- আজ থেকে এ বাড়িতে তোর ভাত
বন্ধ।
কে বলছে ? না, তার বাপ।
শিবুর
মটকা গরম হয়ে গেল। তেড়ে গেল বাপের দিকে। শিবুর বিধবা দিদি জ্যোৎস্না ছুটে এলো
ভাইকে আটকাতে।
শিবু বলল, ছাড়। ও বুড়োকে আজ বুঝিয়ে দিতে হবে, কে কাকে খাওয়ায়।
জ্যোৎস্না
বলল, তুই কি পাগল হয়েছিস ? নিজের বাপের গায়ে হাত তুলবি?
- হাত তুলব না তো। জানে শেষ
করে দোব। তারপর জেলে যাব। ফাঁসিতে ঝুলব। কার বাপের কি?
শিবুর বাপ
পকাই হেঁপোকেশো রুগী। দরমা ঘেরা বারান্দায় চৌকির বিছানায় শুয়ে থাকে। কথা বলতে গেলে
গলায় ঘরঘর শব্দ হয়। বাড়ির লোক ছাড়া কেউ তার কথা বুঝতে পারে না।
- মাথা গরম করিস না ভাই।
জ্যোৎস্না বাচ্চাদের আদর করার মতো করে শিবুর পিঠে হাত বোলায়, কি শুনতে কি শুনেছিস... !
শিবু এক
ঝটকায় জ্যোৎস্নাকে ঠেলে দিল, ঠোঁট
নাড়লে বুঝতে পারি আলতুফালতু বকছে না ঠাকুরের নাম জপছে। বলে কিনা ভাত বন্ধ। যার
পয়সায় গিলছ, তাকেই
আবার হুমকি দিচ্ছ।
- ঠিক আছে। ঠিক আছে।
জ্যোৎস্না আবার শিবুর কাছে এগিয়ে আসে, ওর
কি মাথার ঠিক আছে রে? রোগে
ভুগেভুগে শরীরের কলকব্জাগুলোর সঙ্গে মাথাটাও ঢিলে হয়ে গেছে। আনসান বকে। মুখ ধুয়ে
আয়। আমি চা বসাই। তোর রোজগার না থাকলে সবাই শুকিয়ে মরবো। কে না জানে!
শিবু বলল, মানছ তাহলে?
- না মেনে উপায় আছে ? যদি মিথ্যে বলি, সেটা
ধম্মে সইবে? কখ্খনো
না। জানবি ওপরে একজন আছে। সব দেখছে। বিচার করছে।
দিদির
কথায় শিবুর মাথা ঠাণ্ডা হল। মুখ ধুল। প্যান্ট জামা পড়ে দেওয়ালে লটকানো ছোট আয়নায়
চুল আঁচড়াল। চুলের সঙ্গে সঙ্গে লম্বা জুলপি আর চাপদাড়িতে চিরুনি বোলাল। ঝাক্কাস
লাগছে। গরম চায়ের কাপ ঠোঁটের কাছে নিয়ে গিয়েও নামিয়ে রাখল মাটিতে।
জ্যোৎস্না
জিজ্ঞেস করল, কি হল? খুব গরম?
শিবু
প্রথমে বলল, হুঁ।
তারপর ঘাড় ফিরিয়ে বারান্দায় শুয়ে থাকা বাবার দিকে চেয়ে বলল, বুড়োটাকে চা দিলে না?
জ্যোৎস্না
বুঝতে পারল শিবুর বুকের ভেতরে খেলাটা শুরু হয়ে গেছে। রাগের পারদ মাথা থেকে নামতে
শুরু করেছে।
- দোব। একটু ঠাণ্ডা হোক।
মুখের কাছে কাপ ধরে খাইয়ে দিতে হবে। বললাম না, শরীরের
কলকব্জাগুলো সব ... ।
- বেরচ্ছি। জ্যোৎস্নাকে কথা
শেষ করতে দিল না শিবু। সাবধানে থাকবে। সব দিকে নজর রাখবে।
'সব
দিকে'-র মধ্যে যে বুড়ো বাপটাও আছে এটা
বোঝা জলের মতো সোজা।
জ্যোৎস্নার
বুকের ভেতরটা হাল্কা হয়ে গেল।
(দুই)
পাঁচ
কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে শিবুকে মালিকের বাড়ি পৌঁছতে হয়। জায়গাটার নাম আলতারা। মালিক গোবিন্দ মণ্ডলের
অনেকরকম ব্যবসা আছে, মুদির
দোকান। তেলকল। সার বীজের গোডাউন। তার সঙ্গে আবার দুধের ব্যবসা। মুদির দোকানটি
বাড়ির লাগোয়া। বাকিগুলি এক আধ মাইল পূবে পশ্চিমে। মালিকের এইসব ব্যবসাগুলো
দেখভালের দায়িত্ব শিবুর। মালিক শিবুর পরিচয় দেয় 'আমার
ম্যানেজার'। এতে
শিবু খুশি হয়। অন্য কর্মচারীদের চোখে তার কদর বাড়ে। তারা তাদের পাওনাগণ্ডা, সুবিধে অসুবিধে যে কোন বিষয়ে কিছু বলার থাকলে শিবুর মাধ্যমে
মালিককে তা জানায়।
শিবুর
চোখে গোবিন্দ মণ্ডল মোটের ওপর ভালমানুষ। ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাসী। পুজোপার্বণে গরীবগুর্বোদের
শাড়ি ধুতি, শীতে
কম্বল এসব দেয়। সকলের সঙ্গে 'বাবা
বাছা' বলে কথা বলে। কর্মচারীদের মাস
মাইনে, পুজোর বোনাস ঠিক ঠিক সময়ে মিটিয়ে
দেয়।
গোবিন্দ
মণ্ডলের কোন ছেলে নেই। চারটিই মেয়ে। তিনজনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোটটি মাধ্যমিক ফেল
করে আর পড়াশোনা করেনি। সে জিনসের প্যান্ট জামা পরে স্কুটি চালিয়ে বোঁ চক্কর মারে।
মেয়েটির
নাম আরাধনা। শিবুকে শিবুদা বলে ডাকে। কোন কারণে মুখোমুখি এসে দাঁড়ালে মন মাতানো
সেন্টের গন্ধে শিবুর মাথার মধ্যে ঝিমঝিম করে। ভ্রু নাচিয়ে কথা বলে যখন শিবুর বুকের
মধ্যে বিদ্যুৎ চমকে যায়। এদিক সেদিক চোখ পড়ে শিবুর। ঠোঁটের দোরগোড়ায় এসে কথা আটকে
যায়। মালিকের মেয়ে। কি থেকে কি হয়ে যায়। কাজ হারালে মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়বে।
আরাধনার
একটা ডাক নাম আছে। ঋতু। শিবু ওই নামেই ডাকে।
অন্যদিনের
চেয়ে আজ একটু বেশী জোরে সাইকেল চালাচ্ছিল শিবু। সকালে বাপের সঙ্গে ঝামেলাটা না হলে, মিনিট পনের আগে বাড়ি থেকে বেরোতে পারত। নটার আগেই কর্মস্থলে
পৌঁছে যেত। যেমনটা সে প্রতিদিন যায়।
টালি-খোলা
পেরচ্ছে যখন জামার বুক পকেটে মোবাইলটা বেজে উঠল। এক হাতে সাইকেলের হ্যাণ্ডেল, অন্যহাতে মোবাইলটা বার করে সুইচ অন করল। অচেনা নম্বর। ফোন
বন্ধ করে দিল। কানে মোবাইল ধরে এক হাতে সাইকেল চালানো বেশ রিস্কি ব্যাপার। আর
এইসময় স্টেশন রোডের রাস্তায় বাইক অটো,টোটো
ম্যাজিক ভ্যানের গিজগিজে ভিড়। তার সঙ্গে কানফাটানো হর্নের শব্দ।
ফোনটা
আবার বেজে উঠল। শিবু আমল দিল না। 'এ
যো মহব্বত হ্যায়...'। গান
বাজতে বাজতে থেমে গেল। বড় জোর আট দশ সেকেন্ডের গ্যাপ। আবার গান শুরু হল। বাজতে
বাজতে সেটা 'মর জায়েঙ্গে মিট জায়েঙ্গে ইয়ে বদনাম' – পর্যন্ত পৌঁছেছে যখন, বাধ্য
হয়ে শিবু রাস্তার এক ধারে সরে এসে সাইকেল থেকে নেমে ফোনের সবুজ সুইচ টিপে বলল, হ্যালো !
ঝাঁঝালো
মেয়েলী গলায় ধমক, ফোনটা ধরছ
না কেন ?
গলাটা
শিবুর বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিল। কোনরকমে বলল, অচেনা
নম্বর দেখে ধরিনি।
- এটা আমার জিও নম্বর। ঋতু, এই নামে সেভ করে নেবে। আজ আসছ তো?
- হ্যাঁ, রাস্তাতেই আছি। দেরী হয়ে গেছে। ঝড়ের বেগে সাইকেল চালাচ্ছি।
- তাড়াহুড়ো করতে হবে না। ধীরে
সুস্থে এসো। আজ বিকেলে আমার সঙ্গে মিট করবে। স্টেশনের আপ প্ল্যাটফর্মে।
- আমি মিট করব ! বিস্মিত গলায় শিবু জানতে চাইল, কেন ?
- আমি বলছি তাই। দুপুরে
জানিয়ে দোব কখন দেখা হবে।
কথা শেষ
করেই ঋতু ফোন কেটে দিল।
(তিন)
বিকালে
শিবু রেলস্টেশনে পৌঁছে হাতঘড়ি দেখল, ঋতুর
বেঁধে দেওয়া সময়ের মিনিট পনের আগে হাজির হয়েছে। চায়ের দোকানে চা খেল। চা খাওয়া খুব
একটা জরুরী ছিল না। আবার ছিলও। কারণ সে খুব নার্ভাস বোধ করছে। একান্তে ডেকে ঋতু
তাকে জরুরী কি কথা বলবে ! শিবু যে তার খুব
কাছের বা বিশ্বস্ত এর কোনটাই নয়। মালিকের মেয়ে সেই সুবাদে কখনও কখনও টুকটাক কথা
হয়। তাও সেসব মামুলি কথা। ইঙ্গিতপূর্ণ বা রহস্য আছে এমন কোন কথা না ঋতু তাকে
কোনদিন বলেছে বা সে ঋতুকে আভাসে বলতে চেয়েছে।
তাহলে!
শিবুর কৌতূহল, উৎসাহ
প্রথম শুনে যেমনটা হয়েছিল, এখন সেসব
মিইয়ে গেছে। পরিবর্তে ভয় তার পিছু নিয়েছে। মিথ্যে বদনাম দিয়ে ঋতু তাকে ফাঁসিয়ে
দেবার মতলব করছে না তো ! নিজের মনগড়া কিছু কথা তার মুখে বসিয়ে দিয়ে, বাবাকে জানিয়ে দেবার হুমকি দেয় যদি !
তার চেয়ে
ভাল মুখোমুখি না হওয়া। ফোনের সুইচটা অফ করে রাখা। পরে সাজিয়ে গুছিয়ে যা হোক একটা
কিছু বলা যাবে। প্লাটফর্মে উঠবে বলে সিঁড়িতে আট দশ ধাপ উঠেছিল। পরবর্তী ভাবনাটা
মাথায় আসামাত্র নামবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। ঠিক তখনই উঁচু গলায় তার নাম ধরে ডাক, কি হল শিবুদা? উঠে
এসো।
ডাক তো
নয়। যেন পিছন থেকে কেউ জামার কলার টেনে ধরল। উল্টোমুখো হয়ে ওপরে ওঠা ছাড়া এখন আর
কোন পথ নেই।
ঋতু বলল, দেরী হচ্ছে দেখে সিঁড়ির মাথায় এসে দাঁড়ালাম। দেখলাম তুমি
উঠছ। বেশ ভাল কথা। হঠাৎ দেখি ঘুরে দাঁড়ালে। কি ব্যাপার! বুঝতে পারলাম না। তাই
ডাকলাম।
শিবু কোন
কথা বলছে না। বলার অনেক কিছুই আছে। কিন্তু ঋতুকে তার কিছুই বলা যাবে না। হাসিহাসি
মুখ করে ঋতুর মুখের দিকে তাকাল।
ঋতু বলল, তোমার গেঞ্জিখানা হেভি জেল্লা মারছে। একটু লুজ ফিটিং হলে
ভাল হতো। এক্সেল নয়। তোমার ডবল এক্সেল লাগবে। চা খাবে ?
- না। শিবু বলল, কীসব জরুরী কথা বলবে...?
- এত তাড়া কিসের? ধীরেসুস্থে বলতে হবে। সোজা এগিয়ে চল। বকুল গাছটার নীচের
ধাপিটায় বসবো।
- অত দূরে কেন? ফাঁকা নির্জন। যত সব পাতা-খোরদের আড্ডা।
ঋতু হঠাৎ
দাঁড়িয়ে পড়ে খিলখিল করে হেসে উঠল, হাসি
থামিয়ে শিবুর কাছে সরে এসে নিচু গলায় বলল, লম্বা
জুলপি, কালো চাপ দাড়ি, ম্যাচো ফিগার! চামচিকের দল তোমাকে দেখলে পুলিশের লোক ভেবে
দৌড়ে পালাবে।
শিবু ঘাড়
নেড়ে বলল, ভুল
ধারণা। রেল পুলিশের সঙ্গে ওদের ভালমতো ওঠাবসা আছে। সবাইকে চেনে।
- হোক। ওখানে বসব বলেছি মানে
ওখানেই বসব।
পাশাপাশি
দুজনে বসল। হাত খানেকের মতো দূরত্ব বজায় রেখে। যেন দুজনেই চাপাগলায় কথা বললেও এ ওর
কথা শুনতে পায়।
শিবু বলল, তুমি ডেকেছ। তুমিই কথা শুরু করো।
- হ্যাঁ। আমিই বলব। ঋতু বলল, কথাগুলোকে সাজিয়ে নিতে দাও।
- তোমাদের মেয়েদের এই এক
সমস্যা। যা কিছু করার আগে সাজগোজেই বেলা কাবার।
ঋতু দুচোখ
বড় বড় করে শিবুর মুখের দিকে চেয়ে বলল, কথার
স্টক তো হেভি। তার সঙ্গে কোথায় গজাল মারতে হবে সেটাও তো বেশ জান। একটু থেমে বলল, বাবা কি আর এমনি এমনি ম্যানেজারের পোস্ট দিয়েছে।
শিবু
লাজুক হেসে বলল, দূর!
মালিক ভালবেসে 'ম্যানেজার' বলে ডাকে। সত্যি সত্যি ম্যানেজার নাকি? ম্যানেজারের মাইনে কত হয় জান?
- তোমারও হবে। আজ হয়নি। কাল
হবে। কাল না হলে পরশু।
ঋতুর কথায়
শিবুর বুকের মধ্যে আনন্দে তুড়ুক করে উঠল। কিন্তু সেটা বুঝতে দিল না। গম্ভীর গলায়
বলল, যা বলার বলো। দেরী হয়ে যাচ্ছে।
- কোন জরুরী কাজ আছে? নাকি বাড়িতে কেউ আসবে?
- বাবার শরীরটা ভাল নয়।
দিদিরও বয়স বাড়ছে। একা সব কাজ সামলে উঠতে পারে না। আমি যতটা পারি, এদিক সেদিক একটু সামলে দিই। এই আর কি।
- আমার মুখের দিকে তাকাও। হুকুমের গলায় বলল ঋতু, বিয়ে করছ না কেন?
- শিবু অবাক গলায় বলল, বিয়ে!
- হ্যাঁ, বিয়ে। তোমার বউ আসবে। বুড়ো শ্বশুরের সেবা করবে। দিদির হাত
নুরকুট হবে। তোমারও দেখাশোনা করবে।
- শিবু হেসে ফেলল, দূর ! ওসব ভাবনা মাথায় আসে না।
- কেন আসে না ? তুমি তো সাধু সন্ন্যাসী নও। মেয়েরা কাছে এলে ছিটকে দূরে সরে
যাও না তো। লুকিয়ে চুরিয়ে ভালই মাপজোপ করো। উঁহু। আঙ্গুল তুলবে না। জানবে মেয়েদের
সামনে দুটো চোখ ছাড়া পিছনেও একটা চোখ আছে। ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা নাকে গন্ধটাও পায়
বেশী।
শিবুর
বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। যে ভয়টা সে পাচ্ছিল, সেই
লাইন ধরেই ঋতু এগোচ্ছে। এখুনি না বলে বসে তোমার ধান্দাটা কি বলো ?
- তুমি ভেবেছটা কি? দুম করে ঋতু বলে বসল।
শিবু
রীতিমত তোতলাতে লাগল, আমি
...! মানে আমি কি ভাবব ...!
ঋতু ঘাড়
দুলিয়ে হাসল, ম্যানেজারির
সঙ্গে সঙ্গে ঘটকালিও করছ ?
- কি বলছ?
- ঠিকই বলছি। আমার বিয়ে নিয়ে
তোমায় কে মাথা ঘামাতে বলেছে ? আমি
কি তোমার ঘাড়ে বোঝা হয়ে বসে আছি?
শিবু হেসে
বলল, তা কেন? তুমি আমার বোঝা হতে যাবে কেন? মালিক বলেছিল ছোটটার বিয়ে দিতে পারলে আর কোন চাপ নেই। ভাল
ছেলের খোঁজ করতে । ব্যাস, এই তো !
ধমক চমকে
কোণঠাসা শিবু হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে হাসছে, আবার
তার সঙ্গে সোজা-সাপটা কৈফিয়ত দিচ্ছে, এমনটা
ঋতুর ধারণার মধ্যে ছিল না।
তার মাথা
গরম হয়ে গেল, আদেশ
পাওয়া মাত্তর মাঠে নেমে পড়লে ?
শিবু
নিঃস্পৃহ গলায় বলল, তা নয় তো
কি? মালিক বলেছে। তার ওপর কথা চলে ?
ঋতু দুম
করে উঠে দাঁড়াল। চোখের পলক না ফেলতেই, শিবুর
মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে নিজের ডান হাতের করতলে শিবুর মুখ চেপে ধরল, আর একটাও কথা নয়। শুনে রাখো, আজ
থেকে তোমার মালিক আমি। তোমার ভালমন্দ আমি দেখব।
ঘটনার
আকস্মিকতায় শিবু ঘাবড়ে গেল। স্থির চোখে ঋতুর মুখের দিকে চেয়ে রইল। ভ্রু নাচিয়ে ঋতু
বলল, হাঁ করে কি দেখছ? যা বললাম মিলিয়ে নিও।
ধুলো
ঝাড়ার মতো করে নিজের দুহাত ঘষে ঋতু বলল, দেখ
না, খেলাটা কেমন জমিয়ে দিই। বাবা
ভেবেছে দিদিদের মতো আমিও বাবার পছন্দ করা ছেলের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসব। ওটি হবে
না।
শিবু
ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞেস করল, তাহলে?
- এমন ছক্কা মারব, বাবা কেন, বাড়ির
সবাই লাট খাওয়া ঘুড়ির মতো গোঁত্তা খেয়ে মাটিতে মুখ গুঁজরে পড়বে। মাথা চাপড়াবে কি
হল ? কেমন করে হল ?
কথা শেষ
করে ঋতু ধাপিতে বসল। আনমনার মতো পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়া সূর্যের দিকে মুখ করে চেয়ে
রইল অল্পক্ষণ। তারপর মুখ ঘুরিয়ে শিবুর মুখের দিকে তাকাল। কোন কথা বলছে না। স্থির
দৃষ্টি। হালকা সোনালী আলোয় ঋতুর মুখখানা শিবুর চোখে অন্যরকম দেখতে লাগল। ঋতুর ছোট
কপাল, আয়ত দুটি চোখ, চাপা নাক, ঈষৎ
পুরু ঠোঁট এমন নিখুঁতভাবে এর আগে শিবু দেখেনি কোনদিন।
সে ডাকল,ঋতু ? সাড়া না
পেয়ে আবার ডাকল,ঋতু ?
ঋতু যেন
ঘোরের মধ্যে সাড়া দিল, হ্যাঁ।
বলো।
- এবার উঠতে হবে।
প্ল্যাটফর্মের আলো জ্বলে উঠছে।
ঋতু
ধীরেসুস্থে উঠে দাঁড়াল।
দুজনে
পাশাপাশি নিশ্চুপ হাঁটল কিছুটা। হঠাৎ করে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল ঋতু। আলতো করে শিবুর
একটি হাত ধরে বলল, আজকের এই
ব্যাপারটা যেন কাকপক্ষীতে টের না পায়। মনে থাকবে ?
শিবু ঘাড়
নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
- আর একটা কথা। বলে শিবুর
কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, এখন
থেকে তোমার মালিক আমি।
(চার)
ধীরলয়ে
সাইকেল চালাচ্ছে শিবু। ভিড়ের রাস্তায় নয়। স্টেশনের জলের ট্যাঙ্কের পাশ দিয়ে গড়পাড়
বরাবর যে রাস্তাটা চলে গেছে, সেই রাস্তা
ধরে শিবু বাড়ি ফিরছে। ফাঁকা রাস্তা। রাস্তার দুপাশে বড় বড় গাছ। হামাগুড়ি দিয়ে
সন্ধ্যে নামছে। গাছের ডালপালার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে পাতলা সরের মতো চাঁদের আলো চুইয়ে
পড়ছে চারপাশে। সে আলোয় শিবুর আবছা ছায়া পড়ছে পিচ রাস্তায়। শিবুর দোসর তার নিজের
ছায়া। সে দোসরকে জিজ্ঞেস করল, স্টেশন
প্ল্যাটফর্মে ডুবুডুবু সূর্যের আলোয় ঋতুকে অন্যরকম দেখতে লাগছিল না ? কেমন শান্ত ! চুপচাপ ! লক্ষ্মী লক্ষ্মী মুখ।
দোসর ঘাড়
নেড়ে সায় দিল, হ্যাঁ।
- আর যে বলল আজ থেকে ও আমার
মালিক। আমার ভালমন্দ ও দেখবে। এ কথার মানেটা কি দাঁড়াচ্ছে?
দোসর বলল, মানে তো অনেক কিছুই হতে পারে। আবার কোন মানে নেই। তাও হতে
পারে।
- কাউকে জিজ্ঞেস করলে হয় না ?
- উঁহু। এ কথা পাঁচকান করা
যাবে না।
- গোল্লায় যাক কি কথার কি
মানে ! শিবু বলল, চোখ বুজে একবার ভাব তো ওই ছবিখানা। সোনার আলোয় ভরা মুখখানা
নিয়ে ঋতু আমার মুখের দিকে চেয়ে আছে। চোখের পাতা পড়ছে না। যেন আজই আমায় প্রথম
দেখছে। আর আমারও মনে হচ্ছে এ যেন অন্য ঋতু। ছবিটা বুকের মধ্যে গাঁথা রইল। এ ছবি
মোছার নয়।
হঠাৎ করেই
শিবুর বাড়ির কথা মনে পড়ল। দু চোখের পাতায় বাপের মুখ ভেসে উঠল। স্পষ্ট শুনতে পেল
দিদির গলা।
চৌরাস্তার
মোড়ে শিবু সাইকেল থামাল। সোজা না গিয়ে এবার তাকে বাঁ দিকে ঘুরতে হবে। মোড়ের মাথায়
একটি তেলে ভাজার দোকান। শিবু আলুর চপ আর বেগুনি কিনল।
বাড়ি ফেরা
মাত্রই তার দিদি বলল, ভাই আজ
তোর এত দেরী হল ? শিবু কোন
জবাব দিল না। তেলেভাজার ঠোঙাটা দিদির হাতে দিল। দিদি বলল, হাতমুখ ধুয়ে আয়। মুড়ি মাখছি।
কুয়োতলায়
দাঁড়িয়ে শিবু শুনতে পেল, দিদি
বাবাকে বলছে, শিবু
এনেছে। তুমি ভালবাসো তাই। আজ নিশ্চয়ই ওর কোন খুশির খবর আছে।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি –
লেখালিখির শুরু গত শতকের শেষ দশকে। বাণিজ্যিক পত্রিকার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে
লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি। গল্প সংকলন আটটি এবং তিনটি উপন্যাস।
.jpg)