Advt

Advt

dronacharya-story-galpo-by-bimal-gangopadhaya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-দ্রোণাচার্য-গল্প-বিমল-গঙ্গোপাধ্যায়

dronacharya-story-galpo-by-bimal-gangopadhaya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-দ্রোণাচার্য-গল্প-বিমল-গঙ্গোপাধ্যায়

এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। এমন তো হয়ও কখনও কখনও।

প্রাণতোষ অবাক বিস্ময়ে ছেলেগুলির মুখের দিকে চেয়ে রইলেন অল্পক্ষণ। তারপর ধীর গলায় থেমে থেমে বললেন, তোমরা আমাকে সম্বর্ধনা দেবে ! এতদিন পরেও আমাকে এভাবে ...........! 'মনে রেখেছ' শব্দ দুটি আর উচ্চারণ করতে পারলেন না। গলার স্বর বুজে এল। বেশ বুঝতে পারলেন, মাথাটা নামিয়ে না নিলে চোখের জল ধরা পড়ে যাবে।

বিদায় নেওয়ার সময় ছেলেগুলি আবার যখন বলল, সামনের রবিবার। ঠিক বিকেল চারটে। প্রাণতোষ মাথা নাড়লেন, আমি যাব। নিশ্চয়ই যাব।

দোতলার ছোট ঘরটি প্রাণতোষের নিজের জগৎ। চৌকির ওপর পাতলা বিছানা। আসবাব বলতে পুরনো মাঝারি একটি কাঠের আলমারি। আর পায়াভাঙা নড়বড়ে একটি আলনা। পারা চটে যাওয়া ঘোলাটে আয়না দেওয়ালে টাঙানো। আলমারি আলনা এবং আয়না বাদ দিলে অবশিষ্ট যে জায়গাটুকু সেখানে দাঁড়িয়ে দুপাশে হাত ছড়ানো যায় না। দেওয়ালে হাত ঠেকে যায়। এ বাড়ির বাকি ঘর দুটি প্রশস্ত। আধুনিক আসবাবে চমৎকার সাজানো। অতিথি অভ্যাগতদের জন্য টিপটপ একটি ডাইনিংও আছে।

বাড়িতে থাকলে প্রাণতোষ নিজের ঘরেই থাকেন। বিছানায় শুয়ে থাকেন। নিচের তলায় ছেলে, ছেলের বউ, নাতি। তারা গল্প করে, হাসে। সেইসব ভাঙা ভাঙা কথাবার্তার শব্দ প্রাণতোষ শুনতে পান। টিভির আওয়াজও ভেসে আসে। কাজের মেয়েটি খাবার নিয়ে আসে। হাত বাড়িয়ে খাবারের থালাটি নেওয়ার সময় প্রাণতোষ মেয়েটির মুখের দিকে চান। কেমন নির্লিপ্ত চোখ দুটি মেয়েটির। খেতে খেতে অন্যমনস্কতায় গলায় খাবার আটকে গেলে খক খক কাশি শুরু হয়। তাড়াতাড়ি জল খান। বড় বড় নিঃশ্বাস পড়ে। হতভম্বের মতো এদিক ওদিক তাকান। তাঁর কাছাকাছি কেউ নেই। সামনে ছোট এক টুকরো ছাদ। বড়ই চুপচাপ। শূন্য দৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে প্রাণতোষের শরীর কেঁপে উঠে থরথর করে। ছোট ছাদটা তখন বিশাল মাঠ হয়ে যায়। মাঠ উপচে মানুষের ভিড়। চিৎকার চেঁচামেচিতে কান পাতা দায়। বল পায়ে প্রাণতোষ ছুটে চলেছেন। তাঁকে আহত করতে উদ্যত অন্যায় পা, তিনি টপকে বেরিয়ে যাচ্ছেন অনায়াসে। মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন প্রতিপক্ষের শেষ প্রহরীর মুখোমুখি। চিৎকার থেমে গেছে। কী হয় কী হয় উত্তেজনায় টানটান চারপাশ। তাঁর সামান্য তফাতে দাঁড়িয়ে একমাত্র প্রতিপক্ষের ভয়ার্ত মুখের দিকে চেয়ে করুণা জাগে মনে। করুণা না বিজাতীয় শ্লাঘা ! নিতান্ত হেলাফেলায় পায়ের বলটিকে আল্তো ঠেলায় সীমানার বাইরে পাঠিয়ে দেন।

কারা যেন সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে, গ্রেট স্পোর্টসম্যানশিপ।

সবল চেহারার একজন মানুষ দৌড়ে মাঠের মধ্যে এসে পাঁজাকোলা করে তাঁকে তুলে ধরে আকাশপানে।

চোখবুজে থাকলে মনে হয় যেন এই সেদিনের কথা। কাজের মেয়েটি ডাকে, আপনার খাওয়া হয়ে গেছে?

অশক্ত শরীরে পাশ ফিরতে কষ্ট হয়। কাতর গলায় প্রাণতোষ বলেন, থালাটা একটু নামিয়ে নাও মা। নিচু হয়ে মেয়েতে রাখতে পারি না।

(দুই)

প্রাণতোষ ভেবেছিলেন খেলাধূলার প্রতি তাঁর ছেলের টান থাকবে, এ যেন দুয়ে দুয়ে চারের মতো সরল গাণিতিক ব্যাপার। ব্যক্তিগত জীবনে সাংসারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে খেলার মাঠের অনেক কিছু তিনি হারিয়েছেন। তাঁর মধ্যেকার সম্ভাবনার বীজ যা অঙ্কুরিত হতে পারেনি, ছেলের মধ্যে তিনি সেসবের প্রতিফলন দেখতেন। প্রাণতোষের স্ত্রীর ধ্যানধারণা ছিল ঠিক এর বিপরীত। খেলাধূলার ভূত মাথা থেকে নামাতে না পারার জন্যই যে প্রাণতোষ আদর্শ মফুস্বলে মধ্যবিত্ত হতে পারেননি, এ বিশ্বাস ভদ্রমহিলার এত দৃঢ় ছিল যে খেলার মাঠকে তিনি নিষ্কর্মাদের চারণভূমি এবং অভাগাদের দাহক্ষেত্র ভিন্ন অন্য কিছু ভাবতে পারতেন না।প্রাণতোষ লক্ষ্য করলেন, মায়ের মতো ছেলের মধ্যেও খেলাধূলার বিষয়ে একটি বিজাতীয় ধারণা প্রকট হয়ে উঠল। বিকালবেলায় কিশোরের দল যখন বল পায়ে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, তাঁর ছেলে তখন বদ্ধ ঘরের জানলায় বসে ট্রানজিস্টারের কাঁটা ঘুরিয়ে গান শুনছে। হিন্দীতে খবর শুনছে। প্রাণতোষ একদিন থাকতে না পেরে ছেলেকে বললেন, খেলতে ভাল না লাগে, মাঠে গিয়ে খেলা দেখতে তো পারিস। তাতে মন ভাল থাকবে। একটু চুপ করে থেকে বললেন, কিছু না হোক, বদ্ধ ঘরটার চেয়ে সেখানে আলো হাওয়াও তো বেশি।

চোখমুখে অবয়সোচিত গাম্ভীর্য ফুটিয়ে ছেলে বাবার মুখের দিকে চেয়ে জবাব দিল, চুপচাপ বসে থাকি তাতেও তোমার খারাপ লাগে?

-   না মানে .... !

-   মা ঠিকই বলে, খেলা খেলা করে তুমি সংসারের ...!

এই অব্দি শুনেই প্রাণতোষের মাথায় রক্ত চড়ে গেল দপ করে তেড়ে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। স্থির চোখে ছেলের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন অল্পক্ষণ। আস্তে আস্তে মাথার রক্ত পায়ে নেমে এল। বুঝতে পারলেন, যা হবার তা হয়ে গেছে।

প্রাণতোষের নিজের মনেই সংশয় তৈরী হল, সত্যি কি খেলার মাঠকে সংসারের চেয়ে বড় করে দেখতে গিয়ে, স্বামী হিসাবে পিতা হিসাবে তিনি দায়িত্ব পালনে গাফিলতির পরিচয় দিয়েছেন? আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকে মানুষের এক ধরনের ক্ষোভ জন্মায়। অতি প্রিয় বস্তুকে তখন তার অসহ্য মনে হয়। যে কোন ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে সেই বস্তুটিকেই সে আগে চিহ্নিত করে। প্রাণতোষেরও তাই হল। তিনি প্রতিদিন নিয়ম করে মাঠে খেলা দেখতে যাওয়া বন্ধ করলেন। এমনকি ছেলের ছেলে, তাঁর নাতি, রাজার বিষয়ে তিনি গোড়া থেকে সতর্ক হয়ে গেলেন। রাজার পাজল বক্স নিয়ে নাড়াচাড়া করা, ধ্যানমগ্নের মতো টিভি-র পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা বা বদ্ধ ঘরের বিছানায় কমিকসের বই কোলে করে চুপচাপ বসে থাকা, এসব দেখেও তাঁর মনে কোন ক্ষোভ সৃষ্টি হল না। রাজার জন্য করুণাও বোধ করলেন না। এই তো ঠিক, তাঁর মনে হল এমনটিই তো হওয়া উচিত।

কিন্তু এসবের পরেও অসাবধানতায় পুরনো অসুখের জানান দেওয়ার মতো স্মৃতি ঘাই মারে আচমকা বুকের মধ্যে। তখন ছোট ছাদটা মাঠ হয়ে যায়। মাঠ ভর্তি লোক। তারা চিৎকার করছেবল পায়ে প্রাণতোষ ছুটে চলেছেন। এসব ছবি বড় জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে। তখন প্রাণতোষের ইচ্ছা করে চিৎকার করে ছেলেকে ডেকে বলেন, রাজাকে এভাবে বন্দি করে রাখিস না তোরা। খোলা আলো হাওয়ার মধ্যে ওকে নিজের মতো করে দৌড়তে দে।

পাশের বাড়ির সঙ্গে উঁচু গলায় বৌমার আলোচনা ভেসে আসে কুইজ বিষয়ে রাজার পারদর্শিতা, স্কুল থেকে ফিরেই হোমওয়ার্কে মগ্ন হওয়া, পড়ার চাপে স্কুলে অসম্পূর্ণ টিফিন খাওয়া। আর আশ্চর্য, রাজাকে কখনও একা পান না প্রাণতোষ। একটু নিরিবিলি পেলে জিজ্ঞেস করে দেখতেন, সত্যি সত্যি খেলার মাঠ ওকে টানে কিনা। মা বাবারা কেন যে বোঝে না, শিশুমনের ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে তার উল্টোছিরি হতে পারে। রাজার মতো কত শিশুর ক্ষেত্রেই এমনটি হচ্ছে। মানুষের জীবন থেকে শৈশব কৈশোর, এইসব পর্যায়গুলি হারিয়ে যাচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে, প্রাণতোষের মনে হল, তাঁর কিছু করণীয় আছে। ঠিকমত বোঝাতে পারলে, বোধোদয় না হোক দুচারজন মানুষ অন্যরকম ভাবতেও পারে!

(তিন)

ভিতরের উত্তেজনা যথাযথ প্রকাশ করতে না পেরে অনেকে বোধবুদ্ধিহীনের মতো ফ্যালফেলে চোখে তাকিয়ে থাকেন। কেউ কেউ আবার কেঁদেও ফেলেন। প্রাণতোষের ক্ষেত্রে এ দুয়ের মাঝামাঝি ব্যঞ্জনা ঘটল। আয়োজক সংস্থা যখন তাঁকে ফুটবলের 'দ্রোণাচার্য' বলে ঘোষণা করল, অনুষ্ঠান সভাপতি দ্রোণাচার্যের মূর্তি খোদাই ফলকটি তাঁর হাতে তুলে দিলেন, ক্যামেরা ক্লিক ক্লিক করে ছবি তুলল, প্রাণতোষের মনে হল তিনি সব ঝাপসা দেখছেন এবং গলার কাছে শ্লেষ্মার মতো কিছু জড়িয়ে যাচ্ছে। দুচার কথা বলার অনুরোধে মাউথপিসের কাছে এগিয়ে গেলেন। যা বলবেন ভেবেছিলেন, পুরোটা বলতে পারলেন না। বাক্যও এলোমেলো হয়ে গেল। তবু চেয়ারে বসে পড়ার পর কলকাতার মাঠের একজন নামী খেলোয়াড় তাঁর কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বললেন, চমৎকার বলেছেন। আপনার বক্তব্য থেকে মা বাবাদের একটু শিক্ষা নেওয়া উচিত।

বাড়ি ফিরবেন বলে প্রাণতোষ রিক্সায় উঠছেন, একটি ছেলে তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। সংগঠকদের মধ্যে থেকে একজন বলল, এর নাম নিলয় সরকার। এ বছর বাংলার হয়ে ফুটবলের প্রতিনিধিত্ব করছে।

প্রাণতোষ ছেলেটিকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, বাংলার মুখ রক্ষা কর। আমরা তো! বলে লম্বা নিঃশ্বাস ফেললেন, এখন অস্তাচলে।

পাশ থেকে কে যেন বলল, আপনি 'দ্রোণাচার্য' আর, নিলয়কে দেখিয়ে বলল, এ 'একলব্য'। আমাদের প্রথম বছরের রেসিপিয়েন্ট।

প্রাণতোষের শরীরের মধ্যে অদ্ভুত শিহরণ হল। তিনি দ্রোণাচার্য, সামনে দাঁড়িয়ে একলব্য। বাংলার মুখরক্ষার ভার যার ওপর! সুঠাম স্বাস্থ্য। তীব্র অনুশীলনে চেহারায় রুক্ষতার ছাপ। চোখদুটিতে কৈশোরের লাবণ্য আটকে রয়েছে। বারকয়েক ছেলেটিকে দেখলেন প্রাণতোষ। মাথা থেকে পা অব্দি! তারপর ধীর গলায় থেমে থেমে বললেন, আকাশ লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়বে। লক্ষ্যটা তালগাছের মাথা হলে, সে তীর বাড়ির ছাদ পেরোবে না। আর একটা কথা! বলে এদিক ওদিক তাকালেন। যেন কোন পরিচিত মুখ খুঁজছেন, তুমি যা শিখলে, চেষ্টা কোর তা অন্যকে শিখিয়ে যেতে। বিদ্যা আত্মার মতো। এর নাশ নেই।

এরপর ফুরফুরে হাওয়ায় রিক্সায় বসে প্রাণতোষের নিজেকে অদ্ভুত হাল্কা লাগতে লাগল। রিক্সা থামিয়ে এক খিলি পান কিনলেন।, দোকানী জিজ্ঞেস করল, হাতে ওটা কী মেশোমশাই? বেশ জেল্লা মারছে। প্রাণতোষ হেসে জবাব দিলেন, মাঠের ধারের একটি ক্লাব আমাকে সম্বর্ধনা দিল।

-   স-ম্ব-র্ধ-না!

-   প্রাইজ দিল। প্রাণতোষ ব্যাপারটা সহজ করে দিলেন।

কাজের মেয়েটি রাতের খাবার দিতে এসে আড়চোখে টেবিলের দিকে বারকয়েক তাকাতেই প্রাণতোষ হেসে বললেন, দেখছিস কি? প্রাইজ, আমাকে দিল।

-   আপনার প্রাইজ? মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। প্রাণতোষ বিরক্ত বোধ করলেন, যা বুঝিস না, তা নিয়ে হাসবি না।

-   আঙ্গুল তুলে ওটা কী দেখাচ্ছেন?

-   লক্ষ্য। বলে একটু থামলেন প্রাণতোষ, তুই বুঝবি না। নিচে নিয়ে যা। টেবিলে রেখে আয়। আর শোন?

চৌকি ছেড়ে নেমে এলেন প্রাণতোষ। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো শংসাপত্রটি ধুতির কোনায় ভাল করে মুছে মেয়েটির হাতে দিলেন, এতে সব লেখা আছে। জোরে জোরে পড়তে বলবি। মন দিয়ে শুনবি।

(চার)

পরদিন সকালে প্রতিদিনের মতো সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজ শুনে বিছানায় আয়েস করে বসলেন প্রাণতোষ, চা আসছে তাহলে, এমনি ভাবনাজনিত তৃপ্তিতে। ঘরের দরজার কাছে এসে আওয়াজটা থেমে গেল। একদম চুপচাপ সামান্যক্ষণ। প্রাণতোষ ঘাড় ঘুড়িয়ে তাকালেন। একটি ছোট মুখ দরজা দিয়ে মাথা বাড়িয়ে ডাকল, দাদুভাই ?

-   ওখানে কেন? ঘরে এস।

ধীর পায়ে রাজা ঘরে এল 'দ্রোণাচার্য' ফলকটিকে ধরে। টেবিলের ওপর সেটিকে নামিয়ে রেখে গম্ভীর গলায় বলল, এই লোকটা তুমি?

প্রাণতোষ হাসলেন, আমি কখনও ওই মানুষটি হতে পারি?

-   এই তো লেখা রয়েছে। রাজা ফলকটি প্রাণতোষের চোখের সামনে তুলে ধরল, দ্রোণাচার্য প্রাণতোষ চ্যাটার্জী।

প্রাণতোষ পরম স্নেহে রাজার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন, তুমি চুপ করে বস। আমি সব বলছি। কে দ্রোণাচার্য, তিনি কি করেছিলেন।

রাজা দ্রুত এপাশ ওপাশ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল, তোমার ঘরে ঘড়ি নেই?

-   না। প্রাণতোষ হাসলেন, কেন?

-   আটটা থেকে ম্যাথ করতে হবে।

-   তাহলে? প্রাণতোষ কপট গম্ভীর গলায় বললেন, তোমার শোনা হল না।

-   বল না। রাজা প্রাণতোষের কোলের ওপর হাত রাখল, আটটার মধ্যে যতটা হয় বল।

প্রাণতোষ সামান্যক্ষণ নিবিড়ভাবে রাজার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর মেজাজী সংগীতের মতো ধীর লয়ে বলতে শুরু করলেন অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের কাহিনী।

কাঠের পাখি গাছের ডালে রেখে দ্রোণাচার্য রাজকুমারদের বললেন, তীর ছুঁড়ে সেটিকে মারতে হবে। সে কী সোজা কাজ? যে সে পারে? পাণ্ডবদের তৃতীয় ভাই অর্জুন তীর ছুঁড়ল। কাঠের পাখির গায়ে সে তীর বিঁধল। দ্রোণাচার্য খুশি হলেন। তখনও তো তিনি জানতেন না, অর্জুনের চেয়ে বড় তীরন্দাজ আছে। তাকে তো চোখে দেখেননি। সে তো গভীর বনের মধ্যে একা একা তীর ছোঁড়া অভ্যাস করত।

-   কে সে?

-   রাজা, নিচে এস। হোম টাস্ক বাকি রয়েছে।

-   বলতেই হবে তার নাম। তুমি জান না?

-   রাজা স্কুলে আন্টির কাছে বকুনি খাবে কিন্তু।

-   তার নাম একলব্য। ব্যাধের ছেলে। ব্যাধ কাকে বলে জান না তো? যারা তীর ছুঁড়ে পশু শিকার করে।

-   রাজা বাপি বাড়ি এলে বলে দেব, তুমি কথার অবাধ্যতা করছ।

-   একলব্যের গল্প শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে।

-   দাদুভাই, মা খুব রেগে গেছে। আমি চলে যাই। কালকে আবার আসব। একলব্যের গল্প বলবে?

-   বলব। সব গল্প বলব। এখন তুমি যাও।

গল্পটা শুরু না করলেই হোত। রাজার মুখটা বারবার মনে পড়তে লাগল। দু ঠোঁট অল্প ফাঁক করে কেমন অপলক তাকিয়েছিল তাঁর মুখের দিকে। ঠিক যেন গল্পটা গিলছিল।

(পাঁচ)

পরের দিন, তারপরের দিন, তারপরের দিন করে এক সপ্তাহ কেটে গেল। রাজা কিন্তু আর এল না। আগের মতোই প্রাণতোষ নিজের ঘরে বসে নিচে রাজার গলার আওয়াজ শুনতে পান। সেদিন তাঁর ঘরে আসার জন্য, রাজাকে কি বকুনি দেওয়া হয়েছে? যেটুকু গল্প শুনেছিল, হয়ত ভুলেই গেছে। কুইজ পাজল বক্স টিভি-র হাঁয়ের মধ্যে সেসব গল্প তলিয়ে গেছে। বাকিটুকুর কথাও স্মরণে নেই আর। প্রাণতোষ ভেবেছিলেন রান্নার মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করবেন। কিন্তু এক অদ্ভুত অভিমান আর জেদের বশে তিনি চুপ করেই রইলেন।

হঠাৎ একদিন সকালে চা দিতে এসে রান্নার মেয়েটি প্রাণতোষকে ডাকল, ওই দেখুন, কে এসেছে।

প্রাণতোষ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, তাঁর ঘরের চৌকাঠের বাইরে রাজা দাঁড়িয়ে। তিনি ইশারায় রাজাকে ডাকলেন। সে কিন্তু কিছুতেই ঘরের মধ্যে এল না। প্রাণতোষ বিছানা থেকে নেমে রাজার কাছে গেলেন, ঘরের মধ্যে না এলে, একলব্যের গল্পটা শুনবে কেমন করে?

মুহূর্তে রাজার ছোট দুচোখ জলে ভরে গেল। ধরা গলায় ফিসফিস করে বলল, তোমার ঘরে যাব না। মা বকবে।

এ কথায় প্রাণতোষের রেগে যাওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু তিনি রাগলেন না। রাজার মাথায় আল্তো করে হাত বুলিয়ে দিলেন, ঘরের মধ্যে আসতে হবে না। আমিই বরং ঘরের বাইরে যাচ্ছি। গল্পটা শুনবে তো?

রাজা চোখ বড় বড় করে বলল, হ্যাঁ। ওই জন্যেই তো লুকিয়ে লুকিয়ে এসেছি।

প্রাণতোষের অদ্ভুত আনন্দ হল, কতদূর বলেছিলাম বল তো?

-   একলব্য বনের মধ্যে একলা তীর ছুঁড়ত...।

-   ও, হ্যাঁ, হ্যাঁ। প্রাণতোষ যেন মনে করতে পারছিলেন না। ঘরের সামনে ছোট চাতালে রাজার মুখোমুখি বসে পড়লেন ধপ করে।

গভীর বনের মধ্যে একলব্য দ্রোণাচার্যের একটা মূর্তি গড়ে তার সামনে তীর ছোঁড়া অভ্যাস করত। একা একা। কেউ জানত না। দ্রোণাচার্য কিন্তু জানতে পারলেন। কেমন করে? সেটাই তো আসল গল্প।

-   রাজা কোথায় গেলে? সাড়া দিচ্ছনা কেন?

-   দাদুভাই, মা রেগে গেছে। - বলে খুব সাবধানে যেন কোন শব্দ না হয়, এইভাবে ছোট ছোট পা ফেলে রাজা সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। প্রাণতোষ অপলক সেদিকে চেয়ে রইলেন।

এরপর থেকে সিঁড়িতে অপরিচিত পায়ের শব্দ পেলেই প্রাণতোষ যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, দ্রুত দরজা থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে পিছন ফিরে বসেন। এটা তাঁর এক অদ্ভুত খেলা। নিজের সঙ্গে খেলা। উত্তেজনায় টানটান হয়ে আপন মনে গুণতে থাকেন এক দুই তিন চার .... বার তের .... সতের আঠার .... বাইশ তেইশ .... আঠাশ উনত্রিশ ....।

যদি একটি কোমল কন্ঠ হঠাৎই ডেকে ওঠে, দাদুভাই, একলব্যের গল্পটা .....!

--- সমাপ্ত ---

 লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

লেখক পরিচিতি –

লেখালিখির শুরু গত শতকের শেষ দশকে। বাণিজ্যিক পত্রিকার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে

লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি। গল্প সংকলন আটটি এবং তিনটি উপন্যাস।