গলদঘর্ম হয়ে চরণ সিংহ মাঠ থেকে ফিরে
আসে। তালপাতার পাখাটা ঘোরাতে ঘোরাতে বলে— ‘কই রে একটু জল দে তো।’ ঘরের বউ, মানে রেবতী সিংহ একটু ঝাঁঝালো
গলায় জবাব দিল — ‘জলটোও লিতে পারো লা? হাতে বল লাই লাকি?’ চরণের হাতে সত্যি আর বল
নেই। সকাল থেকে একদুপুর লাঙল টেনে সে এখন অবসন্ন। গ্রীষ্মের অসহ্য তাপে মাথা
ঘুরে ওঠা পরিবেশে ওরা চাষ করে। মাঠের মাঝে যে ডিপটা আছে সেটাও প্রায়
কিলোমিটার দূরে। একবুক তেষ্টা নিয়ে, এক মাথা রোদ নিয়ে, এক কাঠা জমি লাঙল দিতে গেলে
ওরা হাঁফিয়ে ওঠে। গাছের ছায়ায় একটু জিরোবে তারও অবসর
থাকে না তখন। গরমের সূর্য চরচর করে বাড়ে। চরণ ভাবে ‘ইসব কষ্ট কি রেবতী বুঝতি
পারে লা?’
সে
কী জানে না পুরুষদের মাঠে কাজ করাটা কতো কষ্টের! তবুও চুপ থাকে চরণ। সহধর্মিণীকে একটু পাশে পেলে জলের
শীতলতা একটু বাড়ে। সেটা রেবতীকে কে বোঝাবে! জল দেওয়ার জন্য রেবতীর কোনও হেলদোল না দেখে, সে নিজেই একঘটি জল নিয়ে
কঁৎ কঁৎ করে গিলে ফ্যালে। ফাটা মাটির বুকে জল যাওয়ার মতো সে
জল চলে যায় শরীরময়। একটু ধাতস্থ হয় চরণ। ততক্ষণে রেবতী এসে আওড়াতে
থাকে—
‘ইকটু
তরও সয় লা তুমার?’ ‘টুঁটি শুঁকিন গেল্ছিল’ বলে চরণ আর কথা বাড়াতে চায় না। গোয়াল ঘরের দিকে পা বাড়ায়
সে। ওখানে দুটো জীব জলপিপাসু হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তখনও। জলের অভাবে ওরাও হাঁপাচ্ছে। একদুপুর লাঙল টেনে তারা
বেশ ক্লান্ত, জলশূন্য। নির্বাক হয়ে ওরা চরণের পথ
চেয়ে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। পুকুরের বালতি দুয়েক ঘোলা জল তাদের
এখনই দরকার। ‘হাম্বা হাম্বা’ রবে তারা জানাচ্ছে সেই আবেদন। গোয়াল ঘরের পাতনাতে পুকুরের
বালতি দুয়েক জল দিয়ে চরণ বলল— ‘লে চুঁ চুঁ করে টেনে লে তো।’ গরুদুটো লহমায় নাকডুবিয়ে
পানারি সমেত ওই সবুজ জল টানতে থাকে। শিংদুটো দোলাতে দোলাতে, কানদুটো ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে
সেই ঘোলা জল তারা কোষ থেকে কোষান্তরে চালান করে দেয়। চরণ শুনতে পায় চামড়ার তলে তলে সেই জল যাওয়ার শব্দ। ওদের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে
বলতে থাকে— ‘জল বেজায় বড় উষুধ রে! ই ছাড়া সবকিছু লাচার। গতর বুল, জমি বুল, লিশ্বাস বুল, জল ছাড়া সবই শ্যাষ।’ গৃহবাসী গরুদুটো যেন সব
বোঝে। যেন সব বোঝাতে চায়। শুধু জল নয়, লাঙল টানার পর ওদেরও যে
রীতিমতো বিচালি-খোলের দরকার হয়, সেটা তারা চোখের চাহুনিতে বুঝিয়ে দেয়। লেজটা চরণের দিকে উঁচিয়ে
যেন বলে—
‘দে
ইবার ইকটু ভুঁসি-খোল দে?’ কিছুক্ষণ লেজ ঝাপটেও যখন কোনওকিছু হয় না, তখন ওরা চরণের দিকে এগিয়ে
দেয় মাথা। কর্মঠ চাষির শক্ত হাত তা প্রতিহত করতে
থাকে। ঘনঘন মাথার ঢুঁসানি খেয়ে চরণ ততক্ষণে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। থাকতে না পেরে চালার বাতায়
গুঁজে রাখা পাঁচনটা (ছোট হাতলাঠি) নামিয়ে শপা-শপ বাড়ি জুড়ল চরণ। দু’পা তুলে গরু দুটো লাফিয়ে
উঠছে। চরণ চ্যাঁচাচ্ছে— ‘শালা ভুঁসি চায়! কত খায় রে হারামজাদা?’ ঘনঘন পাঁচনের চাপড়ে সাদা
লোমগুলো ফুলে ওঠে ওদের।
খূরগুলো মাটি আঁচড়ায়, তবুও চরণকে তারা চেয়ে চেয়ে
দেখে। এ-এক কাতর আবেদন যেন। এ-এক অসহায় আত্মসমর্পণ ওদের। মারতে মারতে চরণের হাত লাল
হয়ে ওঠে। গরুর মতো চরণও ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে। বাকহীন প্রাণীদুটি পাকস্থলীর
চাপে পড়ে তবুও চরণকে চেয়ে দেখে। করুণ কালো চোখগুলো যেন বলতে চায়— ‘বাবু এক আঁটি খড় দে? ইকটু খোল দে?’ ওরা জানে না বর্ষার সমস্থ
খড় মধ্যবিত্তরা নিজেদের পেটের দায়ে বেচে দেয়। তারপরে পড়ে থাকা ভুঁসি, ভাতের ধান সিদ্ধ করতে কাজে
লাগে। সরষের আবাদ না থাকায় খোলের কোনও আয়োজন চরণ করতে পারে না। এমনকি অবলাগুলোর কথা ভাবারও
সময় পায় না চরণরা। অভাবের ঘরে দু’দুটো জীব পুষতে হিমসিম খেতে
হয়। তবুও ওদের রাখতে হয়। ট্রাক্টর দিয়ে জমি চষার
সামর্থ্য চরণ সিংহের নেই। তাই গত দশ বছর ধরে ওরা কোনওমতে গরুদুটোকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ওদিকে হাতের কাছে গবাদিভোজ্য
কোনও খাদ্য সামগ্রী না পেয়ে চরণের মাথা আরও গরম হয়ে ওঠে। দ্রুত গতিতে ঘরের দাওয়াই
এসে হাঁক দেয়— ‘বুলি, ঘরে ফ্যান-ট্যান কিছু আছে? গরু দুট্যা কি আজ উপ্যাস
পারবে?’
রেবতী
প্রথমটাই এর উত্তর দেয় না। যেন বোঝাতে চায় গরুর খাবারের দায়িত্ব
চরণের একার। ও-যে হেঁশেলটা কোনমতে টেনে দিচ্ছে ওটাই বরাত। অবশেষে চরণের হম্বিতম্বিতে
বলে ওঠে
— ‘যদি
খাবারই দিতে প্যারব্যা লা, তবে উ-দুট্যাকে দাঁড়িঙ দাঁড়িঙ মারো ক্যানি? বিচে দ্যাও।’ কথাটা যেন আগুনের গোলার
মতো চরণকে আঘাত করে। একেবারে দাওয়ার উপরে এসে রেবতীর
চুলের মুঠি ঝাপটে ধরে চরণ। নিগড়াতে থাকে শক্ত হাতে, ‘উরা লা থাকলি, আমার মাথা চিব্যাতে হবে
তুকে। মাগী, মুখে আলিস কি করি উ কথা।’ দু’চার থাপ্পর লাগিয়েও যেন
শান্তি হচ্ছে না চরণের। ওদিকে মাটির কড়াইয়ে টগবগ করে ফুটছে
ভাত। আখাতে শুকনো বাঁশপাতাগুলো পুড়ছে চরচর শব্দে। আগুনের কারবার সর্বত্র। গরুর পেট থেকে চরণের মাথা, রেবতীর শরীর থেকে মাটির
উনুন,
সর্বত্র। উত্তপ্ত চরণের হাত চলেছে
সমানে,
মুখও—
‘আমরা গিলবো আর উরা কি প্যাট ধরি দাঁড়িঙ থ্যাকবে?’ ক্ষুধার জ্বালা বড়ই দুর্বিষহ। জীবভেদে ক্ষুধার বিভেদ নাই। তাই গরু থেকে চরণ বা রেবতী, ক্ষুধার্ত সবাই। তাই উত্তপ্ত সবাই। আর্ত সবাই। হেঁশেলে কোনওকিছু না পেয়ে, রেবতীর শরীরে ক্ষুধা-জ্বালার ছাপ রেখে বাইরে
বেরিয়ে পড়ল চরণ। একপাল্লার বাইরের দরজাটা ডিঙিয়ে
চারিদিক চেয়ে দেখল। সর্বত্র পাণ্ডু বর্ণের ধূসরতা বিরাজ
করছে। কোথাও কোনও সবুজের চিহ্ন নেই। পুকুরের জল প্রায় নিঃশেষ
হয়ে ঘন সবুজ বর্ণ নিয়েছে। গাছেদের দুর্দশাও চোখে পড়ার মতো। প্রায় গাছ এখন উলঙ্গ। সূর্যের লকলকে আগুনজিভে
বাঁশবনও হলুদ পাতার বন। একমাত্র কয়েকটা কাঁটাগাছ কিছুটা
সবুজ ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এ-অঞ্চলের গরমে মানুষের টিকে
থাকা দায়। গবাদিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুন করার নামান্তর। কোথাও কোনও খাদ্য সংস্থানের সুযোগ
দেখতে না পেয়ে চরণের চরণ গৃহমুখী হল। গোয়ালঘরের চালাতে গরুদুটো
তাকে দেখে ডেকে উঠল ‘হাম-বা হাম-বা’। ক্ষুধাক্লিষ্ট শিশুর মতো
চাহুনি নিয়ে সেই দুই বৃহৎ জন্তু দুটো ডাকছে ‘বাঁ-বাঁ’ স্বরে। হতভাগা চাষীর কানে সেই ডাক
ঠেকল
‘বা-বা’ শব্দের মতো। জন্তু
দুটোর
পেটের খাল ক্ষুধার ক্ষেত্রফল ধরে যেন গভীর থেকে গভীরতর হয়ে উঠছে। জিভদুটো শুকনো পাতনা চাঁটছে। শিং দিয়ে মাটির দেওয়াল খুঁড়ে
তারা যেন এক আঁটি বিচালি পেতে চায়। কিন্তু বিচালি কোথা! ঘাস কোথা! ভুঁসি কোথা! আটটি পাকস্থলীর অন্ন সংস্থান
করতে চরণ অপারগ। বেশ কিছু দিন ধরেই এরকম চলছে। কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে
সেটাও হয়তো চরণ জানে না। ওদের ক্ষুধা চরণকে নিজের কাছে অপরাধী
করে তুলছে দিনদিন। অবশেষ পুরনো, ঘুনধরা সরষের কাঁচকিগুলো
খুঁজে পায় চরণ। তড়িঘড়ি, ওগুলো পুকুরের শ্যাওলা-পচা জলে চুবিয়ে এনে ওদের
মুখের সামনে তুলে ধরে। অবলা দুটো ওগুলোই গোগ্রাসে গিলতে
ব্যাস্ত। ওদের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে চরণ বলতে থাকে —‘ই-ব্যালাটো ইতেই প্যাট ভরা। উ-ব্যালা উপ্যাস যাবি ল্যা
বুলি র্যাখল্যাম।’ কাঁচকি খেতে খেতেই গরুদুটো আওয়াজ
করতে থাকে ‘গঁ গঁ।’
দুপুরের প্রায় শেষ প্রহরে পুকুরের কোমড়জলে গা ডুবিয়ে ভাতে বসে চরণ। সানকি থালে আছে মানকচু সেদ্ধ, কুমড়ো-আলুর ভ্যাকসা তরকারি। অভুক্ত চরণ সে-সবকে গ্রাস পনেরোর মধ্যে শেষ করে। রেবতীকে হাঁক পাড়ে— ‘ইকটু টক করিস লি?’ টকের জন্য আমড়া আজ রেবতী জোগাড় করতে পারেনি। রাস্তার ধারের গাছটায় একটাও পাতা নায়। আমড়া থাকা তো দূরের কথা। টমেটোর আকাশছোঁয়া দাম। খালের চুনোপুঁটি কেনার সামর্থ্য রেবতীর নেই। অতি পুরনো তেঁতুল গুলে, তাতে আলু দিয়ে টক করতে সে পারত, কিন্তু ঘরে আলুও বাড়ন্ত। এসব সাতকাহন না জানিয়ে রেবতী জবাব দিল— ‘চাষার ছেল্যার রাজার বায় ক্যানি!’ ভাত খেয়ে চরণের পেট ও মাথা ততক্ষণে অনেকটা শান্ত হয়েছিল। সে একটু মুচকি হাঁসল— ‘টক হলি, মুখে ইকটু সওয়াদ আস্যতো রে।’ রেবতী চরণকে ভালভাবে চেনে। জানে, এই সহজ মানুষটি কষ্টের সংসারে প্রাণপাত করে। কোনও কিছু করে যখন সংসারের হাল আর টানতে পারে না তখন সে প্রচণ্ড হয়ে ওঠে। বিঘে দেড়েক জমির উপর সংসারটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার উপর খরা লেগেই থাকে। ডিপের জলে চাষ করতে, সার-বীজ কিনতে ধারের পরিমাণটা বেশ বড় অঙ্কের হয়ে দাঁড়ায় তখন। ধান ফললে সেসব বেচে খুব সামান্য উদ্বৃত্ত থাকে ওদের হাতে। তবুও বাপ ঠাকুরদার চাষের রেওয়াজ ছাড়তে পারে না চরণ। অন্যদিকে গবাদি দুটোর কষ্টও সে সহ্য করতে পারে না। বছরের অন্য সময়ে গাছগাছড়ার পাতা-ঘাস দিয়ে ওদের কিছুটা পেট ভরে। আবার অত্যাধিক ঘাসপাতা খেলে ওদের পেটখারাপ করে। মাঝে বাদলা বা জ্বর হয়। বিচালি ওদের কপালে খুব কমই জোটে। বর্ষার খড় উঠলে কম দামে সেসব বেচে দিয়ে নিজেদের পেট ভরায় চরণ সিংহ। এসব কথা হয়ত চরণ মনে মনে ভাবছিল। হয়তো সে ভাবছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের প্রতি যে অনিচ্ছাকৃত অত্যাচার সে করছে, তা একরকমের পাপ। বিশেষ করে অবলা জীবকে ধীরে ধীরে যেন হত্যা করছে সে। সেও যেন একপ্রকার কসাই। চিন্তার এই পাক তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে। মনে মনে সে ভাবে— ‘ই-হাতে আর কতো পাপ করব্যো? আর কতো লিজেকে বাঁচাবো?’ সে ভেবেই চলে— ‘লিজে বাঁচতি উদের মারছি আমি, উদের মারছি আমি....’ অবশেষে একটা লম্বা নিশ্বাস ছেড়ে রেবতীকে বলে— ‘গরু দুট্যা বিচে দুবো বুঝলি?’ দুপুরে ঠিক এ-কথাটাই বলেছিল রেবতী। সে কিছুটা হতভম্ব, কিছুটা অপরাধীর সুরে বলে— ‘আমি কি অই বুল্যাছি। উদের পুষব্যা ক্যামন করি?’ চরণ জানায় ‘ঠিক কথায় তো বুল্যাছিস, বিচে দিলে উরা বাঁচবে, উরা বাঁচলে আমরা মরব্যো। উরা তো বাঁচুক।’ রেবতী নিজেকে চরম অপরাধী ভেবে বলে ওঠে — ‘কী কুক্ষ্যাণে আমি উসব বুল্যাছিলাম, বুড়্যা গরু বিচে দিলে উরা যি কসাইখানায় যাবি গো।’ চরণ উত্তর দেয়— ‘উখানেই উদের মুক্তি, উতি পাপ লাঘব হবি।’ কিন্তু বেচব বললেই বেচা যায় না। মুক্তি দেবো ভাবলেই কেউ তড়িঘড়ি মুক্তিদাতা হতে পারে না। পাইকার আসবে। দরদাম হবে। দশবছর পুরনো গবাদিকে বেচতে গেলে গৃহকর্তী হাজার বার আঁতকে উঠবে। গোয়াল শূন্য হয়ে গেলে পূর্বপুরুষের রেওয়াজকে শেষ করে দেওয়ার মনোকষ্টে চরণ বসে থাকবে ঝিম ধরে।
খাবার খেতে খেতে প্রায় বিকেলে হয়ে
যায়। ততক্ষণে শুকনো মাটির ফাটে ফাটে সারাদিনের জমে থাকা গরম, উঠতে শুরু করেছে বাষ্প হয়ে। বাইরের প্রকৃতি রোদে পুরে
তামাটে। শুকনো গাছের মাথাগুলো ধোঁয়াচ্ছন্ন। থেকে থেকে গরম হাওয়ার দমকায়
ধুলোর কুণ্ডলী উঠে যাচ্ছে উপরে। অকাট্য অসহ্য দাবদাহের শেষ লগ্নে
সূর্যদেব কিছুটা ক্ষান্ত হয়েছেন। আগুনের পিণ্ডের মতো সীমান্তের
শেষ কিনারে গিয়ে যেন বলছেন— ‘আজকের মতো এই। কালকের আয়োজনে আবার দেখা
হবে।’ এ-অঞ্চলের কাঁকড় ফাটা গরম মানুষের শরীরের শেষ রক্ত চুষে খায়। গবাদি জীবকেও এই অসহ্য গরম
ছাড়ে না। জলের প্রতিটি কণা মাটির সপ্ততলে
আত্মগোপন করে। যমদূতের মতো তালগাছগুলো ওঠে ঝলসে। এই পরিবেশে চরণ পাশের গ্রামে
যাবে। শুকনো খালের পাড় ধরে সে অনেকটা পথ এসে একটু চেয়ে দেখল। তখনও জোনাকির আলো জ্বলতে, অন্ধকারের কারবার হতে কিছুটা
সময় আছে। অবশেষে বন্ধু স্থানীয় সাকিন মিঞাঁর বড়ি পৌছায় সে। বাড়ির সামনে এসে হাঁক ছাড়ে— ‘সাকিন ভায়া আছো লাকি?’ মিঞাঁ সাহেব তালপাখার পাখা
হাতে বাইরে এসে দেখে চরণ। এ-অঞ্চলের মুসলমানরা মধ্যবিত্ত
হিন্দু গৃহস্থদের আজও আদর আপ্যায়ন করে। চরণের বর্তমান অবস্থা করুণ
হলেও এককালে তাদের একহাল (ষোল বিঘে) জমি ছিল। খাওয়া পড়ার পরও উঠোনে ধানের
গোলা থাকত। কুঁড়েঘরের মতো উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত খড়ের পালুই। বাইরে বেরিয়ে এসে গলায় জড়িয়ে
রাখা গামছা দিয়ে সাকিন বাঁশের মোড়াটা ঝেড়ে চরণকে বসতে দিল। বলল— ‘বলো ভায়া, আজ দাদাকে মনে পড়্যলো কি
করি?’
‘উ
থাক সাকিন ভাই, ইকটু উপক্যার করত্যি পারো?’ ‘তা বুলেই ফ্যালো, ই মোছল তুমার কি উপক্যার
করত্যি পারে?’ ‘এক কাহন খড় ধার দিতি পারো?’ ‘তা পারি, কিন-তু পুন পাঁচের বেশী হবে
লা ভায়া।’ চরণ যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। অভুক্ত গবাদি দুটোর করুণ
চোখ তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে তখন। কী প্রচণ্ড ক্ষুধা ওদের
তখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তারা চরণের অপেক্ষায় তখনও পেটে খিদে
নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চরণের চরণ-ধ্বনির অপেক্ষায় তারা অধীর
হয়ে উঠবে। এসব ভেবে চরণ আর দেরী করতে চায় না। কিভাবে খড় শোধ করবে সে কথা
ভাবার সময় চরণের এখন নেই। তড়িঘড়ি মোড়া ছেড়ে সে সাকিনের হাতটা
ঝপ করে ধরে ফ্যালে— ‘বহুত উপক্যার করল্যা সাকিন ভাই, ঘরে এক আঁটিও খড় লাই। গরু দুট্যা বেবাক উপ্যাস
পারছে আজ সারাদিন।’ ‘ঈ...আল্-লা’ বলে সাকিন আঁতকে ওঠে। ‘হেঁদুর ঘরে বলদের উপ্যাস
মানে গেরহস্তের অকল্যান ভায়া। যাও যাও জলদি বাড়ি যাও’ বলে সে খড়ের পালুয়ের কাছে
গিয়ে খড় ছাড়াতে শুরু করে। পাঁচ পন খড়ের ভার সেরকম কিছু না। তবুও আয়তনে অনেকটা। একটা মুনিষের পক্ষে সেই
আয়তন সামলে পথ চলা বেশ মুশকিল। কিন্তু ওসব আগুপিছু না ভেবে চরণ
সেই বিরাটাকায় খড়ের বোঝা মাথায় তুলে নেই। যেতে যেতে বলতে থাকে ‘বড় উপক্যার করল্যা সাকিন ভাই। ভগবান
তুমার
ভাল করুন।’ ফিরতি পথে খালের ধারে ধারে শেয়ালগুলোর সবুজ চোখ জ্বলতে শুরু
করেছে। ঝোঁপে ঝাড়ে অজানা পোঁকার ডাক একটানা সুরে বেজেই চলেছে। আধসিদ্ধ আলো, অন্ধকারের হাতে নিজেকে সমর্পণ
করতে ব্যস্ত। এই সময় বিষধর সাপগুলো বেরোবে। একা মানুষ দেখলে শেয়ালগুলো
অতর্কিতে ঘিরে ধরতে পারে। মানুষও মানুষকে ধরার জন্য ওঁত পেতে
বসে থাকতে পারে। কিন্তু এসবের কোনও কিছু চরণের মনে আসে না। ক্ষিপ্র পা কখন গোয়ালের
দাওয়ায় গিয়ে পৌঁছাবে সেটাই তার একমাত্র চিন্তা তখন। হাঁটতে হাঁটতে বোঝার টাল
সামলাতে চরণকে বেশ কসরত করতে হচ্ছে। এক দুপুর লাঙল টানার পর
হাতের পেশীতে টান অনুভব করছে সে। ঘাড়ের শিরাগুলো লাঙলা দড়ির (লাঙল বাঁধার মোটা দড়ি) মতো ফুলতে শুরু করেছে। পায়ের রগে রগে রক্ত সঞ্চালন
যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ওর। তবুও পা চালাতে থাকে চরণ। আল-পগারের বন্ধুরতা পায়ের আঙুলগুলোকে
বার বার ক্ষতবিক্ষত করতে তৎপর। তবুও দ্রুত পা ঘরমুখী গরুর মতো হাঁসফাঁস
করতে করতে এগিয়ে চলেছে। অবশেষে বাড়ির উঠোনে যখন সে পৌঁছাল
তখন সন্ধ্যার লম্ফ জ্বলে উঠেছে গ্রামময়। মাটির ঘরগুলি অন্ধকারের
ঘোমটা নিয়ে দাঁড়িয়ে। ক্লান্ত গ্রামবাসীরা কিছুক্ষণের
মধ্যেই ভাতে বসবে। এরম পরিবেশে ঘরে ঢুকে চরণ হাঁক পাড়ল—
‘রেবতী...’
এসময়
রেবতীর হেঁশেল চালায় থাকার কথা। বা লম্ফের টিমটিমে আলোতে পাঁচালির
অশুদ্ধ শ্লোক উচ্চারণ করার কথা। কিন্তু ঘরে না আছে লম্ফ, না আছে রেবতী। চরণ আরও জোরে হাঁক ছাড়ে ‘রে-ব-ত-ঈ-ঈ’। উত্তর না পেয়ে গোয়ালের দিকে পা বাড়ায় চরণ। খড়ের বোঝাটা নামিয়ে একটু
হলেও স্বস্তি হয় তার। তবুও সে জিরোতে পারে না, এক্ষুনি কয়েক আঁটি খড় কাটতে
হবে তাকে। গোয়ালের দিকে চোখ মেলতেই দেখে একটা লম্ফ হাতে বসে আছে রেবতী। ‘কি রে কি হয়্যাছে?’ চরণের এই প্রশ্নে রেবতী
নিরব। শুধুমাত্র বাদুরগুলো চিঁ চিঁ শব্দে উড়ে চলে যাচ্ছে। ডাঁয়া গরুটা দাঁড়িয়ে। বাঁয়া গরুটা আছে বসে। আবার জিজ্ঞেস করে চরণ— ‘রেবতী তু কি খড় জুগাড় কর্যাছিস?’ তবুও সে চুপ। কাছে এসে চরণ দেখে বাঁয়াটা
জাবর কাটছে না। প্রথমে ভাবে পেটে কিছু না থাকলে
জাবর কাটবে কি করে। আবার ভাবে গতরের আর দোষ কোথায়, জিরোচ্ছে বোধহয়। গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে গা
চলছে না। একটু খটকা লাগে চরণের। অবলাটা তার মিশমিশে কালো
চোখে এক অব্যক্ত আর্তি নিয়ে চরণের দিকে চাইল। এ-আর্তি খড়ের জন্য নয়। এ-চাওনি শুধু স্নেহ নয়, শারীরিক গোলযোগের অস্ফুট
বর্ণনা যেন। দীর্ঘদিন সেবাযত্ন করলে বোধহয় পশু ও মুনিবের মধ্যে একটা বোঝাপড়া
হয়ে যায়। একে অপরের চাওয়া পাওয়া বুঝতে পারে। এমনকি মানুষের মুখের ভাষাও
বুঝতে পারে এই মূক জীবগুলো। ‘ডাঁয়ে বাঁয়ে’ বললে তারা ঠিক দিকে চলে। ‘লিক লিক’ বললে ঠিক গাড়ির চাকার দাগে
দাগে চলতে থাকে। ‘হেই পা পা’ বললে তারা বুঝতে পারে তাড়াতাড়ি
পা ফেলতে হবে। সুতরাং নানা সংকেত, নানা গ্রাম্য ভাষা তারা
শিখে যায়। পশুপালিত জীব, জীবনের অঙ্গাঙ্গী হয়ে যায় এভাবে। সেরকমই বাঁয়াটার করুণ কালো
চোখে হয়তো এমন এক আবেদন ছিল যা চরণকে চিন্তায় ফেলে দেয়। রেবতী বলে— ‘সাঁঝ থেকি ইটো
বসি আছে,
লড়াচড়া
তো কিছুই করছি লা।’ যে ভয়টা এতক্ষণ চরণের সন্দেহ ছিল, সেটা তখন সত্যি হয়ে উঠল। সত্যি গরুটার বাদলা হয়েছে, নইলে অতবড় জন্তু এত নিথর
হতে পারে না। লম্ফটা এবার বাঁয়াটার মুখের কাছে
ধরে অনেকক্ষণ নিরীক্ষণ করে। চুপ করে বলে— ‘কাল কি কাছাল্ছ্যে
ঠাকুর?
ই গরীবের
হাতে কী গরুটোকে তুমি মারতি চাও?’ রেবতী একটু রাগত হয়েই বলে— ‘ঠাঁই অঠাঁয়ে কথা বুলো না
তো!
র্যাতটো দ্যাখোই লা কি হয়?’ চরণ জানায়— ‘গুটা দিন ধরি উপ্যাস দিয়ে ইটোর
ইরম হল্যো রে রেবতী। ই-পাপের ক্ষ্যামা লাই।’ লিজেদের প্যাট ভর্যাতে
উদের প্যাটের কথা একবারউ ভ্যাবল্যাম লা রে!’ লম্ফের
কেরোসিন পোড়া ধোঁয়া গোয়াল ঘরের অন্ধকারে ক্ষীণ হয়ে উপরে হারিয়ে যাচ্ছে। বাঁয়াটা ক্ষীণকায়। ডাঁয়টা থেকে থেকে ডাকছে— ‘বাঁ বাঁ’ করে। অল্প আলোয় রেবতীর চোখের
কোণের জল, চরণ লক্ষ্য করতে পারছে না। ঘোমটা দেওয়া গৃহবধু হয়তো
মনে মনে লক্ষীর পাঁচালি জপ করছে। গৃহস্থ বাড়িতে গরুও লক্ষীর
আরেক রূপ। সেই লক্ষীকে বাঁচাতে আরেক লক্ষী ঠাঁই গোয়ালঘরে বসে আছে। কিন্তু ডাঁয়াটার বাঁ বাঁ
ডাক যেন রেবতীকে চঞ্চল করে তুলছে। সে চরণকে বলে ওঠে— ‘ডাঁয়াটাকে
চার আঁটি খড় খেতি দাও। লাহলে উটোও আর দাঁড়াতি প্যারবে ল্যা।’ ওদিকটায় চরণের লক্ষ্যই হয়নি। বাঁয়ার কথা ডাঁয়াকে ভুলিয়ে
রেখেছিল এতক্ষণ। চার আঁটি খড় কাটতে চরণের শরীর ও মন সরছে না। অগত্যা বিচালিগুলো এলিয়ে
দিল—
‘ই-অল্যায় বড় কঠিন, ই-প্যাট লাছোড়বান্দা রে!’ রেবতী বাঁয়াটার গায়ে একটা
ছেঁড়া চট চাপিয়ে, চলে যেতে যেতে গরুটির দিকে বারেক চেয়ে দেখল। ওটি যেন নির্বাক সন্তানের
মতো রেবতীর দিকে মুখ করে তাকিয়ে রয়েছে। আস্তে আস্তে মাথাটা মাটিতে
নুইয়ে পড়ছে। গোটা শরীর অবশ। পাগুলো ছড়ানো। শুধু গলকম্বলটা একটু নড়ছে। রেবতী আর দাঁড়িয়ে থাকতে
পারে না। দুপুরে যে কথাটা সে অতর্কিতে বলেছিল, সেটাই রেবতীকে কুঁড়ে কুঁড়ে
খাচ্ছিল তখন।
সেদিন রাতে তাদের পেটে ক্ষুধাঅগ্নি
জ্বলে ওঠেনি। না চরণের না রেবতীর।
গভীর
রাতে রেবতী একবার গোয়াল ঘরের চালায় আসে। দেখে গরুটি ওখনও সেই অবস্থায়
পড়ে আছে। অজস্র মশা তার মুখময় ঘোরাফেরা করছে। সমস্থ রক্ত ওরা নির্বিঘ্নে
চুষে নেবে এবার। লেজ তোলার ক্ষমতাও জন্তুটির নেই। ডাঁয়াকে দেওয়া খড়গুলো সে
একটাও স্পর্শ করেনি। বেবাক জীবরা সব বোঝে। ডাঁয়াটা হয়তো ক্ষুধাকে তখন
জয় করেছে। সে তার সহচরীর সুস্থতা কামনা করছে। মাথায় মাথা ঠেকিয়ে বাঁয়াকে
সে যেন বলছে— ‘দুট্যা খড় মুখি দে, একবার উঠি দাঁড়া।’ বাঁয়াটার
খাওয়া-দাঁড়ার যে ক্ষমতা নেই সেটা
বোধহয় ডাঁয়াটা বুঝতে পারে। তার ঘনঘন লেজ নাড়া মনের সেই ব্যাকুলতাকে
প্রকাশ করছে বারেবারে। রেবতী গরুটার গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে
বলছে—
‘তুকে
আমরাই মেরে ফ্যেলল্যাম, লরকে গিয়ে ই-পাপের হিস্যাব আমাকেও দিতে হবি।’ এই বলে গরুটির তলপেটে হাত
বুলিয়ে বুঝতে পারে তার শরীরে চলমান আর কিছুই নেই। শুধু চোখের মণিটি ছাড়া। কী অসম্ভব কষ্ট আর অব্যক্ত
মৃত্যুভয় জন্তুটির মধ্যে খেলা করছে সেটা রেবতী অনুমান করে। নিজেদের পাপী সাব্যস্ত করেও
তার যেন শান্তি হচ্ছে না তখন! শেষরাত অবধি চরণেরও ঘুম
নেই। বিছানার পাশ থেকে রেবতীর উঠে যাওয়া সে বুঝতে পারে। তবুও সে উঠে যেতে পারেনি। ডাক্তার বদ্যি বা গাছগাছড়া
দিয়ে যে ওকে বাঁচানো যাবে না, সেটা সে বুঝতে পারে। মানুষের ষষ্ঠেন্দ্রিয় বোধহয়
আগাম বার্তা পায়। কেননা খুড়িয়া জ্বরের জন্য যে হেভি
ডোজ দেওয়া হয়, তা দেবার জন্য ডাক্তারে বেশ পয়সা নেবে। আবার পাশের গ্রামের ভেটিনারি
ডাক্তারকে ডাকলেও পরের দিন দুপুর না হওয়া পর্যন্ত সে আসবে না। ডাক্তারি তার কাছে নগদের
কারবার। সময়ের সেবা নয়। আর ডোজ দেওয়া হলেও ও বাঁচবে
কী করে?
শরীরে
খাবার না থাকলে ওষুধ নানা বিক্রিয়া করতে পারে। তখন ওই ওষুধ ওর ক্ষেত্রে
বিষ হয়ে উঠবে। চরণ এসব কথা বহুবার ভেবেছে। চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছে। তবুও চোখের সামনে জন্তুটির
মৃত্যু দেখা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই। সকাল হলেই গো-ডহরে যেতে হবে ওকে। যেখানে শকুনগুলো ওদের ক্ষুধা
নিবারণের জন্য বসে থাকবে। শক্ত নখে-ঠোঁটে খু্ঁটরে খুঁটরে খাবে ওর মেদ-মাংস-রক্ত। চামড়াটা কোনও এক চামার এসে কেটে নিয়ে
যাবে। মাছির দল ভনভন করে ঘুরে বেড়াবে। সন্ধ্যা হলে শেয়ালের দল
ঝাঁপিয়ে পড়বে ওর অবশিষ্ট মাংসের উপর। নাম না জানা অজস্র ছোট ছোট
কীটপতঙ্গ বাঁয়াটার কান, নাক, পায়ুর মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করবে ওর শরীরের ভিতর। শরীরের উপর ক্ষুধার আগ্রাসন
চলবে কয়েকদিন ব্যাপি। এসব কথা ভাবতে ভাবতে আঁতকে ওঠে চরণ। ভাবে ‘ইকে কতো কষ্টে পেল্যাছি
আমরা। কতো ধান খেয়্যাছি ইটোর গতর খাটিঙ্। ইর কাছ্ হতি শুধু লিয়্যাছি
আমি।’ এসব আতঙ্কের বিষ যখন চরণকে তিল তিল করে কুঁড়ে খাচ্ছে, তখন রেবতী এসে হঠাৎ বলে
উঠলো—
‘বাঁয়াটো
দেহ রেখ্যাছে গো....উটো আর লাই...আর লাই...’ এবার
চরণ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, বেদনা ও আত্মদাহে সে অস্থির। নিজের হাতে দশ বছর ধরে পালন
করা পুত্রসম জীবটি তার হাতেই সে যেন মেরে ফেলল। সে যেন একজন গৃহস্থ কসাই। ডুকরে চিৎকার করে উঠল সে— ‘ই আমি কি করল্যাম রেবতী....লরকেও আমাদের ঠাঁই হবে লা
রে....লরকেও লা....’ সে একবারও ভাবল না এর পিছনে
বাড়ির অভাবের ভূমিকা আছে। মনে শুধু প্রশ্রয় পেল, নিজেদের পেটের চাহিদায় ওর
মৃত্যুর মূল কারণ। বারবার বলতে থাকল— ‘প্যাট বাঁচাতি প্যাটকেই
ক্যাটল্যাম আমি...কসাই, কসাই হলিও ইরম করতি প্যারতো লা রে।’
ততক্ষণে ভোরের সূর্য উঠতে শুরু করেছে। এ-সময়টা অতি মনোরম পরিবেশ। বেশ ফুরফুরে হাওয়া মাঠময়। পাখিদের ডাকে যেন নতুন দিনের বাজনা বাজছে। কিন্তু এই আবহাওয়াতেও জ্বলছে দুজন। রেবতী ঘরে আর চরণ ফাঁকা মাঠের মাঝে। ভিতরের পাপবোধ তার ভিতরকে কুঁচকে দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের স্নেহ-মমতা তাকে করে তুলছে কাতর, ক্ষমতাহীন। গরুটিকে টেনে নিয়ে যেতে সে আর পারছে না। তবুও গো-ডহরে ওকে ফেলতে পারল না চরণ। নিজের পাপকে সে নিজের জমিতেই পুঁতল শেষমেষ। যে জমির প্রতিটি মাটিতে বাঁয়াটার ক্ষুর প্রতিবছর ফসল ফলাত, তারই শরীর এখন সার হয়ে ফসল ফলাবে চরণের জমিতে। কিন্তু সে ফসল কি চরণ আর মুখে তুলতে পারবে! যার প্রতিটি দানাতে মিশে থাকবে বাঁয়াটির রক্ত-মাংস-হাড়! হয়তো পারবে! হয়তো পারতে হবে! পেটের কাছে হয়তো চরণকেও ঝুঁকতে হবে! রেবতীর রান্না করা ভাতে মিশে থাকবে জন্তুটির শরীরের পরোক্ষ অবদান। মরেও যে রেবতীর ক্ষুধা প্রশমন করবে। সাদা সাদা ভাতে সাদা সাদা হাড়ের ক্যালসিয়াম কখন কার্বোহাইড্রেট হয়ে যাবে সেটা হয়তো চরণ, রেবতী ভুলেই যাবে। ক্ষুধার তারণায় চরণ বলবে— ‘আর দু’হাতা ভাত দে তো...’
ক্ষুধা বড়ই সাংঘাতিক।
এই ক্ষুধা, পেটের আগুনে, গ্রীষ্মের আগুনে দাউদাউ
করে জ্বলতেই থাকবে। জ্বলতে থাকবে রেবতীর বাঁশপাতার উনুন।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি—
কবি ও কবিতা বিশ্লেষক। প্রাবন্ধিক। লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্র-সমীক্ষা ভিত্তিক গ্রন্থ রচয়িতা। নানা লোকসেবামূলক সংস্থার সদস্য।
.jpg)