অফিসে আমাকে একান্তে ডেকে দেবেন বলল, আমার কেসটা দয়া করে আপনি একটু দেখবেন স্যার ?
দেবেন অফিসের সকলকেই 'স্যার'বলে। আমাদের অফিসে দেবেনের চেয়ে
নিচুতে আর কেউ নেই। পনের বছরের ওপর সার্ভিস করছে। অথচ আজও দেবেনের কোন সার্ভিস বুক
নেই। ভবিষ্যৎ
নিরাপত্তার জন্য পেনসন,প্রভিডেন্ট ফান্ড,গ্রুপ ইনসিওরেন্স এসব কিছুই নেই। মাসের শেষে দেবেন ভাউচারে সই করে মাইনে
নেয়। বড়বাবু সাবধানী ভিতু মানুষ। দেবেনের আটশো টাকা বার তিনেক গুণে দেন। মুখে বলেন,তুইও একবার গোনো। আমার সামনে।
মাস কয়েক হল দেবেন বিয়ে করেছে।
নির্মল বসাক বলল,দেবেনকে নাকি ধরে বেঁধে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। কথাটা বলেই খিক খিক শব্দ করে
এমনভাবে হাসল যার অর্থ ভেতরে গোলমেলে ব্যাপার আছে। দেবেনের সঙ্গে কোন মেয়ে
স্বেচ্ছায় গোলমালে জড়াতে পারে,ভাবতেই কেমন অবাক লাগে। দেবেনের
বউ নাকি আবার চাকরি করে। পঞ্চায়েত অফিসে। অঙ্গনওয়ারীর
কাজ। বয়সেও দেবেনের চেয়ে বেশ ছোট। মা ছাড়া মেয়েটির সাতকুলে কেউ নেই। দেবেনকে
ঘরজামাই করে রেখেছে। জীরাট না বলাগড় কোথায় যেন ওর শ্বশুরবাড়ি।
বিয়ের আগে দেবেন আমাদের অফিস বাড়ির দোতলার বারান্দায়
শুত। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বারান্দায় শুয়ে দেবেনের পনেরটা বছর কেটেছে। এখন শ্বশুরবাড়ি
থেকে অফিসে যাতায়াত করে। ভোর ছটায় বাড়ি থেকে বেরোয়। রাত দশটায় বাড়ি ঢোকে। ওদের
লাইনে গাড়ির সংখ্যা কম। তার ওপর সিঙ্গেল লাইন। ক্রসিং-এ দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে
ট্রেন।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামলেই দেবেন বাড়ি ফেরার ফাঁকফোকর
খোঁজে। আমাদের বড়সাহেব,ডিসট্রিক্ট সুপারিন্টেনডেন্ট,কাজ পাগল মানুষ। ফাইলের মধ্যে ডুবে থাকলে কোনদিকে তাঁর হুঁশ থাকে না। কাজের
চাপ কম থাকলে অধস্তন অফিসারদের সঙ্গে বসে গল্প করেন। মুড়ি বাদাম আনিয়ে খান। শুনেছি
ওনার স্ত্রী একটি কলেজের অধ্যাপিকা। সল্টলেক থেকে প্রতিদিন ভদ্রমহিলা দীর্ঘ পথ যাতায়াত
করে চাকরি করেন। হয়ত স্ত্রীর ফিরতে দেরী হয় বলেই সাহেব নিজের অফিসে বসে সময় পার
করেন। সাহেবের সুবিধা, তিনি যতক্ষণ না উঠছেন, অন্যদের ইচ্ছা থাকলেও তাদেরও বসে থাকতে হয়। অযথা বকতে হয়। অকারণে হাসতে হয়।
বারবার চা আনাতে হয়। দেবেনের অসুবিধা সবচেয়ে বেশী। কারণ সবার শেষে আলো পাখা বন্ধ
করে, দরজায় তালা লাগিয়ে চাবির গোছা
কাপড়ের হাতব্যাগে ভরে তাকে বাড়ি ফিরতে হয়। আবার পরদিন সকালে নটার মধ্যে অফিস খুলতে
হয়। তারপর ঝাঁটপাট, টেবিল চেয়ার ঝাড়ামোছা, খাবার জল ভরা, এইসব দিয়ে তার নিত্যকর্ম শুরু
হয়।
দেবেন সম্পর্কে অফিসের লোকের দুরকম ধারণা আছে। কেউ বলে
দেবেন যথেষ্ট পরিশ্রমী। আবার কারোর মতে একনম্বর ফাঁকিবাজ। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে
হয়, দেবেন এ দুয়ের মাঝামাঝি কিছু
একটা। যেমন সবাই হয়। প্রয়োজনে কাজ করে। অপ্রয়োজনে মিথ্যে কথাও বলে কখনও কখনও। চা
সিগারেট বা টিফিনের জন্য মুড়ি-বাদাম ডিম-টোস্ট এইরকম কিছু আনতে দিলে দেবেন
অতিরিক্ত টাকাপয়সাটুকু ফেরত দেয় না। এই ব্যাপারটায় দু চারজনের ক্ষোভ থাকলেও মুখে
কেউ কিছুই প্রকাশ করে না। দেবেনের চাকরি পাকা নয়। মাইনে কম। তার ওপর সম্প্রতি বিয়ে
করেছে, এইরকম সাতপাঁচ ভেবেই তার এই
অসঙ্গতিগুলো কমবেশি সবাই মেনে নিয়েছে।কেউ কেউ আফসোস করে, বিয়ে না করলেই দেবেন বুদ্ধিমানের কাজ করত। একার পেট র ঠ করে চলে যেত।
অর্থাৎ তারা ধরেই নিয়েছে চাকরি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত দেবেনের চাকরি পাকা হবে না
এবং তার মাইনে আটশ টাকাতেই আটকে থাকবে।
দেবেনও স্থির বিশ্বাসী ছিল মাসিক আটশ টাকা মাইনেতেই সে
আটকে থাকবে শেষ দিন পর্যন্ত। কোর্ট বারান্দায় শুয়ে, নিউ রাজলক্ষ্মী হোটেলে দুবেলা খেয়ে, সন্ধেবেলায় শশীর চায়ের দোকানে বসে কিছুক্ষণ গুলতানি করে, সুবেশী সুন্দরী কিছু নারী দেখে তার দিন কেটে যাবে। মাসে একটা কি বড়জোর দুটো
সিনেমা নাইট শোয়ে দেখলে মনের ক্লান্তি দূর হয়। এটা দেবেনের বিশ্বাস। কয়েকটি সিনেমা
আবার একাধিকবার দেখেছে। যেমন 'সপ্তপদী', 'রাম তেরি গঙ্গা মইলি', 'লাভ স্টোরি', 'বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না'।
'সপ্তপদী' দেবেন
তিনবার দেখেছে। 'এই পথ যদি না শেষ হয়' – এই গানটি তার সবচেয়ে প্রিয় গান। আহা অমন একটি মোটর
সাইকেল আর পিছনের সিটে গলা জড়িয়ে ধরে বসে আদুরে মুখের একটি মেয়ে। কোর্ট বারান্দায়
শুয়ে শুধু এই একটি ছবির কথা ভাবতে ভাবতে প্রায় রাতেই তার ঘুম ছুটে গেছে।
আসলে চারপাশের মানুষজনের মধ্যে দেবেন এতই ছোট, এতটাই অনিশ্চিত চালচুলোহীন তার জীবনযাপন যে এইরকম একটা গাড়ি বা অমন একজন
নারীর নিবিড় সান্নিধ্যের কথা সে নিজে কল্পনা করতেও ভয় পেয়েছে। ভরসা পায়নি। যখনই
তার মনে পড়েছে, তখনই কেন্নোর মতো আপনিই গুটিয়ে
গেছে। নিজেকেই নিজে শাসন করেছে, খবরদার। অন্য সবার যা মানায়, ওকে তা মানায় না। এটা দেবেন ভালমতো জানে। গোঁড়া থেকেই জানে। আর জানে বলেই 'হ য ব র ল' গোছের একটি জীবনধারায় সে বেশ
অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। ক্ষোভ দুঃখ হতাশা অথবা রাগ ক্রোধ প্রতিহিংসা এসবের কোন কিছুই
তার বোধের মধ্যে ছিল না। জড়পদার্থকে গড়িয়ে দিলে সেটা যেমন নির্বিকার কিছুটা পথ
গড়িয়ে গিয়ে আপনি থেমে যায়, দেবেনও ভাবত গড়াতে গড়াতে একদিন
সেও ওইরকম থেমে যাবে।
তার জন্য
শোক করার কেউ নেই। মনে রাখা অনেক দূরের কথা। একদিক থেকে ভাবলে বেশ ঝাড়া হাত পা
বেঁচে থাকা।
দেবেনের মনে ধন্দটা জাগিয়ে তুললেন আগের সুপারিন্টেনডেন্ট, সেন সাহেব। রাশভারী মানুষ। কাজও জানেন বিস্তর। এই সেন সাহেবই একদিন দেবেনকে
ডেকে বললেন, পনের বছর চাকরি করছ, এখনও চাকরি পাকা নয় কেন?
দেবেন কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে মিনমিন করে বলল, আমি কি স্যার অতশত বুঝি?
- তুমি না বোঝ, অন্যেরা তো বোঝে। বলে তিনি ক্র্যাং ক্র্যাং করে বলে টিপে বড়বাবুকে ডাকলেন।
তারপর অ্যাকাউন্টট্যান্ট, মেজো সাহেব, সদর সাহেব একে একে সবাইকে ডেকে রুদ্ধদ্বার মিটিং করলেন। দেবেনের চাকরি পাকা
করার ব্যাপারে।
পরদিন অফিসের সকলের মুখে একটিই কথা, দেবেনের জন্য নতুন ফাইল খোলা হয়েছে। কথাটা এর ওর তার মুখফেরতা হয়ে পেঁজা
তুলোর মতো উড়তে উড়তে আই.সি.ডি.এস., মোটর
ভেহিকলস, রেজিস্ট্রি অফিস হয়ে খোদ
ট্রেজারিতে পৌঁছে গেল। কোর্ট চত্বরের সব দপ্তরের লোকজন কমবেশি দেবেনকে চেনে।
ট্রেজারিতে এবং এ.ডি.এম. অফিসে একটু বেশী করে চেনে। কারণ চেকের খবর নিতে এবং ফাইল
পৌঁছতে বা নিয়ে আসতে তাকে এই দুটি দপ্তরে প্রায় রোজ যেতে হয়।
ট্রেজারি অফিসের তাপসবাবু বললেন, কীরে দেবেন, মিষ্টি খাওয়াবি তো ?
দেবেনকে খাওয়াবার প্রশ্ন কেউ কোনদিন করেনি। আনকোরা এই
প্রশ্নটি শুনে দেবেন প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। তাপসবাবুর দিকে চেয়ে অবাক গলায়
বলল, আমাকে খাওয়াবার কথা বলছেন? কেন?
- চাকরি পাকা হয়ে যাচ্ছে।
তাপসবাবু ইশারায় দেবেনকে কাছে ডাকলেন, তোর জন্য নতুন ফাইল খোলা হয়েছে। একটু থেমে বললেন, মাইনে কত বেড়ে যাবে জানিস?
- না। দেবেন ঘাড় নাড়ল। করণ সে
সত্যি জানে না, তার মাইনে আটশ টাকা থেকে বেড়ে
কত দাঁড়াবে। সর্বোপরি তার নামে ফাইল খোলার ব্যাপারটাই তাকে বেশ অবাক করে দিয়েছে।
প্রতিদিনই ওপরওলাদের নির্দেশমতো সে গোছা গোছা ফাইল নাড়াচাড়া করে। লেখাপড়া কম জানলে
কী হবে, ফাইলের আয়তন এবং রং দেখেই বুঝতে
পারে ফাইলের বিষয়বস্তু কী এবং কোন সাহেবের বা কোন কেরানী-বাবুর টেবিলে সেটি পৌঁছতে
হবে।
কিন্তু তার মতো অস্থায়ী একজন কর্মী, অফিসের খাতায় যার নাম পর্যন্ত নেই, আরশোলা উচ্চিংড়ে টাইপের একজন মানুষের জন্য কেনই বা হঠাৎ করে ফাইল খোলা হবে!
বা কোন কারণ ছাড়াই ওপরঅলা আচমকা কেন তার প্রতি এত দরদী হয়ে উঠলেন, এ ব্যাপারটাও তাকে বেশ ভাবিয়ে তুলল।
মুখে প্রকাশ না করলেও মনে মনে দেবেন কিন্তু যথেষ্ট
অস্থির হয়ে পড়ল। একসময় তার এমনও মনে হল, তার প্রতি যে অন্যায় অবিচার করা হচ্ছে দীর্ঘ বছর ধরে, সত্যি সত্যি তা দূর করার জন্য এবার স্বয়ং ঈশ্বর মাঠে নেমে পড়েছেন তার হয়ে
ওকালতি করার জন্য। তাপসবাবুর কাছ থেকে পুরো ব্যাপারটা ধীরেসুস্থে বুঝে নেওয়ার পর
সে ভেতরে ভেতরে চার্জড হয়ে গেল। আর দু চার মাসের মধ্যেই কিছু একটা হতে চলেছে, এই আনন্দে তার দুচোখ ঝাপসা হয়ে গেল।কথা বলার চেষ্টা করেও পারল না। ঠোঁট
দুটি যেন আঠা দিয়ে আটকে দিয়েছে কেউ। কোর্ট চত্বর ছেড়ে সে ফেরিঘাটে এলো ভরদুপুরে।
এমনিই।
গঙ্গার প্রবাহিত স্রোতের দিকে চেয়ে আপন মনেই বলল, এবার শালা পায় কে ! হাত দুটিকে
এমনভাবে ঘোরাতে লাগল যেন দুটি হাত দুটি ডানা। ডানার জোর পরীক্ষা করছে। বাস্তবে
দেবেন যেমন কারোর কোন ক্ষতি করেনি, তার
ক্ষতিও কেউ করেনি। তা সত্ত্বেও কার উদ্দেশ্যে যে সে বলল, 'এবার শালা পায় কে !' বা হাত ঘুরিয়ে নিজের দৈহিক
ক্ষমতা যাচাইয়ের প্রশ্ন তার মাথায় এলো কেন, কে জানে!
মানুষ হিসাবে দেবেন আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমনই। তার কাজকর্মের ধরনধারণেও কোন হেরফের হল না। এমনকি তার মাস
মাইনেও যা ছিল, তাই রয়ে গেল। মাস শেষে ভাউচারে
সই করে আটশ টাকা।
বড়সাহেব, মেজ
সাহেব বা কেরানীবাবুদের কাউকেই দেবেন তার ফাইলের ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস
পেল না। তার চাকরি পাকা হওয়ার ব্যাপারে এবং মাইনেপত্তরের উন্নতির ব্যাপারে ফাইলে
সত্যি সত্যি কী লেখা হয়েছে, সে জানে না। অ্যাকাউন্টট্যান্ট
আশিসবাবু একদিন ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তোর
জন্মসালের কোন কাগজপত্র আছে?
দেবেন ঘাড় চুলকে বলল, আজ্ঞে না।
- পঞ্চায়েত থেকে লিখিয়ে আনতে
পারবি ?
- দেখি। দেবেন মুখে বলল। কিন্তু
মনে মনে ভাবল পঞ্চায়েত তাকে হঠাৎ করে লিখে দেবে কেন? শ্বশুরবাড়ির সুবাদে সে এখন পঞ্চায়েত বাসিন্দা। কিন্তু তার জন্ম তো সেখানে
নয়। হাওড়ার কোন এক গ্রামে। নামধাম কিছুই মনে নেই। মা অপঘাতে মরেছিল। বাবা
নিরুদ্দেশ। সন্তানহীনা পিসি তাকে নিয়ে এসেছিল এই শহরে। তার কিছু বছর পরে পিসি মারা
গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে পিসির ভাইপোরা মাটির দেওয়াল টালি মাথায় একটি ঘরের দখল নেওয়ার
জন্য, দেবেনকে রীতিমত চড়চাপড় মেরে
বাড়ি থেকে বের করে দিল। তারপর থেকে মাস কয়েক আগে বিয়ে না হওয়া অব্ধি পথই ছিল
দেবেনের ঠিকানা। সুতরাং পঞ্চায়েত অফিস থেকে জন্মসাল লিখিয়ে আনার ব্যাপারটা বিশ
বাঁও জলের ব্যাপার। তা সত্ত্বেও দেবেন নিজের ভেতরে অদ্ভুত একটা জেদ অনুভব করল। মা
বাপ হারা একটি ছেলের, এই দুর্যোগভরা পৃথিবীতে যার
হারিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, টাল খেতে খেতে আজ সে আর
পাঁচজনের মতো সংসারী। মাথা গোঁজার জায়গা হয়েছে। সুখদুঃখের গল্প করার সঙ্গী হয়েছে। 'কিছুই না' পাল্টি খেয়ে যখন একটু একটু করে 'হ্যাঁ'-র দিকে এগোচ্ছে, তখন একবার চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী?
আর অদ্ভুত ব্যাপার,দেবেনের বউ এদিক সেদিক করে দেবেনের জন্মসাল সংক্রান্ত একটা সার্টিফিকেটও
জোগাড় করে ফেলল। দেবেনচন্দ্র প্রামাণিক। জন্মসাল ১৯৬৫, দিঘড়া পটাশপুর গ্রাম। পোঃ – বলাগড়। জেলা – হুগলী। পঞ্চায়েত অফিসের ছাপছোপ
মারা। বেশ ঘোরানো প্যাঁচানো একটি সইও রয়েছে স্ট্যাম্পের ওপরে।
অফিসের সকলে জেনে গেল,দেবেনের ফাইলে যেটুকু ফাঁক ছিল,জন্মসাল সংক্রান্ত সার্টিফিকেটটি জমা দেওয়ার পর সে ফাঁকটুকু ভরাট হয়ে গেছে।
অর্থাৎ আর দু একমাসের মধ্যেই দেবেনের সত্যি সত্যি একটা হিল্লে হতে চলেছে। নানাজন
নানারকম আবদার করল। টাইপিস্ট দেবুবাবু তো কয়েক ধাপ এগিয়ে দুম করে বলেই বসল,এবার একটা বাচ্চাকাচ্চা হয়ে যাক দেবেন। ঘটা করে মুখে ভাত লাগিয়ে দে। আমরা
সবাই আনন্দ করে নেমন্তন্ন খেয়ে আসি।
হঠাৎ করে বাচ্চাকাচ্চার কথা উঠতেই দেবেনের বুকের মধ্যে
একটু যেন চলকে উঠল। কোর্ট বারান্দায় শুয়ে যার রাত কেটেছে, এরপর সে কিনা সন্তান আর বউ নিয়ে, সিনেমায় যেমন দেখায় সেইরকম ভাবে শিশুটিকে আদর করতে করতে বা বউয়ের সঙ্গে
শিশুটির ভূত ভবিষ্যৎ বিষয়ে কথা বলতে বলতে একসময় কথা জড়িয়ে আসবে যখন, পাশ ফিরে বউকে বলবে, বড্ড খাটনি গেছে অফিসে। ঘুম
পাচ্ছে।
সেন সাহেব একদিন দেবেনের হাত দিয়েই তার ফাইলটি এ.ডি.এমের
কাছে পাঠিয়ে দিলেন। রিভলভিং চেয়ারে সামান্য ঘুরে গিয়ে একমুখ হেসে বললেন, আমার কাজ শেষ। এবার এ.ডি.এমের সই হয়ে ডাইরেকটরেট ঘুরে আসতে যেটুকু সময়...।
ফাইলটি হাতে ধরে দেবেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। সাহেবের কথা শুনছে। ঠিক শুনছে না। চোখ মুখ
নাক দিয়ে গিলছে। সাহেব অনুযোগের সুরে মৃদু ধমক দিলেন, আচ্ছা বোকা তো! যা তাড়াতাড়ি। আর শোন? বলে জামার পকেটে হাত ঢোকালেন,কড়া
করে এক কাপ চা আনবি।
- পয়সা রাখুন স্যার। দেবেন কৃতজ্ঞ
গলায় বলল।
ফাইল যথাসময়ে এ.ডি.এমের সই-সাবুদ হয়ে দপ্তরে ফিরে এলো।
চিঠিচাপাটি লেখা হল। তাতে মেমো নম্বর ফেলে কলকাতায় ডাইরেকটরেটে পাঠিয়েও দেওয়া হল।
এত দূর পর্যন্ত সব ঠিকঠাক মতো হয়ে যাওয়ায় দেবেনের আত্মবিশ্বাস একটু শক্তপোক্ত হল।
আর তো দু চার মাসের মকদ্দমা।
কোন কিছুর জন্য প্রতীক্ষা করার ঘটনা দেবেনের জীবনে আগে
কোনদিন ঘটেনি। স্বভাবতই অন্যদের ক্ষেত্রে যেমন হয়, উদ্বেগ ভয় বা একটু ঘাড় উঁচিয়ে চলা, পাশ ফিরে তাকানোর মতো চাপা আত্মম্ভরিতা, দেবেনের সেসবের কিছুই হল না। সে কেবল মনে মনে কয়েকটি ছক কষল। যেমন সে তার
বউয়ের অঙ্গনওয়ারীর যৎসামান্য মাইনের চাকরিটা ছাড়িয়ে দেবে। চুঁচড়োয় বাসা ভাড়া নেবে।
আর এসবের পর একটু থিতু হয়ে বসবে যখন, তখন
একটা কাচ্চা বাচ্চার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা
করবে।
কিন্তু মজার ব্যাপারটা হল ডাইরেকটরেটে তার ফাইলটা যাওয়ার
পর থেকে অফিসের সকলের চোখে দেবেনের আচার আচরণ, কাজকর্মের ধারা প্রকৃতি সবই অন্যরকম মনে হতে লাগল। শ্যামবাবুর মনে হল, দেবেন আগের মতো ঝুঁকে চলার পরিবর্তে এখন সোজা হয়ে বুক চিতিয়ে হাঁটে।
অসিতবাবু বেশ উঁচু গলায় সকলকে শুনিয়েই বললেন, দেবেনের হাতটানটা যেন আগের থেকে বেড়েছে। ভেরি ব্যাড হ্যাবিট। অসময়ে উল
বুনতে বুনতে মাথা না তুলেই স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে রানুদির উৎকণ্ঠা ছোপানো প্রশ্ন, দেবেনের বউয়ের বাচ্চাকাচ্চা হবে নাকি? সেদিন দেখলাম, হকার্স মার্কেটে ছোট একটা ফ্রক
তুলে নেড়েচেড়ে দেখছে।
বড়বাবুর কথাবার্তা ধীর-স্থির। কিন্তু ইঙ্গিতময় এবং
অর্থবহ, দারওয়ানের হাতে লাঠির পরিবর্তে
বন্দুক তুলে দিলে, তার চালচলন তো পাল্টাবেই ভাই।
দেবেনের কথা শোনার বা তার সঙ্গে বসে গল্প করার মতো লোক
আমাদের অফিসে কেউ নেই। কারণ পদমর্যাদায় দেবেন সবার নিচে। তেমন কেউ থাকলে নিশ্চয়ই
জানতে পারত, দেবেন ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন
প্রতিমুহূর্তে নিজের দোষত্রুটিগুলি শোধরাবার চেষ্টা করছে। অনেক বিষয়ে অজ্ঞ হলেও
দেবেন এটা জানে, চাকরিতে উন্নতির সময় বেচাল কোন
কাজ করা উচিত নয়। দেবেন এখন অপ্রয়োজনে মিথ্যে কথা বলে না। কোন কাজে অহেতুক ঢিলেমি
করে না। কেউ কিছু কিনতে দিলে ন্যায্য দামটুকু নিয়ে অতিরিক্ত অর্থটুকু ঠিকঠাক ফেরত
দেয়।
তা সত্ত্বেও কেন যে অফিসের সকলের চোখে দেবেনের সবকিছুই
মাত্রাতিরিক্ত সন্দেহজনক ঠেকছে, কে তার ব্যাখ্যা করবে!
প্রথম প্রথম আমার মনে হয়েছিল, এর পিছনে নিশ্চয়ই সঙ্গত কোন কারণ আছে। কিন্তু সন্তর্পণে দেবেনের প্রতি
তীক্ষ্ণ নজর রেখেও দোষারোপ করার মতো, অভিযোগ
করার মতো কোন কিছুই আমার চোখে পড়েনি। আমি তাই দেবেনকে একদিন আড়ালে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার ব্যাপারটা কতদূর এগোল?
দেবেন ঘাড় নেড়ে জানাল, না। অর্থাৎ কিছুই এগোয়নি বা কোন খবর নেই। ব্যাপারটা এখানেই থেমে গেছিল। সেও
নয় নয় করে মাস দুয়েক আগের ঘটনা। তারপর আজ হঠাৎ করে আমাকে একান্তে ডেকে দেবেন কাতর
অনুরোধ করল, আমি যেন তার কেসটা দয়া করে একটু
দেখি।
অফিসে আমি কোন ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত নই। ডাইরেকটরেটে
কারোর সঙ্গেও আমার তেমন দহরম মহরম নেই। কিন্তু তারপরেও সরাসরি 'না' বা 'সম্ভব নয়' বলতে পারলাম না। চুপ করে রইলাম।
ইতিমধ্যে সেন-সাহেব বদলি হয়ে গেলেন। নতুন
সুপারিন্টেনডেন্ট ঘোষাল সাহেব এলেন।আমার মাপের অন্য সব মাঝারি আমলাদের মতো আমিও
নতুন সাহেবের মেজাজ-মর্জি বোঝার জন্য, নিজেকে একটু বেশী করে চেনাবার জন্য, সাহেব কী ভালবাসেন, কোন জাতীয় ব্যাপার তাঁর
অপছন্দের তালিকায় এসবের খানাতল্লাশিতে বেশীরকম মগ্ন হয়ে পড়লাম। দিনকাল ভাল নয়।
কনফিডেনসিয়াল রিপোর্টে সামান্য হেরফের ঘটে গেলে পরবর্তী প্রোমোশন এবং পোস্টিং
দুক্ষেত্রেই মার খেয়ে যাব। কেরানীদের ক্ষেত্রেও তাই। তাদেরও টেবিল বদলের ব্যাপার
আছে। ফলে অফিসার, সাবঅর্ডিনেট অফিসার, কনস্টেবল থেকে শুরু করে কেরানী-বাবুরা পর্যন্ত নতুন সাহেবের চারপাশে একটি
বৃত্ত তৈরি করে যে যার মতো করে নিজেকে হাইলাইটেড করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
ব্যতিক্রম দেবেন। আগের মতোই সে প্রত্যেকের ফাইফরমাশ
খাটতে লাগল। নতুন সাহেব দেবেনের মুখটুকু চিনলেন মাত্র। তার ফাইল ইত্যাদি সম্পর্কে
কিছুই জানলেন না।
সামান্য ফাঁকফোকর পেলেই দেবেন মিনমিনে গলায় আমাকে বলে, আমার কেসটা স্যার ....! আমি যখন যেমন মাথায় আসে, সেইভাবে কখনও বলি, ডাইরেকটরেটে কথা হয়েছে। কখনও
বলি নতুন সাহেবের সঙ্গে তোমার ফাইলটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বা তোমার ফাইলটা
ডাইরেকটরেট ফাইনান্সে পাঠাবে খুব তাড়াতাড়ি। দেবেনের চাকরি পাকা হওয়ার ব্যাপারে আমি
আদৌ কিছুই জানি না। জানার চেষ্টাও করি না।
একান্ত বিরক্ত বোধ করি যখন সংক্ষেপে বলি,আরে বাবা! আমার তো একটা দায়িত্ব
আছে,নাকি?আমার গলায় উত্তাপ আঁচ করেই
বোধহয় দেবেন মুহূর্তে কুঁচকে যায়,সে তো
জানি স্যার....! আপনি তো অন্যদের মতো নন। দেবেনকে খুব সংকুচিত দেখায়। তখন তাকে
কাছে ডেকে তার কাঁধে হাত রেখে বলি,যুদ্ধে
নেমেছি কি এমনি এমনি!
মুহূর্তে দেবেনের চোখ মুখের চেহারা পাল্টে যায়। হেসে বলে,চা খাবেন তো স্যার? হাত নেড়ে ইশারায় জানায় পয়সা
দিতে হবে না।
এক এক সময় নিজের ওপর নিজের রাগ হয়। এই বিড়ম্বনার জন্য
আমি তো নিজেই দায়ী। সেদিন যদি দেবেনের অনুরোধের জবাবে স্পষ্ট করে 'না' বলে দিতাম, তাহলে আজ এইভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে মিথ্যে বলার প্রয়োজন হতো না। দেবেন সরল-সিধে এবং ভিতু প্রকৃতির মানুষ। আমার জবাবের সত্যাসত্য যাচাই করার মতো
বুদ্ধি দক্ষতা এবং সাহস কোনটাই ওর নেই। যদি এর উল্টোটা হতো?
আমি ঘাড় কাত করে সাবধানে দেখি দেবেন চায়ের কেটলি হাতে
চলেছে। ছোটখাটো চেহারা। নিশ্চয়ই অন্য কারোর জামা পড়েছে। হাতা দুটির একটি
বিসদৃশভাবে টেনে গুটিয়ে পাকিয়ে কনুই বরাবর তোলা। অন্যটি হাত ছাড়িয়ে অবলম্বনহীন
ঝুলছে।
দেবেন হেঁটে যাচ্ছে। একা নয়। তার ছায়াটি তার সামনে সামনে
হাঁটছে।
মানুষ দেবেনের চেয়ে তার ছায়াটিকে লম্বায় বেশ বড়
দেখাচ্ছে।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি –
লেখালিখির শুরু গত শতকের শেষ দশকে। বাণিজ্যিক পত্রিকার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে
লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি। গল্প সংকলন আটটি এবং তিনটি উপন্যাস।