Advt

Advt

uturn-story-galpo-by-dr.shibshankar-pal-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-ইউ-টার্ন-গল্প-ড.শিবশঙ্কর-পাল

uturn-story-galpo-by-dr.shibshankar-pal-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-ইউ-টার্ন-গল্প-ড.শিবশঙ্কর-পাল

না না, কঙ্কন আর ওদিকে ফিরেও চাইবে না ভুলেও ভাববে না পুরনো কথা এবার থেকে নিজের কাজে ডুবে যাবে সে জীবনে যে মারাত্মক ভুলটা সে করে ফেলেছে, সেখান থেকে তাকে বেরিয়ে আসতেই হবে বেরিয়ে আসাটাই বা কী এমন কঠিন কাজ? ফোন নম্বরটা আপাতত চেঞ্জ করলে তার সঙ্গে যোগাযোগের কোন সম্ভবনা আর থাকবে না এসব মনস্থির করে কঙ্কন যেন মনে মনে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল শ্রেয়া হয়তো কিছুদিন ফোন করবে, কিছুদিন বিকেলবেলা পথ চেয়ে বসে থাকবে, তারপর  সেও ভুলে যাবে যে কয়েকটা চিঠি বা উপহার একে অপরকে দিয়েছিল সেগুলো কঙ্কন পুড়িয়ে ফেলল হাতের যে লাল ধাগাটা শ্রেয়া  নিজে হাতে কঙ্কনের কবজিতে বেঁধে দিয়েছিল সেটাকে একটানে দিলে ছিঁড়ে ভাবলে ধূর, এসব স্মৃতি থাকলেই তাকে মনে পড়বে তার যে পাসপোর্ট ছবিটা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বইয়ের ভিতরে লুকিয়ে রেখেছিল, সেটাকে কুচিকুচি করে চৌচির করল কঙ্কন যাবতীয় স্মৃতিউদ্ধারক বস্তুগুলিকে চোখের সামনে থেকে উধাও করে, কঙ্কন যেন নিজেকে মুক্ত করল অনেকটা হালকা লাগছে এখন তার কী কুক্ষণে এই দলেদলে সে পরেছিল! কঙ্কন চমকে ওঠে-সম্পর্কের বুকচাপ অসহ্য সবসময় একটা পিছুটান তাড়া করে দিনে ঘড়িঘণ্টা ধরে ফোন করতে হয় প্রতিদিন বিকেলে ওদের বাড়ির রাস্তা দিয়ে বেড়াতে যাওয়া, সপ্তাহে যে দুদিন ও টিউশনি পড়তে যায়, সে দুদিন ওর সঙ্গে রামপুরহাট যাওয়া, ফেরার সময় একই বাসে পাশাপাশি বসে থাকাএসব কাজ থেকে এখন নিষ্কৃতি চায় কঙ্কন কেন যে সে বন্ধুর খাতির রাখতে গিয়ে শ্রেয়াকে ফোন করতে গিয়েছিল! কেন যে রাত জেগে কথা বলতে গিয়ে বন্ধুর ভাললাগার বিষয়টা গোপন করে নিজেকে মেলে ধরেছিল! সেটার হিসাব কঙ্কন মেলাতে পারেনাএটাই হয়তো ভালবাসা কিন্তু এটাকে মনে মনে বয়ে চলাও থেকে থেকে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে নিজের খেয়াল খুশি মতো স্ব-স্বাধীনতার অনেকটা খর্ব হয় এ-কাজে থেকে থেকে বোঝার নামান্তর হয়ে যায় সম্পর্কের নানারকম চাপান-উতোর কেননা এখন সে না পারে বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণখুলে ঘোরাফেরা করতে না পারে ফোনটা বন্ধ করতে, মিথ্যে বলতে না পারে ওর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক ত্যাগ করতেএকদিকে কিছুটা পিছুটান অন্যদিকে কিছুটা মানসিক চাপ কঙ্কনকে দ্বিধাবিভক্ত করে সরাসরি ব্রেক-আপের কথা বললে মেয়েটা হয়তো একেবারে ভেঙে পড়বে হাউমাউ করে চোখের সামনে না কাঁদলেও রাতের বিছানায় সে বালিশ ভেজাবেই এটুকু বিশ্বাস এতদিনে কঙ্কনের জন্মেছিল আবার এই সম্পর্কের ভবিষ্যত কী? খামখেয়ালী ভাললাগাটা সত্যিই কি ভালবাসা? যদি তাই হয় তবে কেন সে চাপ অনুভব করে? —এরকম আত্মপ্রশ্নে জেরবার হয়ে ওঠে ছেলেটা সহজ উত্তর খুঁজে পায়না কঙ্কন তৈরী করতে পারে না সহজ সমীকরণ কখনও শ্রেয়ার অবর্ণনীয় স্পর্শটা বোধ করে আবার কখনও স্বেচ্ছাচারী জীবন হারানোর ভয়টা আতঙ্কের সৃষ্টি করে দুমুখী দোদুল্যমান অবস্থায় শ্রেয়াকে ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা শেষ অবধি নিয়ে ফেলে কঙ্কন

শ্রেয়ার সঙ্গে কঙ্কনের আজ তিনমাস কথা বন্ধ দেখাও ফোনটা প্রয়োজনে সুইচ অন করে আবার অফ করে কঙ্কন সুতরাং কথা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা আর থাকেনা সে রীতিমতো আড্ডা মারে বিকেলে ঘুরপথে মাঠে ক্রিকেট খেলতে যায় এভাবে বেশ চলছিল কঙ্কনের হঠাৎ একদিন রাস্তায় শ্রেয়াকে দেখতে পেয়ে কেন জানিনা কঙ্কন তার পিছু নিল শ্রেয়ার আসমানী রঙের ওড়নাটা কঙ্কনকে বারবার ডাকতে থাকল ওর ব্যবহৃত ডিওর গন্ধটা কঙ্কনকে উদভ্রান্ত করে তুলছে নিজের অজান্তে পা চলতে শুরু করল কঙ্কনের চুলের পিছন-গাডারের ঘন মেরুণ আভা যেন মোহের জাল রচনা করে আগে আগে এগিয়ে চলেছে প্রায় আগুপিছু, রাস্তার দুধারে কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না কঙ্কন শুধু এগিয়ে যাচ্ছে সামনে সামনে এগিয়ে চলেছে মেয়েটা অদৃশ্য সুতোর টানে কে যেন কঙ্কনকে টেনে নিয়ে চলল আগুপিছু ভাবার কোন অবকাশ তার নেই নেই কোনও চেতন-অবচেতনের বোধসামনে শ্রেয়া বাকি সব অদৃশ্য পরিচিত গ্রামের লোকেরা গা ঘেঁষে চলে যাচ্ছে বুঝতে পারছে না ছেলেটারাস্তার পাশে কালি মন্দিরের পাশ দিয়ে যেতে যেতে প্রণাম করতে গেল ভুলে ছেলেটা গোটা চরাচরের একক রূপ নিয়ে সামনে চলে যাচ্ছে শ্রেয়া এগিয়ে যাচ্ছে ও পিছনে পিছনে নির্লজ্জ-নির্ভয় কঙ্কন তবুও বেহায়ার মতো, আর্ত প্রার্থীর মতো নিঃশব্দে এগিয়ে চলল গ্রামের ছেলেটা শুধু এগিয়ে গিয়ে শ্রেয়ার সমান্তরাল হতে চাইছে আর থাকতে পারছে না এখনি এখনি ওকে পেতে চায় পিছনের কথাও এখন সম্পূর্ণ উধাও মাথা থেকে বুকের ভিতরে শুধু ঝড় উঠছে সশব্দে তারই প্রতিফলন ছেলেটার মুখে, চোখে, আসমানী রঙের পিছু পিছু বাসস্ট্যান্ডের অনেকটা কাছে এসে কঙ্কন এবার ডাকল— ‘শ্রেয়া...’

সে পিছনে তাকাল না থামলও না

কঙ্কন ডাকল—  শ্রেয়া....’

সে আপন ছন্দে এগোতে থাকল কোনরকম চঞ্চলতা শ্রেয়ার পাকে থামাল না

কঙ্কন আবার ডাকল— ‘শ্রেয়া...’

তিনডাকের তুকতাক নিশ্চয় আছে সে ডাক যেন দড়ি বাঁধার মতো আর এগোতে দিল না শ্রেয়াকে তবুও সে পিছনে মুখ ফেরাল না শুধু একটু থামল সমান্তরাল স্থানে এসে কঙ্কন বলল— ‘কোথায় যাচ্ছ?’

শ্রেয়া নির্বাক স্থির কঙ্কন বলেই চলল—ফোনটা কাজ করছে না

শ্রেয়া জানে কথায় কথায় ফোন বন্ধ করে দেওয়া, কথায় কথায় দীর্ঘদিন কথা বন্ধ করা কঙ্কনের সহজ-স্বভাব সে আগুপিছু ভাবেনা যখন যা মনে হয় তখন তাই করে শ্রেয়ার মনে যে এর ঝড় লাগতে পারে সেটা কঙ্কনকে কে বোঝাবে? শ্রেয়ার নিরব ব্যথাগুলো কেন সে বোঝার চেষ্টা করে না? শব্দ ব্যায় করে কেন মনের অবস্থা বোঝাতে হবে? ভালবাসা যে নিরব, নিঃশব্দ সেটা কঙ্কন কবে বুঝবে? শ্রেয়ার নিরবতার মধ্যে এই চুপকথা মিশে ছিল তার চোখেমুখে ফুটে উঠছিল না বলা অনেক কথার তথ্যচিত্র এরকম কঙ্কন বহুবার করেছে হয়তো আগামীতেও করবে এসব ভাবতে ভাবতে শ্রেয়া অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে— ‘যদি ভাঙবে, তবে গড়লে কেন?’

কঙ্কন এর উত্তর খুঁজে পায় না

শ্রেয়া বলে—যদি গড়বে, তবে পিছাও কেন?’

কঙ্কন তবুও চুপ

মেয়েরা বলে—যদি পিছাবে তবে পিছনে এলে কেনো?’

কথাগুলোর মর্ম যে ভালবাসার দীর্ঘ ও দৃঢ় বন্ধনের নিমিত্ত সেটা বুঝতে কঙ্কনের বাকি থাকেনা কিন্তু এভাবে ফোন বন্ধ করা, শ্রেয়ার বাড়ির রাস্তা দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করা, এসব করে যে মনের যোগাযোগ বন্ধ করা যায় না, সেটা কঙ্কনকে কে বোঝাবে? ভাললাগাটা শুধু রাতের ফোনালাপে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না শুধু দেখা করার রুটিনে ঝুলে থাকেনা তার থেকেও বেশী থাকে মনের ভিতরে সারাদিনের কাজকর্মের পদে পদে মিশে থাকে তার অনুরণন তার রেশ ঘরে বাইরে, রাতেদিনে, স্বপ্নে-জাগরণে অঙ্গাঙ্গী হয়ে থাকে সেই বোধ অনুভবের গণ্ডী অদৃশ্য অলক্ষ্য ডোরে দুজনকে বাঁধতে পারে মনে মনে এসব কথা মুখস্ত করার মতো আওরাতে থাকে শ্রেয়া কিন্তু মুখ ফুটে কিছুই বলেনা সে জানে, এসব অনুভূতি মুখে বললে অনুভূতিটাই জোলো হয়ে যায় কঙ্কন শ্রেয়ার নিরবতাকে কিছুটা আঁচ করে ভাবে শ্রেয়ার অভিমানকে আর বাড়তে দিলে হবে না আবহাওয়া যখন এরকম ভারাক্রান্ত তখন কঙ্কন বলে ফ্যালে— ‘দিনের শেষে পাখি ঠিক তোমার বাসায় ফিরে আসবে শ্রেয়ো-কথার অর্থ শ্রেয়া বুঝতে পারে জীবনানন্দেরবনলতা সেনসেও পড়েছে কিন্তু জীবনানন্দ তাঁর নাটোররাণীর সঙ্গে যে অন্ধকারের আয়োজন করেছিলে, শ্রেয়ার সে অন্ধকার কী কঙ্কন মোছাতে পারবে? কথায় কথায় যে কঙ্কন দূরে যেতে চায়, তাকে কেনই বা শ্রেয়া সময় দিচ্ছে! কেনই বা গ্রাম্য লোকের সন্দেহবাগি চোখগুলোকে শ্রেয়া মূল্য দিচ্ছে না! কেনই বা বাসস্ট্যান্ড চত্বরে শ্রেয়া বাসের অপেক্ষায় অধীর হয়ে উঠছে না! খামখেয়ালী কঙ্কনের কথাগুলোকে মনে মনে গিলছে কেন সে! দিনের শেষ পাখি ঠিক বাসায় ফিরে আসবে, কথাকে বিশ্বাস করছে কেন শ্রেয়া? কঙ্কন কেন বলছে— ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিরিটির তীরেএসব নরম শব্দ মানুষকে আপ্লুত করে তোলে এজন্যই হয়তো কবিতার শক্তি মাপা যায়না শুধু হদৃয়ের তারে দোলা দিয়ে মানুষকে মাতোয়ারা করে তোলে একলহমায় শ্রেয়াকে আঁকড়ে ধরে কঙ্কনের সুরমেশা ধীর উচ্চারণের বাক্যগুলো হয়তো একেই ভালবাসা বলে! গভীর অভিমানও একটুকরো কথার মূল্যে চূরচূর হয়ে যায় গোপন বুকে হিল্লোল জেগে ওঠে জমাট মনকে মুহূর্ত স্বাভাবিক করে দেয় ছেলেটিএবারে খোলসা হয়ে মুখ খোলে শ্রেয়া

 বিকেলেও তো আমাদের রাস্তায় আসতে পারো দিনের শেষে একটাও তো ফোন করতে পারো?’

নিজেকে বাঁচাতে কঙ্কন বলে — ‘বিকেলে তোমার সঙ্গে সবাই থাকে

শ্রেয়া বলে —‘সবার মাঝে থেকে খুঁজে নিতে হয়

কঙ্কন বলে  নিজের নিশ্বাসকে খুঁজতে হয়না, ওটা সর্বত্র বিরাজ করে

শ্রেয়া উত্তর দেয়— ‘তবুও নিশ্বাসকে কাছে টানার কষ্টটুকু করতে হয়-কথার উত্তর খুঁজতে থতমত খায় ছেলেটা বড় দুঃসাহসী হতে হয় এই কষ্ট করতে গেলে বিপথগামী হয়ে শুধু নিজের ভালবাসাকে তাহলে গুরুত্ব দিতে হয় ব্যক্তিসত্বার চাওয়া পাওয়া, পারিবারিক চাহিদা, সামাজিক স্বীকৃতিকে জলাঞ্জলি দিতে হয় তবুও কঙ্কন বলে—

লজ্জায় তোমার মুখের দিকেও তাকাতে পারি না শ্রে...

শ্রেয়া জানে কঙ্কন এখনও শ্রেয়া অন্ত প্রাণ হয়ে উঠতে পারেনি তবুও বলে—অনুভবটা কী তাকানোর উপর নির্ভর করে? হৃৎপিণ্ডের সঞ্চালন কী শুধু চোখের উপর নির্ভরশীল?’

ছেলেটা বলে—তোমাকে দেখলেই নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারিনা

শ্রেয়া বলে—অস্বাভাবিক না হলে কোন কিছুই পাওয়া মুশকিল কঙ্কন

কঙ্কন বলে—যা আমার তাকে পেতে গেলে অস্বাভাবিক কেন হতে হবে? সহজ হয়ে চাইলেই সব পাওয়া যায় শ্রে...

শ্রেয়া  — ‘সহজ হওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ কঙ্কনএসব ভারী প্রশ্নের উত্তর কঙ্কন দিতে পারেনা প্রতিদিন রুটিন করে আসাযাওয়া করা তার কাছে বিরক্তিকর সেটা সে বলতে পারেনা কঙ্কনের ভালো লাগে যখন খুশি তখন যাবে যখন মনে হবে না তখন হারিয়ে যাবে যখন অনেক সময় পেরিয়ে যাবে তখন হঠাৎ করে আবার ফিরে আসবে, নিজের দাবি চেয়ে বসবে কিন্তু মনের এসব কথা গোপন করে কঙ্কন বলে ওঠে—যদি না তাকালেও তুমি আমাকে অনুভব কর, তাহলে ও-রাস্তায় না গেলেও নিশ্চয় তোমার হৃৎইঞ্জিন কঙ্কনের সুরে বাজতে থাকেকঙ্কন জানে শ্রেয়ার এরকম অনুভূতির কথা সে জানে হাজার বছর পরও শ্রেয়ার ভালবাসা ওরমই অটুট থাকবে, তাই সে মাঝে মাঝ দূরে যেতে সাহস পায় ওদিকে কঙ্কনের কথার আর্দ্রতা শ্রেয়াকে বারেবারে ভিজিয়ে দেয়  খেই হারিয়ে ফেলে কঙ্কনকে প্রশ্রয় দেয় শ্রেয়া আবার কঙ্কনকে একটু জাগাতে গিয়ে বলে—ব্রোঞ্জ নয়, সোনার কঙ্কন চায় আমার

কঙ্কন— ‘সুর তুলতে জানলে যে কোন ধাতুর কঙ্কন থেকে সুর ওঠে

শ্রেয়া— ‘কেও বাজতে না চাইলে তাকে বাজাই কি করে?’

কঙ্কন— ‘এই আজ যেভাবে বাজালে ঠিক সেভাবে তোমার পায়ের তাল, ওড়নার ছন্, চুলের সুরে কঙ্কনও যে বেজ ওঠে শ্রে!’

ওদিকে হৃদয়পুর থেকে লোকাল বাসটি হর্ণ মারতে মারতে এগিয়ে আসছে এখনি এসে পৌঁছাবে বাঁকিপুর বাসস্ট্যান্ডে বাসেরন্যপেক্ষমান যাত্রীরা এই দুজন বেহায়া যুবক-যুবতীর কথাবার্তা গিলে হয়তো বিরক্ত হয়ে উঠছে হয়তো মনে মনে এদের বেহায়াপনার জন্য নিন্দা করছে শ্রেয়া জানে দিনদিন নির্লজ্জ হয়ে উঠছে সেও রাস্তা চলতে গিয়ে যার মুখ তুলে হাঁটার স্বভাব ছিলনা, সে আজ জনসমক্ষে কঙ্কনের কথায় দিশেহারা বাসটি হেলতে দুলতে,প্যাসেঞ্জারের উপচানো ভিড় বুকে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাল শ্রেয়া এই বাসে চেপে রামপুরহাট যাবে গ্রামের লোকগুলোও যাবে স্বভাবসিদ্ধ ধীর গতিতে বাসে উঠল শ্রেয়া বাসটি ধকাতে ধকাতে এগোতে লাগল যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে সংসারের নানা কথাবার্তায় ব্যস্ত থেকে থেকে হর্ণের বিকট আওয়াজ কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে একে ওপরের উপর মাঝে মাঝে ঝুঁকে পড়ছে যাত্রীরা বসার একটাও সীট নেই এসবের মাঝে শ্রেয়া যেন আত্মমগ্ন হয়ে আছেকঙ্কন তার বাসায় ফিরে আসবে’— -কথাটা মনে পড়ছে তার মনে পড়ছে বাজাতে জানলে যে কোনও ধাতুর কঙ্কন থেকে বেজে ওঠা সুরের কথা কঙ্কন কেন তাকে দূরে রেখে হঠাৎ আবার কাছে টানতে পারে! এই খামখেয়ালী ছেলেটার ভিতর কী এমন আছে! কী এমন আছে যা শ্রেয়াকে বারবার চঞ্চল করে তোলে! বাইরের জগত প্রকৃতির সবুজ ছবি দেখতে শ্রেয়ার বেশ ভাল লাগছে এখন তাল-বাবলা-্যাওড়া গাছের সারি পরপর পার হয়ে যাচ্ছে, দ্রুত রাস্তার ধারে পুকুরের জল, ফাঁকা মাঠ, দিকচক্রবালের সীমানা সবই দেখতে ভাল লাগছে এখন শ্রেয়ার মনে হচ্ছে পিছন থেকে যেন কেউ ডাকল— ‘শ্রেয়ো ওড়নাতে কেন জানিনা কঙ্কনের হাতটা সে অনুভব করল  চুলগুলো সাপের মতো ফনা তুলে যেন কঙ্কনকে স্পর্শ করছে তার কটিদেশে ছুঁয়ে মনে হয় কোনও যাত্রীর দেহভার ঝুঁকে পড়েছে মুখ ফিরিয়ে যেই চোখ তুলেছে, সেই কঙ্কনের নাকের গরম নিশ্বাস পড়ল শ্রেয়ার ঘাড়ে কানের পাশের চুলগুলো কুঁচকে উঠল শ্রেয়ার শিদাঁড়ার প্রতিটি খাঁজ ঝিনঝিন করে উঠল তার গোটা শরীর যেন ঝুঁকে পড়ল কঙ্কনের গায়ে শুধু একটা ডাক তাকে ওই ভিড়ের মাঝেও চকিত করে তুলল— ‘শ্রেয়ো চলোকঙ্কন কখন যে বাসে উঠেছে সেটা শ্রেয়া টের পায়নি কঙ্কন আবার বলল— ‘আমার শ্রেয়াহাতটা শ্রেয়ার কোমড় আঁকরে ধরল কনুই থেকে হাতের উপরিভাগ শ্রেয়ার বুকবন্ধে ঘেঁসে থাকল একটা পা  চাপিয়ে দিল শ্রেয়ার পায়ে দুটো শরীরের মাঝের শূন্যস্থানকে মিটিয়ে দিল বাসের উপচে পরা ভিড় ইঞ্জিনের ঘন ঘন উষ্ণশ্বাস ত্যাগের সঙ্গে মিশে গেল ওদের শরীরমনের উত্তেজনা

এভাবে কঙ্কন আবার শ্রেয়াতে মত্ত হয়ে উঠল শ্রেয়াও ঘরের গোপন কোন থেকে ফোন করতে থাকল কঙ্কনের হুটহাট আবদারে আসতে থাকল বাড়ির বাইরে কঙ্কন ওকে জানাল— ‘বাইকের হর্ণটা পরপর দুবার বাজলে জেনো ওটা আমার হর্ণ শ্রেয়া জানাল তাদেররাস্তার দিকে দরজার একটা কপাট খোলা থাকলে জেনো সে বাইরে আসতে পারবে নাসকাল দশটায় সে একবার রাস্তা সংলগ্ন দোকান দাঁড়ায়, দুপুর দুটোর সময় ছাদে কাপড় তুলতে আসে, প্রতি শনিবার বিকেলে মাঠকালিতলা বেড়াতে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু কঙ্কন এরকম কোন সময়সূচি অনুযায়ী কর্মজীবনের কোনজ তালিকা শ্রেয়াকে দিতে পারেনা সে শ্রেয়াকে জানায় যখনই সে শ্রেয়ার বাড়ির রাস্তা দিয়ে যাবে পরপর দুবার হর্ণ বাজাবে, ওটাই ওর সিগন্যাল এরকম সংকেত ও সময়সূচি অনুযায়ী দুজনের দেখা হয় কিন্তু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটু কথা বা চোখে চোখে ইশারা ইঙ্গিত কিছুই হয় না ওদের শুধু শ্রেয়া বাইরে থাকলে কঙ্কন পাশ দিয়ে হর্ণ বাজিয়ে চলে যায় শ্রেয়া কোনরকমে একঝলক তাকিয়ে ঘুড়িয়ে নেই মুখ গ্রামের সবাই এদের দুজনকে জানে সবার সামনে কথা বলার লজ্জা এরা কাটিয়ে উঠতে পারেনা শুধু দিনান্তে এক ঝলক চোখের দেখাতে এদের ভালবাসা অদ্ভত সমীকরণে জারিত হতে থাকে অবশ্য ফোনালাপ চলে রীতিমতো অসুবিধা থাকলে মেসেজ করে এরা কাজ চালিয়ে নেইমাঝে মাঝে রামপুরহাট বা অন্য কোনও কাজে শ্রেয়া বাইরে গেলে ওদের দেখা হয় বাসে পাশাপাশি বসে ওরা হাতের আঙলগুলো একে অপরের আঙলের মাঝে ঢুকিয়ে দেয় পেন দিয়ে একে অপরের হাতে নাম লেখেথেকে থেকে শ্রেয়া বলে ওঠে—

 এভাবে আর কতদিন?’

 মানে?’

 বুঝতে পারছ না, নাকি বুঝতে চাইছ না?’

 কী?’

 যেটা বলতে চাইছি

 সময় হলে সব হবে এত তারা কিসের?’

 তাড়া নয়, বাবার বয়স হচ্ছে, আমাকে নিয়ে বাবার চিন্তা হয়

 চিন্তার কী আছে, বাবা-মাকে আমার কথা বলে দিতে পারকঙ্কনের একথা  শ্রেয়ার খুব ভাল লাগে জাতিতে তারা এস.সি. কঙ্কন জেনারেল চিরন্তন এই গ্রাম্য জাতি বৈষ্যমটা তাদের সম্পর্কে বাধা হতে পারে, এচিন্তা শ্রেয়ার ছিল কঙ্কনের কথা আজ সে একটু আশ্বস্ত হল কিন্তু বিয়ের জন্য কঙ্কন এখনই প্রস্তুত নয় মনে মনে কথাটাকে গোপন করে কথা বাড়াল কঙ্কন—

 আমাকে নিয়ে কী ভাব তুমি? কী চাও?’

 শ্রেয়া বলে—‘যেন বুড়ো বয়সে তোমার ঘাড়ে মাথাটা এলাতে পারি

 আর

 আমার বর এই শব্দের অধিকার

 সে অধিকার কী এখনও পাওনি?’

 আমি চায় তোমার বাড়ি থেকে সামাজিক অনুষ্ঠান করে আমাকে সে অধিকার দেওয়া হোক’—  কথাটা কঙ্কনকে আবার ধাক্কা দিল শ্রেয়াকে তার নিজের করে নিতে কঙ্কনের কোন আপত্তি নেই বরং শ্রেয়াকে না পেলে ভবিষ্যতে তার কি হতে পারে তার বহু উদাহরণ সে পেয়েছে হাজার চেষ্টা করেও শ্রেয়াকে সে ভুলতে পারেনি হাজার কিমি দূরে গেলেও শ্রেয়ার অনুভব তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধ রাখবে হাজার মেয়ের ভিড়ে শ্রেয়া ছাড়া কাউকে তার ভাল লাগবে না শ্রেয়ার শান্ত নিরব চাওনি, অতিমৃদু চলন, মায়াবী আকষর্ণ অন্য কারোর মধ্যে সে খুঁজে পাবেনা শ্রেয়াকে না পেলে একটা নিশ্বাস নেওয়াও কঠিন হবে কঙ্কনের কিন্তু বাড়ি থেকে শ্রেয়াকে মনে হয় মেনে নেবে না অনন্ত তার বাবা কখনই মানবে না একরোখা, বংশবাদী মানুষ কঙ্কনের বাবা কিছুতেই সে মহারাজ মাথা নোয়াবে না তার উপর গ্রামের মেয়ে, -সম্পর্ক কঙ্কনের বাড়ির তরফে একেবারে অসম্ভব বিষয়টা কঙ্কন আঁচ করে, তবুও শ্রেয়াকে হারানোর ভয়ে তাকে বলতে পারেনি কোনদিন যখনই ভেবেছে বিয়েটা যদি না হয়, তখনই তার ভিতর হাহাকার করে উঠেছে গোটা শরীর অবশ হয়ে গেছে ঝিনঝিন করেছে প্রতিটি শিরা কি হবে আর কি হবে না, এর হিসাব যখন করতে পারেনি, তখন শ্রেয়াকে ভোলার চেষ্টা করেছে সে ভালবাসা মানে বোঝা, ভালবাসা মানে চাপ, ভালবাসা মানে কঠিন দায়িত্ব, সর্বক্ষণের বুকব্যাথাএসব ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছে কঙ্কন শ্রেয়ার থেকে দূরে সরে এসেছে আজকে শ্রেয়ার মুখে বিয়ের প্রসঙ্গ শুনে আবার দ্বিধায় পড়ল ছেলেটি তবুও শ্রেয়ার হাসি মুখের লোভে বলল— ‘এই তো দুশো মিটার দূরে থাক হুস করে বরবেশে তোমাদের বাড়ি চলে যাব একদিন

তা কেন? আমার বাবা-মায়ের ইচ্ছা তাদের জামাই আসবে ঘটা করে আতসবাজি হবে আমাদের রাস্তার বাঁকটায় বিকেলে যেখানে দাঁড়িয়ে থাকি ওখানে করা হবে বরাসন

কঙ্কন বলে— ‘বাপরে! মনে মনে এতকিছু ভেবে রেখেছ?’

 এতে ভাবার কি আছে মেয়েরা ছোট থেকেই তার বিয়ের স্বপ্ন দেখে

আচ্ছা বিয়েটা যদি পালিয়ে গিয়ে করি? তোমার আপত্তি আছে?’

শ্রেয়া ভাবতে থাকে এরকম কেন বলছে কঙ্কন? সবার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে কঙ্কন শ্রেয়াকে গ্রহণ করবে ওটার নামই তো বিয়ে বাবা-মাকে না জানিয়ে, পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করাটা যে কাপুরুষের কাজ সকলের আশীর্বাদ না থাকলে শাখা-নোয়ার আয়ু যে বাড়েনা এসব ভাবতে ভাবতেই শ্রেয়া জানায়— ‘তোমার কাছে এই দেখা করতে আসাটা কি খেলা? খেলার সময় আমার আর নেই কঙ্কন?’ কঙ্কন জানে শ্রেয়াকে সে ভুলতে পারবে না বাবার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস পাবেনা এরকম মাঝামাঝি অবস্থায় সে  না পারে শ্রেয়াকে পরিষ্কার করে করে কিছু বলতে, না পারে মন থেকে ওকে মুছে ফেলতে কি অসম্ভব দ্বন্দ্ব কঙ্কনের ভিতরে খেলে যায়, তা সে শ্রেয়াকে বোঝাবে কি করে? বোঝাবে কি করে তার দুদিকের এই টানাপোড়নকে বাবামাকে অসন্তুষ্ট করে সেও এগোতে পারবে না, আবার শ্রেয়াকেও হারাবে না দুদিকটা সামলাবে কি করে বুঝে উঠতে পারে না ছেলেটা অগত্যা মাথা নিচু করে শ্রেয়া বলে— ‘কিছু বললে না যে?’

 যখন সময় হবে তখন দেখা যাবে

আর ধর সময়টা এখনই চলে এসেছে তাহলে কি বলবে?’

চল আজই বিয়ে করে ফেলি’—এই বলে হেসে ওঠে কঙ্কন কথাটা সেই মুহূর্তে সে অন্তর থেকেই বলে এভাবে হুট করে না করলে দুদিক সামলে কোন দিনই সে শ্রেয়াকে পাবেনা আবার শ্রেয়াকে না পেলে এক চিরন্তন বিচ্ছেদ যন্ত্রণা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে শ্রেয়া যে বলেছিলঅনুভবের কথা’, সেই অনুভব সারাজীবন তার পিছু ছাড়বে না কথার রেশ শেষ না হওয়ার আগেই বাস রামপুরহাট এসে পৌঁছায় বাস থেকে নামে ওরা শ্রেয়ার ভিতরের অনিশ্চয়তাটা জেগেই থাকে৷কঙ্কনের দ্বিধাটা কিছুটা মৌন হয় দুজনে পা বাড়ায় সামনের দিকেদুফালি রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছায় তারা

সেদিনের পর থেকে শ্রেয়ার মনে মনে ভয় হয় কোন কাজ করতে গেলে ভাল লাগে না নোটসের খাতাটা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে একডাকে সারা পাওয়া যায়না চুলে শ্যাম্পু করতে ইচ্ছে করেনা হাতের নখে ময়লা জমেই থাকে কঙ্কনের ফোনটাও লাগে না মাঝে মাঝে দায়সারা গোছের একটা মেসেজ দিয়ে চুপ করে যায় যে স্বপ্ননীড় সে মনে মনে গড়ে রেখেছে, তার সবই যেন মিথ্যে মনে হয় এভাবে থেকে থেকে যখন সে আর থাকতে পারে না, তখন ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে চোখের জল বেহায়া হয়ে গড়ায় বুকের ভিতরটা ফাঁপা হয়ে যায় নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয় শ্রেয়া চোখদুটো ফুলে ওঠে কঙ্কনকে পাওয়ার অনিশ্চয়তা তাকে অস্থির করে তোলে কঙ্কন এখনও তার কাছেই আছে, কিন্তু সে যদি সামাজিক মর্যদা দিয়ে শ্রেয়াকে গ্রহণ করতে না পারে? যদি কঙ্কন তার বাবার কথা শুনে থমকে দাঁড়ায়? তখন শ্রেয়া কী করবে? কোন পথে পা বাড়াবে? জীবনে মন দেওয়া যে এতো কষ্টকর সেটা সে অঙ্গে অঙ্গে আঁচ করে শিরশিরে শীতে গোটা শরীর শিউরে ওঠে কী মারাত্মক এই হারানোর ভয়! কী বিভৎস মনের চাওয়া পাওয়ার দাবি! কয়েকদিন ধরেই শ্রেয়াকে কিছুটা অপ্রকৃতস্থ মনে হয় তার মায়ের যে মেয়ে আগে টকের বাটিটা নিয়ে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে থাকত, ড্রেসিংটেবিলের সামনে নানারকম ফাঁসে চুল বাঁধত, নিজের ইচ্ছাই রান্না করতে লাগত, কলতলার রাশিকৃত জামাকাপড় গান করতে করতে কেচে ফেলত— সেই শ্রেয়া আজ কেমন যেন গুটিয়ে গিয়েছে কেমন যেন হারানোর বেদনা তার গোটা কপালের মাছিতিলগুলোর গায়ে গায়ে ফুটে উঠেছে কিছুটা অনুমান করে মা জিজ্ঞেস করে—কিছু কি হয়েছে শ্রেয়ো? তুই কেন চুপচাপ হয়ে থাকিস বল তো?’

কি হবে? কিছুই তো হয়নি মা

  কিন্তু মায়ের মনচোখকে কে ফাঁকি দেবে? মা ঠিক বুঝতে পারে মেয়ের কিছু একটা হয়েছে

 কি হয়েছে বল, আমাকেও বলবি না?’

মায়ের হাতের ছোঁয়া পেয়ে মেয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না আঁচলের তলে মুখ ডুকিয়ে কেঁদে ফেলে শ্রেয়া

এই দ্যাখো! শুধু শুধু কাঁদে! ওরে হয়েছেটা কি? সেটা তো বলবি?’

শ্রেয়ার বাক সরে না সে আরও ডুকরে ওঠে চিপে ধরে মাকে রাস্তায় চলে যাওয়া মোটর বাইকের দুটো হর্ণ তাকে আরও শীতল করে চলে যায় আবার বেজে ওঠে ওই হর্ণ রাস্তার দিকে দরজার দুটো কপাটই বন্ধ উপরে গিয়ে শাড়ী তোলারও সময় হয়ে এসেছে বাইকের হর্ণটা আবার দুবার বেজে উঠল শ্রেয়া যেন তলিয়ে যাচ্ছে ওর মায়ের কোলে দুচোখের জলকে সে সামলাতে পারছে না হাতদুটো থরথর করে কাঁপছে খটমট দাঁতে সে বলে ওঠে—‘কঙ -কন নামটির বর্ণবিশ্লেষণ শুনে মা প্রথমটা বুঝতেই পারেনা বলে— ‘কঙ্কন নিয়ে কি করবি? তোর বিয়েতে এটাই দেবোশ্রেয়া হাঁকরে ওঠে— ‘কঙ্কন

দেবো বললাম তোএতে কান্নার কি আছে?’ -কথায় কান না দিয়ে একদৌড়ে রাস্তার কাছে ছুটে গেল শ্রেয়া দেখল গোট রাস্তা ফাঁকা ধুলোগুলো শুধু মাটিছাড়া হয়ে উপরে ভাসছে পোড়া পেট্রোলের গন্ধটা তখনও শ্রেয়াকে হয়তো বলে গেল— ‘আমি চলে গেলামমাও পিছু নিল— ‘এ কি পাগলামো করছিস? কি হলো তোর?’ আর কোন কথা বলতে পারল না শ্রেয়া কঙ্কনকে হারানোর ভয় তার কাছে আশু সত্য বলে স্থির হয়ে রইল থাকতে না পেরে মা বলেই ফেললেন— ‘ও পাড়ার কঙ্কন? কিন্তু কেন এরম করলি মা? ওরা যে বড়বাড়ির ছেলে!’ যে ভয়টা শ্রেয়া করছিল সেটাই যেন তার মা বলে ফেলল বাড়ির ছেলে বলেই কঙ্কন হয়তো শ্রেয়াকে কোনদিন নিজের করে নিতে পারবে না শুধু যে কটা দিন থাকবে মনকে তোলপাড় করে হারিয়ে যাবে তারপরের তোলপাড়টা কেমন করে সামলাবে শ্রেয়া? নিজেকে সে সামলাবে কিভাবে? এই কঙ্কনের কথাটা তার মা কিছুটা জানত গ্রাম্য খবর সবার কানে পৌঁছায় তাছাড়া একই গ্রামের বড়বাড়িতে যদি মেয়ের বিয়ে হয়, সে স্বপ্ন কে না দেখে? শ্রেয়ার মাও মনে মনে ওদের সম্পর্কটা মেনে নিয়েছিলমেয়ের যখন এরকম অবস্থা, তখন শ্রেয়াকে কিছুটা থিতু করার জন্য শ্রেয়াকে মামার বাড়ি নিয়ে গেল ওর মা সিউড়ির পুরনো বাসস্ট্যান্ডের কাছে মামার বাড়ি মামার মেয়েরা শ্রেয়ার সমবয়সী শহরের মেয়েরা প্রেমের ব্যাপারে অনেকটা এগিয়ে থাকে শ্রেয়ার চালচলনে তারাও বুঝতে পারে ব্যাপারটা মামার মেয়েদের একপ্রকার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে আর যাদের সঙ্গে ওদের বিয়ে হবে, তার সূত্রপাত ভালবাসা থেকে মামারা তাদের মেয়েদের ভালবাসাকে মেনে নিয়েছে ছেলে পক্ষও রাজি আছে ওদের বিয়েতে এই সহজ পাওয়াটা শ্রেয়াকে আরও দিশেহারা করে তোলে সেও যদি কঙ্কনকে এক চাওয়াতে পেত, তাহলে কী ভালটাই না হতো! যদি কঙ্কন তার বাড়ির বড়দের রাজি করাতে পারত, তাহলে শ্রেয়ার কষ্টের কোন কারন থাকত না কিন্তু কঙ্কন তার বাবাকে রাজি করতে পারবে বলে শ্রেয়ার মনে হয়না অনন্ত কঙ্কনের সেরকম কোন দৃঢ় সংকল্পের নামোনিশান সে খুঁজে পায়নি তাই থেকে থেকে আঁতকে ওঠে মেয়েটা এদিকে শ্রেয়ার বিষয়টি মামিমার কানে যায় কঙ্কনের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেয় শ্রেয়ার মামিমা কঙ্কনকে ফোন করে

হ্যালো

হ্যালো

অচেনা মহিলা কণ্ঠ শুনে প্রথমটাই থতমত খায় কঙ্কন ওদিক থেকে আওয়াজ আসে—

কঙ্কন বলছ?’

হ্যাঁ, বলুন

আমি শ্রেয়ার মামিমা— কথাটা শুনে কঙ্কনের ভিতরটা ছ্যাঁক করে উঠল -ফোনের অর্থ সে ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে ওদিকের ফোনের পাশে কারোর নিরব উপস্থিতি কঙ্কনের রোমে রোমে জানিয়ে দিয়েছে যে মেয়েটা কাঁদছে কিছুক্ষণ চুপ থাকে কঙ্কন যে দ্বিধা, যে সিদ্ধান্তহীনতায় সে ভুগছে সেটাকে খোলসা করার ক্ষমতা তার নেই যদি সে সরাসরি বলে দেয়, বাবা এই সম্পর্ক মেনে নেবেনা, তাহলে সে শ্রেয়াকে চিরতরে হারাবে আবার বাবার বিরুদ্ধে গিয়ে শ্রেয়াকে বিয়ে করার মতো পৌরুষও তার নেই এই দুইয়ের মাঝে কঙ্কনের নিজের অস্তিত্ব কোথা সেটা সে নিজেও জানেনা একজনকে পেতে গেলে আরেক জনকে হারাতে হবে তাকে তাতে দুপক্ষের কোন একপক্ষ জয়ী হবে সেখানে কঙ্কনের নিজস্ব অবস্থান কোথায়? শ্রেয়ার দাবি বাড়ি থেকে তাকে মেনে নিতে হবে, পালিয়ে গিয়ে বিয়ে সে করবে না বাবার দাবি এস.সি. মেয়েকে মেনে নেবে না কাকে রাখবে আর কাকে হারাবে কঙ্কন? তার নিজের ভালবাসার মূল্য কি কেউ দেবে না? শ্রেয়া তো পালিয়ে আসতে পারে! বাবাও বর্তমান সময়কে মেনে শ্রেয়াক বৌমার মর্যদা দিতে পারে! কিন্তু দুপক্ষই যে অনড় আবার শ্রেয়ার আন্তরিক চাওয়া আর বাবার সুকঠিন স্নেহপাশের কোনটাকে গুরুত্ব দেবে কঙ্কন? না কি তার নিজের ইচ্ছাকে সবার আগে রাখবে এই ত্রিমুখী প্রশ্নে কঙ্কন জেরবার হতে থাকে কিন্তু মুখে কিছুই বলে উঠতে পারেনা ওদিকে মামিমা বলেন—

শ্রেয়ার মনের অবস্থাটা জানো কি?

মামিমাকে কে বোঝাবে মনের কথা সবথেকে বেশী মনই বোঝে একজনের মনের সাড়া আরেকজনের মনকে কোনরকম চিঠিপত্র ছাড়াই জাগিয়ে দেয় শ্রেয়ার অন্তরকে কঙ্কনের থেকে কে বেশী বুঝবে? শ্রেয়াকে নিজের করে পেলে সব থেকে বেশী খুশি হবে কঙ্কন নিজে কিন্তু ওসব কিছুই বলল না কঙ্কন৷বিনিময়ে উত্তর দিল—

আমাকে ক্ষমা করবেন

এই চাওয়াপাওয়ার জটিল জীবন নকশায় কঙ্কন নিজেকে শূন্য করে বাবার সিদ্ধান্তকে মেনে নিল কিভাবে নিল সেটা সে জানেনা কিন্তু এর ফলাফল মারাত্মক হবে, সেটা সে জানেআমাকে ক্ষমা করবেনবলে নিজের কাছে নিজেই অপরাধী হয়ে ওঠে সেচিরসবুজ ভাললাগার মূলোচ্ছেদ করে বোধশূন্য হয়ে যায় ছেলেটা ওদিকে ফোনের ওপারে মামিমা রীতিমতো কথা শোনাচ্ছে রীতিমতো শ্রেয়ার হাঁসফাঁস করা কথা ফোনের লাউডস্পিকারকে কাঁপিয়ে কঙ্কনের বুকে এসে আছড়ে পড়ছে তবুও কঙ্কন চুপ বাবার বিরুদ্ধে যাওয়ার মনোবল তার নেইস্বেচ্ছায় শ্রেয়াকে হারাল কঙ্কন আর মনে মনে বলতে থাকলত্যাগ, ত্যাগ হয়তো এটাই তার আত্মত্যাগনিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধে সে চিরকাল ক্ষতবিক্ষত হবে তবুও চুপ করে থাকবে মামিমা যতই বলুন — ‘বড়বাড়ির ছেলেরাই এরকম’, তবুও কঙ্কন খুব আস্তে বলল— ‘ক্ষমা করবেনশ্রেয়ার মনের অবস্থা কী হতে পারে সেটা কঙ্কন জানে শ্রেয়া হয়তো তাকে ভুল বুঝবে, হয়তো মনে মনে অভিশাপ দেবে, হয়তো রেগে গিয়ে অন্য কোথা বিয়েতে সম্মতি জানাবে আর ভাবতে পারেনা কঙ্কন ফোনটা দূরে ছুঁড়ে ফেলে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায় তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে পশ্চিম আকাশের কোনা দিয়ে পাখির ফিরছে বাসা নারকেল পাতাগুলো ঝনঝন করে নড়েই চলেছে এসব দেখতে দেখতে অন্ধ ছাদের কোণাটায় কঙ্কন চুপ করে বসেই থাকল আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবতে থাকলবিরাট শূন্য, মহাশূন্যময় আমাদের জীবন পারিবারিক ও প্রেমাকর্ষণের দোদুল্যমান টানদড়িতে ঝুলবে সে, হয়তো আগামী জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত

সময় চলে গেলেও মনের পিছুটান কিছুতেই কমেনা তবুও ওসব নাছোড়বান্দা অনুভব মানুষকে পাশ কাটাতে হয় কঙ্কনকে শ্রেয়ার বাড়ির রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসা বন্ধ করতে হয় কঙ্কনের উপরের বারান্দার যে কোনা থেকে শ্রেয়া লাল বাড়িটা দেখা যায় সেখানে আর যায় না কঙ্কন রাস্তায় কোন অসাবধান মুহুর্তে শ্রেয়ার সঙ্গে দেখা হলে চোখ বন্ধ করে সে মনের ভিতর থেকে যে শ্রেয়া ডাকটা থেকে থেকে জেগে ওঠে, তাকে কিছুতেই ভুলতে পারে না কিছুতেই শান্তির কোন উপকরণ খুঁজে পায় না ছেলেটা এক অস্বাভাবিক অস্বস্তি সর্বদা ধাওয়া করে ফোনটা হাজারবার দেখে, হাজারবার মেসেজ টাইপ করে আবার মুছে দেয় অনেকটা পাগলের মতো ফাঁকা চোখে দূরের দিকে শুধু চেয়ে থাকে কঙ্কন একা একা নিজের মনের সঙ্গে কথা বল যে মনের একটা দিক শ্রেয়ার প্রতিনিধি, অন্যটা কঙ্কনের

শ্রেয়ার দিকের মনটা বলে ওঠে— ‘কেন তুমি আমার অধিকারকে ত্যাগ করলে? কেন কেন?’

কঙ্কনের এদিকের মনটা বলে— ‘বাবা-মাকে অমান্য করি কি করে?

ওদিকটা বলে— ‘তাহলে ভালবাসার অবস্থান কোথা?’

এদিকটা বলে— ‘বিরহে, ত্যাগে

ওদিক— ‘ওগুলো কাগজে মানায় কঙ্কন, ব্যক্তিগত জীবনে ত্যাগের মূল্য মর্মান্তিক

এদিক— ‘মর্মান্তিক না হলে ভালবাসা বাঁচে না

ওদিক— ‘তাহলে মন থেকে কিছু চাওয়া কি অপরাধ?’

এদিকটা বলে— ‘না তোমার অপরাধ নয়, ওটা আমার অক্ষমতা

ওদিক বলে ওঠে —‘তুমি তো পুরুষ, দৃঢ় হতে কেন পার না?’

এদিক থেকে বলে — ‘সব পুরুষই যে দৃঢ় হবে, -তোমার অমূলক ধারনা

ওদিক যুক্তি দেখায়— ‘তোমার কথা বারবার আমাকে দৃঢ় করেছে, আমাকে রচনা করেছে

এদিক বলে— ‘নিজেকে তোমার ভিতরে স্থাপিত করতে পারি, কিন্তু প্রতিমার উপর যে শিল্পীর দাবি থাকে না শ্রে...’

ওদিক বলে— ‘প্রতিমার মুখের হাসি তো শিল্পীরই অবদান, সে হাসি কি তোমার নয়?’

এদিক — ‘সে হাসি সকলের উদ্দেশ্যে নিবেদিত

ওদিক— ‘আমি মানুষ হতে চায়, প্রতিমা নয় মানুষের মতো আমি তোমাকে চাই

এদিক— ‘চাইলেই কি সব পাওয়া যায়? ছাড়তেও হয়

 এসব তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেও নিজের মনকে বাগে আনতে পারে না কঙ্কন বারে বারে মনে পড়ে শ্রেয়াকে সেও হয়তো এখন ফোনটা নিয়ে বসে থাকবে ঘরের ভিতরে বসে বসে শুধু হিসাব মেলানোর অঙ্ক কষবে যখন কিছুতেই হিসাব মিলবে না তখন ওড়নাচাপা বুকটা ধড়ফড় করে উঠবে বিকেলে বাইরে আসবে সে, পথ চেয়ে চেয়ে চোখ ঝলসে যাবে, আস্তে আস্ত অন্ধকার নামার মতো বরফ শীতল নীরবতা শ্রেয়াকে গ্রাস করবেএভাবে একই গ্রামের ঢিলছোড়া দূরত্বের দুটি বাড়িতে দুটি ছেলেমেয়ের মধ্যে দূরত্বটা বাড়তে থাকবে এত কাছে থেকেও কেউ কারোর কাছে আসতে পরবে না শ্রেয়া যতই হাত বাড়াক, কঙ্কন নিজের হাতকে অদৃশ্য শিকলে বেঁধে নেবে কেটে যাবে অনেকটা কাল, কেটে যাবে বছর, ঘুচবে না দূরত্ব মনে মনে কথা চালাচালি হবে, কিন্তু সে কথা একে অপরের কানে পৌঁছাবে না শেষে কঙ্কন ফোনটা সুইচ অফ করবে, শ্রেয়া ক্লাস পরীক্ষার চাপে ব্যস্ত থাকবে কঙ্কন ওদিকের রাস্তা ত্যাগ করবে, শ্রেয়া তার অসুস্থ বাবাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়বে মাঝে মাঝে দুজনের আত্মা হাহাকার করলেও কেউ কাউকে জানাবে না অমীমাংসিত রিলেশনটা ভবিষ্যতের হাতে সঁপে দেবে দুজনে

 

আজ বেশ কয়েকমাস দুজনের না হয়েছে দেখা, না হয়েছে কথা দুজনেই কঠিন পাথর হয়ে দুজনের প্রথম অগ্রসরের আশায় বসে আছে গ্রামের অনুষ্ঠানগুলো হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ওদের দেখা আর হচ্ছে না যদিও বা দূর থেকে শ্রেয়াকে কঙ্কন দেখছে, তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে চলে এসেছে শুধু ভেবেছেকোন মুখে সে সামনে গিয়ে দাঁড়াবে শ্রেয়া ভেবেছেকঙ্কনের কী মন বলে কিছু নেইভেবেছে তার ভালবাসার কোন শক্তি নেই? খামখেয়ালী কঙ্কনকে বেঁধে রাখার কোন মন্ত্র তার জানা নেয়? কঙ্কন শ্রেয়াঘটিত কারণে বাবার সঙ্গে পারিবারিক অশান্তিগুলো শ্রেয়াকে জানাবে না জানাবে ন যে কঙ্কনকে এই বিয়েটা না করার জন্য তার পিসিমনি, জামাইবাবু, মামাদের ডেকে এনে আলোচনা করেছে তার বাবা সবাই একসুরে বলেছে ওরা এস.সি. সবাই একযোগে কঙ্কনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে এটা অসম্ভব কঙ্কন তার সাধ্যমতো লড়াই করেছে সবার সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়ার হুমকি দিয়েছে অগত্যা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছে মায়ের মুখ চেয়ে আবার ফিরেও এসেছে গ্রামের জলহাওয়াতে এসেই টের পেয়েছে শ্রেয়ার নিরব অবস্থান প্রিতিটি বিকেল, প্রতিটি রাত সে অসহ্য দহনে পুড়েছে চুপচাপ হয়তো শ্রেয়ার চোখে সে হয়ে উঠেছে কাপুরুষ তা হোক তাকে হাজার দোষী সাব্যস্ত করা হোক, কিন্তু শ্রেয়া যেন পিছনে না তাকায় শ্রেয়া যেন বাড়ির কথামতো অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজি হয়শ্রেয়া যেন সবভুলে নিজের জগতে ফিরতে পারে সংসার সাগরে যেন তার নৌকাটি ভাসাতে পারে সে নৌকার নাবিক নাই বা হলো কঙ্কন, কিন্তু দূর থেকে তার সংসারনৌকার চলাচলের খবর কঙ্কন নিশ্চয় পাবে দূর থেকেই চোখের জলটা মুছে নেবে সে চুপ করে ছাদের অন্ধকারে নিজেকে গুঁজে দেবে, সিগারেটের পর সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে শেষে ক্লান্ত হয়ে ছাদেই খোলা গায়ে গড়াগড়ি দেবে বাড়ির লোককে এসবের কিছুই বুঝতে দেবে না কঙ্কন আগ্নেয়গিরির মতো সে যুগ যুগ চুপ করে থাকবে, ভিতরের জ্বলন্ত লাভাগুলো কোনদিনই দৃশ্যমান হবে না সকলের কাছে ওদিকে শ্রেয়াকে তার মা বোঝাতে থাকে, বলতে থাকে— ‘জীবনে সবাই যা চাই, তা তো পায় নাচুপ করে থাকে শ্রেয়া অসুস্থ বাবা বলে— ‘দেখ মা, এগিয়ে যাওয়াই জীবন কতদিন পথ চেয়ে আর বসে থাকবি?’ সব কথা নির্বাক হয়ে শ্রেয়া শোনে বাবা মায়ের সামনে চোখের উপচে পড়া জলকে কোনরকমে সামলে নেয় মা বলে—তোর বাবার শরীরটা ভাল নেয় আমারও চিন্তা বাড়ছে  অবাক হয়ে শ্রেয়া তার জীবনের এই পরিহাসকে মেনে নিতে বাধ্য হয় কেননা পালিয়ে গিয়ে কঙ্কনকে সে কোনদিনই বিয়ে করতে পারবে না অসুস্থ বাবার শেষ ইচ্ছাটা তাকে পূরণ করতেই হবে বাবার কথামতো বিয়ের সব আয়োজনে সে অমত করবে না৷ তবুও মন সায় দেয় না তার তবুও কঙ্কনের কোন প্রতিক্রিয়া সে জানতে পারে না যে মেসেজ সে কঙ্কনকে দেয় তারও উত্তর শ্রেয়া পায় না একদিকে বাবামায়ের কর্তব্য অন্যদিকে অন্তরের আবেদন শ্রেয়াকে স্থির থাকতে দেয় না বুকের ব্যাথা বুকে রেখে শ্রেয়া জানায়— ‘তোমরা ছেলে দেখগ্রাম্য পরিবেশে শ্রেয়া মানুষ কিন্তু রঙের চমক, কোঁচকানো চুলের বাহার, দোহারা শরীরের লাবণ্যে যে কোন যুবকের শ্রেয়াকে পছন্দ হওয়ার কথা এককথায় এক চটকে শ্রেয়াকে সবার চোখে ধরবে সহজ দেখাশোনার মাধ্যমে সৌম্যর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয় শ্রেয়ার ছেলেটা পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোর নিবাসিকিছুদিনের মধ্যে ওরা টুকটাক ফোনে কথা বলতে শুরু করেছে

সৌম্য যেদিন দেখতে এল সেদিন শ্রেয়া একটি লালপেড়ে হলুদ শাড়ী পড়ল মায়ের কঙ্কনদুটো হাতে চুল বাঁধার পুরনো ধরনটাও পাল্টে দিল কঙ্কনের প্রিয় ক্লিনিক প্লাস শ্যাম্পুর বদলে অন্য শ্যাম্পু লাগাল চুলে তাদের দুজনের প্রিয় ওয়াইল্ড স্টোন ডিওর বদলে রজনীগন্ধা নিল ঢেলে একগাছা হলুদ হাড় তার গোলাপি গলা জুড়ে চকচক করে উঠল দুগালে ফেসপাউডারের সেডে মাছিতিলগুলো আত্মগোপন করল মেরুন লিপস্টিক লাগিয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন সাজে সাজাল শ্রেয়া এরকম সাজগোজ সে কোনদিন করেনি কঙ্কনের ভাললগাত তার অসিসাধারণ সহজাত রূপটা কপালের কোলে ছোট্ট টিপ সেই ছোট্ট একটা টিপ আর গাছপালা রঙের চুড়িদারে কঙ্কন তাকে বারবার কামনা করেছে কিন্তু আজ সে বদলে নিল নিজেকে মনের তলে একবারওশ্রেয়োডাকটা চিৎকার করল না এমনকি হাঁটাচলাতেও কোন পুরনো ক্ষতের লক্ষণ ধরা দিলনা বরং রীতিমতো হাসিখুশি মুখে সৌম্যর সামনে প্রেজেন্ট করল নিজেকে হাতজোড় করে নমস্কার বিনিময়ে ফুটে উঠল এক অনন্য শরীরী ভঙ্গিমা শান্ত সহজ সরল মেয়েটি রীতিমতো স্মার্ট হয়ে উঠল শহুরে মামার মেয়ে দুটির চালচলনকেও সে আজ হারিয়ে দিতে পারে হারিয়ে দিতে পারে কঙ্কনের পিছুটান বাবার মুখের হাসি ফোটাতে শ্রেয়া আজ ঘুরে দাঁড়াল জীবনের এক বিশেষ সিন্ধান্তক্ষণে কোন স্মৃতি, কোন আবেগ তার মনের মধ্যে গুঞ্জন করবে না আর এমনভাবেই নিজের সঙ্গে নিজে লড়ে দৃঢ় হয়ে দাঁড়াল সৌম্যর সম্মুখে দেখাশোনার সাধারণ ফর্ম্যালিটির পর সৌম্যকে নিয়ে গেল উপরের ছাদে ওখানে দুজনে গোপন কথাগুলো সেরে নেবে ছাদের যে প্রান্ত থেকে কঙ্কনের বাড়ি দেখা যাই, সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল শ্রেয়া বিকেলের পড়ন্ত বেলায় ওখান থেকে কঙ্কনর সাদা বাড়ির দিকে তাকিয়ে থেকেই কথা শুরু করল শ্রেয়া সৌম্য— ‘তাহলে এম.. টা শেষ করে কি করবে?’

শ্রেয়া— ‘তুমি যা বলবে তাই

ম্য— ‘আচ্ছা আমার বাবা-মাকে নিয়ে কোন জিজ্ঞাসা?’

শ্রেয়া— ‘না,বাবা-মাকে সবাই দেখে বিশ্বাস রাখতে পার

সৌম্য— ‘কাউকে জীবনে ভাল লাগেনি?’

শ্রেয়া— ‘ভাললাগত কিন্তু সেখানে ভালবাসা ছিল না বোধহয়

সৌম্য— ‘আমাকে এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবে?’

শ্রেয়া  প্রয়োজন বোধ করিনা

সৌম্য— ‘আমার সম্বন্ধে কোন বিশেষ চিন্তাভাবনা?’

শ্রেয়া— ‘যাকে আপন করব, সেই আমার কাছে গোটা পৃথিবীআজ সকাল থেকে এখন অবধি সে কঙ্কনের ভাললাগা বিষয়গুলির বিপরীত আচরণ করেছে কথাবার্তাও সে এরকম করে বলেনাতবুও বলেছে তবে এইগোটা পৃথিবীর কথাটা কঙ্কনের উক্তি সেটা শ্রেয়ার অজান্তেই বেরিয়ে যায় ঝটকায় নিজেকে সংবর করে বলে— ‘আর কিছু জিজ্ঞাসা আছে?’

 সৌম্য বলে—জিজ্ঞাসা নয়, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুভবটা বোধ করছি

বিনিময়ে একটু মুচকি হেসে দুজনে নিচে নেমে এল বাঁকা বাঁকা সিঁড়িগুলোর বাঁক বেয়ে বঙ্কিমি পদচালনা করে আগে আগে এগিয়ে চলল শ্রেয়া নেমেই দেখল মায়ের মুখের প্রশান্তি যুক্ত চোখদুটো অসুস্থ বাবার পাদুটো ছুঁয়ে ডাইনিং টেবিলের বাঁক ধরে ধরে খাবার পরিবেশনে মনোনিবেশ করল শ্রেয়া

এই দেখাশোনার খরবটি কঙ্কন পায় সঙ্গে সঙ্গে পা দুটো হেলেকেঁপে ওঠে মনের ভিতরে এক অসহ্য অস্বস্তি বোধ করে কঙ্কন মাথার ভিতরে চি চি করে একটা ঝনঝনানি শুরু হয় কিরকম যেন অস্বাভাবিক হয়ে যায় মুহূর্তে মানুষ মুহূর্ত যে একলহমায় সব উল্টে দিতে পারে সেটা কঙ্কন জীবনে এই প্রথম ফিল করল খেলার মাঠে খবরটা পেয়ে সে আর স্থির থাকতে পারেনা হনহন করে বাড়িমুখে হাঁটতে লাগল ছেলেটা মাঘমাসের প্রথম সপ্তাহে শ্রেয়ার বিয়ে সেটা আসতে এখনও মাসদুয়েক বাকি আছে ততদিনে নিশ্চয় নিজেকে সামলে নেবে ও শ্রেয়ার মতো অন্য কোন মেয়ে পেলেই সে নতুন করে ভালবাসবে -কথাটা ভেবে একটু শান্তি পেল কঙ্কন এমন কি কঠিন কাজ এটা? শ্রেয়া যদি অপেক্ষা না করে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে কঙ্কন পারবে না কেন? শ্রেয়ার পছন্দের সাদা শার্ট সে আর পরবে না ওয়াইল্ড স্টোন ডিও ব্যবহার করবে না যতই গরম লাগুক মাজা ড্রিংসটা আর ছোবে না— এসব প্রতিজ্ঞা অজান্তেই করে ফেলল নিজের সঙ্গে বাড়ি ফিরে ফাঁকা বিছানায় উপুর হয়ে নিজেকে দিল ছুঁড়ে সবই যেন বিরক্তিকর মনে হচ্ছে তার বিছানা, এমনকি গায়ের জামাকাপড় সবই যেন জ্বালা দিতে লাগল তাকে গোটা শরীরটা যেন থেকে থেকে কুঁকড়ে উঠছে,পেটের ভিতরে নাড়িগুলো কেমন যেন পাকিয়ে যাচ্ছে, মাথায় ভীষণ ব্যাথাকিছুতেই যেন একটা শান্তির নিশ্বাস নিতে পারছে না কঙ্কন নিজেকে মুহুর্মুহু বোঝাচ্ছে, তবুও মন বুঝছে না নিজেকে শক্ত করতে চাইলেও হাহাকার উঠছে ভিতর থেকে কেন কেন কেন? এরকম কেন হচ্ছে তার? কী এমন হারিয়েছে সে? কী এমন অভাব আছে তার? এতসব প্রশ্ন মনের সামনে রেখেও থেকে থেকে উতলা হয়ে উঠছে কঙ্কন এখনি উঠে শ্রেয়াদের বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে এখনি মনে হচ্ছে একটা ফোন করি এখনি মনে হচ্ছে শ্রেয়াকে চিৎকার করে বলিভরসা রাখতে পারলে না? পাখি তার বাসায় ঠিক ফিরে আসততখনি মনে হচ্ছে সে বলে — ‘বিশ্বাস রাখতে পারলে না? একটা সুযোগও দিলে না?’ পরক্ষণে মনে হয়েছে শ্রেয়া তাকে বারবার এই চূড়ান্ত সময়ের জন্য জাগাতে চেয়েছে তবুও জাগেনি সে হেলায় হারিয়েছে শ্রেয়াকে শ্রেয়ার কথা এত হালকা করে সে কেন নিল? কেন সে একবারও ভাবল না তারগোটা পৃথিবীঅন্যের হয়ে যেতে পারে কেন সে চিনতে দেরি করল তার এই আন্তরিক ভালবাসাকে মনে হতে থাকল শ্রেয়াকে না পেলে একটা মুহূর্তও কাটবে না তার শ্রেয়ার মুখেরআমার সোনা, আমার বরকথাগুলো অন্যকারোর হয়ে যাবে কঙ্কন তাহাত পা মুখ সব সব আমার, তুমি গোটাগুটি আমার', এই কথাগুলো কাকে বলবে সে? কাকে বলবে সে— ‘আমার কাছে তুমিই দেবতা, তুমিই আমার পুজোকিছুতেই স্থির হতে পারেনা কঙ্কন উঠে বসে শুয়ে পড়ে মাথা চিপে ধরে বালিশে মুখ গোঁজে কিছুতেই নিজেকে আজ শান্ত করতে পারছে না ছেলেটা অগত্যা উল্টোদিক থেকে ১০০ থেকে ১ গুনতে লাগল ওওমঃ শিবায়' জপ করল তবুও তবুও কিছুতেই স্থির হতে পারেনা কঙ্কন এরকম কেন হচ্ছে? কেন হবে? এসবের উত্তর খুঁজছে কঙ্কন  মনের ভিতর থেকে জেগে ওঠা হাহাকারটা যখন আর কিছুতেই থামছে না, তখন ফোনটা কাছে টেনে নিল আজ বহুদিন পর শ্রেয়াকে একটা ফোন না করে আর থাকতে পারছে না কঙ্কন পরপর ৩২ বার ফুল রি করল তবুও কেউ ফোন ধরে না অগুন্তি মেসেজ করল তাতেও কোন উত্তর নেয় কারোর এসবের মাঝে তার মা কয়েকবার কঙ্কনকে ডেকে গেছে ডাক সে শুনতেই পানি কঙ্কন বাইরের প্রকৃতি দিনের আলো ফুরিয়ে ততক্ষণে অন্ধকারে ডুবছে জোনাকি পোঁকা উড়তে শুরু করেছে সজনে গাছে প্যাঁচাটা ডেকে উঠল চিলের সান্ধডাকে একটা কর্কশ শব্দ রাধাচূড়ার হলুদ ফুলে কালো ভ্রমরটা অনবরত ভনভন করে চলেছে বাইরের প্রকৃতি যেন বিষণ্নতা ছেয়ে কঙ্কনকে আরও বিষন্ন করে তুলছে সে নিজেকে কিছুতেই বোঝাতে পারছে না মেনেও নিতে পারছে না, শ্রেয়া-সৌম্য সম্পর্কটা এক চূড়ান্ত অসহায়তা তাকে গোগ্রাসে গিলছে যেন এক সর্বহারার বেদনা প্রতিটি শিরা-উপশিরায়, রক্তে রক্তে দ্রুত গতিতে বয়ে চলেছে, যা হয়তো বুকটাকে চুপ করিয়ে দেবে আর পারছে না কঙ্কন চিনচিন করছে সর্বাঙ্গ বোধ চিন্তার ক্ষমতা হারাচ্ছে সে

  গত কয়েকদিন থেকে দিশেহারা হয়ে উঠেছে কঙ্কন শ্রেয়া শুধু কয়েকটা মেসেজ করে ফোনটা অফ করে দিয়েছে যে মেসেজগুলোর একটাতে লেখা ছিল— ‘আমি তোমারই থাকব তুমিই আমার বরমেসেজটা লক্ষ্যবার পড়েছে কঙ্কনবাবার বিরুদ্ধে ছেলেটি যেতে পারেনি, নিজের মনকেও বোঝাতে পারেনি কঠিন পদক্ষেপ না নিয়ে শুধু অন্তর্দাহে পুড়ছে সে অনবরত মনে মনে শ্রেয়ার সঙ্গে কথা বলে গিয়েছে—

কঙ্কন— ‘-শূন্যতা কিভাবে পূর্ণ করব শ্রেয়ো?’

মনের ভিতরের শ্রেয়া— ‘কোন কিছুই শূন্য থাকে না

— ‘কিভাবে বাঁচব আমি?’

শ্রে— ‘ত্যাগের মহত্বে

— ‘তুমি কিভাবে এত শক্তি পেলে?’

শ্রে— ‘সে শক্তি তোমারই দেওয়া

— ‘আমি দুর্বল, আমি শক্তিহীন

শ্রে— ‘ওই দুর্বলতা আছে বলেই ভালবাসা বাঁচে

— ‘সময় কি এভাবেই বেঁকে যায়?’

শ্রে— ‘সময়কে চিনে নিতে হয়

— ‘সময় যে মুহুর্তে বাঁকবদল করে

শ্রে— ‘কিন্তু মনবদল করে না

— ‘তুমি কিভাবে এটা পারলে?’

শ্রে— ‘জানি না, তবে.....’

— ‘তবে কী?’

শ্রে— ‘থাক সে-কথা ভাল থেকো

শ্রেয়া জীবনের চূড়ান্ত বাঁকে পৌঁছে গেছে আগে কথায় কথায় শ্রেয়াকে ভোলার জন্য ইউটার্ন নিতে যে কঙ্কন একমুহূর্ত ভাবত না, একলহমায় শ্রেয়াকে দূরে সরিয়ে দিত, তার কাছে আর কোনদিকে বাঁকা সম্ভব নয়  রাস্তার বাঁকে, বারান্দার ফাঁকে, কঙ্কনপাখিটা প্রতি সন্ধ্যায় তার বাসা খুঁজে ফিরবেকিন্তু বাসা মিলবে না সীমাহীন কষ্টের বোঝা নিয়ে ছেলেটা একটু শান্তিতে বাঁচার চেষ্টা করলেও তার পরিত্রাণ মিলবে না তার কিছুই করার থাকবে না, একটা ফোনও না  প্রতিটা মুহুর্ত এক বিরাট শূন্যে চলাফেরা করবে ছেলেটা সেখান থেকে খুঁজে পাবে না ইউটার্নের রাস্তা

গত ন'বছর ধরে  সর্বক্ষণের অস্বস্তি কঙ্কনের মনময় অনবরত চাবুক চালায়, আর হেডফোন গুঁজে ছেলেটা গান চালিয়ে দেয়

কেটেছে একেলা বিরহের বেলা

আকাশকুসুম চয়নে

সব পথ এসে মিশে গেল শেষে

তোমার দুখানি নয়নে...’

 লেখকের  অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।

 লেখক পরিচিতি—

কবি ও কবিতা বিশ্লেষক। প্রাবন্ধিক। লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্র-সমীক্ষা ভিত্তিক গ্রন্থ রচয়িতা। নানা লোকসেবামূলক সংস্থার সদস্য।