টিকিট না কেটে ভ্রমণের আনন্দ
আছে,
আছে
ভয়ও। তাতে টাকা সাশ্রয় হয় আবার অধিক ব্যায়ের বিড়ম্বনাও থাকে। পরপর দু’দিন বিশেষ
কারণ বসত আমাদের টিকিট ক্যানসেল করতে হল। রেল কোম্পানি কিছু পয়সা ফেরত দিল। অনেকটা
ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ আর কি! কিন্তু ফেরার টিকিট আর পেলাম না। সব ট্রেন বুক। ওয়েটিং
লিস্টের টিকিট করতে ভরসা হলনা। তাতে কনফার্ম না হলে সাদা-কালো বাবুরা টানাহিচরা
শুরু করে। বেশি কথা বললে কোর্টের দরজা দেখায়। সে এক যাচ্ছেতাই অবস্থা।
কয়েকমাস আগে টিকিট কেটে বর্ধমান
যাচ্ছি। দিব্বি ট্রেনে জায়গা পেয়েছি। জানলার ধারে। ফুরফুরে হাওয়ায় মৌজ হয়ে
বুদ্ধদেব গুহর ‘মাধুকরী’ খুলে বসেছি। কয়েকজন কাছে এলেন। আমার হাতের গড়ন দেখে
বললেন—
ছাড় ছাড়,ও হ্যান্ডিক্যাপ
অ্যাঁ আমি হ্যান্ডিক্যাপ!
রোগা হলেও হাতে আমার বেশ বল। ওরা
কি দেখতে পাচ্ছে না বুদ্ধদেবকে কিরকম ধরে আছি। দু’হাতে পাতা বাহার মেলে ধরেছি।
তবুও বলে কিনা বিকলাঙ্গ!
ঝটিকায় বলে উঠলাম—
আমার হাতে বেশ জোর।
কবজির মোচড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কথা
বললাম। অঙ্গাভিনয় আর কি!
ওনারা তখন বলে বসলেন—
তাহলে নাম এবার নামবো মানে? আমার তো টিকিট আছে।
মামদোবাজি পেয়েছেন নাকি?
হেঁসে উঠল ওঁরা। বলে ফেলল—
পড়াশোনা করেছিস কিছু?
যা শালা, এরা কি দেখতে পাচ্ছে না
বুদ্ধদেব গুহ আমার মুষ্টিতে! হাতের কব্জিতে বিপদতারিণীর ধাগা! লহমায় বলে ফেললাম—
আমি গবেষক। ইউনিভার্সিটি যাচ্ছি।
ওঁরা আরও হেঁসে উঠল—
এটা কে রে? গবেষকের এরকম প্যাটকা চেহারা হয়
নাকি?
কি করে বোঝাই কবিতা বিশ্লেষণে
আমি হাত পাকাচ্ছি। প্রবন্ধ ছেপেছি ছাপ্পান্নটা, গল্প বুনতে পারি। ব্যাটারা তো
টিকিটের ছাপ ছাড়া আর কিছুই বোঝেনা। আনন্দবাজার খুলে ভুলেও সম্পাদকীয় বা রবিবাসরীয়
পড়েনা এরা হয়তো। শুধু কার্বন পেপারের ভয় দেখায়। গরীব মূর্খদের শুধু ফাঁফরে ফ্যালে।
জাঁকিয়ে বললাম—
এই দেখুন আমার গবেষণার দ্বিতীয় অধ্যায় ‘কবি-মনের
চালচলন’।
ওঁরা কাগজগুলো উল্টেপাল্টে
বোদ্ধার মত বললেন—
তাহলে একটা কবিতা বল?
মহা মুশকিল তো! কবিতা বলতে বললেই বলা যায় না!
ভাব না আসলে কবিতার অকালমৃত্যু ঘটে। তবুও জোড় করে উচ্চারণ করতে থাকলাম—
‘উদভ্রান্ত সেই আদিম যুগে
স্রষ্টা যখন নিজের প্রতি
অসন্তোষে
নতুন সৃষ্টিকে বারবার করছিল
বিধ্বস্ত
তাঁর সেই অধৈর্য ঘন-ঘন মাথা
নাড়ার দিনে....’ ওঁরা মানে বুঝল নাকি কে জানে! আফ্রিকার অন্ধকারকে আফ্রিকার কষ্টকে
ওঁরা কি বুঝবে? ওঁরা বললে—
ছাড় ছাড় নাম এখন। হিড়হিড় করে ওঁরা টেনে নিয়ে গেল
রেলওয়ের একটা ঘরে। সামনে গারদ। কয়েকজন ভিতরে আছে। আমাকে বললেন টিকিটের ফাইন না
দিলে ওখানে ভরে রাখবে। ততক্ষণে আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। জেল! জীবনেও জেলের মুখ
দেখিনি। আজ টিকিট কেটেও শ্রীঘরে বাস হবে তাহলে। অগত্যা বললাম—
আমি তো টিকিট কেটেছি!
ওঁরা আবার হেঁসে উঠল—
হ্যান্ডিক্যাপ কামরা চিনিস না?
যা শালা!রেলে যে বিকলাঙ্গদের
জন্য আলাদা কামড়া থাকে জীবনেও শুনিনি। গত রাতে পড়া বুদ্ধদেবের উপন্যাসের ঘোরে ঘোরে
ট্রেনে উঠেছিলাম। তারই খেসারত এটা হয়তো। কাগজ কলম নিয়ে একজন আমার নাম লিখে নিলেন।
নামের আগে শ্রী বসাতে যাচ্ছিলেন। বারণ করলাম—
দয়া করে ওটি বসাবেন না। শ্রীঘরে গেলে শ্রী না
থাকাই ভাল।
ওনারা জানালেন—
স্ট্যান্ডবাই ফাইন দিবি?
উরে বাবা!বর্ধমান যাব বলে
শ’দুয়েক টাকা নিয়েছিলাম। এটিএমটা ফেলে এসেছি বাড়িতে। পণ্ড হল আজকের ক্লাসটা।
অগত্যা এক বন্ধুকে ডাকলাম। সে বেচারা বোলপুর থেকে হন্তদন্ত হয়ে এলো। টাকা দেবে কি,তার আগেই হেসে খুন।
জেলের সামনে বসে থাকা অবস্থায় আমার একটা ছবি আগেই তুলেছে ও। ওটা দেখিয়ে বলল—
এটা ভাঙিয়ে বেশ কদিন চলবে দাদা।
যা ব্যাটা। এই কেস চাপা দিতে আবার টাকার ধাক্কা!
রেলকে দিতে হবে চারশো। হে রেলকোম্পানী তোমার গাড়ির নাম, রেল নম্বর, কামরার বিবরণ বড় বড়
হরফে বাংলা,হিন্দি,ইংরেজিতে লিখে রেখো। নইলে গবেষকরাও গারদবাসী হতে
পারে!
যাইহোক হচ্ছিল পাহাড় থেকে নিচে আসার জন্য
ট্রেনের কনফার্ম টিকিটের কথা। টিকিট না পেয়ে, আমরা ঠিক করলাম বাসে বাড়ি ফিরব।
কিন্তু বাসে যখন তখন বাথরুম করা যাবেনা। ঠাঁই বসে বসে পা ব্যথা হবে। সময় লেগে যাবে
ঢের। রাতের বাসে বিপদও অনেক। আমার সঙ্গী ভাইটির এক্স বান্ধবীর দৌলতে, বান্ধবীর বরের এক বন্ধুর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হল। ও রেলে নয়, ডাক বিভাগে কাজ করে।
ওকেই ধরলাম। ভাই আমার, ওই বান্ধবীর সঙ্গে বিয়ের আগে পর্যন্ত চুটিয়ে প্রেম
করেছে। তার রেস না রস কি আছে কে জানে সে বান্ধবী আমাদের বিশেষ সাহায্য করল। বরের
সঙ্গে ফোনালাপ করাল। বরের বন্ধুকে ফোন করে আমাদের বিষয়ে জানাল। আমরা সে সূত্রে
ডাককর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম।
রেলে ডাক বিভাগের যে বিশেষ
কামড়া থাকে সেটা আমরা জানতাম না। বান্ধবীর দৌলতে সেটা জানলাম। ওই বরের বন্ধু
আমাদের জানান—
রাতের ট্রেনে ডাক নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা বিশেষ
কামড়া থাকে।
আনন্দে নেচে উঠলাম। হাত পা
ছড়িয়ে শুয়ে শুয়ে যাওয়া যাবে, সে জানাল। পাহাড় ঘোরার ক্লান্তিতে আমরা তখন অবসন্ন।
স্নান না করতে পারলেও একটু শোয়ার জায়গা পাওয়া বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার। টিকিট লাগবে
না আমাদের,ও ব্যবস্থা করে দেবে।
রাত আটটার ট্রেন। জলপাইগুড়ি
থেকে রামপুরহাটে নামবো আমরা। স্টেশনে ঢোকার আগে হংকং মার্কেট ঘুরতে গিয়ে আমরা দেরি
করে ফেলেছি। ওখান থেকে কেনা বাবার বেতের চেয়ারটা একটু ভারি লাগছে এবার। ওদিকে শুরু
হল বৃষ্টি। ভিজতে ভিজতে বেতের সহনশীলতা পরীক্ষা করতে করতে কোনওরকমে স্টেশন
পৌঁছলাম। বন্ধুটির ডাক বিভাগের অফিসের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। অবশেষে মহারাজ
এলেন। চা,জল ওসব কিছুই নয়,এসেই বললেন—
তিন গুনিত দুই অর্থাৎ ছ’শো টাকা দাও। যা বাবা, ট্রেনের ভাড়া তো দুশো
করে! এরা তো একশো বেশী চাপাচ্ছে। তা হোক আমরা বললাম—
টিকিট দেবে তো?
ও জানাল—
আমিই টিকিট। কেউ তোমাদের টুঁ
শব্দটি পর্যন্ত করবে না।
সুতরাং বিনা টিকিটে ডাক-বাবুকে
টিকিট করে আমরা ট্রেনে চাপব। ট্রেন ঢুকছে। ডাকবাবু বললেন ছাতা আছে। ভাবলাম বাহ বেশ
ভাল মানুষ তো। আমাদের খেয়াল রাখছেন বোধহয়। হাজার হলেও বান্ধবীর বরের বন্ধু। আমি
বললাম—
হ্যাঁ হ্যাঁ অত ভাবতে হবে না। সে বলল—
বাঁচা গেল। ছাতাটা একজন মেলে ধর।
আমি ছাতা মেললাম। ও টুক করে
ছাতার তলায় ঢুকল—
এবার চলো। ট্রেন লেগে গেছে।
মনে মনে বললাম—
হ্যাঁ রেল কোম্পানি তোমার স্টেশন চত্বরের ছাতা
যে ফুটো ফুটো!
ভারতীয় রেল সময়ের যথাবিহিত ব্যবহার করে,ঝারা পনেরো মিনিট পর
স্টেশনে এসে হাঁফ ছেড়েছে। আমরা তড়িঘড়ি উঠতে চলেছি, বাবার চেয়ারকে বাঁচাতে হবে।
দরজার মুখে একজন বললেন—
কে রে, কে রে এরা? এই সর সর?
আমরা কুকুর তাড়ানোর স্বর শুনে
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। ঠেলাগাড়িতে রাজ্যের সাদা সাদা বস্তা এসে পৌঁছল। গ্রুপ
ডি’-র রেলবাবু গ্রুপ এ-বাবুর মতো সেই বন্ধুটিকে অর্ডার করছে। যেন রাজ্যের আবর্জনা
ভরা আছে ওগুলোতে। ধপাধপ ফেলছে। যেন ধোপাখানা এটা। হাতে করে বস্তাগুলোকে ট্রেনে
তুলতে লাগল বন্ধুটি। উপরে থাকা আরেকজন ওগুলো লাথি মেরে ভিতরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
কয়েকটা বাথরুমের দরজার সামনেই ছেড়ে দিল। বস্তা তো উঠল, সেই বন্ধুটিও উঠল
ট্রেনে। কিন্তু আমরা কখন উঠবো? হায় আমার বাবার চেয়ার, তোমাকে কি শেষ অবধি
বাবার স্পর্শ দিতে পারব না! ভিক্ষা প্রার্থীর মতো দাঁড়িয়ে আমরা ততক্ষণ ভিজলাম।
একটা ছাতাতে দুজনের হবে কি করে! অবশেষে ডাক-বন্ধু ভিতরের বাবুকে জানাল—
ওরা অমুকের আত্মীয়।
ভাবলাম—
কি রকম আত্মীয় রে বাবা! কান মুলে তো ছ’শো টাকা
নিয়েছ৷ টিকিটও দাও নি৷ এবার একটু আশ্রয় দাও? ভিতরের বাবুটি মোক্তারের মতো
জানাল—
আসতে বল।
আমরা উঠবো। কিন্তু চেয়ারটা যে
ট্রেনের দরজা দিয়ে ঢুকবে না। ওটা দেখে ভিতরের বাবুর তো চক্ষু চড়কগাছ। বলেই ফেললেন—
এটা আবার কি? না না এসব নিয়ে যেতে
পারব না।
আমার তো অবস্থা টাইট। বললাম—
স্যার,বয়স্ক বাবা। অনেক শখ করে
কিনেছি। দয়া করে এটিকে সঙ্গে নিন।
সে বাবু দাঁত প্রদর্শন করতে
করতে বলল—
যা খুশি তাই নাকি? জানো এটা ডাকের কামরা?
অতসব আমরা জানিনা। এই প্রথম
জানলাম। কিন্তু কথা না বাড়িয়ে বললাম—
স্যার, ওরকম করবেন না। বাবার
শেষ ইচ্ছেটা পূরণ করতে দিন।
কিছু না বলে উনি দরজা ছাড়লেন।
সে চেয়ার আর ঢোকে না। কাতুকু্তু, উপরে নিচে, ত্যারছা করে কোনওরকমে সে
আরামকেদারা কামড়ায় ঢুকে একটু আরাম করবে কি,বন্ধুটি সেটাকে টেনে ঢুকিয়ে দিল
বাথরুমের সামনে। যা বাবা!বাবার চেয়ার, বাথরুমে থাকবে? ক্ষমা কোরও বাবা। বাড়ি
গিয়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে নেবো। না হলে টাটকা বার্ণিশের উপর গোরবজল দিয়ে দেবো একটু।
ওদিকে কামড়ার ভিতরে কয়েকজন লোক। গোটা একটা
কামড়া। যাচ্ছি আমরা দশ বারো জন। শোবার জায়গাটা তাহলে গ্যারান্টি পাব। ডাককর্মীরা
তখন ওসব বস্তা গুনছে। ছোট বড় মাঝারি, হাত ব্যাগের মতো কোনটা। সবগুলোর
মুখ আঁটা। একটা করে ট্যাগ লাগানো। একটা করে গুনছে আর বস্তাগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলছে।
ওসব আর দেখতে ভাল লাগছে না আমার। একটা জায়গায় দুই ভাইয়ে বসলাম। সঙ্গে সঙ্গে একজন
বললেন—
এই এখানে হিসাব চলছে দেখতে
পাচ্ছ না? যাও ওই ভিতরের দিকে যাও।
ততক্ষণে বুঝে গেছি ওই
বস্তাগুলোতে ডাকের নানা কাগজ গোটা দেশের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। কতকত মানুষের বহু জরুরি
কাগজ,
কোম্পানি, অফিস আদালতের নথি, চাকরি-বাকরির জয়েনিং
লেটার,
টাকা
পয়সার চেক, আমাদের মতো লেখকের বইও ওসব বস্তাতে চলেছে। কিন্তু ওদের যা অবস্থা, হাতে পাওয়ার আগে দশ
পাঁচটা ভাঁজ পড়া অসম্ভব নয়। দ্বিখণ্ডিত হয়েও হাতে আসতে পারে। কোনও জিনিস থাকলে, সেটা আস্ত থাকা ভাগ্যের
ব্যাপার। এ-প্রসঙ্গে বলি, মধুসূদন দত্তের জন্ম উৎসবে যশোর জেলা প্রশাসন ‘মধুকর’
বলে একটা পত্রিকা প্রকাশ করে, সঙ্গে অনুষ্ঠান হয়। ওই পত্রিকায় একটা লেখা দেওয়ার
সুবাদে ওঁরা আমাকে একটা মেমেন্টো দেয়। আমি ওখানে সশরীরে যাওয়ার আমন্ত্রণ পাইনি। কিন্তু
ওখানে যিনি গিয়েছিলেন, তিনি মেমেন্টোটি বগলদাবা করে এনেছিলেন। মনের আনন্দে
ওনাকে জানালাম ওটা ক্যুরিয়ারে পাঠিয়ে দিন। উনি বললেন বেশ। আমার তারপর আর সময় কাটে
না। কখন আসবে আমার মেমেন্টো। মধুসূদনের মাটি মেখে। অবশেষে একদিন উনি এলেন।
ডাকবিভাগের দৌলতে রেল চড়ে যখন ওটি হাতে এলো, তার হাত পা মাজা ততক্ষণে ভেঙে
গেছে। কয়েক জায়গা রঙ চটা। ওটিকেই ফেবিকুইক দিয়ে জোড়া লাগিয়ে সো’কেশ বন্দি করলাম।
হায় ডাক,
হায়
রেল— তোমার পরিষেবায় আমি ধন্য! ক্যুরিয়ারের যৎসামান্য খরচা দিয়ে ওই টুকরোগুলো
পেলাম ওটাই বা কী কম!
ভাইটি আমার হাত পা খুলে বসে পড়ল। চপ্পলের
এই এক সুবিধা। খোলা পড়ার ঝঞ্ঝাট নেই। আমি পড়েছি সু। পাহাড়ের বৃষ্টিতে সে তিনদিন
ভিজেছে। ভিতরের মোজা জড় পদার্থ বলে গ্যাঁজ নেয়নি। কিন্তু তার যা গন্ধ বেরোচ্ছে, জুতো খুললে ডাকের
বাবুরা মারতে চলে আসবে। পা দুটো সারাদিন ওখানে বন্দি থেকে দশঘন্টা সাঁতার কাটার পর
ভেজা আঙুলের মতো চিপসে গেছে। প্যাচপ্যাচে মোজার মধ্যে পা দু’টো আর থাকতে পারছে না।
লজ্জাও লাগছে, এ জুতো খুললে ম্ ম্ করে গন্ধ বেরোবে। মান সম্মানের আর কিছু থাকবে না
তাহলে। শেষ অবধি হোটেল থেকে চুরি করে আনা দু’টাকার সাবান’টা নিয়ে বাথরুম যাব বলে উঠেছি, তখন ভাই বলল—
সাবানটার নাম কি ছিল দাদা? গন্ধরাজ তাই না?
আরে বুর্বাক সু পড়ে যে এ
বিড়ম্বনা হবে কে জানত!
জুতো কোম্পানি সস্তাতে লাভ করতে
গিয়ে ভেন্টিলেশনের তত্ত্ব ভুলে যায় সেটা ওকে কে বোঝাবে। একটা বিরক্তির চাহনি দিয়ে
আমি চলে গেলাম। মিনিট দশেক বাথরুমে পরিচর্চা করে পা দুটো অশেষ শান্তি পেল। পায়ের
গুরুত্ব যে কত বোঝা গেল। হায় রে পা!
অবশেষে খালি পায়ে একটু শান্ত হয়ে বসেছি।
ডাকবাবুরা বস্তাগুলোকে এদিক ওদিক করে কিসব করছে। একজন গুঁণো সূচ, রাবারের স্ট্যাম্প নিয়ে
ঠক ঠক করে কাগজে ঠাপ্পা লাগাচ্ছে। বড়বাবু কাগজে কলমে হিসাব মেলাচ্ছেন। কোন প্যাকেট
কোথায় যাবে তার হিসাব। কোনটা বোম্বে, কোনটা ব্যাঙ্গালোর, কোনটা কোলকাতা। ওদের
গন্তব্য বিভিন্ন স্থান, ওদের গুরুত্ব যথেষ্ট বেশি। কিন্তু ওদের গুদামবন্দী ঠাঁসাঠাসি রূপ এই প্রথম দেখলাম। যে কাগজকে আমরা
সরস্বতী বলে প্রণাম করি, তাদের উপরে ডাকবাবুরা দিব্বি পা চালিয়ে চলে যাচ্ছেন।
সামান্য একটা প্লাস্টিকের ট্যাগকে ভরসা করে কত কত মানুষের জীবন দাঁড়িয়ে থাকে! আধা
ঘণ্টার মধ্যে কাগুজে কাজ সেরে বাবুরা আহারে বসলেন। বস্তাগুলোকে কেউ কেউ বসার চেয়ার হিসাবে ব্যবহার করলেন। আমার
চেয়ারটা বাথরুমে কি করছে কে জানে। স্টেশনে দাঁড়ানোর সময় কেউ যদি ঝেড়ে দেয় তাহলে
বুঝতেও পারব না।
আমাদের পাশেই একজন খেতে বসলেন।
বেশ মিশুকে মানুষ। খোস গল্পের ওস্তাদ। খাবারের পাত্র খুলে গল্প শুরু করলেন। বললেন—
তোমরা খেয়ে এসেছ?
মিথ্যে বললাম— এসেছি।
সত্যি বললে খেতে দিত নাকি কে
জানে! আমরাও বিস্কুটের প্যাকেট বার করলাম। ভদ্রতার খাতিরে বললাম—
চাখবেন নাকি?
উনি বললেন—
রেখে দাও, রাতের দিকে দেখা যাবে।
দু’টো বার্বন বিস্কুট ওঁর জন্য ব্যাগবন্দী
করলাম। ততক্ষণে উনার খাবারের গন্ধে আমাদের জিভে জল ঝরছে। সে জল বিস্কুটে ঢাললাম।
উনি বলেই চলেছেন—
জানো? এটা ডাক বিভাগের বিশেষ
কামড়া?
আমরা বললাম— টিটি ওঠে না?
টিটি কেন? আমরা না বললে একটা
টিকটিকিও উঠতে পারবে না। এখানে ডাক বিভাগের বিরাট পাওয়ার।
উনাকে জানালাম না যে আমাদের মতো
টিকটিকির কাছে বন্ধুটি বেশ টাকা নিয়েছে। বললাম—
পুলিশ?
পুলিশ কেন? আমরাই গার্ড দিচ্ছি
দেখতে পাচ্ছো না?
দেখলাম কামরার ওদিকে তিনটে
লোহার রড বেঁধে এ-বিশেষ কামড়াটিকে ওদিকের জেনারেল কামড়ার সঙ্গে আলাদা করা হয়েছে।
মানুষ কেন, একটা বেড়ালও অনায়াসে ডিঙিয়ে আসতে পারে। ওদিকে তাকিয়ে আছি, এমন সময় উনি যোগ করলেন—
ভায়া ওটাই বজ্রআঁটুনি। কারো
সাধ্যি নেই ওটি ডিঙানোর।
বুঝলাম ডিঙানোর সাধ্যি নেই, কিন্তু তিনশো করে ঝাড়লে
দিব্বি এসে বসা যায়। ওদিকে একটা স্টেশনে আবার মাল উঠছে, মানে ডাকে দেওয়া
কাগজপাতি। ভাঙরিবালাদের ভাঙরি মাল ভর্তি বস্তার মতো ওগুলোর অবস্থা। কিন্তু ওতে
সরকারী সীলমোহর আছে। হে সীলমোহর তুমি ধন্য! অদ্ভুত তোমার ক্ষমতা। নিরাপত্তার
অদ্ভুত ব্যবস্থা তোমাদের। সঙ্গে সঙ্গে ডাকবাবু
বস্তা গুনছেন। জানলা দিয়ে কয়েকজন যাত্রী বলছে—
এটা আমাদের কামরা। এই দেখুন
আমাদের টিকিটে লেখা আছে।
বাবু জানাচ্ছেন—
এটা RMS অর্থাৎ রেলওয়ে মেল
সার্ভিস। কিন্তু বাইরে বড় বড় হরফে কোথাও ওটা লেখা নেই। লোকে বুঝবে কি করে? তাই একটার পর একটা লোক
আসে আর ডাকবাবু বলেন—
RMS RMS.
এই RMS হতে পারত রেলওয়ে মানি
সার্ভিস। কেননা এই কামড়াতে ডাক বিভাগের অনন্ত ছয় জন আছেন যারা ডিউটি ছাড়া যাচ্ছেন।
অর্থাৎ ডাকের কর্মী বলে বিনা পয়সায়, আর আমাদের মতো লোকেদের লাগছে
তিনশো করে। দুদিকেই আয় ওদের। ইতিমধ্যে আরও তিনজন ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ এসে জানাল—
একটু উঠতে দিন না? আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
চলে যাব।
ডাকবাবু বললেন— দেখছ না জায়গা
নেই।
সত্যি তাই গোটা কামড়াতে দশ
বারোজন লোক আর গোটা তিরিশেক কাগজের পুঁটলি থাকলে আর দাঁড়াবার জায়গা থাকে না! ওরা
বারবার অনুরোধ করছে। ওদিকে আমাদের সেই বন্ধুটি যাত্রীদের ইশারা করে জানাচ্ছে—
তিনশো করে দেবে? রাতের ট্রেন। টিকিট না
থাকলে তিনশোও দিতে হয়। টিটিদের দেখেছি সাধারণ মানুষের তিরিশ টাকার টিকিট না কাটার
জন্য তিনশো টাকা ফাইন করতে। পুলিশ যাত্রীরা শেষ অবধি তিনজনে ন’শো দিল। ডাক-বন্ধু
কাগজের সেই টুকরোগুলো পরম যত্নে সাজিয়ে-গুছিয়ে বড়বাবুর কাছে রেখে গেল। হায় কাগজ!
ক্ষেত্র বিশেষে তোমার অনেক মূল্য! গান্ধী ছাপ থাকলে তুমি পরম যত্নবান, ডাকছাপ থাকলে তোমার
অবস্থা কি হয়, তা স্বচক্ষে দেখছি!
এদিকে খেতে বসা ডাকবাবু গল্প করেই যাচ্ছেন।
ভাইটি ওঁর সঙ্গ দিচ্ছে, কথায়। আমি দেখছি বড়বাবুর কাগজের হিসাব। কাটাকুটি করে, কার্বন পেপারের ওপরে
রি-রাইট করে হিসাব মেলাতে। বাঁ হাতে আরেকটি চটি খাতা। ওখানে অনেক দিনের হিসাব
লেখা। শুধু ডেট, সংখ্যা আর প্রত্যেকের পাশে ৩০০/- লেখা। মানে, মাসের শেষে ওরা এই
পয়সার হিসাব করবে। না রেল, না ডাক কোনও বিভাগই এ-হিসাব জানবে না। আমি কৌতূহল না
রাখতে পেরে বড়বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম—
ওটা কিসের খাতা স্যার?
উনি প্রথমে সেকেন্ড পাঁচ তাকালেন, তারপর জবাব দিলেন—
রামপুরহাট অনেক দেরি। ঘুমিয়ে পড়।
কিন্তু বলি কি করে। ঘুম যে আসবে
না। ডাকবিভাগের এই বিশেষ রাত্রি-যজ্ঞ আমার গল্পের উপাদান হতে পারে। উনি আমার
গল্পের চরিত্র হতে চলেছেন। তাই, একটু মশকরা করতে বললাম—
আপনাদের সারারাত পাহাড়া দিয়ে যেতে হয়! কষ্টও খুব
এ-কাজে!
উনি মনে হয় খুশি হলেন। জিজ্ঞেস
করলেন—
তুমি কি কর?
বললাম— গবেষণা?
বললেন— বিষয়?
বললাম— কবিতা
বললেন—রানার কবিতাটা পড়েছ?
বললাম— হ্যাঁ, রানার গানটাও বেশ
প্রিয়। সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথাকে গানে রূপ দিতে গিয়ে সলীল চৌধুরী গানটাকে নিয়ে
রীতিমতো গবেষণা পর্যায় পেরিয়ে তুলে ধরেছেন।
বললেন— ডাক বিভাগ নিয়ে তো কেউ গবেষণা করে না? করলে বুঝত আমরা কি রকম
পরিষেবা দিয়ে থাকি।
মনে পড়ল আমার একটা কথা। আমার
দাদা একটা পরীক্ষার ইন্টার্ভিউ দিয়েছিল। দিন গুনছিল অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আসার।
গ্রামের পোষ্ট অফিসে প্রায় প্রতিদিন যেত। তবুও চিঠি আর আসে না। দিন যায় মাস যয়, অগত্যা দাদা গেল হেড
অফিস। কাকুতি মিনতি করে প্রতিদিন সাব-পোষ্টঅফিসে চিঠি পাঠানোর খাতাটা দেখে জানত
পারল সে চিঠি এক মাস আগে ছাড়া হয়েছে। গ্রামের পোষ্ট মাস্টারকে এসে ধরলে উনি বললেন—
এত চিঠি আসে হিসাব গুলিয়ে যায়।
আজ তুই যা। আমি খুঁজে দেখব।
পোষ্ট মাস্টার তিনদিন পর বাড়ি এসে দাদাকে জানাল—
ফ্যানের হাওয়ার ওটা আলমারির তলায় ঢুকে গিয়েছিল।
পিওন ঘর পরিষ্কার করতে গিয়ে কালকে পেয়েছে এবং আরও বলেছিল— আমরা দ্রুত পরিষেবা দিই।
দেখলি তো কাল-বিলম্ব করিনি।
দিন সাতেকের দেরির জন্য দাদা ওই
চাকরিটা হারিয়েছিল। বলতে বলতে মনে পড়ল, ওই পোস্টমাস্টারের রেকারিং
ডিপোজিটের কাহিনী। গ্রামের গরীব মানুষগুলো একটু একটু করে পয়সা জমিয়ে পোষ্ট অফিসে RD অর্থাৎ রেকারিং ডিপোজিট
করে। উনি বহু মানুষকে ভুল রিসিপ্ট দিয়ে অনেক পয়সা আত্মসাৎ করেছিলেন। যার মূল উপায়
ছিল ইন্ডিয়ান পোষ্টের উপর মানুষের অগাধ বিশ্বাস। মনে পড়ছে অনেক কথা। বড়বাবু ওদিকে
উনাদের পরিষেবার নানা খতিয়ান শুনিয়ে যাচ্ছেন। ডাক বিভাগের সবই যে অকেজো, চোখে লাগার মতো তা
কিন্তু নয়। এ-বিভাগের রেলের মতো অনেক পরিষেবা আছে যা আজও মানুষের ভরসা বজায়
রেখেছে। কিন্তু RMS এর এই রাত্রিকাণ্ড বেশ উপভোগ্য!
কামড়ার সকল ডাককর্মীর খাওয়া হয়ে গেছে। নিজের
নিজের মতো কেউ লুঙ্গি, বারমুডা, গেঞ্জি পড়ে, গামছা-চাদর বিছচ্ছেন।
ট্রেনেই চালাচ্ছে ধূমপান। বড়বাবুর বিড়ির তড়াটা পড়ে আছে আমার চোখের সামনে। ইচ্ছে
করলে দুটো টান দেওয়ায় যায়। ধূমপানের জন্য বড়বাবু নিশ্চয় ফাইন নেবেন না! কিন্তু আমি
বিড়ি সেবন করিনা। বড়বাবু হঠাৎ কাগজপত্র গুছিয়ে আড়িমিুড়ি দিয়ে উঠলেন। কাজের প্রেশার
খুব উনার! রাতের ঘুম চোখে কুড়ি লাইন হিসাব লেখা বেশ কষ্টের! হিসাবের জ্যান্ত
চিত্রগুপ্ত উনি। কিন্তু চিত্রগুপ্ত তো ঘুমবে! উনি উঠলেন, পছন্দ মতো দুটো ছোট
সাদা বস্তা বাছলেন। একটাকে মাথার আরেকটাকে পায়ের বালিশ করে উনি শুরু করলেন নিদ্রার
প্রস্তুতি। সেই বন্ধুটিকে হাঁকলেন—
কই রে!
সে বেচারা অনেক আগে ঘুমিয়ে পড়েছে। পুলিশের এখানে
প্রবেশাধিকার নেই বলে, ওই দরজার দ্বারী। বড়বাবুর হাঁকে সে চোখ রগড়াতে রগড়াতে
কাছে এলো—
কিছু বলছেন?
কেউ আসতে চাইলে তিনশোর নিচে
গলাবি না।
রাতের ট্রেন আপন গতিতে ছুটছে। যদিও সময়ের
চিন্তা নেই। দূরত্ব আর সময়ের অঙ্ক, ট্রেন ড্রাইভাররা শেষ কষেছিল
ট্রেনে চাকরি পাওয়ার পরীক্ষায়। ওসব অঙ্ক আর কষতে হয় না এখন। ঘুমের চোটে মাঝে মাঝে
লাল সিগন্যালকে ওরা সবুজ দ্যাখে। ট্র্যাক-বিহীন হয়ে দুর্ঘটনা হলে রেল-দপ্তর ওটা
সামলে নেই। সাসপেন্ড হলেও পরে জয়েন করার সুযোগ পায় ওরা। মানুষ কে কার খোঁজ রাখে!
এসব ভাবতে ভাবতে বাথরুমের দিকে গেলাম— চেয়ারটা দেখতে। টাটকা বার্ণিশটা নিশ্চয় জলে
ভিজে নষ্ট হয়েছে। কাছে গিয়ে দেখি বেতের চেয়ার আর ট্রেনের দরজা সমান তালে দুলছে।
গেটটা বন্ধ করতে ডাক-বন্ধু ভুলে গেছে। দরজার উপরের লকটা করে ফিরে আসব এমন সময় সেই
গল্পবাজ ভদ্রলোক এসে হাজির—
ফুঁকবেন নাকি?
তা মন্দ হয় না। দুটো সিগারেট
বার করে উনাকে একটা দিলাম। ট্রেনে এভাবে সিগারেট খাব কল্পনাও করিনি কোনোদিন। একবার
জিআরপিএফের খপ্পরে পড়ে সিগারেট খাওয়ার জন্য সাতশো টাকা ফাইন দিয়েছি। কিন্তু এটা
ডাকের রেল। ভয় নেই। গল্পধর শুরু করলেন গল্প—
রেলের শুরু কবে জান? ডাকের জন্ম মনে আছে?
রেলেরটা মনে নেই। তবে ডাকটা মনে
হয় পায়রার পর শেরশাহের আমলে!
উনি প্রশ্ন করেই যান—
রেলের বার্ষিক আয় কত জান?
কি করে জানব? শুনেছি টিকিট না কাটার
জন্য রেলের অনেক লস হয়। পরিষেবার নানা ফিরিস্তি মেটানোর দায় যেন শুধু যাত্রীদের। ট্রেন যখন লেট করে তার তো
ফাইন হয় না?
উনি হাসলেন। জানালেন—
ট্রেন আছে বলে দেশ চলছে। আর
আমাদের ডাক।
আমি বললাম—
সব যদি ডিজিটাল হয়ে যায় তাহলে মনে হয় ডাকের
দরকার কিছুটা কমবে।
উনি গেলেন রেগে—
মানে? আমরা না থকলে চিঠিপত্রের
নিরাপত্তা দেবে কে?
আমি বললাম—
ডিজিটাল ইন্ডিয়া?
উনি জানালেন—
ওটাতে হ্যাকের সম্ভাবনা থাকে।
জানালাম— ওদিকে তিনটে রড পেরিয়ে
কেউ যদি বদমাশি করে দুটো বস্তা সরিয়ে রাখে? বা আমিই যদি একটা বস্তা ফেলে
দিই?
উনি কি বলবেন হয়তো ভেবে পেলেন না। শুধু বললেন—
আজকে তো আমার ডিউটি অফ। আর
হারালেও অ্যাড্রেস নট ফাউণ্ড বলে একটা অপশন আছে। ততদিনে কেস সামলে নেবেন বড়বাবু।
এসব কথা শুনে, চেয়ারে বসে আমার বাবা যেন
হাসছেন। উনি ওখানে নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে ওই মানুষটির কথা। জমিজায়গা
সংক্রান্ত RI অফিসের আদায়কারী হিসাবে
উনি এক পয়সার হিসাব মেলাতে চুল ছিঁড়তেন। ক্যালকুলেটর ছাড়া যোগবিয়োগ করতে রাত
জাগতেন। এনারাও রাত জাগেন, ট্রেনও রাতে ছোটে, তবে হিসাবে নয়, বেহিসাবে। ট্রেন করে
লেট,
ডাক
খুলে রাখে গেট— তিনশো... তিনশো...তিনশো...। ট্রেন বা রেলকে কৈফিয়ত কে চাইবে!
আমাদের ধর্মে ওটা সয়ে গেছে। সুযোগ নিতে গিয়ে আমরাও সুযোগসন্ধানী আজ— ডাক-রেলে উঠে
বসেছি।
RMS এর নিরাপত্তা বলয়ে আমরা অবশেষে
রামপুরহাট স্টেশনে নামব। সে বন্ধু তো ঘুমিয়ে কাঠ। ঘুমোচ্ছে সবাই। ভাবলাম ওকে ডাকব
না। না ডেকে নেমে গেলে কেউ বুঝতে পারবে না। কিন্তু গেটটা যে খোলা থেকে যাবে!
রামপুরহাট পোষ্ট অফিস থেকে যে বস্তাগুলো উঠবে সেটারও হিসাব মেলাতে হবে। অগত্যা
বন্ধুটিকে ধাক্কা দিয়ে তুললাম—
ওঠো ওঠো রামপুরহাট এসে গেছে।
ঘুমের ঘোরে সেই কুম্ভকর্ণ ধরমর করে উঠল। সটান
এসে গেট খুলে দেখল স্টেশন ঢোকার আগে ট্রেনটি স্লো করেছে। আমাদের বলল—
নেমে যাও!
নামব কি করে? চেয়ার আছে যে!
মুখ বিকৃতি করে সে বলে উঠল—
ধুর। যতসব ঝামেলা।
আমরাও বুঝতে পারলাম আমাদের পয়সা
শেষ হয়ে গেছে। অবশেষে স্টেশন ঢোকা মাত্র সে আমাদের একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে
দিল। বলল—
স্টেশনটুকু নিজেরা সামলে নিও।
আচ্ছা ফাঁফরে পড়লাম তো। রীতিমতো
টাকা দিলাম, কোনও রসিদ পেলাম না! স্টেশনে টিকিটহীন যাত্রীর মতো নামলাম আমরা। যেন
কিছু চুরি করেছি। তার উপরে মাথার উপর চেয়ার। দূর থেকেই আমাদের চেনা যায়। চেয়ারের
জন্য বিশেষ গুডস্ পারমিশন চাইবে কিনা কে জানে! টিটিতে ধরলে আবার তিনশো লাগবে বোধ
হয়! স্টেশনে নেমে চেয়ারটা মাথায় তুলে আমি উল্টোপথে হাঁটা দিয়েছি। একটা টিটি বেশ
কিছুদূর এসে আমাকে পেরে উঠল না। স্টেশনের চোরাপথে বাইরে বেরিয়ে— সে এক শান্তি।
টাকা দিয়ে চোরের হাল আমাদের। দ্রুত আসতে গিয়ে ভুলেই গেছি ভাইটির কথা। চেয়ারটাকে
পরম ধন হিসাবে আনতে গিয়ে দৌড়াতে হয়েছে। বাবা বসবেন ওটাতে। বহুদিনের শখ আমার।
জীবনের শেষ দিনগুলি ওটাতে দুলতে দুলতে উনি কাটাবেন। সুতরাং ওটার মূল্য আমার কাছে অনেক।
বেশ কিছুক্ষণ পরে মনে হল ভাই কোথায়? ও হয়তো টিটির চোখ ফাঁকি দিয়ে এই
বেড়িয়ে আসবে আর কি! তাই স্টেশনের বাইরে একটু দূর থেকে ওর প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে
থাকলাম। মিনিট যায়, ঘণ্টা হতে চলল, তবুও সে আসে না! ওকে ফোন করলাম।
কয়েকবার করার পর ও ফোন ধরল। ধরার পর ওদিক থেকে উত্তর এলো—
দাদা, কেস খেয়েছি!
কি হল রে? ব্যাটারা ধরেছে নাকি?
হ্যাঁ দাদা, ওরা কাগজে কি সব লিখছে?
আমি বললাম—
টাকা দিয়ে রফা কর
ওরা চারশো চাইছে। না দিলে কাল
কোর্টে পাঠাবে বলছে
শোন শোন আমি টাকা নিয়ে যাচ্ছি।
ভাইটি বলল—
দাঁড়াও একটু।
ওদিকে ফোনে কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছি, ভাই বলছে— স্যার আমি
যদি দৌড়ে পালাই আপনি ধরতে পারবেন না আমাকে। স্কুলের রানে আমি প্রতিবার ফাস্ট হতাম।
ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বলছেন—
তা যা দেখি! তোর পা কত লম্বা দেখা?
ভাই বলছে—
যেতাম কিন্তু যাব না। ফাইনটা তাড়াতাড়ি কাটুন।
শুনলাম অফিসারটি অন্য কারোর
সঙ্গে কথা বলছে। তারাও হয়তো টিকিট কাটেনি। ব্যস্ততার জন্য অনেকে টিকিট কাটতে পারে
না,
সেটা
ওরা বোঝে না। রেল-দপ্তর ট্রেনে উঠে টিকিট কাটার ব্যবস্থা রাখতে পারে। তাতে এরকম
ঝামেলা এড়ানো যায়। মানুষও নিশ্চিন্ত হয়ে ট্রেন চড়তে পারে। অনেকক্ষণ ফোনটা ধরে বসে
আছি। ভাবছি ভাই বলবে—
টাকা নিয়ে এসো দাদা।
লোকের পর লোক বেরিয়ে আসছে
স্টেশন থেকে, তার মাঝে হঠাৎ দেখি একটা ছত্রভঙ্গ অবস্থা শুরু হল। ঠেলাঠেলি করতে
লাগল লোকে। তার মাঝ থেকে কে যেন ছুটে বেড়িয়ে গেল।
অ্যাঁ আমার ভাই নাকি! দেখে তো
সেরকমই মনে হল। লালরঙের গেঞ্জিটা পড়ে সে প্রাণপণে ছুটছে, পিছনে কেও তাড়াও করছে
না। আমি চিৎকার করে উঠলাম—
দাঁড়া দাঁড়া।
কিন্তু সে থামেই না। ছুটেই
চলেছে রানারের মতো। যেন রেলকে ফাঁকি দেবার খবরটা সে সবাইকে এখনই দিতে চায়। টিটিদের
বোকা বানানোর আনন্দে সে যেন ছুটছে রেলের স্পিডে। ফোনটা ড্রপ করে, বাবার চেয়ার নিয়ে আমিও
লাগালাম ছুট। অবশেষে বহু কষ্টে যখন তার কাছে পৌঁছলাম, সেখান থেকে আর রেলডাক
শোনা যায় না। শুধু একটা ডাক কানে আসছে, ভাইয়ের হৃৎপিণ্ডের লাবডাব
লাবডাব....
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি—
কবি ও কবিতা বিশ্লেষক। প্রাবন্ধিক। লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্র-সমীক্ষা ভিত্তিক গ্রন্থ রচয়িতা। নানা লোকসেবামূলক সংস্থার সদস্য।
.jpg)