মা বলল, কোটন এসেছে, তোকে
খুঁজছে।
দীপু বিরক্ত হলো,বলে দাও,ছুটির দিন,বেলা
অব্ধি ঘুমবে। ডাকতে বারণ করেছে।
ও যা ছেলে ! মায়ের গলাতেও বিরক্তি,এখনই যাবে
ভেবেছিস ? বকতে
বকতে মাথার পোকা বার করে দেবে। তার চেয়ে তোর কাছে পাঠিয়ে দিই। বাজার থেকে কিছু
আনার থাকলে,ওকে
দিয়ে আনিয়ে নে।
যা ভাল বোঝ করো। বলে দীপু পাশ ফিরে শুলো।
গতকাল রাতে বৃষ্টি হয়েছে। বাতাসে গা শিরশিরানি ভাব। দীপু
পায়ের কাছে ভাঁজ করে রাখা চাদরটা টেনে নিয়ে মাথা পর্যন্ত ঢাকা দিল।
ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কোটন ডাকল,দীপুদা? এত বেলা
পর্যন্ত ঘুমচ্ছো?
দীপু কোন সাড়া দিল না।
পাড়ায় এত বড় একটা ম্যাটার হয়ে গেল! কোটন বলল,তুমি
কিছুই জানতে পারলে না ?
কি হয়েছে?মাথা থেকে চাদর নামিয়ে সোজা হয়ে
শুল দীপু।
বাজারের মুখে ধামাকা ফাইটিং। বুলটু আর শম্ভুর গ্রুপের
মধ্যে। পুলিশ হাওয়া। যে যেদিকে পারে দৌড়চ্ছে। আমি আসছিলাম দিদির বাড়ি থেকে। বুঝলাম
সিগন্যাল ভাল নয়। বাধ্য হয়েই সাইকেল থেকে নাবলাম। বিশ্বাস করো, কিছু করতে
হলো না, হাত
তুলে গলা চড়িয়ে বললাম, স্টপ, দেয়ার এ মার্কেট প্লেস। নো ক্যাওস,অর
রেজাল্ট ব্যাড।
তারপর ? দীপু একটা লম্বা হাই তুলে বলল।
তারপর আর কি ! দুদল
দুদিকে দৌড় দিল। 'কনক ভাণ্ডার'-এর মালিক শম্ভু বারিক আমার পিঠ
চাপড়ে বলল,ভাগ্যিস
তুমি ঠিক সময়ে এসে পড়েছ কোটন, তা না হলে কয়েকটা লাশ পড়ে যেত।
এক কাজ কর তো কোটন ! দীপু হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে
মানিব্যাগটা টেনে নিলো, বাজার থেকে এক প্যাকেট ফিলটার উইলস
নিয়ে আয়।
এখন আমি বাজারের দিকে যাব না দীপুদা,একটা
আর্জেন্ট কেসের ব্যাপারে পীরতলা থেকে দুজন লোক আসবে। জানো তো, ঝামেলা
অশান্তি হলেই লোকে আমায় ডাকে। একটু চমকে দিলেই যদি কাজ হয়ে যায়, কে আর
থানা পুলিশ করে বলো ?
কোটন দীপুর পুরনো প্রেমিকা অদিতির ছোট ভাই। অদিতিদের বাড়ির
সকলে লেখাপড়ায় বেশ ভাল। কেবল কোটন ছাড়া। কোটন তো স্কুলেই গেল না কোনদিন। ছোট থেকেই
ও এক বিদঘুটে স্বভাবের। হুট-হাট যার তার বাড়ি ঢুকে পড়া, হাবিজাবি
বিষয় নিয়ে এক ঘেয়ে বকবক করা। তবু এ পর্যন্ত সহনশীলতার মধ্যে ছিল। বয়স বাড়ার সঙ্গে
সঙ্গে ওর মধ্যে একটা ধারণা ডেভলপ করল, ও খুব দুঃসাহসী এবং একজন বড় মাপের
ডন। যখন তখন যার তার লাশ ফেলে দিতে পারে। যে কোন গণ্ডগোলের মধ্যে ও গিয়ে দাঁড়ালে
মুহূর্তে সব ঠাণ্ডা। এ শহরের সব দুষ্কৃতকারী ওকে 'গুরু' বলে মানে।
অদিতি একদিন দীপুকে বলেছিল, এটা এক ধরণের অসুখ। নিজে যা নয়, কোনদিন
হতেও পারবে না, সেই সব ভাবনা ওর মাথার মধ্যে পাক খায়।
দীপু বলেছিল, ছোট থেকে ঠিকমত ট্রিটমেন্ট করালে
হয়ত ঠিক হয়ে যেত।
বাবা মা চেষ্টা করেনি ভাবছ ? অদিতি রেগে গেছিল, অনেক বড়
বড় ডাক্তার দেখানো হয়েছে। মা'তো বাবাকে লুকিয়ে মন্দির মসজিদ, জল পোড়া তেল পোড়া, মাদুলি
কবচ, কত
কি করেছ। এটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছু নয়।
এতে তো যে কোন দিন বিপদ ঘটে যেতে পারে, তাই না ? দীপু
বলেছিল।
আমার তেমন কিছু মনে হয় না। বলে অদিতি হেসেছিল, সবাই জানে, ওর যাবতীয়
বীরত্ব মুখের আওয়াজে। আদতে ও রাম ভীতু। ও যেসব দাদাদের নাম বলে, তারা ওকে
কেউ চেনেই না। লক্ষ্য করে দেখো, ও সেইসব লোকের কাছেই ওর বাহাদুরির
গল্প করে, যারা
কোনরকম ঝামেলার ত্রিসীমানায় থাকে না।
অদিতির বিয়ে হয়েছে দীপুদের পাশের পাড়ার প্রলয়ের সঙ্গে।
অদিতির এই গোপন প্রেম দীপু টের পায়নি।
অদিতি জানত, দীপু নির্বিরোধ শান্ত স্বভাবের
ছেলে। নিজের মনের মানুষটি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখলেও, ও কোনরকম জোর ফলাতে যাবে না।
প্রলয় অদিতির বিয়েটা নির্বিঘ্নেই হয়েছিল।
এ সবের পরেও দীপুদের বাড়িতে কোটনের যাতায়াত বন্ধ হয়নি।
কোটনকেও দীপু দূরে ঠেলে দিতে পারেনি।
ফিরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই কোটনকে ডাকল দীপু, শোন।
কোটন খুব অনিচ্ছার সঙ্গে দীপুর বিছানার একপাশে বসল, যা বলার
শর্টে বলো। বললাম না, আর্জেন্ট কেসের ব্যাপারে বাড়িতে
দুজন আসবে।
তা বুঝলাম। দীপু বলল, সাত সকালে দিদির বাড়ি গেছিলি কেন ?
আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিল।
কে ?
কে আবার ? দিদি।
দীপু অবাক হল, দিদি তোকে ডেকে পাঠিয়েছে ? কেন ?
একটা প্রবলেম তৈরি হয়েছে, তাই।
দীপু নিজের পেটের মধ্যে হাসির সুড়সুড়ি টের পেল। কারণ সে
জানে, প্রলয়দের
বাড়িতে কোটনের কোনরকম অ্যাকসেস নেই।
গলাটাকে ভারি করে দীপু বলল, নিজেদের ফ্যামিলির কেসে জড়িয়ে
ইমেজটাকে নষ্ট করবি কেন কোটন? ওদের সমস্যাটা ওদেরকেই মেটাতে দে
না।
এটা তুমি ঠিক বললে না। কোটন বলল, নিজের
দিদির ব্যাপারে হাত গুটিয়ে বসে থাকব, তা হয় নাকি?
না, তা হয় না। দীপু হেসে বলল, ঝামেলাটা
কি ?
দিদি যে কি ভুল করল না !
কোটন জিভ দিয়ে চকচক আওয়াজ করল, ম্যান হিসেবে তুমি ফাস্ট ক্লাস
ছিলে।
কোটনের এ কথায় দীপু লজ্জা বোধ করল, বাদ দে, ঝামেলাটা
কি ?
সেটা বলা যাবে না। সব কেসেই একটু প্রাইভেট ব্যাপার থাকে।
তাই না?
হ্যাঁ, তা ঠিক।
নিজেদের ফ্যামিলির ব্যাপার তো ! বলে একটু থামল কোটন, জানো
দীপুদা, কেসটা
একটু অন্যরকমভাবে হ্যাণ্ডেল করতে হবে।
কথা শেষ করেই কোটন তার প্যান্টের পিছন পকেট থেকে খাপে ঢাকা
একটি ছুরি বার করল। মুহূর্তে ওর চোখমুখের চেহারাও কেমন বদলে গেল। খাপ থেকে ছুরিটা
বার করে, শান
দেওয়ার ভঙ্গিতে বাঁ হাতের তালুতে বারকয়েক ঘষল। তারপর চাপা গলায় বলল, দিদির
শ্বশুরের পেটে ঠেকিয়ে বার কয়েক ফলস্ ঘোরাব, তাতেই কাজ হয়ে যাবে। ঝামেলাটা আজই
মিটিয়ে দিতাম। মালটা বাড়ি ছিল না। বাজারে না কোথায় গেছে।
কোটনের মুখের আওয়াজের সঙ্গে দীপু পরিচিত। কিন্তু সঙ্গে
ধারাল ছুরি রাখে,আজই প্রথম জানল।
দীপু নিজের শরীরের মধ্যে অস্বস্তি বোধ করল। অস্ত্র হাতে যে
কোন মানুষ সাংঘাতিক কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারে।
ছুরিটা আমায় দে। দীপু বলল।
কেন ? কোটন অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল।
ছুরি-টুরি তোর হাতে মানায় না কোটন। যে কোন ঝামেলায় তুই গিয়ে
দাঁড়ালে, সেটাই
কাফি। ছিঁচকে মস্তানরা ছুরি পেটো এ সবের ভয় দেখায়।
কোটন অপলক দীপুর মুখের দিকে চেয়ে রইল অনেক্ষণ। তারপর
ছুরিটাকে খাপে ভরে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে বলল, দিদির শ্বশুর ঘোটালা টাইপের। টাকার
গরমে ফুটছে। দিদিকে আসতে দেয় না আমাদের বাড়িতে।
দীপু বিছানায় উঠে বসল। কোটনের দিকে নিজের হাতটা বাড়িয়ে বলল, ছুরিটা
আমায় দে।
কোটন অসহায় চোখে দীপুর মুখের দিকে তাকাতেই দীপু ধমকে উঠল, কথাটা
কানে যাচ্ছে না? যা বলছি, তাই কর।
কোটনের চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, দীপুর
ধমকে সে ভয় পেয়েছে এবং বেশ ঘাবড়ে গেছে। প্যান্টের পকেট থেকে ছুরিটা বার করে সে
দীপুর হাতে দিল, এখন রাখছ রাখো। কিন্তু এটা আমার কাজে লাগবে। তখন দিতে হবে
কিন্তু।
দীপু হেসে বলল, ঠিক আছে। এখন বাড়ি যা। দরজাটা বন্ধ
করে দিবি। আমি ঘুমবো।
(দুই)
ইতিমধ্যে দীপু খোঁজ খবর করে জেনেছে, কোটন তাকে
মিথ্যে বলেনি। অদিতির শ্বশুরবাড়ির সাথে,তার বাবার পরিবারের সম্পর্কের
অবনতি হয়েছে। অদিতিকে এখন আর তার বাবার
বাড়িতে আসতে দেওয়া হয় না।
কি কারণে কেন এমনটা ঘটেছে, দীপু জানে না। কিন্তু তার কষ্ট
হয়েছে। অদিতির জন্য।
অদিতিকে দীপু এখনও ভুলতে পারেনি। অদিতি প্রতারক এমন ভাবনা
তার মনে আসে না।
আজ হঠাৎ করে কোটনের হাতে ছুরিটা দেখে, অদিতিকে
আরও নিবিড়ভাবে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিতে ইচ্ছে হল দীপুর।
এখন থেকে নির্বিরোধ, স্বভাব-ভীতু দীপুকে, অদিতি
নতুনভাবে চিনুক। উঠতে-বসতে, প্রতিটি শ্বাসবায়ুর সঙ্গে
নিরুচ্চারিত শব্দে দীপুকে স্মরণ করুক। এমন ভাবনায় দীপু খুশি হলো।
হতে পারে এটি একটি খেলা। দীপুর মনে হলো, তা হোক, খেলাটা
শুরু করা যেতেই পারে। হার-জিত, এগিয়ে যাওয়া, পিছিয়ে
পড়ার, বাস্তব
যখন বলছে এসবের কিছুই নেই, তখন খেলাটা চলতেই থাকুক না।
(তিন)
একদিন অফিস থেকে দীপু, অদিতির মোবাইলে ফোন করল ভরদুপুরে।
অদিতি ফোন ধরে বলল, কি
ব্যাপার ? এত
দিন পরে হঠাৎ ?
দীপু বলল, আমার একটা উপকার করতে হবে।
তোমার উপকার? বলে অদিতি হাসল, এখনও আমার
ওপরে ভরসা রাখো ?
রাখি বলেই তো অনুরোধ করছি।
বেশ বলো, কি করতে হবে ?
একটা ছুরি তোমার কাছে লুকিয়ে রেখে দিতে হবে।
ছুরি? দীপু টের পেল অদিতির গলায় শীতের
কাঁপন, কি
বলছ, দীপু
!
হ্যাঁ। ধারাল একটা ছুরি। ছুরিটা কেন কিনেছিলাম মনে পড়ছে না, কিন্তু
এখন ওটা আমার কাছে আর রাখতেও চাইছি না।
ডাস্টবিনে কিম্বা গঙ্গার জলে ফেলে দাও।
উপায় নেই। দীপু লম্বা করে শ্বাস ফেলল, ওটা আমার
কাজে লাগবে। তাই আপাতত তোমার কাছে লুকিয়ে রাখতে চাইছি।
দীপু,আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না। কেমন যেন সব .... !
দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। দীপু হেসে বলল, কোটনের
হাত দিয়ে ছুরিটা তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব।
কোটনকে এ বাড়িতে অ্যালাও করা হয় না। অদিতি বলল।
কোটন আর আগের মতো নেই। দীপু বলল। গত কয়েক মাসে ওর মধ্যে র্যাডিকাল
চেঞ্জ এসেছে। এখন আর হাতে গলা কাটার গল্প করে না।
প্লীজ,তুমি কোটনকে পাঠিয়ো না।
কোটনই যাবে। ওর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ছুরিটা তুমি সাবধানে
নেবে ওর থেকে। আর যত্ন করে সেটা আগলে রাখবে।
এই অব্ধি বলে অল্পক্ষণ চুপ করে রইল দীপু।
টেলিফোনের অপর প্রান্তে কোন শব্দ নেই। কিন্তু লাইনটা চালু
আছে, দীপু
বুঝতে পারল। বলল, অদিতি? তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ ?
পাচ্ছি।
কোটনকে পাঠাচ্ছি। সঙ্গে ছুরিটা।
অদিতির উত্তরের অপেক্ষা না করে, দীপু নিজের মোবাইলের সুইচ অফ করে
দিল।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি –
লেখালিখির শুরু গত শতকের শেষ দশকে। বাণিজ্যিক পত্রিকার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে
লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি। গল্প সংকলন আটটি এবং তিনটি উপন্যাস।
.jpg)