একজন প্রচণ্ড জ্ঞানী, বিদ্বান ব্রাহ্মণকে দেখতে পেলেন। ওই ব্রাক্ষ্মণকে গ্রামের
সবাই সম্মান করে। ওই ব্রাক্ষ্মণের
সঙ্গে নারদ মুনির দেখা হলে মুনিবর কে দেখে ব্রাহ্মণ নমস্কার করেন এবং জিজ্ঞেস করলেন - এবার যখন আপনি গোলকে যাবেন
প্রভুকে জিজ্ঞেস করবেন তিনি আমাকে কবে দেখা দেবেন ।
মুনি বললেন, ঠিক আছে জিজ্ঞেস করব এবং পুনরায় হাঁটতে লাগলেন আর মনে মনে
ভাবলেন, এই ব্রাহ্মণ তো
এতো বড় পণ্ডিত, একে
নিশ্চয় এই জন্মেই দেখা দেবেন ।
কয়েক মাস পর নারদমুনি গোলকে গেলেন, দেখলেন ভগবান শ্রী কৃষ্ণ দোলনায় দুলছেন । নারদকে দেখে এগিয়ে
এসে ভবনের ভেতরে নিয়ে গেলেন এবং অতিথি সৎকার করলেন, অনেক গল্প হল, নারদ মুনি বিদায় চাইলেন কিন্তু ভবন থেকে বের হবার সময় মনে
পড়ল মুচি ও ব্রাহ্মণের কথা । তাই ফিরে গিয়ে ভগবান শ্রী কৃষ্ণকে জিজ্ঞেস করলেন , প্রভু ওই যে ডুমুরিয়া গ্রামে এক ব্রাহ্মণ ও মুচি আপনাকে
জিজ্ঞেস করতে বলেছিল, আপনি তাদের কবে দেখা দেবেন । ভগবান বললেন, তুমি তাদের বলবে আমি যখন এবার গোলকে গেলাম দেখলাম প্রভু
দোলনায় দুলছেন এবং ওনার সামনে একটা সূচের ছিদ্রের ভেতর দিয়ে একটা হাতি যাওয়া আসা
করছে । নারদমুনি বললেন, ঠিক আছে প্রভু, আমি বুঝে গেলাম আপনি কি বলতে চাইছেন,বলে প্রভুকে নমস্কার
জানিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এলেন।
সেই পথ দিয়েই ফিরলেন যে পথ দিয়ে
গোলকে গিয়েছিলেন, পথে প্রথমেই ব্রাহ্মণের সাথে দেখা হল, নমস্কার জানিয়ে ব্রাহ্মণ নারদমুনিকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি গোলকে গিয়েছিলেন ?
মুনি বললেন- হ্যাঁ !
-ভগবান আমাকে কবে দেখা দেবেন ?
তখন নারদমুনি বললেন, জানতো এবার আমি যখন গোলকে গেলাম, দেখলাম ভগবান শ্রী কৃষ্ণ একটা দোলনায় বসে দুলছেন এবং ওনার
সামনে একটা সূচের ছিদ্রের ভেতর দিয়ে একটা হাতি যাওয়া আসা করছে ।
ব্রাহ্মণ বললেন, এটা কি করে সম্ভব, এরকম কোন দিনও হতে পারে না এবং সে চলে গেল। নারদমুনি এগিয়ে
যেতে লাগলেন এবং কিছু দূর যেতেই ভগবানের নামগান শুনতে পেয়ে এগিয়ে গেলেন, দেখলেন সেই মুচি গাছের নীচে বসে জুতো সেলাই করছে । মুচি
মুনিবর কে দেখে ওঠে দাড়িয়ে মুনিকে নমস্কার
জানিয়ে জিজ্ঞেস করল,মুনিবর আপনি কি গোলকে গিয়েছিলেন?
নারদমুনি ওকেও বললেন হ্যাঁ ! মুনিবর ভগবান কবে আমাকে দেখা
দেবেন ? নারদ মুনি বললেন জানো
এবার যখন আমি গোলকে গেলাম, একটা আশ্চর্য জিনিস দেখলাম । মুচি বলল কি দেখলেন ? মুনি বললেন,দেখছি ভগবান শ্রী কৃষ্ণ দোলনায় দুলছেন এবং ওনার সামনে একটা
সূচের ছিদ্রের ভেতর দিয়ে একটা হাতি যাওয়া আসা করছিল ।
মুচি বলল - সবই সম্ভব ।
নারদ মুনি বললেন, সূচের ছিদ্রের ভেতর দিয়ে একটা হাতি যাওয়া আসা করছে এটা তুমি বিশ্বাস করছ ?
মুচি বলল হ্যাঁ, কেন করব না, প্রভু চাইলে করতেই পারে । নারদমুনির বেশ লাগল মুচির কথা
শুনে । তখন উনি ওখানে বসলেন ।
মুচি বলল, আপনাকে একটা জিনিস
দেখাই, মুচি যে গাছটার
নিচে বসে জুতো সেলাই করত, সেটা ছিল এক প্রকাণ্ড বট গাছ । গাছের তলায় অনেক ফল পড়ে ছিল, সেখান থেকে একটা ফল তুলে নিয়ে সে মুনিকে বললেন দেখুন এই
ফলটা, তারপর ফলটা কে
ফাটাল, তার ভেতরে শুকনো
শুকনো বীজ ছিল । মুচি বলল দেখুন এই একটা বীজ দিয়ে যদি এই এত বড় একটা বট গাছ হতে
পারে তাহলে সূচের ছিদ্রের ভেতর দিয়ে হাতি কেন যাওয়া আসা করতে পারবে না । নারদ মুনি বুঝতে পারলেন মুচি ভগবানের প্রকৃত
ভক্ত এবং সে এই জন্মেই ভগবানের দেখা পাবে ।।
_________________
লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখিকার
পরিচিতি ঃ-
জন্ম
বিহারের কিশানগঞ্জ । প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর কিষানগঞ্জেই । আঞ্চলিক বার্ষিক
পত্রিকা, ই-ম্যাগাজিন তাৎক্ষনিক.কমে অণুগল্প, ছোট গল্প, প্রবন্ধ লেখালেখি করেন । ওনার প্রথম গ্রন্থ ‘নবরত্ন’(গল্পগুচ্ছ)
। বই পড়া, ভ্রমণ ও আধ্যাত্মিকতায় রুচিশীল এবং কুসংস্কার
বিরোধী।
.jpg)