Advt

Advt

jahawar-story-galpo-by-shibshankar-pal-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-জহর-গল্প-শিবশঙ্কর-পাল

                                       

আজ সকাল থেকে তার মেজাজ সপ্তমে সাত সকালে গোবর জল দিয়ে উঠোন ধোয়া, ঘরের মেঝে নিকানো, জামাকাপড় সার্ফ দেওয়াএসব জহরার নিত্যকাজজহরা পালবাড়ির কাজের মেয়ে বয়স পঞ্চাশের কোঠায় শরীরে সারাজীবনের ধকলের চিহ্ন কাজ করতে করতে, বাসনকোসন মাজতে মাজতে সে পরিশ্রান্ত জহরা মুসলিম নারী এক পুত্রের মা জহরার ছেলে-বৌ তার ভাতকাপড়ের দায়িত্ব ন্যায় নি বরং বয়স্ক জহরার মাস-মাইনের টাকাটা হাতাতে ওরা ব্যস্ত সে বিরোধ করে না বাৎসল্যের করুণ টানে নির্দ্বিধায় তুলে দেয় ওদের হাতে সেটা মাতৃত্বের এক আশ্চর্য সমীকরণকিছু কিছু মানুষের জন্ম হয়, খেটে খেটে মরার অপেক্ষায় শুধু গায়ে গতরে পরিশ্রম করার জন্য জহরা তার জ্বলন্ত উদাহরণ বাসন মাজতে গিয়ে জহরার পেশিতে টান পরে ঝাঁট দিতে গেলে গুঁড়ি হয় না মাজা জল ঘেঁটে ঘেঁটে হাতে-পায়ে পড়ে হাঁজা তবুও কাজ করতে হয়, পেটের দায়ে, অভাবের তাড়নায়, বেহায়া পাকস্থলির দাবি মেটাতে বয়স্ক জহরা যেন প্রাণের দায়ে মরতে মরতেও কাজ করে কাজ করতে হয় তাকেশরীরের অবসন্নতা, পেশীর সংকোচন স্নায়ুতন্ত্রে গিয়ে বলে—তিষ্ট ক্ষণকালমস্তিষ্ক, পেশী আর পেটের সুসমাধান করতে পারে না অতিরিক্ত রক্ত প্রেরণ করতে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে—পারছি না আর, আমি নই প্রেসার-কুকার সে যন্ত্রণা জন্ম দেয় উষ্ণতা-জ্বালা-ব্যথা রক্তমাংসের জহরা এসব বোঝে না, কিন্তু বুঝিয়ে দেয় ওর কথাবার্তা রাশিকৃত নোংড়া জামাকাপড়,খসা পাতা ভর্তি উঠোন, তেলচিটে রান্না চাতাল— জহরার মেজাজকে টঙ করে রাখে

তবুও ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে ঘুমের শেষে সকালটা জহরার ভালই লাগে শরীর একটু সতেজ হয় শেষ রাতে ফুটে ওঠা ফুলগুলো তাকে দেখে হাসে পায়রা শালিকের কথাতালে সে ঘসে নেই একটু লাল মাজন ঠাণ্ডা জলে গোরব গুলে ছড়িয়ে দেয় উঠোনময় গবাদির জন্য খড় কাটতে কাটতে গা চাটে সাদা ফটফটে গরুবাচ্চাটা মায়ের আহ্লাদ হয় জীবভেদে মাতৃসত্বা এক এভাবেই শুরু হয় জহরার সকাল কিন্তু তা টেকে না বেশীক্ষণ

-ঘরের ছোটবাবু রাত জাগে শখে না প্রয়োজনে, কেও জানে না  ঘড়ির সকাল কাঁটা নটার ঘরে পৌঁছায় বিছানা ছাড়ে সে সেদিন সকালে বাড়ির পাশের রাধাচূড়াতে ডেকে চলেছিল হলুদ হলুদ ছোটপাখি নিমফলের গন্ধ ছড়াচ্ছিল ভুরভুর করে ডেকে গেল বেহয়া এক কোকিল সে ডাক ছোটবাবুর সুপ্রভাতী আমেজে ভর করে হাতের ব্রাশ হয়ে যায় গতিহীন সে ব্রাশের চলন-গমন সমাধা করতে করতে ছোটবাবু বলল

 কী রে জহরা তোর আজ হয়েছেটা কী? সকাল থেকে গজগজ করতে শুরু করলি?’

 উত্তর দিতে বয়েই যায় জহরার রান্নাঘরের পাশে জড়ো হয়ে আছে এঁটো বাসনের কাঁড়ি বালতি বালতি জল দিয়ে ধুতে হবে উঠোন-চাতাল-দোতলার ঘরবারান্দা কোনদিনই কী এর নিস্তার নেই? কোনদিনই কী ছুটি পাবে না জহরা? প্রতিদিনের এই অত্যাচার বয়স্ক পেশীগুলো আর সামলাতে পারছে না প্রতিদিন সূর্য উঠলে তার ভয় করে, পেশির শিরা-উপশিরাগুলো শিরশির করে ওঠে খুব সকালের সেই ক্ষণিক সতেজতা লহমায় রাতের সঞ্চিত ক্যালরি পুড়িয়ে ফেলে

 জহরা মনে মনে ভাবে ছোটবাবুর প্রশ্নের উত্তর দেবে না  আবার ছোটবাবুকে হাতে না রাখলে মাঝে মাঝে লাল মাজন মাজার পয়সা দেবে কে? জ্বর-জ্বালা হলে ঔষুধ? ওগুলো না দিলেও ছোটবাবুর উপর তার কেমন একটা টান আছে ছেলের বয়সী ও স্নেহের নিরিখে ছোটবাবু জহরার অনেক কাছের তবুও অন্তর থেকে বেরিয়ে আসে তার উত্তর—তুমার কী? মুখে বলতে ভাল লাগে, করত্যে তো হয় না!’ কথাটা খুব একটা খারাপ বলে নি জহরা বিদ্যাপুষ্ট ছোটবাবুর মনে পড়ে যায় পোষ্টমাস্টার গল্পের ছোট্ট রতনের কথা তাকেও কাজ করতে হতো পেটের দায়ে জহরাকে করতে হয় বাঁচার তাগিদেপরিশ্রমের ধকল বয়সের ভেদ মানে না ছোটবাবু এসব বোঝেন জহরার কষ্টকে একটু ভুলিয়ে রাখার চেষ্টায় বলেন

 তোর কমাসের মাইনা বাকি আছে রে?’

 অর হিস্যাব তুমি রাখ গা

 তা না হয় রাখব, জমা করিস তো?’— জহরাকে সঙ্গে নিয়ে ছোটবাবু একটা শাখা ব্যঙ্কে ওর অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল বন্ধু ম্যানেজারকে বলে এসেছিল ডিপোজিট ফর্মটা পূরণ করে দেওয়ার জন্য কিন্তু সে ডিপোজিট খতিয়ে দেখার কথা আর তার মনে হয়নি ভুলেও মনে পরেনি চাঁদের কথা

 অ সব টাকা তো ব্যাটা ল্যায়, উ-ই জানে উসব’—

জহরার আয় ওর ছেলে নেয়, এটা ছোটবাবু জানত না ওই টাকা চালন হতো লোকমারফত নিজের আয়ের উপর যে নিজের কর্তৃত্ব থাকা উচিত, জহরাকে সে বোঝাতে চেয়েছিল কিন্তু এই সহজসরল মানুষগুলো শুধু টাকা নয়, একটু ভালবাসার জন্য শরীরের শেষ রক্তটুকু  দিতে পারে মুনিবের ঘরে দীর্ঘদিন কাজ করে এটাকেই ভাবে নিজের ঘর মুনিবের আয়পয়, মুনিবের শ্রীবৃদ্ধিকে মনে করে নিজের মুনিবের ঘরে কোন উৎসব অনুষ্ঠান হলে বিশেষ হয়ে ওঠে জহরার ভূমিকা কিন্তু শরীর তো! তাই মাঝে মাঝে জহরার মেজাজ গরম হয়, তিতিবিরক্ত হয় শরীর আর টানতে পারে না রিগরমরটিসে অবস হয়ে যায় স্নায়ু ছিট্যাস লেগে আঙলগুলো স্বাভাবিক হতে চায় না রুটি স্যঁকা চাটুর মতো তখন সে তেতে ওঠে রেগে যাওয়া জহরার রাগ নয়; ওটা ওর শারীরিক কষ্টের বহিঃপ্রকাশ—

  দ্যাখো ছোটদা দুচারট্যা বাসন কম করলি হয় না?’

  তা নিশ্চয় হয়, কিন্তু কাকে বলব বল? মা যে আর পারে না রে!’

  আর আমরা বুঝি মানুষ লয়

মানুষ... মুনিষও

মুনিষই তো!’— বলেই চোখের কোণে জল আসে জহরার কাপড়ের খুঁটে জল মুছে পুকুরের ঘাটে পা বাড়ায় সে

সব মানুষের দুটো হাত সব হাতের কাজ আলাদা কেউ সে হাতে খায়, আরেকজন সে উচ্ছিষ্ট পরিষ্কার করে হাতে ব্যথা হলে কেউ হাত বাড়িয়ে দেয় অন্যজনে হাত মালিশ করে, হাত দিয়ে কেউ ওই হাতে একটু হাতা ঘোরায়, আর ওই হাতার তেলচিটে হলুদ-লাল রঙ তুলতে কারো হাত ঘষে ঘষে সার হয় কে বুঝবে একথা! বোঝার দরকারও নেই কারো! টাকার অঙ্কে সংসার যেন কিনে ফেলেছে জহরাকে! জহরার হাতে যতদিন জোর থাকবে ততদিন ওর দাম জহরার শিরদাঁড়া যতদিন সোজা থাকবে ততদিন ও ব্যবহারযোগ্যকিন্তু এসব কথা ছোটবাবু মুখেও আনল নাশুধু বলল—

বেশ বেশ হাত চালাজহরার পিছন পিছন সে চলে এসেছে ঘাট অবধি ভাঙাচোরা ইঁটের সিড়ি পাশেই আতাগাছ নারকেল গাছটা পাতার ছাতা মেলছে কয়েকটি ব্যাঙের গ্যাং ডুবছে-ভাসছে জলে একটা ফড়িং তিরতির করে কচুপাতার উপর কাঁপাচ্ছে  ডানা এটা সংসারের আরেক রূপ ঘাটের কোলে হাতবন্ধ করে সেসব দেখছে ছোটবাবু ওদিকে হাত চলছে জহরার ঘস ঘস করে কড়াইয়ের কালিটা তোলা হল ক্যাঁচক্যাঁচ করে গোবর-বালি দিয়ে তুলল থালাতে পড়ে থাকা মশলার জামাট চর্বি না খাওয়া অর্ধেক মিষ্টিটা রাখা আছে ডিসে ওই পুকুরজলে হাত চুবিয়ে ওটাকে মুখে পুড়ল জহরা ঘেন্না-পিত্তিকে জয় করেছে এই মেয়েটা কপালে বিন্দু বিন্দু ফুটে উঠছে ঘাম হাতের শিরাগুলো সেলাইনের সূঁচ ফোটানোর জন্য ফুলে উঠছে যেন তবুও হাত চলছে সমানেপ্রেসারকুকারে, ডেকচিতে, তামার জলপাত্রে ছোটবাবু জহরাকে বলছে—আচ্ছা তোর হাতসাফাই তো!

  হাতের কথা শুনে জহরার মনে পড়ে ওর হাতের চর্মরোগ দীর্ঘদিন ধরে হাতটা চুলকাচ্ছে ওর শক্ত হাতের তালু ভেদ করে বিজিবিজি সব লাল ফুসকুরি উঠেছে বলছে

 এ্যা কবে ভাল হবে বুল তো? সারারাত শুধু চুলকাই

 নিম হলুদ লাগাতে বলেছিলাম যে তোকে

 লাগাই তো, অতে কিছু হছে না গো

 ওই পুরনো মলমটা শোবার সময় লাগাস না?’

 অ জি শেষ হয়ে গেল্ছে

 আমাকে তো বলতে পারতিস, দিনদিন যে এটা বাড়বে রে

আর কমেই বা কি হবে বুল? জল ঘ্যাঁটলে আবার হবে

 এটাই যদি ওর মায়ের হতো তাহলে ডাক্তার দেখিয়ে রোগকে বিদায় জানানো হয়ে যেত  কিন্তু জহরা বলে এদিকে কারো নজর নেই কাজের লোকের ওসব ছোটখাট রোগ দেখতে না পাওয়া সব ঘরের স্বভাব ঘরের বড়বাবু বলেই দিয়েছে— ‘সামান্য চুলকানি ওটা ওর জন্য ডাক্তারের হ্যাঙ্গামো করাটা আদিখ্যেতাকথাটা ছোটবাবু মেনে নিতে পারেনি একটু উঁচু গলাতে দাদাকে বলেছিল— ‘নিজের হলে তো দশবার ডাক্তারের কাছে ছুটতিসবড়দা বলেছিল— ‘যখন এতই দরদ, তখন নিজেই ব্যবস্থা কর নাএভাবে দুচার কথা হতে হতে বেশ গরম হয়ে উঠেছিল ছোটবাবু নিরব জহরা শুনছিল, কি বলবে ভেবে না পেয়ে সে ফস করে বলে ফেলল— ‘আমার লেগে তুমরা কাইজ্যা করিও না তো, অ চুলকানি আপনি হল্ছে আপনি ভাল হয়ে যাবিজহরাকে বোঝাবে কে? প্রতিদিন নোংড়া পুকুরের জল ঘাঁটলে ওরকম চর্মরোগ বাড়ে বই কমে না লাল লাল ফুটকুরিগুলো শেষ অবধি নিতে পারে ঘায়ের চেহাড়া খুব খারাপ কিছু হলে চালাতে হতে পারে কাঁচি জহরার ওই হাত আছে বলেই জলখাবারের থালা, দুপুরের উচ্ছিষ্ট বাসন, কাপ-প্লেট, জামাকাপড়, আবর্জনা, গোয়ালঘর থেকে রান্নাঘর, শোবার ঘর থেকে ডাইনিং সব ঝাঁ চকচকে থাকেযেটা থাকে না, সেটা ওর হাতসেলিকলে সারে না সব চুলকানি

সকালের সূর্য আস্তে আস্তে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছিল জীবন চলাচলের ঘড়িতে জেগে উঠছিল চঞ্চলতা প্রাতরাশের তাড়াহুড়োতে মা ছিলেন ব্যস্ত বৃদ্ধ গৃহকর্তা চা-পর্ব শেষ করে মুড়ির অপেক্ষায় আছেন বসে উঠোনে কয়েকটি চড়ুই লাগিয়েছে কিচিরমিচিরলাল-লাল জবাগুলো দুলছে প্রাচীরের কোলে রোদ চকচকে হয়ে আছে গোটা উঠোন বৌদি ঠাকুর ঘরে ছোট ভাইপোটি মোবাইল নিয়ে কার্টুনেগোয়ালের গরুগুলি হাম্বা হাম্বা করে জহরাকেই ডাকছে কিন্তু জহরার এখন সময় নেই ঘাটের কাজ এখনও কিছুটা বাকি পুকুরের কচুরিপানাতে বেগুনি ফুল, কয়েকটি ডাহুক পাখি ওখানেই ঠোঁট গুঁজছে, মাঝে মাঝে মাছের ঝাঁক জলের উপরে একপাক দিয়ে আবার যাচ্ছে তলিয়ে হাঁসেদের প্যাঁক প্যাঁক সাইরেন, দণ্ডীবকের মাছের জন্য অধীর অপেক্ষসংসারের চলমানতা চলছে সমান তালে

জহরা এক ফাঁকে গুল মেজে নিল পুকুরের জলে কুলকুচি সার ঘাটের ঠাণ্ডা জল ছুঁয়ে যায় তার পা আর ততই যেন জহরা গরম হয়ে ওঠে ঠাণ্ডা গরমের এ-এক অদ্ভত বৈপরীত্য বালি কাঁকড়গুলো জহরার হাতে প্যাঁক প্যাঁক করে বাঁধে ঠাণ্ডা জলের সংস্পর্শে বাড়ে চুলকানি মশাগুলো হুল ফোটাতে ছাড়ে না উচ্ছিষ্ট ভাতের লোভে কখনও কখনও ঢোঁড়া সাপ জহরার পায়ের কাছে এসে তোলে মুখ এসবকে অবজ্ঞা করে তাকে হাত চালাতে হয় মুড়ি খাওয়ার বাসনগুলো তাড়াতাড়ি ধুয়ে দিতে হবে, সুতরাং কাজের তাড়াও থাকে আর ততই রেগে ওঠে জহরা, গজগজ করে আওরাতে থাকে—ক্যাল থেকে যদি কাজ করতে আসি তাহলে আমার নাম জহরা লয় সব কাঁড়িকাঁড়ি গিলবে আর আমাকে মাজতে হবে মায়া দয়া অ্যাদের কিছুই নাই দাঁড়া কাল মজা দেখাছিঅর্থাৎ জহরা এরকম প্রতিজ্ঞা প্রায়দিন করে কাজ করতে না আসার হুমকি দিতেও কসুর করে না কিন্তু গৃহগিন্নি জানেন জহরার ঘরদোর থেকেও নেই, তাকে শেষ অবধি গোয়ালঘরে শুতে আসতেই হবেদিন যদি যাই আলেডালে, রাত যাবে না রাগ দেখালেমনিবগিন্নি এ সমীকরণটি ভালই বোঝেন, তাই জহরার কাজ ছাড়ার হুমকি তাদের কাছে প্রহসন মাত্র এই সুযোগে গিন্নিমা ঘর থেকে একটু জাঁকিয়ে বলেন—

তু বাপু প্রতিদিন কাজ ছাড়ার হুমকি দিস না যা না, বেরিয়ে গিয়ে দেখ না কত ধানে কত চাল

ক্যালই যাব দেখিস, তখুন বুঝবি

তা তোর এই কাল কবে হবে শুনি

এই লে থ্যাকলো তোর থালা, আমি চলল্যাম’— বলে জহরা উঠে দাঁড়ায় হনহন করে পুকুরপার থেকে চলে আসার জন্য পা বাড়ায় হঠাৎ কি যেন ভেবে সে শান্ত হয়ে বসে এভাবে চলে গেলে তার ঠাঁই হবে কোথা? বাড়ি গেলে ছেলে-বৌ তাকে তাড়াতে পারলে বাঁচে একচালা ঘরে জহরার শোবার জায়গা তারা ছাড়ে না রান্নাকরা ভাতে হাজির হলে বলে— ‘আসবি তা আগে বুলতে হবে তো আমানি আছে খাবি?’ এসব কথা শুনে জহরার চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে বুকের ভিতরটা ওঠে চিনচিন করে আল্লার উদ্দেশ্যে বলতে থাকে ও— ‘ই আল্লা! রহেম কর ই পরবর্দিগার রহেম করএভাবে কতদিন রাগ করে সে বাড়ি গিয়েছে আবার প্রত্যাখাত হয়ে অগত্যা মনিব বাড়িতে এসেছে ফিরে

 

প্রতিটি ছোটবড় জীবের কিছু না কিছু গল্প থাকে অতীতের স্মৃতি থাকে জহরারও গল্প আছে কিন্তু সে গল্পের নেই শ্রোতা খুব ছোট বয়সে জহরার বিয়ে হয়েছিল পাশের গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে তেলচুকচুকে সেই কালো পুরুষটিকে জহরা একদা মন দিয়েছিল মোটামুটি সুখেই ছিল সে সকালে উঠে নিজের ঘরের সবকাজ সে একাই করত উঠোন নিকানো থেকে গোবর দেওয়া, নাস্তা তৈরী থেকে কাঁথা বোনা, ছাগল চড়ানো থেকে ধানসিদ্ধ সবরকমের কাজে সে ছিল পটু স্বামীর আদর যত্নেরও ত্রুটি ছিল না তার জীবনে স্বামী তাকে আদর করে ডাকতজহরবলে তা শুনে জহরার কালো মুখটি হয়ে উঠত লাল কোন উত্তর সে দিতে পারত না স্বামী বলত—

 ইটু কাছ ঘেঁসি বস ক্যানি,’

জহরা ভীষণ লজ্জা পেত বাক সরত না তার

 চুপ করে বলত— ‘দূর থেকি দ্যাখো ক্যানি

উত্তরে স্বামী বলত—দূর থেকি দেখলি তোর খুসবু যি লাকে ঠ্যাকে না

এর কী উত্তর দেবে জহরা ভেবে পেতো না শুধু বলত—তুমার খুব গায়ে পড়া অভ্যাস হল্ছে

নিজের বোকে কাছে ডাকলি কি অল্যায় হয়?’— এই বলেই জহরাকে সে চেপে ধরত উষ্ণতার চাপ ভাল লাগত জহরার নারী নীরব থেকে অনেক কিছুর উত্তর দিয়ে দেয় জহরার নিরবতা তার স্বামীর কাছে ছিল সম্মতির নামান্তর দুজনে কোমল বন্ধনে নিজেদের নি জড়িয়ে লাউপাতার লোমশ রোয়ার মতো জহরার শরীরের সমস্থ কোষগুলি জেগে উঠত মুহুর্তে নাকের দুই পাশ উঠতো ফুলে পুরুষের শরীরের কঠিন গঠনকে সেও আঁকড়ে ধরতো উষ্ণতার চরম মুহূর্তে পৌঁছাত তারাবিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে জহরার একটি ছেলে হয় ঈদের পবিত্র মাসে ছেলেটির জন্ম বলে তার নাম রাখেচাঁদ এই চাঁদ দেখেই মুসলিমরা ঈদের উৎসব পালন করে তাই এরকম নামকরণ চাঁদ হওয়ার কিছুদিন পর থেকে তার স্বামী বিগরাতে থাকে আগে জহরার পাশে বসে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাত, সে এখন জহরার পাশেও আসে না জারের দিনে এক কাঁথা তাদের না থাকলে হতো না এখন তারা আলাদা কাঁথা নেয় রাত করে বাড়ি ফেরে পীরতলার বাথানে পড়ে থাকে তার স্বামী স্বামীর এরকম ব্যবহার জহরাকে চিন্তাই ফেলে দেয় না থাকতে পেরে একদিন সে বলেই দেয়— ‘তুমাকে কি জিনে পেয়্যাছে?’

এই প্রশ্নে স্বামীর চোখে যেন আগুন জ্বলে ওঠে— তোর বাপকে জিনে পেয়েছেহতবাক জহরার আর বাক সরে না গাঁয়ে ঘরের কানাঘুঁসোতে শুনতে পায় তার স্বামী অন্য একটি মেয়েকে নিকহা করবে স্থির করেছেপাশের গ্রাম সন্ধ্যাজোলে মেয়েটির বাড়ি ওখানেই তার স্বামী পড়ে থাকে সন্ধ্যাজোলের পীরের বাথানে তারা দুজনে গল্প করে কিছুদিন পর তার স্বামী আর বাড়ি ফেরে না নতুন সংসারে নতুন নারীর কোলে ডুবে যায় সে

  অগত্যা জহরা ফিরে আসে বাপের বাড়ি বগলে একটা পোঁটলা আর চাঁদকে নিয়ে সেই কবে স্বামীর ঘর ছেড়েছিল জহরা তাও প্রায় বছর সাঁইত্রিশ আগের কথা বাবা যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন জহরার কোনও অসুবিধা হয়নি গায়ে গতরে গোটা ঘরের কাজ সামলাতো সে মুনিষ খাটা, বাঁইচোর চাল করা, ঢেঁকির চাল কোটাসব কাজ পারত জহরা এভাবে বেশ ভালই কেটে যাচ্ছিল ওর ছেলেটিও জোয়ান হয় উঠছিল খরা-গ্রীষ্মের ধান পোঁতা থেকে শীতকালের আলু-ফুলকপি চাষে চাঁদ এখন একজন দক্ষ মুনিষ তার মনিবের জমির সবরকম দেখভাল সেই করে এসব দেখে জহরার বুকে ভরসা হয় মনে মনে চাঁদের বিয়ের কথা স্থির করে তাছাড়া চাঁদের বয়সও হয়েছে জহরার বাবা অর্থব হয়ে বিছানায় অবশেষে কলমা পড়ে চাঁদের বিয়ে হয় বৌটি বেশ নতুন বোকে জহরা ঘরে তোলে একজোড়া জরির শাড়ি দিয়ে জীবনের এই স্রোতে জহরা বেশ ভালই ছিল কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর চাঁদ যেন কেমন হয়ে উঠেছে চাঁদের বো-ও জহরাকে কথা শোনাতে ছাড়ে না বাসি ভাতে একটির বেশি দুটি মরিচ নিলে জহরাকে কথা শুনতে হয় চাঁদও বলে— ‘গিলতে পারে বটে!’

আগুনে ঘি দিয়ে বউটি যোগ করে— ‘ই গতরে কত খায় জানো? মালসার সালুন শ্যাষ করে দ্যায়জহরা হতবাক হয়ে যায় খাওয়ার জন্য এত খোঁটা! না খেলে গায়ে গতরে সে খাটবে কি করে?  সারাজীবন জহরা খেটেই এসেছে পেট ভরে খেয়েছে কিন্তু এরকম কথা জহরা হজম করবে কি করে? হাঁসের বাচ্চা বড়ো করার মতো সে চাঁদকে মানুষ করেছে নিজে আধপেট খেয়ে ছেলেকে তিনবেলা খাইয়েছে  বুকের দুধ চাঁদের মুখে দিয়েছে তুলে সেই চাঁদ আজ জহরার খাবার দেখে বিরক্ত হচ্ছে! বউকে নিয়ে ঘরের ভিতরে আলাদা করে খেতে শিখেছে! জহরা খেতে বসলে বলতে থেকেছে—এই হল্যো, দে উকে গিলতে দেপাশ থেকে চাঁদের বউ বলেছে—বুড়্যা বয়সে উ রাক্ষস হল্ছেহায় উদরযন্ত্র! তোমার চাকিতে দানা না দিলে তুমি শান্ত হবে না! হায় হৃদয়তন্ত্র! তুমি যতই কষ্ট পাও, অতীতের ইতিহাস কেউ ভুলেও খুলে দেখবে না এটাই বোধ হয় জীবন এটাই বোধ হয় বেঁচে থাকার সমীকরণ ছেলে বউয়ের এসব কথা শুনে জহরার রক্ত পানি হয়ে যায় দুচোখ দিয়ে সেই রক্ত, পানি হয়ে বয়ে চলে মনে পড়ে স্বামীর সঙ্গে সেই আদর-আনন্দের দিনগুলি বাবার সঙ্গে গরু চড়াতে গিয়ে গণ্ডায় গণ্ডায় আঁখ চিবানোর কথা শীতের ধান বিক্রি করে কেজি হিসাবে গুড়ঝুড়ি খাওয়ার কথা স্বামী বা বাবা কেউই তো জহরার খাওয়া নিয়ে কোন দিন কিছু বলেনি! কোনদিন জহরারও মনে হয়নি শরীর রাখতে গিয়ে বা আনন্দের সঙ্গে প্রাণ ভরে খাওয়াটা, খাওয়ার অত্যাচার! কিন্তু ছেলে-বোর চোখে সেটা অত্যাচার মনে হয়েছে তাই জীবনের এই খাতে এসে জহরাকে আবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছিল এক পোটলা কাপড় নিয়ে সে হাজির হয়েছিল ওই গ্রামের বাবুবাড়িতে কাজের লোক হিসাবে

জহরা এখন রীতিমতো এই বাবুবাড়ির সদস্য তার থাকার জন্য গোয়ালঘরে জায়গা দেওয়া হয়েছে রাতের জন্য মশারি, বিছানা, টর্চ, জলের বোতল সবই আছে তার খাওয়ার জন্য আলাদা থালা গ্লাস বাটি বছরে চারটে কাপড়, শীতে চাদর, সাবুন-তেল সবই পায় সে মাসমাইনে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা করে দিয়েছে ঘরের ছোটবাবু সুতরাং এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জহরা যে মাঝে মাঝে একটু দাপট দেখাবে এটাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই গৃহগিন্নি যদি বলেন— ‘উপরটা আজ একটু মুছে দিস জহর’, তো জহরা সেদিন মুছবেই না আবার যেদিন গিন্নি কিছুই বলবেন না, সেদিন জহরা নিজে থেকেই সব ঘরগুলো সাফাই করে দেবেকখনও কখনও গান ধরবে— ‘আল্লা মেঘ দে পানি দেছোটবাবু জহরাকে রাগাতে গিয়ে যদি বলে—জহরা তোর গোস্ত খেতে ইচ্ছে করে না?’ জহরা তার উত্তরে বলবে— ‘গরু খেই আমরা, কিন্তু তুমরা ওই গরুর দুধ খাও কি করি? উটোতেও তো গরুর গোস্তরস মিশে থাকেকথাটা সত্যিই তাত্ত্বিক হয়ে ওঠে কিন্তু এই মূর্খ মহিল এতবড় একটি ধর্মবিভেদের কথা এত সহজে কিভাবে মেলায়, তার হিসাব বিদ্যাযুক্ত ছোটবাবুও করতে পারেনা ঝট করে বলে ফ্যালে— ‘দুধ দিয়ে যে শিবের পুজো হয় রে তাই ওটাকে আমরা গ্রহণ করিজহরা বলে—গোস্ত খেলে প্যাটের পুজ্যা হয়কথাটা কি নিদারুণ সত্য আগে পেট তারপর সবকিছু, এই কথাটি জহরার থেকে কে বেশি বুঝবে পেটের কারবার জীবনের বড় ধর্ম জীবনের এই বড় শিক্ষা সে কী গোয়ালঘর থেকে পেয়েছে? গোয়ালের গরু বাছুরের শানি কেটে দেওয়া থেকে, জল ভুঁসি দেওয়া, খোল দেওয়া,  বিচালি কাটা সবই জহরার নিত্যকর্ম গরুদের সঙ্গে মিশেই কি তার এই শিক্ষা? তাই হয়তো জহরাকে দেখে বাছুরটা ডেকে ওঠে— ‘হাম-বা-  হাম-বা-আ জহরা ওদের খাবার দিতে দিতে বলতে থাকে— ‘প্যাট ভরে আগে খা, ডাঁই করি খাবাছুরটি লেজ নাড়তে থাকে গলাটা টান করে বাড়িয়ে দেয় জহরার দিকে তার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে জহরা বলেই চলে— ‘মা যেদিন হবি সেদিন আর এই আদর পাবি ন্যা, সবাই তুর দুধের দিকে তাকিন থাকবেবাছুরটি কিছু বোঝে কি না কে জানে, শুধু মাঝে মাঝে ডেকে ওঠে— ‘হাম-বা-...’ জহরা আপন মনে বলতে থাকে— ‘দুধ দিতে যখন আর পারবি ন্যা, তখন তুর গোস্তের লেগে সবাই মুখিন থাকবে

প্রতিদিনের মতো সেদিনও জহরা উচ্ছিষ্ট  থালাবাটি,  প্রেসারকুকার, তেলচিটে কড়াই নিয়ে পুকুরপারে বসেছিল  জহরকণার মতো শিশিরবিন্দু কচুপাতা থেকে জল-শ্যাওলার গায়ে পড়ছিল খসে কুমড়ো মাচা থেকে দুটো সবুজ পাখি গেল উড়ে প্রজাপতিগুলো ঘাসফুলের উপর ডানার বাতাস দিচ্ছে কলাবনে একটা বেড়ালওঁত পেতে অনেকক্ষণ বসে আছেপুকুরপারের এই গ্রাম্য ছবি বড়ই মনোরম ঘাটে ঘাটে বৌ-বিটির দল বাসন মাজতে বসেছে ক্যাওট জাল ঘুরিয়ে ধরছে মাছ টিনের তৈরী ভেলাতে ক্যাওট জলের উপর থাকে ভেসে জলের আয়নায় গাছের ছায়া সূর্যের রোদ মেখে করে চিকচিক এই ছবি জহরার খুব ভাল লাগে শরীরের যত ব্যথা বা মনের পীড়া একলহমায় উধাও হয়ে যায় গুনগুন সুরে কাজে হাত লাগাই জহরা জহরারুখে কারবালার সেই গানে যেন জীবনের সুর মিশে থাকে কথার বিকৃতি ঘটলেও সুরের মধ্যে একটা বেদনকথা থেকেই যায় হয়তো সে বেদনা জহরার মনের বেদনা, কারবালার গানে যার পরিসমাপ্তি কিন্তু কারবালার ইতিহাস কি জহরা জানে? সেখানেও ত রক্ত-মৃত্যু!মৃত্যুর হিসাব জানুক আর না জানুক জহরা হয়তো ওই বেদনগানে নিজের কষ্টগাথাকে খুঁজে পায় হয়তো নিজের অজান্তে নিজেকেই খুঁজে ফেরে সে সবই হারিয়েছে সে বা সব থাকতেও কিছু নেই তার একদৌড় দূরত্বে তার নিজের বাড়ি তবুও সেখানের দরজা বন্ধ একহাঁক দূরত্বে থাকে চাঁদ তবুও আওয়াজ পৌঁছায় না চাঁদের কানে মাছগুলো যেন টুপ করে গোলাকার বৃত্ত এঁকে বলে যায়—দেখ ভেলকি ঘুরে ঘুরেকত গূঢ় এ-কথা সত্যি জীবন তো ভেলকিনাচ গোলাকার ঘুরে যাওয়া কেন্দ্র থেকে ছিটকে বেরোনোর পথ কোথা? জহরার কর্মময় জীবনের শেষ কোথা? জহরা তার ছেলের বাড়ি বহু বছর যায়নিতবুও মুসলিম পাড়ার কোন লোকের সঙ্গে দেখা হলে সে জিজ্ঞেস করে— ‘আমার চাঁদ ক্যামোন আছে গো?’ পথচলতি লোকটি উত্তর দেয়— ‘ব্যাটা কি তুমাকে তারিন দিয়্যাছে?’ জহরা  লজ্জা পায় আঁচল দিয়ে বুক ঢাকার মতো ছেলেকে ঢাকতে গিয়ে বলে— ‘দ্যাখো ক্যানি বাবুরা বাড়ি যেতি দ্যায় নাচাঁদ তো আমাকে বাড়ি যাওয়ার লেগি কত্ত বুলেগ্রাম্য খবর খুব বেশি দিন গোপন থাকেনা মুসলিম পাড়ার প্রত্যেকে জানে জহরাকে তার ছেলে তাড়িয়ে দিয়েছে আর এটা জানে বলেই লোকটি জহরাকে জানায়— ‘তুমার লাতনি হল্ছে, -টো জানো কি?’ -খবর শুনে জহরা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা মেয়ে হয়েছে, চাঁদের মেয়ে হয়েছে, জহরা দাদি হয়েছেএই অনুভব তার গোটা শরীটাকে ঝাঁকিয়ে দেয় শিহরণ ও আনন্দের আবেগে সে  শুধু উচ্চারণ করে— ‘আমিন হায়রে মন! যন্ত্রণার ফাঁকে কে রেখে যায় মুহুর্তের ফুরফুরে হাওয়াদিগ্বিদিক ভুলে জহরা ছুটে যায় নিজের বাড়ি তালপাতার বেড়া দেওয়া উঠোন পেরিয়ে সোজা গিয়ে হাজির হয় ভাঙা চালাটা নিচে ওখানে তার নাতনিকে রাখা হয়েছে অন্ধকার চালাতে জ্বলছে লম্ফ নাবজাতকের কুঁই কুঁই আওয়াজ জাগিয়ে দিচ্ছে জহরার মাতৃসত্তাকে সব ভুলে যেতে পারে সে চাঁদ যদি তাকে ঠাঁই দেই তাহলে আজ থেকেই সে এখানে থেকে যাবে তাছাড়া পোয়াতির খেয়াল রাখার জন্য লোকের দরকার ততক্ষণে চাঁদ এসে উপস্থিত হয় ছেলেকে দেখে জহরার বাক সরে না যদি সে একবার বলে— ‘মা রে থেকি যা ক্যানিযদি সে একবার কোলের কছে এসে বসে! যদি একবার মুখ খোলে— ‘তুরই তো লাতনি, তু এ্যর দায় লে মাঅনেকক্ষণ ঘোরের মধ্যে কেটে যায় জহরার নিষ্পলক নাতনির দিকে চেয়ে চেয়েএতক্ষণ নির্বাক থাকা চাঁদের একটি শব্দে মোহভঙ্গ হয় জহরার কানের ভিতর থেকে কলিজার খালখন্দ জ্বালাতে জ্বালাতে প্রবেশ করেকালমুখীশব্দটি শব্দ সত্যিই ব্রহ্মশক্তি সম্পন্ন একটি ব্রহ্মশব্দই মানুষের যাবতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষাকে লহমায় তছনছ করে দিতে পারে জহরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় হঠাৎ যেন তার নিজেকে আরও বৃদ্ধ মনে হয় টাল সামলে চাঁদের হাতে মাসমাইনের কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বেরিয়ে আসে জহরাশূন্য আকাশের দিকে চেয়ে থাকে কিছুক্ষণ কি যেন বিরবির করে মনে মনে— ‘লা ইলাহা ইল্লল্লাহ

কিছুদিন বিষন্ন থাকার পর জহরা আস্তে আস্তে বাড়ির ওই ঘটনাটি ভুলতে থাকে দৈনিক কাজের চাপে, গিন্নির সঙ্গে কাঁথা বুনতে বুনতে আবার নিজের ছন্দে ফিরে আসে সে গিন্নি জহরাকে জিজ্ঞেস করে— ‘তোর নাতনির কি খবর রে জহরা? যা একদিন দেখে আইপ্রথমদিন দেখতে যাওয়ার কথাটা জহরা গোপন করে যায় গিন্নিকে টেক্কা দিতে গিয়ে বলে— ‘লাতিনটো খুব ধলো হল্ছে গো একপেছ্যা চুল মাথাতে আল্লার দুয়াই চাঁদের মুখটো যেন উগলিন লিছে-কথার মর্ম নাতনি বেশ ফর্সা এক ধামা চুল তার মুখটি হুবহু চাঁদের মতো গিন্নি মনে মনে একটু খুশি হয় যদি এই নাতনির সূত্র ধরে জহরাকে ওর ছেলে ডেকে নেয়! হাজার হলেও সারাদিন কাজের পর বাপের ভিটেতে ঘুমানো স্বর্গসমান যদি এটা না হয়, যদি চাঁদ জহরাকে কোনদিন বাড়িতে স্থান না দেয়, তবুও জহরার অসুবিধা হবেনা সে মরে গেলে মুসলিম সমাজের লোক ডেকে তার যথাযোগ্য কবর-মাটির ব্যবস্থা করা হবে চল্লিশার দিন পাড়ার আত্মীয়দেরও খাওয়ান হবে এসব কথা ছোটবাবু বহু আগে জহরাকে জানিয়ে রেখেছে সুতরাং শেষের দিনটি নিয়ে জহরার কোন চিন্তা নেই শুধু নাতনিকে নিজে হাতে মানুষ করার আক্ষে জহরার থেকেই যাবে তবুও গিন্নি বলেন— ‘তাহলে তোর নাতনির জন্যও দুটো কাঁথা বানায় কি বলিস?’ জহরা যেন চিন্তায় পড়ে যায়, কাঁথা দিতে তারও ইচ্ছে করে কিন্তু দেবে কীভাবে? তারজন্য ওই দরজা বন্ধ বলে— ‘উটো তুমি দিয়ে পাঠ্যায়ো, তুমি দিয়্যছো শুনলি চাঁদ আমার খুশ হবেগিন্নি বুঝতে পারেন জহরার এই চালাকি গিন্নি জানেন, যে নাতনির জন্য জহরার এত টান, যার জন্য সেদিন ও ছুটে গিয়েছিল, সে নিজে আর ও বাড়ি যেতে চায় না তাই গিন্নির আশ্রয় নিচ্ছে

 সেদিন পুকুরের ঘাটে ভাসছিল এঁটো শালপাতা সকালে পুকুর পাড়ে এসে সেগুলো পরিষ্কার করার সময় সে পাইনি পাশের বাড়ির সঙ্গে এ বাড়ির বিবাদের জেরে এই ঘাটের মাঝ বরাবর কয়েকটি সীমারেখা নির্ণায়ক ইঁট ছিল যার উত্তর অংশ ও-বাড়ির আর দক্ষিণ অংশ এ-বাড়ির, মানে জহরার মুনিবের পুকুরের শান্তশীতল স্রোতের দোলায় ওই নির্বোধ পাতাগুলো বুঝতে পারেনি যে তারা কন্ট্রোল লাইন অতিক্রম করে দক্ষিণ মেরু থেকে বিতর্কিত উত্তর মেরুতে পৌঁছে গেছেমানে ও-বাড়ির ঘাটের সীমানায় পাশের বাড়ির গিন্নির গলার ঝাঁঝ আর অহেতুক নামহীন উদ্দেশ্যহীন অভিশাপ বাণীতে জহরা এটুকু আঁচ করতে পারল যে কুরুক্ষেত্রর মাটি আজ আবার গরম হয়েছে এই ঘাটের একটা গল্প আছে দুটি পরিবার যখন একে অপরকে আর কিছুতে পেরে ওঠে না, তখন সমস্থ বিবাদ ও আক্রোশের কেন্দ্র হয়ে ওঠে এই ঘাট পুকুরের উল্টোপারের বাগদী, বেদে, মালো পাড়ার মেয়ে বৌ'রা এই ঘাটের ইতিহাস জানে ঘাটকে নিয়ে ঝগড়ার সময় বাবুবাড়ির গিন্নিদের গ্রাম্য অশ্রাব্য শব্দসমাসের উল্লেখ ছোটলোকদের চুলোটমুলোট ঝগড়ার সময়ে গালমন্দর সেরা সেরা বাণকে হার মানায় তখন এই ছোট্ট ভূমি থেকে উদ্ভূত সমস্যা শেষ অবধি ঘরে প্রবেশ করে, মগজে গিয়ে বলে এবারে কিছু একটা না করলেই নয় শেষ অবধি ও-বাড়ির গিন্নি জহরাকে এসে সটান প্রশ্ন রাখে— ‘পাতাগুলো জেনে বুঝে এদিকে ফেললি তো?’ সলিল প্লাবতার বিজ্ঞান জহরার জানা ছিলনা  সে থতমত খেয়ে উত্তর দেয়— ‘আমি অর কিছু জেনি ন্যা  কে ফেল্ছে কি করি বুলবো?’ -বাড়ির গিন্নি সহজে ছাড়ার পাত্রী নন আওয়াজ উঁচিয়ে বলতে থাকেন—সব মুখোশধারীরা ঘরে ঠুকে আছে, আর তোকে যা শেখাচ্ছে বুড়ি বয়সে তাই করছিস সব জ্যন্ত শয়তান ছুতো না পেয়ে পায়ে পায়ে ঝগড়া করতে আসিসজহরা এবার একটু জাগল, খোঁচাগুলো তাকে সরাসরি দিলে সে হয়ত উত্তর দিতনা, কেননা মাঝে মাঝে কাদা-ময়লা তার নিজের অজান্তে ওদিকে চলে যায় এই ঘাটের একটা নিরবতা আছে তাই এসব কথা শুনেও জহরা কিছুক্ষণ চুপ থাকে ঘাটের ঠাণ্ডা হাওয়াই যখন হাঁসগুলো চড়ে, জহরার ফেলে দেওয়া ভাতগুলো খুঁজে খায়, তা দেখতে জহরার বড় ভাল লাগে কখনও কখনও মনে পরে কারবালার গানযে গানে তার আব্বার জুরি ছিল না এই অঞ্চলে হামু মিঞা, জহরার বাবা একডাকে তাকে সবাই চিনত, কাজ থেকে ফিরে, আমানি খেয়ে, তার বাবার গলাটা নাকি খুব খুলত ওই অতীতে হয়তো জহরাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় এই ঘাট! যেখানে শুধু আছে  নির্বাক নিস্তব্ধতা আর শান্ত হাওয়ার কোলকিন্তু ও-বাড়ির গিন্নি লাগাতার বলতে থাকেন— ‘এই পাতা তুই ফেলেছিসমদ-মাতালদের এঁটো পাতা কি আমি ঘোচাবো?’ শেষমেষ জহরা মুখ খুলল বহুদিন পর বাহু উত্তোলন করে— ‘দেখ গিন্নি এ্যা কাজ আমার লয় আমার গিন্নি এসব করত্যেও বুলে না কখুনোরাগ যেন আরোও চড়ে উঠল ও-বাড়ির গিন্নির দুচারটে বঙ্গীয় শব্দকোষ বহির্ভূত গালি সংযোগ করে বললে— ‘তোর ভাবি হচ্ছে মিচকি বেড়াল আর তু তার সাগরেদ তোর বাবুদের সব হরেহম্বে নেওয়া স্বভাব ঘাটটাও ছাড়বে না!’ জহরা এইহরেহম্বের অনুপ্রাশে বিষম খেল কেননা সে জানে চেয়ে নেওয়া, ভিক্ষে করে নেওয়া, গায়ে গতরে কাজ করে নেওয়ার থেকে হরেহম্বে নেওয়া জ্যন্ত পাপতাতে বেহস্তও নসিব হয় না জহরা তার গিন্নির সঙ্গে দিনে অন্তত দশবার ঝগড়া করে গোঁসা করে মাঝে মাঝে তুই তুতুকারির পর্যায়েও চলে যায় কিন্তু তার গিন্নিকে অন্য কেউ বাজে কথা বললে জহরা তাকে ছাড়বে না সে এবারে ঝেড়ে উত্তর দিল— ‘হরেহম্বে কত্তা কারুর কিছু ল্যায় নি আমাদের গুটা মোসলমান সমাজ তাকে গড় হয়ে সেলাম জানায় তুমার ভাতার জি রেতে রেতে পুকুরে জাল ফ্যালে, ওটোকে কি বলব্যা?’  আজ ছোটবাবুর পরীক্ষা ছিল তাই  -বাড়ির গিন্নিমা তদবিরে ছিলেন পুত্রের কানে এসব কথা যেন না যায় তবুও বাড়াবাড়ি দেখে তিনি জাঁকিয়ে উঠলেন— ‘জহরা! ওই ছোটলোকদের কথায় কান দিস নাঘাটের কোণ থেকে প্রতিউত্তর এল— ‘কী আমার সতী-সাবিত্রী রে! মরদ নেয় না পাছার কাছে, মাগি বলে সোহাগ আছে-বাড়ির গিন্নি এবারে ব্রম্ভাস্ত্রটি ছেড়েই দিলেন— ‘আইবুড়ো মেয়ে ঘাড়ে, মাগি মরে অহংকারেঅর্থাৎ ও-বাড়ির বিবাহযোগ্যা কন্যাটির এখনও যে বিয়ে হচ্ছে না, খোঁচাটি তদুপলক্ষে অথচ দুদুটো এম.. ডিগ্রি গলায় ঝুলিয়ে ছোটবাবুরও যে বিয়েটি হয়নি সে কথা এ-বাড়ির গিন্নি বেমালুম ভুলেছেন ওদিকের সীমারেখা পার হয়ে এবারে যে গোলাটি এল তাতে লেখা ছিল— ‘দেখ নিজের ব্যাটার মুখ, লক্ষীছাড়ার অশেষ দুখজহরা এই দুমুখের মাঝখানে পড়ে নিজের অবস্থান সূচিত করতে গিয়ে বলে— ‘আমি সবপাতা সাফ করে দিছি, তুমরা কাইজ্যা করো না এদিকে প্রেস্টিজ খোয়ার ভয়ে এ-বাড়ির গিন্নিমা বললেন— ‘খবরদার জহরা ও পাতায় তুই হাত দিবি না যার এলাকায় ঢুকেছে সেই ওসবের গতি করুক -বাড়ির গিন্নি আর কিছু বাক্যব্যয় না করে আশ্চর্যরকমভাবে গৃহমুখী হলেন  জহরাও একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল পুকুরের ওপার থেকে সরকারবৌ একটু উচুঁ গলায় জানিয়ে দিল — ‘মুখেই বাবুবাড়ি, ভাষার বহর দেখলে গা ঘিনঘিন করে ওঠেঅন্যদিন হলে জহরা হয়তো একটা কার্যকরী গাঁইয়া প্রবাদ ঝাড়ত  কিন্তু আজ যে কাণ্ডটি হল তা যে অশেষ লজ্জার! দুটো পাতার জন্য এতকিছু!

 ঘাট থেকে উঠে জহরা গোয়ালের কাজে মন দিয়েছিল পথচলতি একটি লোকের মুখে খবর পেল তার নাতনির গত কয়েকদিন ধরে জ্বর হয়েছে জহরের ভিতরটা কীরকম যেন ছ্যাক করে ওঠে সেও শুনেছে করোনা নামক এক জ্বরে মানুষ দেখতে দেখতে মরে যায় তাকে ছুঁলেও সে রোগ সংক্রামিত হয় তবু প্রাণের টানে জহরা নিজের বাড়ির দিকে ছোটে মসজিদের মাইক থেকে তখন ভেসে আসছিল— ‘হাইয়া আলাস্ সালাহ্   হাইয়া আলাস্ সালাহ্চাঁদ তার মাকে আজ ফেরাতে পারেনি ছোট ছেলের মতো উঠল কেঁদে ফুঁপাতে ফুঁপাতে বলে উঠলমারে!’ মুখ গুঁজে দিল জহরার বুকে নাতনিকে নিয়ে কদিন ব্যস্ত থাকে জহরা বাবুবাড়ির কাজ সামলে ছুটে আসে বারবারগতর তখন কাজের হিসাব ভুলে যায় যা করে সবই প্রাণের তাগিদে

   কয়েকদিন ধরে জহরার গাটা ছ্যাঁকছ্যাঁক করছে ইঁটভাটার মতো উত্তাপ বেরোচ্ছে গা থেকে দিন থেকে পাচ্ছে না স্বাদগন্ধ গ্রামের কর্ক ডাক্তার বিজন বলেছে— ‘ওকে যেন কেউ স্পর্শ না করে’ ‘মা-বিটির ই জ্বর কী করোনা?’ ভেবে পানা চাঁদ শুধু মায়ের মতো আল্লাকে অহরহ স্মরণ করছে সে এদিকে ঘাটের উত্তর অংশের মালিক মানে ও-বাড়ির কত্তাঠাকুর গ্রাম পঞ্চায়েতে যে আর্জি জানিয়েছিলেন আজ ছিল তার সরজমিন পরিদর্শন আর্জি আর কিছু নয়, ঘাটের সিমানা নির্ধারণ হায়রে ঘাট! যাকে নিয়ে এত কাণ্ড, যাকে ঘিরে এত মনের ঝাল, যেখানে এত হাওয়া, এত শীতল ছায়া, সেই ঘাটের রাণী আজ গরহাজির নাতনির পাশে আজ সে আছে শুয়ে গিন্নিমা কোনরকমে মরতে মরতে কাজ করছেন অহরহ স্মরণ করছেন জহরকে ছোটবাবু বিজন ডাক্তারের সঙ্গে ফোনেই খবর রাখছেন করোনা মানুষকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে হারিয়ে দিচ্ছে মানবিকতাকে গোয়ালঘরে উড়ছে জহরার পুরনো কাপড় সাদা পর্দার মতো ওট এখনও মেলা আছে— জহরার জীবনছবির না লেখা অনেক কথা ওখানে লেখা যায় যেন

ঘাট পরিদর্শনে এসে পঞ্চায়েত প্রতিনিধি মুখের মাক্সটি খুলে জানালেন — ‘এই ঘাট বন্ধ হবে সার্বজনীন ঘাটের স্কিম অ্যাবাউট টু স্টাটএই সহজ সমীকরণে ঘাটের দুপক্ষ মালিক রষ্ঠ হলেন মনের কালি তাঁরা ফেলবে কোথা! ওদিকে জহরা,যে এই ঘাটের সব রহস্য, সব স্নেহ জানত সে নিয়েছে শয্যা করোনার কামড়টা যদি ও সামলে নেয়, দীর্ঘদিন কাজের ধকল তাকে আর দাঁড়াতে দেবে না হয়তো অ্যাকাউন্টটা জীবিত আছে নাকি কে জানে! ওদিকে ফুটফুটে চাঁদমুখী নাতনিটি তার পাশে শুয়ে শুয়ে হাত পা ছোড়ে, হয়ত বোঝাতে চায় এসে গেছে পরবর্তী জহরা যে একটু বড় হয়ে বাবুদের এঁটোকাঁটা ঘোচাবে এভাবে সেও একদিন বার্ধক্যে আরেক জহরার চারা রেখে যাবে গ্রামে গঞ্জে ওরা কাজের লোক হিসাবে কাটিয়ে দেবে পুরুষের পর পুরুষ ওরা মেনেই নিয়েছে ওরা কাজের লোক

 পুকুরের শান্ত ঢেউয়ে আজও হাওয়া লাগে আজও বক আকাশের গায়ে ছবি এঁকে যায় কলাপাতা লাউপাতার নাচে পুকুরের জলে হিল্লোল জাগে আজও হিল্লোল জাগে ওপারের মালোবৌদের থালা-বাটি-ঘটির সংসারে, কথকতায় শুধু এদিকের মজে যাওয়া ঘাট আজ নির্বাক শ্যাওলা কচুরিপানার আড্ডা জহরের ঔজ্জ্বল্যহীন আজ জহরাও ওপারের ঘাটে যাওয়ার অপেক্ষা করছে ঘাট অপেক্ষা করছে অন্য কোন জহরার হাওয়ায় নাচে পুকুরের জল মাছেদের চারাপোনাগুলো যেন বলে— ‘দেখ ভেলকি ঘুরে ঘুরেমাঝে মাঝে ঘাটের পারে এসে ছোটবাবু ভাবেন— ওই বালি কাঁকড়ের সাদা সাদা ছোট পাথরগুলো যেন জহর হয়ে জ্বলছে স্ফটিক সাদা পাথর থেকে বেরিয়ে আসছে জহরের দ্যুতি সে দ্যুতি দেখার অবকাশ কোথায় মানুষের!

লেখকের  অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।

 লেখক পরিচিতি—

কবি ও কবিতা বিশ্লেষক। প্রাবন্ধিক। লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্র-সমীক্ষা ভিত্তিক গ্রন্থ রচয়িতা। নানা লোকসেবামূলক সংস্থার সদস্য।