Advt

Advt

mriganabhi-story-galpo-by-dr.shibshankar-pal-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-মৃগনাভি-গল্প-ড.শিবশঙ্কর-পাল

 

mriganabhi-story-galpo-by-dr.shibshankar-pal-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-মৃগনাভি-গল্প-ড.শিবশঙ্কর-পাল

হোয়্যার ক্যান আই ওয়াশ মাই ক্লথস্?’

‘ক্যান এনিবডি হেল্প মি?’— কথাগুলো বলে চলেছিল সে যাদের বলছিল তারা সে কথার আদিঅন্ত বুঝতে পারছিল না বোঝার চেষ্টাও ছিলনা চেষ্টা করলেও ওরা বুঝত নাওরকম বহু আসে এ-তল্লাটে

মাটির ভাঁড়ে গরম চা পান করতে তারা ব্যাস্ত গালগল্পে বাঙালি চিরকালের বীর জাতি তাই গল্পের আসড়ে ওসব কথা বিশেষ আমলও পাচ্ছিল না চায়ের দোকানে লোকে কথা শোনার থেকে কথা বলতেই বেশি ভালবাসে

মেয়েটা জার্মান অ্যাকসেন্টে ইংরেজিতে কথাগুলো বেশ কয়েকবার বলল কেউ কোন গা-গোছ করছে না দেখে সে অবশেষে চুপ করল মাটির ভাঁড়টা ডাস্টবিনে ফেলে উঠে যাবে আর কি!

সে-সময় কথাটা পাড়ল বাপি এতক্ষণ সে তন্ময় হয়ে জার্মান মেয়েটির কথাগুলো শুনছিল মুখটা ওর দিকে বাড়িয়ে— ‘দেয়ার ইজ এ টিউবওয়েল নিয়ারবাই ইউ ক্যান ইউজ

মেয়েটি কথাটা প্রথমে বুঝতে পারে নি—

 পার্ডন?’

বাপি একটু লজ্জা পেল তার ইংরেজি বচন হয় শুদ্ধ নয় নতুবা ইংরেজি উচ্চারণে বাঙাল ভাষার টান চলে আসছিল কিন্তু নিজেকে জাহির করার এই একটা সুযোগ বিদেশি মেয়ে বয়স বেশ কম, উনিশের ঘরেবেশ ফর্সা, ফলবাজারের আপেলের মতো এসব ভাবনাকে লুকিয়ে সে আবার বলল

 টিউবওয়েল ইজ নিয়ারবাই ইউ গো দেয়ার অ্যান্ড ওয়াশ

 মেয়েটি একটু যেন ধাতস্থ হল হয়তো তার ব্যাগভর্তি জামাকাপড় সে পরিষ্কার করবেকিম্বা স্নান বা রিফ্রেশ কিন্তু এই বিদেশিনী কি কোথাও রূম ভাড়া নেয়নি? তারাপীঠে তো হোটেলের অভাব নেই বিদেশিদের টাকার টান নিশ্চয় পরেনা যাইহোক মেয়েটাকে একটা ইংরেজি বাক্য ঠিকঠাক বুঝিয়ে বেশ আনন্দ হচ্ছিল বাপির

সে উঠে যাবে বাপিও তারাপীঠ থেকে বাড়ি ফিরবে এরকম সময় বাপির মনে হল এটাই হয়তো কোন বিদেশির সঙ্গে শেষ কথা সারাজীবন বিদেশি ভাষায় বিদেশি লোকের সঙ্গে কথা বলার খুব শখ তার গতবার তারাপীঠের কৌশিকী আমাবস্যায় আসা দুটো অস্ট্রেলিয়ানকে সে কথা বলেও ঠিকঠাক আলাপ করতে পারেনি ওদের কথার টান বিরাট টানাটানা ওরা কথা বলে দ্রুত ইংরেজির রেলগাড়ি ছোটায় সুযোগটা পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি বাপি ওদের সঙ্গে কথায় পেরেও ওঠেনি কিন্তু এ মেয়েটির কথা তুলনায় অনেকটা বোঝা যায়, টান থাকলেও ধরা যায়

 

সেই লাল শালু পরিহিত যুবতী কলের দিকে এগোয় খালি পা দু’টো একটু উঁচিয়ে উঁচিয়ে মাটিকে আঘাতহীন ভাবে চলল সে সুঠাম শরীররে অঙ্গে অঙ্গে এক অদ্ভছন্দ কটিদেশে সোহাগ করে শালুটা জড়ানো আছে চোখের কোণে কোণে জার্মান জাতির বলিষ্ঠতা সে চলে যাচ্ছে, কদম চালে উঠছে-নামছে শ্বেতপদ্মের মতো পা দু’টো বাপির চিল-চোখ ওটাই যেন লিখে রাখছে মনের খাতায় আর হয়ত ওর সঙ্গে দেখা হবে না তার আর হয়তো কোন বিদেশিনীকে সে কথা বলেও সাহায্য করতে পারবে না এসব ভাবনায় বুঁদ হয়ে সে আপনমনে ওর দিকে এগিয়ে গেল কলতলার কাছে গিয়ে বলল—

ক্যান আই পাম্প?’

মেয়েটি সলজ্জ হয়ে বলল

নো নো, আই ক্যান ম্যানেজ থ্যাঙ্ক ইউ

এই ধন্যবাদ জ্ঞাপনের ধরনটা বেশ আকর্ষণীয় চোখ দুটো কিরকম ফুটে উঠল ওর, কাঁধের দিকটা একটু গেল হেলে, ঠোঁট থেকে বেরোনোর সময় শব্দগুলো যেন মধু মাখা আহা কত মধুর হতে পারে ধন্যবাদ জানানো, কতো শালীন হতে পারে মানুষের কথা অগত্যা বাপি আবার বলল—

 উইল ইউ স্টে হেয়ার?’

 ওহ্ ইয়েস ফর টেন ডেজ

 আই অ্যাম লোক্যাল হেয়ার ক্যান উই মিট এগেন?

মেয়েটি কি ভাবল কে জানে? হয়ত সে অন্য কিছু ভাবছে  এতক্ষণে পাঠকরা ভাবছেন অন্যকথা তবুও সহজ হয়ে বলল—

 ইফ ইউ উইস

 ইফ ইউ উইস, আই ক্যান হেল্প ইউ টু ট্রাভেল লোকাল রিলিজিয়াস প্লেসেস্

 মেয়েটির পড়নে লালা শালু মাথার চুলে জট না পড়লেও সাধনার একটা বিন্যাস আছে ওখানে হাতের কব্জিতে রুদ্রাক্ষের মালা বাঁ হাতে মহাদেবের ত্রিশূল

সন্ধ্যাতে পুনরায় একই জায়গা দেখা করতে আসার কথা দিয়ে বাপি উল্টো রাস্তা ধরল বাড়ি এসে মনে পড়ল মেয়েটির ফোন নম্বর তো নেওয়া হয়নি! কোথায় থাকবে সারাদিন সেটাও অজানা সন্ধেয় সে কি আসবে?

বিকেলের পড়ন্ত রোদকে গায়ে নিয়ে বাপি বাড়ি থেকে বেরোল সন্ধ হতে এখনও কিছুটা দেরি বাড়ি থেকে তারাপীঠ যেতে বেশি সময় লাগে না মাঠের ধারে এসে কিছুক্ষণ বসল ও লালাসূর্যের রঙে আজ কেন জানিনা মেয়েটার রঙ মিশে যাচ্ছে সূর্যমাখা কালো মেঘ যেন ওর এলো চুলের মতো সীমান্তের ধ্যানস্থ রূপে যেন মেয়েটির সাধ্য-সাধনের সমীকরণ লুকানো কে যেন টানছে ওকে! শুধু কি ইংরেজি বলার লোভ! না কি অন্য কিছু! যা অপরিচিত অজ্ঞাত জর্মান মেয়েটির দিকে ওকে টানছে! মাঠের ভূত-পাখিগুলোর কিচির মিচির শব্দে পৃথিবীর যাবতীয় ভাষা টুকরো টুকরো হয়ে মিশে যাচ্ছে ওরা যেন বলেই চলেছে জীবন সাধনার কথা অনুভবের পৃথিবীতে সীমান্তের দূরত্ব, ভাষার বিভেদ মনে হয় ক্ষণস্থায়ী

 

আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামে বাইকটা স্টাট দিয়ে বাপি তারাপীঠের দিকে এগিয়ে যায় গন্তব্য সকালের চায়ের দোকান৷ বাইকটা তারাপীঠের একটা ছোট্ট নিতাই মন্দিরের পাশে রেখে, একটু দূর থেকেই চোখ রাখল বাপি হয়তো মেয়েটা আসবে না হয়তো সে ভুলে যাবেওটাই স্বাভাবিক

চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে অনেক লোক শীতসন্ধ্যার চায়ের আসড়ে রাজ্যের হোটেল বয়গুলো হাজির ঝিকিমিকি আলোর ঝাঁকে যেন ফ্লুরোসেন্ট বাল্ব হয়ে মেয়েটি জ্বলছে মাটির ভাঁড়ে মাঝে মাঝে চুমুক দিয়ে সে চেয়ে আছে দূর পথে প্রতীক্ষা? না, না, তা নিশ্চয় হবে না জার্মান বড় কঠিন জাতি

বাপি ধীরেসুস্থে মেয়েটির সামনে আসে হাসিহীন মুখে মেয়েটি অভ্যার্থনা জানায়—

হোয়েন?’

জাস্ট নাও

টি?’

ইয়েসবলে বাপি হাঁক দিল— ‘রাহুল চা দে রে...’

সন্ধের তারাপীঠ চলেছে নিজের ভঙ্গিতে কেউ কাউকে চেনেও না সব আগন্তুক তীর্থযাত্রী— তারামা দর্শনার্থী চপ-মুড়ি, রুটি-সবজির দোকানে ভীড় সামনের দ্বারকা নদীতে রাজ্যের আবর্জনা নিয়ে জলরাণী গড়িয়ে চলেছে আলোর ঝলকে দেখা যাচ্ছে না উপরের আকাশ লাইন দিয়ে বড় বড় লজগুলো যেন টাকার ট্যাঁকশাল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে হাওয়াতে ভেসে আসছে পেট্রোল পোড়ার ঝাঁঝ রাহুলের চায়ের ধোঁয়া শুধু একজনকে আজ আচ্ছন্ন করে তুলছে ওরা দুজনেই নিরব মানুষের চলাচলে মেয়েটির চোখ আর মেয়েটিতে বাপির

ডু ইউ লাইক দিস প্লেস?’— এই আচমকা প্রশ্নে মেয়েটি একটু নড়ে বসল যে চেতনায় সে ছিল সেখান থেকে ফিরে জবাব দিল

টারাপীঠ?’

ইয়েস?’

ওহ্ ইয়েস আই ইউজড্ টু কাম হেয়ার

ফ্রম সো লঙ,ইউ সাফার টু কাম?’

ইয়া, মাই গুরুজী বিলঙস্ ফ্রম টারাপীঠ

এই যা! তাহলে তো আমাদের সব জায়গা দেখেছে ও! ওকে বীরচন্দ্রপুর, নলহাটি ঘোরানোর ইচ্ছেটা তাহলে আর পূরণ হবে না যে বুক লুকানো আনন্দ নিয়ে বাপি ওকে দেখা করতে এসেছিলওটাতে জল পরল বাইকে বসিয়ে বিদেশিনীকে ইংরেজি বলতে বলতে ঘোরানোর ইচ্ছেটা, চা শেষে মাটির ভাঁড়ে পরিণত হল তাহলে আর কী করা? ওর পরিচয় জানতে ইচ্ছে হল বাপির পাশে বসে এক অদ্ভত মেয়েলি গন্ধ নাকে নিয়ে গল্প শুনছিল বাপি ওকে শুধু একটা করে প্রশ্ন করে দেওয়া, তারপর বিভোর হয়ে ওর কথা শোনা মাঝে রাহুল এসে একটু খোঁচাও দিয়ে গেছে—

বাপিদা, বাইরের লোক, সাবধানকিন্তু মানুষ যখন হারায় তখন সব বোধ হারায় যা হবে পরে দেখা যাবে ভেবে বর্তমানকে নষ্ট করতে চায় না মেয়েটির বাড়ি জামার্নির এক শহরতলিতে বাড়িতে মা বাবা আছেন বহু পূর্বে তারাপীঠের অঘোরীবাবা জার্মানি গিয়েছিলেন সেইসূত্রে উনার সঙ্গে পরিচয় রে শিষ্যত্ব গ্রহণ ও তারাপীঠ আসা তবে দেশে থাকাকালীন মেয়েটি ট্রাকের মাল আনলোড করে কখনও কখনও ট্রাকে করে যেতে হয় বহুদূর কিন্তু ওসব করলেও সাধনার এক চুপকথা তাকে বারবার তারাপীঠ আসতে বাধ্য করে কিছুদিন এদিক ওদিক ঘুরে, শ্মশানের শবদাহ দেখে চলে যায় ও তবে মায়ের মুখ দর্শন ও করে না

বাপি ভাবে, কিরকম সাধনা এটা? তারামায়ের মুখ দর্শন না করে ভৈরবীর সাধনা হয় কি করে? উচাটন মন্ত্রে শক্তিকে আহ্বান করতেই হয় শবসাধনা নিশ্চয় ও করে না তাহলে ও বিভৎস ভয়ানক হতো এতো কোমলতা ওতে থাকত না ওদিকে মেয়েটি বলে চলে—

আই ওয়াজ ইন কামাক্ষ্যা বিফোর ইন এ কেভ’— গুহায় ছিল ও! বাপি এবার একটু ভয় পায় আচ্ছা সাহস তো ওর! সাধনার জন্য অন্ধকারে থাকা তাই কী তন্ত্র সাধনায় কালোর ব্যবহার হয়, যা মহাকাল কিন্তু ওর কাপড়ের রঙ তো লালা, হাতে ত্রিশূল আছে তো! ওই লাল কি তাহলে প্রথমে শক্তি অর্জনের উপায় মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে বাপির আজন্ম তারাপীঠে থেকে সে একদিনও তারাপীঠের মহাশ্মশানে রাত কাটায় নি শ্মশানে পড়ে থাকা নরমুণ্ডগুলো কী ভয়ানক! মাঝে মাঝে ওগুলো চুরিও করে কারা যেন আর কথা শুনতে চায় না বাপি পরিচয়ের যবনিকা ঘটলেই যেন হয় হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মেয়েটাকে বলে

আই হ্যাব টু লিভ, মাইন্ড নট

হোম?’

ইয়েস

এনিওয়ান ওয়েটিং দেয়ার?’— কথাটা কোন উপলক্ষে মেয়েটি বলল, তা বাপি জানে না সে শুধু এটুকু জানে এই গুহাবাসী, ত্রিশূলধারী অঘোরী শিষ্যার কাছে থেকে তাকে চলে আসতে হবে তারামায়ের মাটি থেকে মায়ের কাছে শুধু কথাটা কিভাবে পারবে সেটাই সে তখন ভাবছে, এমন সময় মেয়েটি বলে উঠল

ইওর নম্বর?’

কোন এক মোহময়ী স্বরের তাড়নায় সে আওড়াতে থাকল

 নাইন সিক্স সেভেন নাইন এইট ফাইভ ফোর ত্রি ডবল জিরো

 

বাড়ি ফেরার এই স্বল্প পথ যেন আর শেষই হয় না পুরনো বটগাছদুটো পেরিয়েও অনেকটা যেতে হবে ওকে বাইকের লাইটকে যেন মুহূর্তে গিলে ফেলছে রাতের আঁধার কালোর এক অন্তহীন রাজ্যে যেন সে চলেছে যে রাজ্যের খোঁজে মেয়েটি এসেছে সুদূর জার্মানি থেকে যে আঁধারের নিস্তব্ধতা শ্মশানের মতো চারু পান করতে চায় হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে ওর এক্সেলেটরটা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব কোনরকমে মুখের সিগারেটের আগুনকে ভরসা করে বাড়ি ফেরে বাপি

 

খাওয়া দাওয়ার পর ফোনটা হাতে নিয়ে কি যেন ভাবে বাপি একটু খোঁচাখুঁচি করতে করতে টিং করে একটা মেসেজ নম্বর অপরিচিত বয়ানে লেখা—

ইউজ ইওর স্পিরিট...ফাইণ্ড ইওর ওয়ে টুমরো অ্যাট সেম প্লেস টেনও ক্লক

   

মেসেজেটা কার সেটা বুঝতে বাকি থাকে না বাপির নম্বরটা সেভ করে, ইমোজিসহ মুহূর্তে যাকে ভয় পেয়েছিল বাপি, তার মেসেজ পেয়ে কেন জানিনা বাপি খুশি হয় টেনও ক্লকে সূর্য জেগে থাকে দিনের আলোতে বিদেশি শ্রীকে সে পুনরায় দেখা করতে চায় মন তার হিসাবনিকাশ কিভাবে করে সে রহস্য ওই অন্ধকারের মতো জটিল অতত না ভেবে কালকের অপেক্ষায় অধীর হয়ে ওঠে বাপি

সকাল সকাল জামাটা গায়ে গলিয়ে সোজা চলে আসে রাহুলের দোকানে দুতিন পাত্র পান করেও সময় আর কাটে না দশটা তো এখনও বাজে নি? তাহলে এত কিসের তারা? যে আসবে সে কিই বা বলবে?

না না সাধিকারা মন অপেক্ষা মন্ত্র অন্বেষী

হয়তো একটু সাহায্য নেওয়াই ওর আসল উদ্দেশ্য

উনিশের মনকে সে সাধনায় উত্তীর্ণ করেছে

হে মন, ধীরে ধীরে...’ —এসব কথায় বাপি যখন বিভোর, রাহুলের দোকানে যখন গল্পের হাট বসে গেছে,তখন তার চোখ পড়ল সামনে সাদা গায়ে লালের লালিমা মেখে সেই উনিশী আসছে, ধীরে ধীরে চতুর্দিকে হাসির ছোঁয়া লাগিয়ে দিয়ে আপন মনে কে বলবে ও সাধিকা? ওর ওই লালবসন যদি না থাকে, যদি ও সুতিছাপা একটা শাড়ি পড়ে, হাতের কব্জিতে রুদ্রাক্ষের মালা না নিয়ে যদি কাকন ধারণ করে, ত্রিশূলের জায়গায় একটা হাতা বা খুন্তি দিয়ে দিলে,ওকে বাঙালি রমণী মনে হবে গোল টোল পড়া মুখে সিন্দুরের টিপটা সত্যি জ্বলজ্বল করবে ততক্ষণে মেয়েটি কাছে এসে গেছে, চোখ বিনিময়ও হয়েছে দুজনের

সরি ফর লেট’

নো নো

টি?’

সিওর সিওর

রাহুল দুকাপ চা এনে দিয়ে আবার মিচকি হেসে চলে গেল আজকে দোকানের লোকগুলো ওদের বেহায়ার মতো দেখছে ভাবছে হয়তো অনেককিছু বাপির লজ্জা লাগছে এখান থেকে পালাতে পারলে বাঁচে তবুও হুট করে ওঠা যায় না বিদেশিরা জানে বাঙালি বড় শান্ত জীব সহযোগী বাঙালির আতিথ্য বিশ্ববিখ্যাত মানুষের চোখের গ্রাসকে এখানে একটু সহ্য করতেই হবে কথা পাড়ে বাপি—

হোয়্যার ইউ স্পেন্ড দ্যা লাস্ট নাইট?’

মেয়েটি খুব সহজ করে জবাব দেয়—

স্ম্যাশান’— এই উদ্ভট শব্দটি বাপির কানে বাজে না সে আবার জানতে চাই

হোয়্যার?’

মেয়েটি পরপর ওই শব্দটি উচ্চারণ করে

স্ম্যাশান, স্ম্যাশান

বাপি এবার বুঝতে পারে ও শ্মশানে ছিল কাল রাত্রে জিজ্ঞেস করে

ডোন্ট ইউ ফিয়ার?’

নট অ্যাট অল দিস ত্রিশূল ইজ উইথ মি

মেয়েটির যা শারীরিক গঠন, কোমলতা না দেখে যদি তার পুষ্টতা দেখা যায়, তাহলে সে শক্তিতী তার যেমন শ্রী আছে তেমনি আছে শক্তি কোমল কঠিনে মেয়েটি অনবদ্য এসবের সঙ্গে বাপি ভাবে তাহলে ও নিশ্চয় আকুতভয় ভৈরবিনী ও তন্ত্র মন্ত্র শক্তি সাধনার সন্ধানে শ্মশান দর্শন ওর উদ্দেশ্য ওই শ্মশানেই আছে পাঁচটি নরমুণ্ডের আসন আজ বাপির অত ভয় লাগছে না দিনের আলোয় অন্ধকার শক্তির যুক্তিগুলি সে সাজাচ্ছে একে একে অজস্র সাধুর বাস এখানে যজ্ঞের ধুমোতে ওরা শ্মশান বিষাক্ত করে তোলে হ্রিং ক্রিং মন্ত্রও শোনা যায় উচ্চস্বরে বশীকরণ, নিঃসন্তানের সন্তান, গৃহশান্তি প্রভৃতি বিভিন্ন উদ্দেশ্যে এখানে হয় হোম কেজি কেজি ঘি, লঙ্কা, বেলপাতা যেমন পোড়ান হয়, তেমনি বৈষ্ণবদের সমাধিস্থল থেকে লাশও হারিয়ে যায় মাঝে মাঝে ওদিকে মেয়েটি গতরাত্রির কোন কথা আর বলল না বাপি জিজ্ঞেস করলে ও শুধু মুচকি হাসে গুপ্ত সাধনাকে হয়তো সে সুপ্ত রাখতে চায় ইতিমধ্যে সময় অনেকটা গড়িয়েছে লোকের চোখও অসহ্য হয়ে উঠছেবাপি তাই প্রস্তাব রাখল একটু ঘুরতে যাওয়ার মেয়েটি যেন ওটাই চাইছিলস্থানীয় লোক পেয়ে সে যেন বেশ খুশি হয়েছে মতবিনিময় করে ওরা বীরচন্দ্রপুর যাবার সিদ্ধান্ত নিল ওটা নিত্যানন্দের জন্মস্থান কুরুক্ষেত্র থেকে রথের চাকা এখানেই পরেছিল, তাই এটা একচক্রাধাম নিতাই-এর বৈষ্ণবক্ষেত্র এটি

বাইকের পিছনে বসল মেয়েটি কাঁধের উপর নির্দ্ধিধায় রাখল হাত ওর উরু দুটো আঘাত করছে বাপির পিছনে বক্ষকেন্দ্র থেকে থেকে দূরত্ব-শূন্য হচ্ছে বাপির পিঠের সঙ্গে চন্দনের গন্ধ আসছে নাকে আর কথা বলে যাচ্ছে মেয়েটি—

আই হ্যাব নেভার ভিজিটেট হেয়ার বিফোর

ডু ইউ নো,দ্যা গ্রেট রিলিজিয়াস রিফরমার ওফ বেঙ্গল? শ্রীচৈতন্য?’

হু ইজ হি?’

হি ওয়াজ দ্যা ম্যান,হু ডেলিভার্স বৈষ্ণবভক্তি টু এভরিওয়ান নো রিলিজিয়াস বার্ডন ওয়াজ দেয়ার এভরিওয়ান ইজ ইকুয়্যাল ইন হিজ ফিলোফি

মেয়েটি বৈষ্ণব সাধনা সম্বন্ধে জানেনা সে জানে শক্তির সাধনা তারামার মুণ্ডমালের তাৎপর্য সে জানে কিন্তু জানে না, তারাপীঠের কত কাছেই আছে প্রেমসাধনার পীঠ বীরচন্দ্রপুর যেখানে কঠোর সাধনা নয়, কোমল ভালবাসাতে ভগবানকে পাওয়া যায় শক্তি আর ভক্তি এখানে কত কাছাকাছি অবস্থান করে আমরা বুঝেও বুঝতে চাই না যেমন ওই মেয়েটির কোমল কান্তি রূপের ভিতরেই আছে কঠিনের সন্ধান তবে ও কেন নিজের কোমল রূপকে অবলম্বন করে জীবন কাটাচ্ছে না? কেন ও লাল মেখে আরক্তিম হয়ে আছে? কেন ও বুঝছে না সহজ সরল হয়েও প্রেম পাওয়া যায় প্রেম সাধনার মাঝে মজুত আছে এক বিপুল শক্তিভাণ্ডার এসব কথা বাপি ওকে বোঝাচ্ছিল কেন! সেটা সে জানে না ভাললাগার আবেশে সে কথা বলেই চলছিল সে ভালোলাগা কিসে, সেটার সঠিক তালুক অজানা ভাললাগার হয়তো কোন কারণ থাকে না

 

বীরচন্দ্রপুরে মেয়েটি অন্যরূপ ধারণ করল গড় হয়ে প্রণাম করল হাড়াই পণ্ডিতের ভিটেতে, যেখানে নিতাই জন্মেছিলেন রীতিমতো তিলক লাগাল কপালে হরে কৃষ্ণ হরে রাম মন্ত্র বলতে চেষ্টা করল ভিখিরিদের কিছু পয়সাও দিল এসব অবাক হয়ে দেখছিল বাপি কত সুন্দর তার এই সহনশীলতা কত সহজ এখানে সে আন্তরিক হয়ে উঠছিল বাপি আরও আরও কাছের হয়ে উঠছিল সে ধান জমিতে নেমে ধান ছিঁড়ল মেয়েটি গরুর বাচ্চাগুলোকে জড়িয়ে ধরল কদমতলায় বসে খাওয়াল ওদের দেশের সুগন্ধি সুপুরি অর্ধনগ্ন হয়ে স্নান করল রাস্তার ধারে, পুকুরে

 

বিকেল বিকেল ওরা ফিরে এল তারাপীঠ সিদ্ধপীঠ তারাপীঠে পা দিয়ে মেয়েটি জানাল—

ক্যান ইউ ম্যানেজ এ পারমিশন?’

হোয়াট ফর?’

মেয়েটি জানাল সে শ্মশানে মৃতদেহের উপর সাধনা করতে চায় তাই পুলিশি পারমিশন চাই ওর কথাটা শুনে আঁতকে উঠল বাপি যে মেয়েটি এই কিছুক্ষণ আগে প্রেমসাগর বীরচন্দ্রপুর ঘুরে এল, সে কী করে এখন শবসাধনার কথা ভাবছে গা শিরশির করছে বাপির দিনের আলোতে এত আনন্দ যেখানে আছে সেখানে অন্ধকারের কি দরকার? কী দরকার মৃত শবদেহের? কৃচ্ছসাধনার পথে কেন হাঁটছে ও? প্রেম কেন উদয় হয় না ওর মনে? যার অঙ্গে অঙ্গে এক অপরূপ লাবণ্য আছে, যার বয়স উনিশের ঘরে, যার মাঝে মায়া আছেসে কেন যাচ্ছে অন্যপথে? আলো-আঁধারের দুই মুখ হয়ে উঠছে এই জার্মান যুবতী বাপির মনের কথা ওর মনের গুহায় প্রবেশ করেনি হয়তো প্রবেশ হওয়ার অপেক্ষাও করতে পারে না আর বাপি

মেয়েটি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে তারাপীঠ পুলিশ স্টেশনের দিকে পুলিশ ওকে সন্দেহ করতে পারে, এই বঙ্গীয় চিন্তা ওর নেইওকে আটকাবে কে? শক্তিকে বশে আনার বিন্দুবিসর্গ জানে না বাপি আর যেটা জানে,সেটা ওই মেয়েটি জানতেও চাইবে না উনিশের এই নারী প্রকৃতির কোমলতা আরওমল হতে পারতশক্তির মোহ তাকে কেন ভুলিয়ে রাখল এভাবে এসব ভাবতে ভাবতে পিছিয়ে যাচ্ছে বাপি আর অগত্যা বলে বসেছে—

প্লিজ ডিলিট দ্যা নম্বর ফ্রম ডিভাইস

মেয়েটি অগ্নিবর্ণ হল ফোনটা ধরে হন্তদন্ত হয়ে খুঁজল বজ্রকণ্ঠে জানাল—

ডিলিটেড

লেখকের  অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।

 লেখক পরিচিতি—

কবি ও কবিতা বিশ্লেষক। প্রাবন্ধিক। লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্র-সমীক্ষা ভিত্তিক গ্রন্থ রচয়িতা। নানা লোকসেবামূলক সংস্থার সদস্য।