আমার
দেখা সবচেয়ে স্বার্থপর, হৃদয়হীন যে মানুষটি, তিনি আমার বাবা।
আমাদের
আলো বাতাসহীন বুকচাপা পারিবারিক পরিবেশে যে মানুষটি ক্রমশ হাঁপিয়ে উঠছিলেন, তিনি আমার মা।
চরম
আর্থিক দুরবস্থার মধ্যেও আমার মা,মাসিক ছ'আনা চাঁদার বিনিময়ে পাড়ার লাইব্রেরীর সদস্য হয়েছিলেন। ছোট টুকরো কাগজে তিনি
বইয়ের নাম লিখে দিতেন। আমি সেই চিরকুট দেখিয়ে মায়ের পছন্দমতো বই নিয়ে আসতাম। বই
হাতে পেয়েই মা প্রথমে সেটি নাকের সামনে খুলে ধরে লম্বা করে শ্বাস নিতেন, আঃ!
বই ছিল
মায়ের জীবনে শীতের রোদ্দুর। দক্ষিণের বাতাস।
মায়ের
ইচ্ছা ছিল আমার নাম রাখা হোক ফাল্গুনী। পাঠকদের মধ্যে ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় তখন
একটি জনপ্রিয় নাম। আমার স্বেচ্ছাচারী, অবিবেচক বাবা, মায়ের ইচ্ছাটুকুকে বিন্দুমাত্র আমল না দিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত নিলেন, আমার নাম রাখা হবে প্রশান্ত। প্রশান্ত নামে
একটি সাগর আছে। এইটুকুই তাঁর জানা ছিল। শব্দটির আভিধানিক অর্থ, ব্যাপ্তি এবং ধ্বনিমাধুর্য, এসব বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না।
বড় হয়ে
আমি মায়ের মুখে এসব শুনেছি।
ছোট
থেকেই বাবার সঙ্গে আমাদের তিন ভাই বোনের কয়েক যোজন দূরত্ব। বাবা ছিলেন চটকলের
কর্মী। ভোরবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সন্ধের পর যখন বাড়ি ফিরতেন, তখন তাঁর নীল রংয়ের পোশাকের এখানে ওখানে
মেশিনের চটচটে তেলের দাগ, তালি দেওয়া জুতোয় ধুলোর পুরু আস্তরণ, অবিন্যস্ত মাথার চুলে পাটের চকচকে সাদা ফেঁসো জড়িয়ে থাকত। বাবা বাড়ি ফিরলে
আমরা তিন ভাইবোন যতদূর সম্ভব আড়ালে আড়ালে,দূরে দূরে থাকতাম। বাবা তখন কথা বলতেন চিৎকার করে। রুক্ষ কর্কশ গলায়। যে
কোনও বিষয়,তা যে
যত তুচ্ছই হোক না কেন,মনমতো পছন্দমতো না হলে,হাতের সামনে যা পেতেন,উঠোনে, ঘরের
মেঝেতে, এমনকি আমাদের বাড়ির
সামনের বুনো কাঁকরোল,বাসক পাতায় ভরা জঙ্গলে ছুঁড়ে ফেলতেন।
- দেখবে? দেখবে কি করি? বলে ধমকে উঠতেন মাকে। কোনও কোনও দিন মায়ের
চুলের মুঠি খামচে ধরে দেওয়ালে মায়ের মাথা ঠুকে দিতেন দুমদুম করে। মা অসহায়ের মতো
দু হাতের করতলে মুখ ঢেকে, কখনও বা মাথাটাকে দ্রুত এপাশ ওপাশ নাড়িয়ে আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা
করতেন। মায়ের গাল বেয়ে, চিবুক বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ত। আশ্চর্য মায়ের কান্নার কোনও শব্দ ছিল না। আমরা
তিন ভাই বোন দরজার আড়াল থেকে, চৌকির নিচ থেকে, মাকে অত্যাচারিত হতে দেখতাম। ক্ষোভে আক্রোশে আমরা দাঁতে দাঁত পিষতাম।
আমাদের নিঃশ্বাসে আগুনের হলকানি ছুটত। তারপরেও নীরব অশ্রুপাত ছাড়া আমরা আমাদের
মায়ের জন্য একফালি প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারিনি।
মাঝরাতে
হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখতাম, মাঝারি মোটা একটি পিচবোর্ড আড়াল দিয়ে, বুকের নিচে বালিশ নিয়ে উপুড় হয়ে
শুয়ে, আমার মা গল্প উপন্যাস
পড়ছেন। হ্যারিকেনের অল্প আলোতেও স্পষ্ট দেখতে পেতাম, মায়ের সারা মুখ জুড়ে হাসিহাসি ভাব। ভাল
লাগার, মনে ধরার মতো কোনও কোনও
অংশ দু বার তিনবার পড়তেন বলেই, কখনও কখনও পাতা ওলটাতে অনেকটা সময় পার হয়ে যেত। তখন মায়ের ঠোঁট নড়ত বিড়বিড়
করে। আবেশে অল্প অল্প মাথা নাড়তেন বা আচমকা দু চোখ বুজে হয়ত নির্বাচিত অংশের শব্দ
প্রতীক ডায়লগ থেকে একটি পরিপূর্ণ ছবি নির্মাণ করে, নিজের মতো করে দেখতেন, ভাবতেন। হয়ত বা টুকরো কোনও কথা, বাড়তি কোনও শব্দ সংযোজন বা বিয়োজন করতেন। তখন মায়ের মুখের দুঃখ যন্ত্রণা
অত্যাচারের ছাপ ঢাকা পড়ে যেত নির্মল আনন্দে। গভীর প্রশান্তির নিচে।
বাবা
তখন অকাতরে ঘুমতেন। রাত্রির গভীরে চরাচর জুড়ে মৌনী নীরবতা। আমাদের মাথার ওপরে টিনের
চালে শিশির ঝরে পড়ত টুপটাপ করে। সরীসৃপ হেঁটে যেত সরসর আওয়াজে। কখনও বা পথহারা
নিঃসঙ্গ একটি পাখি ডেকে যেত কুব কুব করে। থেমে থেমে।
পাশের
বিছানায় বাবাকে দেখতাম, আত্মকেন্দ্রিক আয়েসি মানুষটি, আস্ত একটি পা বালিশ সাপটে ধরে কাত হয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছে। বাবার মশারিতে কোন
ছিদ্র নেই। বিছানার চাদর পরিপাটি। টানটান পাতা। অল্প হাঁ করা বাবার মুখ। ঠোঁটের
দুপাশে গড়িয়ে আসা থুথুর আবছা দাগ। সরু তীক্ষ্ণ গোঁফ। মাংসহীন চওড়া থুতনি এবং কালো
মোটা রোমশ ভ্রু। এইসব মিলেমিশে স্বেচ্ছাচারীর মুখের আদল। দেওয়ালে ঘুমন্ত বাবার
শরীরের ছায়া। অসম, খাপছাড়া, কিম্ভুতাকার।
(দুই)
অবিরত
অপমান আর যন্ত্রণায় পীড়িত আমার মায়ের মনে এমন নৈরাশ্য সৃষ্টি হয়েছিল যে, এই পৃথিবীর রূপ রস বর্ণ গন্ধ তাঁর কাছে
অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। আমরা কেউই বুঝতে পারিনি ভেতরে ভেতরে আমাদের মা কতটা ক্ষয়ে
গেছিলেন। ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সিঁথির সিঁদুরের মোহ, আত্মজের মায়া, এমনকি অমন নিবিড় বই-প্রীতি, কোনও টানই তাঁকে আটকে রাখতে পারল না।
পুনর্জন্মে বিশ্বাসী মায়ের মনে হয়েছিল, হয়ত তাঁর মনমতো জীবনটি, এই জীবনটির বিনাশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, নদীর ওপারে।
মা
আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
তখন
আমি কলেজে পড়ি। বাকি ভাইবোন দু জন স্কুলে।
মায়ের
দুঃখজনক মৃত্যুর জন্য বাবার কোনও মনস্তাপ দেখিনি আমরা। বরং তিনি আরও বেশি রুক্ষ
হয়ে উঠলেন। অনিয়মিত উপস্থিতির জন্য কর্মস্থলে তাঁর দুর্নাম হল। চাকরি থেকে বরখাস্ত
হয়ে গেলেন। সীমাহীন দারিদ্র্য এবং অবহেলার মধ্যে দিয়ে আমরা তিন ভাইবোন যে কীভাবে
বড় হলাম!
বোনের
বিয়ে হয়ে গেল। ভাব ভালবাসা করে। ভাই কর্মসূত্রে পাকাপাকি সেটল করে গেল রাজস্থানে।
অবিবেচক, স্বার্থপর, অসময়ে ছাঁটাই হয়ে যাওয়া কপর্দকশূন্য বাবা, আমার আশ্রয়ে রয়ে গেলেন।
(তিন)
আমি
বাবাকে এড়িয়ে চলি। অবজ্ঞা করি, ঘৃণা করি বলে। আমার স্ত্রী বাবার মৃত্যু কামনা করে। প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে। আমার ছেলেমেয়েদের বুঝিয়ে
দেওয়া হয়েছে, এ
সংসারে বাবা ব্রাত্য। অবাঞ্ছিত আবর্জনা। তারা ভুলেও বাবার কাছে যায় না।
বাবার
কোনও বন্ধু নেই। প্রিয়জন-পরিজন, তাও নেই। নির্বান্ধব মানুষটি সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত, বাড়ির সামনের ছোট বাগানটিতে একটি টুল পেতে
তার ওপর বসে থাকেন চুপ করে। বাবার সঙ্গী বলতে একটি লাঠি। সরু এবং মাঝারি লম্বা।
কোন কোনও দিন দুপুরে ভাত খাওয়ার পর ঝিমুনি এলে, বাবা বারান্দায় উঠে এসে দেওয়ালে মাথা রেখে বসে বসে ঘুমোন। থেকে থেকেই পরনের
কাপড়ে লাঠিটি মোছেন। বাগানে, বারান্দায়, সীমানার পাঁচিলে, সূর্যের বিভিন্ন অবস্থানের ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্যের ছায়া পড়ে। বাবা নিবিড়
একাগ্রতায় সরু লাঠিটি দিয়ে এইসব ছায়াদের দৈর্ঘ্য মাপেন। জামার পকেট থেকে ছোট একটি
নোট বই বার করে কি সব লেখেন। আপন মনে বিড়বিড় করেন। আঙুলের কড় গুনে হিসেব করেন।
কখনও হঠাৎ করে বলে ওঠেন, হল না। মিলছে না।
আমার
স্ত্রী বাবার এই অদ্ভুত কার্যকলাপে ভয় পায়। কান্নাভেজা গলায় বলে, ইনস্যানিটি তোমাদের হেরিডিটি। তোমার
ঠাকুরদারও শুনেছি শেষ বয়সে ভীমরতি হয়েছিল।
আমি
জানি এ বিষয়ে বাবার মুখের দিকে চেয়ে কোনও প্রশ্ন করতে গেলে আমি এতটাই উত্তেজিত হয়ে
পড়ব, যা থেকে একটি অপ্রীতিকর
ঘটনা ঘটে যেতে পারে। কারণ বাবাকে আমি ঘৃণা করি।
তার
চেয়ে অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করলাম, বাবার ছোট নোটবইটির পাতা উল্টে, আমি এই উদ্ভট কাজকর্মের কারণ খুঁজতে পারি।
(চার)
এরপর
সত্যি সত্যি একদিন রাতের বেলায় চুপি চুপি বাবার ঘরে ঢুকে, ঘুমে অচেতন মানুষটিকে ডিঙিয়ে, দেওয়ালের পেরেকে ঝোলানো জামার পকেট থেকে ছোট
নোট বইটি তুলে নিয়ে এলাম। উত্তেজনায় তখন আমি রীতিমতো হাঁপাচ্ছি। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায়
নিজের ঘরে ঢুকে, দরজা বন্ধ করে, ঘুমন্ত স্ত্রীকে ঠেলা দিয়ে ডাকলাম, দ্যাখো, কি
এনেছি!
তারপর
আমরা দুজনে মনোযোগী ছাত্রছাত্রীর মতো নোট বইটির পাতা ওলটাতে লাগলাম। প্রতি পাতায়
হিজিবিজি কিছু রেখা। আর তার নিচে অসংলগ্ন, অসমাপ্ত কিছু বাক্য। কোথাও কোথাও বাক্যের বুনন অস্বাভাবিক সাবলীল। বেশ কিছু
বানান ভুল। যেমন স্বার্থপর, ঘড়ি, শেকড়, শুঁড়, জ্বলা, প্রদীপ, হ্যারিকেন।
- ওদের
মা অনেক দূরের তারায় থাকে। তারাটা মিটমিট করে। রাত্তিরে ছায়া নেই।
- আগুনে
পুড়লে মানুষ কালো হয়ে যায়।
- বাগানের
ছায়া। বারান্দার ছায়া। পাঁচিলের ছায়া। হাতির শুঁর। হাজিরাবাবুর মুণ্ডু। পাখির
খাঁচা।
- গির্জার
ঘড়িতে তিনটে। পাঁচিলে ছায়া। কালকে এক লাঠি। আজ এক লাঠির একটু কম। আকাশে মেঘ নেই।
- গাছেদের
ছায়া। আমার ছেলে ছেলের বউ নাতির ছায়া। ওরা কি গাছ? গাছেদের শেকর আছে। মানুষের শেকর নেই।
- দিনের
আলোতে বেশি ভয় করে। ছায়া পড়ে।
- ওদের
মা হারিকেন জেলে বই পড়ত। বই এত ভাল? জনাইয়ের মনোহরা মুখে লেগে থাকে।
- আমি
খুব সার্থপর। আমার ছায়া সোজা নয়।
- কারখানার
গেটে একটা পাগল গান করত -– কত পদীপ জলে নগরে নগরে। তুমি যেই তিমিরে তুমি সেই
তিমিরে। তিমির মানে কি? ওদের মাকে জিগগেস করলে হোত।
- সকালের
ছায়া। দুপুরের ছায়া। বিকেলের ছায়া। গাছেদের ছায়া। পাখিদের ছায়া। মানুষের ছায়া।
- বড়
ঘরির নীচে বসে চেঁচাব। সব রকমের ছায়া পাওয়া যায়।
আমার
এবং স্ত্রীর, দুজনেরই
ছায়া পড়েছে ঘরের দেওয়ালে। সেদিকে তাকিয়ে দুজনেই চমকে উঠে ঘাড় ফেরালাম। পরস্পরের
মুখের দিকে চেয়ে রইলাম অপলক। কতটুকুই বা দূরত্ব আমাদের দুজনের মধ্যে!
তবু যেন কত দূরে, একজন আরেকজনের থেকে !
লেখক পরিচিতি –
লেখালিখির শুরু গত শতকের শেষ দশকে। বাণিজ্যিক পত্রিকার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে
লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি। গল্প সংকলন আটটি এবং তিনটি উপন্যাস।
.jpg)