Advt

Advt

desher-khabar-galpo-story-by-dr.shibshankar-pal-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-দেশের-খাবার-গল্প-ড.শিবশঙ্কর-পাল

 

desher-khabar-galpo-story-by-dr.shibshankar-pal-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-দেশের-খাবার-গল্প-ড.শিবশঙ্কর-পাল

পদ্মপাতায় গরম ভাত আর কলাপাতায় কলাই ডালের দিনকাল আর নাই গোআশি বছরের আশীষের এই কথায় একটা পুরনো স্মৃতির গন্ধ ভেসে আসছিল পাশে বসে থাকা সোনারাম গায়ের ঝিমুনি কাটিয়ে একটু নড়ে বসল

 যা বল্যাছ দাদা, স্যাইসব দিনের খানাপিনা আর কুথা এখন সব বিদিশি খাবার আল্ছ্যে পুড়া, সিদ্ধ আমানি, খারানি খাবারের কাল আর নাই গো

 বয়স্ক আশীষ যেন এটাই বোঝাতে চাইছিল সোনাকে বলছিল

 হ্যাঁ রে সুনা, খুদ-সিদ্ধ কচু-পুড়া খেয়ি আমরা বড় হয়্যাছিগুড়জল খেয়ি চারকাঠা ভ্যুঁঙ চুটাতে গায়ে গতরে একটুও টান লাগেনি শুধু গুগলির ঝোল দিয়্যা এক সানকি ভাত সাঁটাল্ছি আজকাল তা বুললে মাল-সম্মান কিছুই থাকবে না

 শুন দাদা এখন কাল পাল্টাল্ছ্যে লাতি-লাতিনরা এখন বিদিশি খানা খেতি শিখ্যাছে তুমার আমার কাল কি আর আছে?’ সোনারাম বলেই যাচ্ছিল

আমাদের ঘরে তখুন কতো খাবার হ্যতো কাঠের জালে মাটির সরাতে সালুনের যে সওয়াদ ছিল, খাট্টা টকের যে রেওয়াজ ছিল, তা কুথায় যেন হারিঙ গ্যালো রে বড়ার টক, কদমের টক, খুসা মাছ, তেঁতুলের টক আমরা কতো খেয়্যাছি বল তো! টক না হলি তো আমদের ভাতই হজম হ্যতো না

 টকের কথা শুনে আশীষের জীভে জল আসছিল বারদুয়েক ঢোক গিলে আশীষ সোনার দিকে চেয়ে থাকল বীরভূমের শুকনো মাটি, রূক্ষ জল-হাওয়াতে এই মানুষ দুটো বহুকাল কাটিয়েছে গায়ে গতরে পরিশ্রম করেছে ঘর-সরসার করেছে, ছেলেপুলে মানুষ করেছে তবে দুজনেই ভোজনপিপাসু মানুষ, নইলে জীবনের এই পড়ন্ত বেলা খাবারের হিসাব-নিকাশ নিয়ে এরা বসতো না দুই বন্ধুর মধ্যে সেসব চর্চা আজ একটু বেশি মাত্রায় হতে শুরু করেছে আশীষ সোনাকে বোঝাতে লাগল তখনকার দিনে মানুষের হজম ক্ষমতার কথাবিয়েকাজে মানুষের খাবারের নানা গল্পকথাপটল মাল নাকি আশীষের বিয়েতে এক বালতি ছ্যাঁছড়া (পঞ্চব্যঞ্জন)ওয়ার পরও বারো গুণ্ডা মণ্ডা খেয়েছিল আশীষের দাদা একজায়গায় বসে একটা গোটা কাঁঠাল সাবার করে দিত জোয়ান বয়সে সে নিজে হজম করতে পারত সের তিনেক দুধ খাওয়ার প্রতিযোগীতা চলত তখন কে কতো বেশি খেতে পারে সেসব চাক্ষুষ করাও ছিল আনন্দের ঘরে সংসারে মোটা ভাতকাপড়ের অভাব ছিল না তখন বকবক করে বলেই চলেছিল সে

 বুঝলি সুনা, আমরা বেগুন পুড়া, লঙ্কা বাঁটা দিয়্যা কতো মুড়ি খেয়্যাছি বুল? এক খুড়া মুড়ি তো একটানে শ্যাষ করা কুনো ব্যাপারই ছিল না মা বুলতো এ ছেল্যা মুড়ি খেয়ি গতরখান বাগালে বো বুলতো তুমি মরলি ঝিলে দু-খুরা মুড়ি চাপাবো

 তা বোদি ঠিক বুলত দাদা, তুমার মুড়ি খাওয়া ছিল রাক্কসের মতো যেন গরুতে সানি খেছে মনে হ্যতো আমরাই বা কি কম ছিল্যাম দাদা, শুধু গুড় মাখিঙ আদটিন মুড়ি খেত্যাম এক লিশ্যাসে একহাঁড়ি তালের রস হাফিস করত্যাম

আশীষ আর সোনা বীরভূমের যে অঞ্চলের মানুষ অর্থাৎ সিউড়ি-রামপুরহাট-মুরারই অঞ্চলে এই ধরনের খাবারের প্রচলন আজও কিছুটা আছে বিশেষত এই অঞ্চলে টক আর মুড়ির প্রচলন আজও বহাল তবিয়তে দেখতে পাওয়া যায় সকালের চা থেকে শুরু করে জলখাবার, বিকেলের আহার, এমনকি রাতের ভোজনও বীরভূমের এই এলাকার মানুষ মুড়ি খেয়ে চালাতে পারে আর টক না হলে এদের চলবেই না রুক্ষ পরিবেশে টক বা আমানি নাকি শরীরে তাকত জোগায় -অঞ্চলের মানুষের এরকম ধারনা মুড়ির কথা বলতে বলতে আশীষের মনে পড়ে যায় মুড়ির সঙ্গে কুড়ুত কলাই বাঁটা, হ্যাঁটকা কলাই বাঁটা, কচু পোড়া মাখিয়ে মুড়ি খাওয়ার কথা মুড়ির নাড়ু, চালভাজার নাড়ু, তিলের নাড়ু, চিড়ের নাড়ুর কথা সোনাকে মনে করাতে গিয়ে সে শুরু করে সেই পুরনো দিনের গপ্প

 মাটির খুলাতে (মাটির বড় কড়াই, কিছুটা চ্যাপ্টা) খাজরথরি, দক্ষণ্যালঘু চালের মুড়ি হ্যতো আঙুলের পাপের মতো চালভাজা, হলুদ মুড়ি, খই-মুড়কি হ্যতো ঘরে ঘরেভোররাতে উঠি মা-বিটিরা ধান সিদ্ধ করত্যো চাল ল্যাড়ত্যো তারপর খুলার গরমবালিতে চাল ফেললেই সাদা সাদা মুড়ি ফুটকে উঠত্যো সে মুড়ির বাসই (গন্ধ) ছিল আলাদা বুল সুনা?’

 খোলায় ভাজা তপ্তমুড়ির মতো সোনা বলতে থাকল—

‘শ্যাষ জি কবে সেই মুড়ি খেয়্যাছি তা আর মনে লাই দাদা এখুন সব লে ভাজা মুড়ি মুড়ি তো লয় যেন জুয়ালি খেছি মনে হয়’ (জুয়ালি অর্থাৎ সবজির ফেলে দেওয়া খোসা, খুদ অর্থাৎ চালের অব্যবহার্য টুকরো দিয়ে গবাদির জন্য সিদ্ধ করা খাবার) একটা দীর্ঘনিশ্বাস নিয়ে সোনা আবার বলতে থাকে—

‘আজকাল সব লতুন লতুন খাবার আল্ছ্যে দাদা বো-বিটিরা ফ্যাসবুক-ট্যাসবুক দ্যাখে আর সালুন রাঁধে শিল-নুড়ার বাঁটা মশলা যেন হারিঙ গ্যালো! সওয়াদের কথা আর বুল না! সেদিন লাতনি পালং শাগের সঙ্গে পনির না ফনির কিসব মিশিঙ এমন এক সালুন রাঁধলে দাদা, খেয়ি গা বমি বমি করতি লাগ্যলো

 -কথাটি আশীষের বেশ লাগল, বললে

আমরা কাটখোট্টা মানুষ হে ভায়া আমাদের কি উসব বাহারি সালুন জিভে লাগ্যবে? সারাজীবন কলমি-হ্যাঞ্চা-শুশুনি শাগভাজা খেয়ি বড় হল্ছি সরষ্যা বাঁটা আর ঘানির ত্যালের বাস (গন্ধ) ইকালের সালুনে পাবি?’

 কথাটা সত্য এই তালুকে কলমি, সজনে, লাউশাক, কচুশাক, পুনকা বা অরহর কলাইয়ের শাক একসময় বহুল প্রচলিত ছিল শাকের সঙ্গে গোটা সরষে, কাঁচা লঙ্কা, ঘানিতে পেষা সরষের তেল দিয়ে যে শাকের পদ রান্না করা হতো তার স্বাদ বড় বড় রেস্টুরেন্টে গেলেও এখন পাওয়া যাবে না আর এই চাষাভুষো মানুষ দুটো ছোট থেকে রাঢ়ের রান্না চাতালে বড় হয়েছে তাদের কাছে নতুন আদব কায়দার পদ জিভকে উল্টে দেবে এটাই স্বাভাবিক আশীষ-সোনার কথা সেটাই যেন উঠে আসছিল বীরভূমের পুরাতন বা প্রায় হারাতে বসা খাদ্যাভ্যাস আজও যেন বহু মানুষের স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে তারা আজও সেসব খাবারের গন্ধ খুঁজে ফেরে স্মৃতির পটে থেকে যায় আঞ্চলিক জলহাওয়া, মাটির গন্ধ, মা-বউদের একান্নবর্তী রান্না চাতালের ইতিকথা আশীষ আর সোনার এই কথপোকথনে তাদের মনের কষ্টও যেন মিশে ছিল আশীষের গোয়ালঘরের বাইরে মাচায় বসে দুজনে পেতেছিল গল্পের আসর নেহাত সময় কাটানো, বয়সের শেষ প্রান্তে এসে মানুষের খাওয়ার চাহিদা হয়তো একটু বাড়ে তাই অতীতের কথায় তারা খাবারের গন্ধ খুঁজছিল শাকের কথা যখন হচ্ছিল তখন গোয়ালঘরের বাছুরের হাম্বাডাক সোনার স্মৃতিতে হয়তো দুধ ঘি মাখনের ছবি তুলে ধরল কথার প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে সে যোগ করল—

‘আর দাদা আগে আমাদের ঘরে ঘরে কত দুধ থ্যাকতো বলো তো! দুধের চাঁছি, দই, ঘোল তো ইকালের ছেল্যাপুল্যারা চাঁখতি পানা চালগুড়ির সঙ্গি চাঁছি মিশিঙ পুলিপিঠ্যা, অ্যাঁশক্যা পিঠ্যা, অ্যাঁড়শ্যা কত রকমের পিঠ্যা যে হ্যতো!’

এসব শুনে আশীষের চোখদুটো চকচক করে ওঠে  যারা ছোট থেকে ঢেকিতে পেষা চালের পিঠে খেয়েছে আবার যাদের বয়স আশীর কোঠায় তাদের কাছে পিঠেপুলির গল্প পেটের খিদে বাড়িয়ে তোলে সোনা সেই কাজটি অজান্তে করে ফেলেছিল আশীষ তাই আবেগের সঙ্গে স্মৃতি মিশিয়ে বলল—

‘আহা! জারের (শীতের) দিনে আখার (উনুনের) ধারে বসে মা আমার চ্যাল গুল্যতো মাটির খুলাতে তালপাতা দিয়ে সেই চ্যালগুলা ছড়িঙ দিতো ভুসির (ধানের খোসার) জালে সেই পিঠ্যা হ্যতো অমিত্ত (অমৃত) সে সওয়াদ জি আজও জিভে লেগে আছে ভায়া

সোনা  পিঠেগলার মতো কথাগুলো গিলছিল -বিষয়ে তারও সমান অভিজ্ঞতাশীতের সময় বীরভূমের এই শুকনো অঞ্চল যখন কুয়াশা মেখে সতেজ হয়ে উঠত, পৌষ মাসের ধান কাটা-মারা হয়ে গেলে ঘরে ঘরে চলত পিঠের উৎসব গোকুল পিঠে, পাটিসাপটা, ধুকিপিঠে, মালপোয়া তৈরীর তোজোর চলত ঘরে ঘরে ঢেঁকিশালে চাল কুটতে কুটতে মেয়েরা ধরত গান সমবেত আয়োজনে একই ঢেঁকিতে কোটা হতো গোটা গ্রামের চাল সেসব রেওয়াজ বয়স্ক সোনা ও আশীষ দেখেছে আবার সেসব হারিয়ে যাওয়ার সাক্ষীও তারা তাই স্মৃতির জাবর কাটতে গিয়ে আঞ্চলিক খানাপিনা এদের আজকের আলোচনার বিষয় সোনা তার আশীষদাদার কথায় মশগুল হয়ে বলে—

‘তা কি আর ভুলা যায় গো! সেসব ছ্যাল বড় আলন্দের দিন লবানের (নবান্নের) পরব

 গোয়ালঘরের ধারে ততক্ষণে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছেআশীষ-সোনার জীবনের মতোহারাতে বসেছে পুরনো রান্নাচাতালের বহুপুরোনো অভ্যেস বহু পুরনো পদের আঞ্চলিক স্বাদ-গরিমা শীতের প্রকোপ এখন এই অঞ্চলে একটু বেশি মাত্রায় হাজির হয় মাটির ফলন বৃদ্ধি হলেও চালের পিঠে তৈরী করার হ্যাঙ্গামো এখন আর মা-বৌরা করতে চায়না মুড়ি ভাজতে চাইনা টক রান্না করার থেকে চাটনি রান্না করা এদের কাছে অনেক সহজ মনে হয় হ্যাঁটকা বাঁটা বা কলমির শাক রান্না করলে এদের ছেলেপুলেরা রে-রে করে তেড়ে আসে চিলিচিকেন-চাউমিনের দৌড়ে চালভাজা, শামুককল-গুগলির তরকারি পাতে নিতে এদের লজ্জা করে নতুন নতুন খাবারের অভ্যাসে এ-অঞ্চলের মাটির আখা থেকে আর পাওয়া যায় না ঘসির (ঘুঁটের) জ্বালের উত্তাপ আম-আমড়া-কুল-করমচা আচারের গন্ধ আশীষ সোনাদের খাদ্যাভ্যাস হয়ে ওঠে গল্পবীরভূমের হারাতে বসা খাদ্যকথা

লেখকের  অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।

 লেখক পরিচিতি—

কবি ও কবিতা বিশ্লেষক। প্রাবন্ধিক। লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্র-সমীক্ষা ভিত্তিক গ্রন্থ রচয়িতা। নানা লোকসেবামূলক সংস্থার সদস্য।