শিলিগুড়ি থেকে গাড়ি করব। সঙ্গে আমার দুই ভাই। শেয়ারের গাড়িতে যাবনা আমরা। কেননা ওতে প্রাইভেসি থাকে না। যখন তখন থামব বললে থামা যায় না। পয়সা একটু কম লাগে বটে, তবে গাদাগাদি করে খোয়ারের জন্তুর মতো যেতে হয়।
রিজার্ভ গাড়িই করব আমরা। কিন্তু একটু সেয়ানাগিরি
দেখাতেই হয়। একজন ড্রাইভার বলল তিনজনে গেলে একটা ওয়াগেনার দেবো। চার হাজার লাগবে। আমরা শুরু করলাম আড়াই হাজার
থেকে। শেষ অবধি সে সাড়ে তিনের নিচে নামেই না। একটা সিগারেট টানতে টানতে
অর্পণকে বললাম— ‘ওর সাথে বেশি কথা বলিস না।’ বিক্রম ভাই বলল— ‘দাঁড়াও না ওরা ওতেই যাবে।’ ড্রাইভার আর এক-দুবার জানাল— ‘সারে তিনে যাবে কি?’ আমি তিনজনের দলের লিডার। সটান জানালাম— ‘তুমি যাও তো! ওরম বহু পাওয়া যাবে।’ ড্রাইভার, দাদাল, ট্রাভেল এজেন্সির প্রত্যেকে
ঝানু মাল। নিজেদের ভাঁড়ারে পাঁচ সাতশো তুলে রেখেই কথা বলে। পারলে ওই এজেন্সি শিলিগুড়ি
থেকেই আপনার হোটেল, আপনার ট্যুর প্যাকেজ সব করে দেবে। কানটা মুলে টাকাটাও নিয়ে
নেবে। আমরা ওসব চক্করকে পাশ কাটিয়ে, শুধু একটা পারসোলান কার
করতে চাই।
জায়গাটা থেকে সরে এসে, দূরে একজায়গায় ব্যাগপত্র
রেখে,
লোকাল
ছেলের মতো ঘুরতে লাগলাম আমরা। যেন কোনও দিকেই আমরা তাকাচ্ছি না। এলাকাটা যেন আমাদের নখদর্পণে। এরকম ভান করে আমরা ঘুড়ে বেড়াচ্ছি। দূরে বিক্রম একটা দোকানে
বসে ব্যাগ আগলাচ্ছে। হঠাৎ একটা নেপালি ড্রাইভারকে দেখে
অর্পণ কথাটা ছুড়ল— ‘ইয়ে ড্রাইভার লোগ পাবলিক কো মুরগি বানাতা হে।
মু
মাংগি রকম্ বোল দেতা হে।’ কথাটা রীতিমতো ড্রাইভারের
গায়ে লাগল। সে আধো হিন্দিতে বলল— ‘ইঁহা পেট চালানে কে লিয়ে
মু চালানা পড়তা হ্যায়।’ প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলাম আমরা। কথাতে কাজ হয়েছে। একে পাকড়াও করলেই যাবার
আসল ভাড়াটা জানা যাবে। লোকাল ছেলের মতো আমি বললাম— ‘দেখো না ওরা বাইরের লোকদের
কেমন আনসান ভাড়া বলছে। আমার সামনে একজনকে গ্যাংটক
যাবার জন্য সারে তিন হাজার বলে বসল।’ ফর্সা মুখের নেপালি একটু
মুচকি হাসে— ‘আরে! ও তো থোরা যাদা বোলনা পড়তা হ্যায়।’ ‘তুমি হলে কত নিতে?’— কথাটা লহমায় বলে ফেললাম। ফিটফাট পোশাকের ড্রাইভারটি জানাল— ‘তিন হোতা তো হাম চলে যাতে।’ সটান জানালাম— ‘যাবে?’ সে বেচারা অবাক। রাস্তায় যেতে যেতে আমাদের কথার সঙ্গ দিতে গিয়ে ও যেন
একটু বেকায়দায় পড়ে গেল। কিন্তু যখন বলেই ফেলেছে, তখন আর না বলে কি করে? ‘কিদার
যাওগে?’
সোজা
বাংলায় বললাম— ‘গ্যাংটক, কিন্তু যেতে যেতে দাঁড়াতে হবে। ভিউ পেলে ছবি তুলতে দিতে
হবে।’ বাথরুমের ব্যাপারটা ওরা কনসিডার
করে।
তিনে কথা পাকা হলো। সামনে অর্পণ, পিছনের সিটে আমি আর বিক্রম। চিড়িঙ, মানে আমাদের ড্রাইভারকে
তাহলে আমরা একটু বোকা বানাতে পেরেছি। একটু আনন্দও হচ্ছে। গাড়ি চলেছে সেবক রোড ধরে। দু’দিকে সবুজের খেলা ততক্ষণে
উপভোগ করতে শুরু করেছি। চিড়িঙ জুড়ে দিল নেপালি গান। যেতে যেতে যেখানেই মনে হচ্ছে
আমরা বলছি— ‘চিড়িঙ ভাই রুকো।’ নামছি, ছবি তুলছি, আমাদের কোনও তাড়া নেই। গাড়িটাও কিনে ফেলেছি মনে
হচ্ছে। আর ওই ড্রাইভারকে? মনে হয় ওকে আমরা যা বলব, ওকে তাই শুনতে হবে। মাঝে এক-দু কাপ চা, বারবাড়ন্ত হলে লাঞ্চটা ওকে
করাব আমরা। তাতে ওর বলার আর কিছু থাকবে না। আমরা যা বলব তখন ওকে তাই
শুনতে হবে।
গাড়ি চলেছে তিস্তার খাদ বরাবর। পিচ রাস্তার বাঁক ধরে ধরে। টুকটাক চিপস, বাদাম ভাজা চলছে। চিড়িঙ সিগারেট ছাড়া আমাদের
কাছে আর কিছুই খাচ্ছে না। না থাকতে পেরে অর্পণ ভাই মুখ খুলল— ‘কেয়া চিড়িঙ ভাইয়া? থোরা কুছ লি জিয়ে না?’ চিড়িঙ শুধু মিচকি হাসে, মুখে কিছুই বলে না। স্টেয়ারিঙকে ডাঁয়ে বাঁয়ে
ঘুরিয়ে শুধু এগিয়ে চলে। শিরশির করে শব্দ উঠছে দুধারে। সবুজের স্পর্শ চোখ জুড়িয়ে
দিচ্ছে। আস্তে আস্তে শীত অনুভব করছি। কিছুদূর আস্তেই আমরা বেশ
কয়েকবার দাঁড়িয়েছি। যেতে যেতে চিড়িঙকে নানা প্রশ্ন করেছি। সে কোনওরূপ বিরক্তি না দেখিয়ে অনর্গল
উত্তর দিয়ে গেছে। অপরিচিত, কয়েক ঘন্টা পর যে অন্য কাউকে
সঙ্গ দেবে, প্রতিদিন তার পরিচিতির লোকজন বদলাতে থাকবে। নিত্যনতুন লোকের সঙ্গে তার
পরিচয় ঘটবে পথে। পথেই শেষ হবে সে পরিচয়। তাই এতবার উত্তর দেওয়ার
কোনও প্রয়োজন তার থাকার কথা নয়। তবু পাহাড়ি মানুষগুলো যে
সময়টুকু কাছে থাকে, মনে হয় নিজেদের লোক। মনে হয় একে দিয়ে বাড়তি দু’চারটে স্পট দেখে নেওয়া যায়। ওদের একটু পটালেই হয়। কিন্তু এসবের দরকার হয় না। ওরা এমনিতেই যেতে যেতে অনেকবার
দাঁড়ায়।
তিস্তার একটা চরে কয়েকটি টেন্ট দেখে বিক্রম লাফিয়ে
উঠল— ‘দাঁড়াও চিড়িঙ ভাইয়া, এখঠো ফোটো লেঙ্গে।’ ড্রাইভার সাহেব মোলায়েম
একটা হাসি দিল। আরে— ‘ইঁহা তো হর জাগহা ফোটো হ্যায়।
ওকে
ওকে,
রুকো
রুকো।’ আমরা নামলাম। ঝারা পনেরো মিনিট একপ্রকার
অদেগলার মতো সময় কাটালাম। একে অপরের মুখে মুখ গুঁজে চলতে থাকল
সেলফি। নদীর চরের টেন্টগুলো যেন
ছাইরঙের ইগলুর মতো দাঁড়িয়ে আছে। পাশে বয়ে যাচ্ছে তিস্তা। চরে বসে তিস্তায় পা চুবিয়ে
বসে আছে ক’জন। চিড়িঙ-এর তবুও তাড়া নেই। সে ফুসফাস করে টেনেই যাচ্ছে। আমি ভাবছি, ‘আচ্ছা লোক তো, ওর কি তাড়া নেই।
ও কি
সত্যি একটু বোকা। কি জানি?’ যাই হোক এরম করতে করতে দুপুরের
লাঞ্চটা চিড়িঙ নিজের টাকায় করল। ঘুরিয়ে আমাকে দু-তিনটে সিগারেট
খাইয়ে গ্যাংটক পৌঁছে দিল। ওকে বোকা বানানোর জন্য আমাদের বিশেষ কষ্ট করতে হয় নি। বারবার দাঁড়ানোর জন্য বিশেষ
অনুরোধও করতে হয় নি। বিশাল অঙ্কের তিন হাজার টাকা দিয়ে
আমরা ওকে কিনে নিয়েছিলাম যে!
পরের দিন গ্যাংটকের দশটি জায়গা ঘুড়ে আমরা চিড়িঙকে বিদায় দিলাম। বিনিময়ে দুই হাজার। রাতে হোটেলে ফিরে এসে আমরা
নিজেদের মতো আনন্দ করছি। হোটেলের জানলার সামনে রাতের গ্যাংটক
দেখছি। অজস্র জোনাকির ঝাঁক যেন এই শহর। পাহাড়ের কালো কোলে হাজার
হাজার টিমটিমে আলো জ্বলে আছে। যেন কোনও অয়েল পেন্ট এটা। যত দেখা যায় ততই নানা ছবি, নানা রূপ ফুটে ওঠে। ‘আফ্রিকা’ কবিতাটা বারবার মনে আসে। মনে এল ঠাকুমার আমলের লম্ফের
কথা। কি অপরূপ এই ছবি। কালো কালো পাহাড়ের কোলে
জ্বলছে অজস্ব লম্ফ-দীপ, চোখ ফেরানো মুশকিল। রাতের ডিনার সেরে আবার কিছুক্ষণ
জানালায়। আওড়াতে থাকি— ‘এ নবমী নিশি তুমি না হইও
অবসান।’ অগত্যা দুই ভাইয়ের আবদারে লেপবন্দি হতে না হতেই সকাল।
সকালে উঠেই আমরা টের পেলাম লাচেন
লাচুং যেতে গেলে একদিন আগে টিকিট করতে হয়। নানা ট্রাভেল এজেন্সিকে
ফোন করেও কিছু হল না। আজকের দিনটা তাহলে এখানেই থাকতে
হবে। প্যাজেকে রাজি হলে ওরা আগামী কাল দু’দিনের ট্যুরে নিয়ে যাবে। তিনজনের বারো হাজার। কিন্তু মন আমার মানছিল না। কালকে কি হবে, সেসব না ভেবে পায়ে হেঁটে
শহরটাকে দেখা উচিত। জ্যাকেটটা গায়ে নিয়ে তিন ভাইয়ে বেরিয়ে
পড়লাম। এম. জি. মার্গ, দেওরালি, বৌদ্ধ মঠ দেখতে লাগালাম
হাঁটাপথে। না হাঁটলে কোনও শহরকে সঠিকভাবে জানা যায়
না। ওদের চলন-বলন বোঝা যায় না। ওদের জীবনছন্দ হাঁটতে হাঁটতেই
লক্ষ্য করতে হবে। কত পরিশ্রমী ওরা! কত
পরিচ্ছন্ন ওরা! শহরটাকে ওরা সৌহার্দ্য ও সোহাগে
আনন্দময় করে রেখেছে। প্রত্যেকের মুখে একগাল হাসি। প্রশাসনের প্রতি অগাধ ভরসা
ওদের। দাঁড়াবার জায়গা থেকে আবর্জনা ফেলার জায়গাটা পর্যন্ত পরিপাটি
করে গোছানো। বিক্রমের কথাই— ‘স্বচ্ছ ভারতের উদাহরণ গ্যাংটক।’ অর্পণ বলেছে— ‘এ যেন পরীর দেশ, কত্ত সুন্দরী মেয়ে গো দাদা।’ আমার কথায়— ‘পাহাড়ের মনকে ওরা জয় করতে
পেরেছে। ওদের চলার ছন্দে আছে জীবনের গান।’ কিন্তু বাঙালিসুলভ স্বভাবে
আমরা যেখানে সেখানে থুথু ফেললাম। বিনা টিকিটে ফ্লাওয়ার গার্ডেনটা
দেখে নিলাম। যে দোকানের মেয়েটিকে চোখে ধরল, সেখানেই লোলুপ দৃষ্টি চালালাম। আড়চোখে দেখলাম মদের দোকানের
রঙিন বোটলগুলো। এখানে লিকারের দাম অনেকটা কম। দরদাম করেও শেষে কুড়ি টাকা
কম দিয়ে কয়েকটি বৌদ্ধ মূর্তি কিনলাম। আমরা বাঙালি, আমরা বুদ্ধিমান। আমাদের যেন কেও না ঠকায়, এটা আমরা ঘুমের ঘোরেও ভেবে
থাকি। ভাবি ঠকে গেলে জীবনের ষোল আনা বৃথা। ঠকানোতে জীবনের জয়। কিন্তু আসার পথে চিড়িঙ আমাদের
পয়সায় লাঞ্চ না করে, আমাদের আগে থেকেই ঠকিয়ে রেখেছে, সে কথা বেমালুম ভুলে গেলাম।
ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা নামল। মোড়ে মোড়ে জ্বলে উঠল আলো। বৌদ্ধ মঠের ধ্বনি লাগল কানে। হর্ণহীন গাড়িগুলোর গতি আমাকে
করে তুলল চঞ্চল। রোল-নুডলের দোকানগুলোতে মানুষের
মেলা। ঝলমলে কাপ-মূর্তি-খেলনার দোকান। ভেসে আসছে স্থানীয় ভাষা
না জানা গানের সুর। গ্যাংটক রাণী আমাকে আষ্টেপৃষ্টে
বাঁধছে। উচ্চারণ করতে ইচ্ছে করছে— ‘আহা কি দেখিলাম, জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না।’ অর্পণ ও বিক্রম, ওরা নিজেদের মতো মানুষের
চলাচল উপভোগ করছে। সুন্দরী মেয়েগুলোর লাউডগার মতো শরীর, তামাটে গায়ের রঙ, গোলমুখের হাসি, পানসি নৌকার মতো চলন, পনিটেল চুলগুলোর ডিগবাজি— ওদের চোখ-মনকে ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। এম. জি. মার্গের মাঝ বরাবর লাগানো নানা ফুল, আলোর বাহার, কালো ইঁটের উপর গতিমান জনগণ
আমাকে করে তুলছে ভাবুক। কতো বিপরীত এদের জীবন চলাচল! কতো নিবিড়তা এদের মন-প্রকৃতিতে!কতো শিষ্টাচার এদের আদর-আহ্বানে!
রাত্রি ন’টায় হোটেল ফিরলাম। বেমালুম ভুলে ছিলাম আগামী
দিনের প্যাকেজের কথা। ট্রাভেল এজেন্সিদের এত রাতে ফোন
করেও লাভ হল না। ওরা আটটার মধ্যে ওসব দোকান বন্ধ
করেছে। এ-রাজ্যে আমাদের কেউ চেনে না। কেউ নেই যাকে বলতে পারি— ‘ভাই? কাল একটু কালা পাথরের বরফ
দেখিয়ে নিয়ে এসো না?’ এখানে সব হিসাব কষে চলে। পয়সা দাও, পরিষেবা নাও। উপায়ন্তর না দেখে, চিড়িঙকে ফোন লাগানো হলো—
‘হ্যালো চিড়িঙ ভাইয়া? হাম ওহ তিন লেরকা যো কাল আপকে সাথ গ্যাংটক ঘুমে থে।’ এভাবে হিন্দি ভাষাকে তছনচ
করে আমরা কথা বলতে লাগলাম। ওদিক থেকে আওয়াজ এল— ‘হাঁ হাঁ বলিয়ে? ক্যাইসে হো?’
আশ্চর্য!পয়সার বিনিময়ে দু’দিনের পরিচয়,আর এখন বলছে কিনা কেমন আছো?আমরা
হলে তো প্রথমেই বলতাম—‘মতলবটা কি? বা কাজের কথাটা আগে বলুন?’কিন্তু চিড়িঙ বলল— ‘আপ লোগো নে খানা খায়া?’ হিন্দির হট্টগোল লাগিয়ে
অর্পণ বলল— ‘হুঁ হুঁ, আপ?’
‘আভি তো নেহি। চায়ে পি রাহা হু।’
‘তো চিড়িঙ ভাইয়া এখঠো কাম থা।’
‘বোলিয়ে’
‘কাল হাম লোগো কো প্যাকেজ মে জানা
হে। কুছু হেল্প করো না?’
‘কিধার জানা হে?’
‘ও গুরুদংমার,কালা পাথর’
‘ও তো প্যাকেজ মে জানা পরেগা। হামারা গাড়ি উধার নেহি জাতা
হ্যায়।’
এরকম করে বাংলা হিন্দির ঘটকালি করে
শেষ অবধি চিড়িঙ আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। কাল সকালে বেরোব। বিনিময়ে বারো হাজার।
চিড়িঙ-এর বলে দেওয়া রিতেশ ভাইয়ের
এজেন্সির ড্রাইভার, আমাদের নিয়ে চলল আরও উপরের দিকে। মিলিটারি ক্যাম্পের ১৫০০০
ক্যাফে পেরিয়ে আমরা যাব আরও উপরে। ১৭৮০০ ফুট উঁচুতে। গুরুদংমায়। আমরা গেলাম। যা দেখলাম তা অভূতপূর্ব। অবর্ণনীয় প্রকৃতির ছটা ওখানে। রাতে ফিরলাম লাচেন গ্রামে। বর্ষার কারণে এ-কদিন বৃষ্টি হয়েই চলেছে
এ-অঞ্চলে। একটা জ্যাকেটে ভিজে ভিজে সার হচ্ছি আমরা। নিজেদের মোজার গন্ধ নিজেরাই
নিতে পারছি না। স্নান সেই প্রথম গ্যাংটকে পৌঁছানোর
দিন থেকে বন্ধ। ওদিকে রাস্তায় নামল ধ্বস। সিকিম সরকার সব পর্যটকদের
হোটেল ছাড়তে বিজ্ঞপ্তি জারি করল। এবারে আমরা বেশ ভয় পেলাম। নেটওয়ার্ক ও ফোন-পে অচল থাকায় আমরা হলাম
ঠুঁটো জগন্নাথ। যে বাড়তি টাকা ছিল তাও প্রায় শেষ। লাচেনে এ.টি.এম নেই। নিরুপায় হয়ে আবার চিড়িঙকে
ফোন, হোটেল মালিকের ফোন থেকে। ও এক কথায় আমাদের চিনতে
পেরেছে। দ্বিতীয় বাক্যে বলে দিয়েছে—‘ডরিয়ে মত। মে হুঁ না।’ একটু ভরসা পেলাম। কিন্তু বিক্রমের মনে সন্দেহ
আর যায় না। সে বলে— ‘ও কথার কথা বলছে দাদা। যদি কিছু হয় তাহলে আমাদের
দুর্গতির শেষ থাকবে না।’ কিন্তু আমাদের করারও কিছু নেই। এজেন্সির লোককে ভরসা করতেই
হবে,
নয়তো
চিড়িঙকে। অতিরিক্ত কিছু খেতে গেলেও আমরা এখন ভাবছি। একটা সিগারেট দু’বারে খাচ্ছি। পাঁউরুটিগুলো বাঁচিয়ে রেখেছি। এককাপ চায়ে তিনজন চালিয়ে
নিচ্ছি। মনে পড়ছে ২০০০ সালে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের অঞ্চলের বন্যার কথা। কত মানুষ ভেসে গেছিল। কত মানুষ ভেজা চাল খেয়ে, ঘরের চালের উপর জীবন বাঁচিয়েছিল। গবাদিগুলোকে তারা ভাসিয়ে
দিতে বাধ্য হয়েছিল।
এখানে বৃষ্টি থামছেই না। রিতেশের ড্রাইভার পরের দিন
সকালে গায়ের জোরে গাড়ি বার করল। কিছু দূর গিয়েই দেখলাম পর্বতরাজ
টুকরো টুকরো হয়ে রাস্তা অবরোধ করে দাঁড়িয়ে আছেন। মিলিটারি সেনা আমাদের দেখে বলে— ‘আপলোগ কিউ আতে হে, ইস্ বক্ত?’ আমরা উত্তর দিতে পারিনি। বুদ্ধিমান বাঙালি হয়েও হতে
হয়েছে নির্বাক। কয়েক ঘন্টা পর ভারতীয় সেনার তৎপরতায়
ধ্বসের পাথরগুলো সরানো হল। আমাদের ড্রাইভার বলতে থাকল— ‘ডরকে
আগে জিৎ হে।’ তখন না ভাল লাগছে গাছ। না পাহাড়, ঝড়না। না মেঘ। শুধু মনে হচ্ছে এ-রাক্ষস পাহাড়ে কেনই বা এলাম? কেনই বা এত প্রকৃতিপ্রেমী হওয়া? ইউটিউব
চালিয়ে দেখে নিলেই হয়। চোখের পাতা থেকে পিছনের ছিদ্র তখন
দিপিক দিপিক করছে। একটু এগোতেই আরও বীভৎস ব্যাপার। ড্রাইভার বলল— ‘ডরিয়ে মত। গানা শুনিয়ে।’ আমি না থাকতে পেরে বললাম— ‘নিকুচি করেছে তোর গানাকে, এতে আসার কি দরকার ছিল।’ ড্রাইভার একটু মিচকি হেঁসে বলল— ‘বাঙ্গাল কা ডরপোক
আদমি।’ কথাটা গায়ে লাগল না। কেননা তখন শুধু মৃত্যুভয়
তাড়া করছে। নীচের যে খাদগুলো আসার দিন সীমাহীন রহস্য উন্মোচনের স্বর্গদ্বার
বলে মনে হয়েছিল, তাকে এখন নরক বলে মনে হচ্ছে। হাজার ফুট নীচ থেকে সে যেন
আমাদের উপর প্রয়োগ করছে মাধ্যাকর্ষণ বল। ‘মা’বলে ডাকারও সময় পাব না, যদি একবার গাড়ি স্লিপ করে। মনে হল অ্যাডভেঞ্চার! ওসব বোকারাই করে। বাড়িতে বসে বসে পাতা পাতা
গল্প লেখা এর থেকে ঢের সহজ। সামনের রাস্তাটা আর নেই। ওদিকের রাস্তা পুরোটা বিচ্ছিন্ন। ঝর্ণার প্রচণ্ড প্রহারে
গোটা রাস্তাটা মাঝ বরাবর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কয়েকজন সৈনিক ওখানে দাঁড়িয়ে। একটা বুলডোজারও। দূর থেকে দেখেই গা শিউরে
উঠল। মনে মনে আওড়াতে থাকলাম— ‘এ কি রূপ তেমার! কি ভয়ানক তুমি? হে প্রলয়ঙ্কর থামাও তোমার
ডমরু।’ গ্যালন গ্যালন জল এসে রাস্তাটাকে বানিয়ে দিয়েছে ক্যানাল। রাস্তার ভাঙা জায়গাটা থেকে
জল ঝড়ছে ডুডুমার ডাকের মতো শব্দে। ঝাপটে ঝাপটে জলরাশি, রোশ দেখিয়ে নামছে নীচে, তড়িৎবলে। সাদা সাদা বুদ্বুদের স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ছে
চারদিকে। পাথরের বড় বড় মাথাগুলো বরুণের রোশকে নিচ্ছে মাথায়। তবুও সলিল প্লাবতাকে কিছুতেই
বাগে আনা যাচ্ছে না। এটাই প্রকৃতি। যেখানে বুদ্ধিমান মানুষকেও
হার মানতে হয়। এসব তাণ্ডব দেখে আমার দুই ভাই, অর্পণ ও বিক্রম অনেক আগেই বকমবকম
থামিয়েছে। সিভিল নিয়ে বি.টেক. ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে ওরা। তবুও বুঝতে পারছে না, এখানের রোড ম্যানেজমেন্ট
কিভাবে করা দরকার। কিভাবে ওয়াটার সাপ্লাই-এর কাছে আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিং
আজও হার মানে। কিভাবে ধ্বস রোধ করা যায়। ইঞ্জিনিয়ারিং এর কোন সূত্র
প্রকৃতিকে শান্ত করতে পারে!
সেদিন আমাদের আর এগোনো হলো না। এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা নিয়ে
সেই হোটেলেই ফিরলাম আমরা। বেশিদিন থাকতে হলে লাঞ্চ ও ডিনারের
জন্য অতিরিক্ত টাকা নেবে নাকি কে জানে? ওখানেই হয়তো আরও দুটো দিন থাকতে
হবে। রুমের জানলা খুলে পাহাড়ের ভিউ আর ভাল লাগছে না। গাছগুলোকে মনে হচ্ছে এই
তাড়া করল বুঝি। উপরের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে পাহাড়
যদি ভেঙে পড়ে। যদি হোটেল সমেত এক ধ্বসে আমরা তলিয়ে
যায় তিস্তার তলে? মেঘ দেখে মনে হচ্ছে ওরা বিপদের বাঁশি বাজাচ্ছে। বৃষ্টির কণায় কণায় মৃত্যুর
গঙ্গাজল ধরা। দূরে ওই পাহাড়ের কোলে বাড়িগুলো কি কবর? ধর্মীয় পতাকাগুলোতে শেষ
সময়ের বাণী স্পষ্ট হয়ে উঠছে যেন! ঝর্ণা দেখে মনে হচ্ছে ওরা
সাদা অজগরের মতো আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। রাতে ঘুম হলো না। অনেক রাত্রে, প্রায় বারোটার সময় বিক্রম
চিড়িঙকে একটা ফোন লাগাল। এই দূর দেশে ওই আমাদের একমাত্র ভরসা।
‘চিড়িঙ ভাইয়া শো গ্যায়া কিয়া?’
‘কন?’
‘হাম লোগ ও তিন বান্দা, রিতেশ ভাইয়া কো....’
‘হাঁ হাঁ বোলিয়ে বোলিয়ে?’
যাক চিড়িঙ আমাদের চিনেছে। ওরা নিশ্চয় শেষ সময়ে সরে
যাবে না। যদি কিছু দরকার হয়, পাওয়া যাবে।
‘ইধর তো স্লাইড হো গ্যায়া। জরুরত পরে তো আপকো ইয়াদ
করেঙ্গে’
কি জানি চিড়িঙকে ইয়াদ করার আগে ভগবান
আমাদের ইয়াদ করবেন কিনা! বাড়িতে মা-বাবার মুখটা কি শেষ বারের
মতো দেখে এসেছিলাম? ভাইপো চিঙ্কু ও পুট্টুকে কী আর আদর করতে পরবো না? পি.এইচডি-র থিসিসটা জমা দিয়েও হয়তো
ডিগ্রিটা আর আমার পাওয়া হলো না! মিস করছি শেষ খাওয়া মায়ের
হাতে কাঠের জ্বালে মাংস ভাত আর তেঁতুলের টক। বৌদির হাতের চা’কে। বেরোনোর সময় দাদুর বাড়নটাও
শুনলাম না— ‘না, ওদিকে এখন বর্ষা, যাওয়ার কোনও দরকার নেই।’
ওদিকে লাউড স্পিকারে চিড়িঙ বলল— ‘কাল আগর রাস্তা নেহি খুলা, তো সুভা ফোন করনা।’ হোটেল মালিকের ফোনটা ছিল
বলে তাও যোগাযোগটা হল। ভদ্রলোক বিশেষ কিছু বললেন না, ফোন ব্যবহার নিয়ে। তখন পাহাড়ে নিশুতি রাত।
পরদিন সকাল হলো। ভাই দুটো এই দু’দিনে গান ভুলে গেল। লেপচা মেয়েগুলোর কথা আর
একবারও ওরা বলছে না। জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছে না, কোনও বাঙালি বৌদি এ-তল্লাটে এসেছে কিনা। পাশের রুমের ওড়িয়া মেয়েটিকে
দেখেও ওরা কথা বলছে না। ঝাড়গ্রামের যে কাকু-কাকিমা আমাদের প্যাকেজের
শেয়ার গাড়িতে ছিলেন, উনারাও গুম মেরেছেন। প্রত্যেকে নিজের রুমে বন্দি
হয়ে আছে। শুধু ডাইনিঙে দেখা হচ্ছে। ওয়েদার ফোরকাস্ট তিনদিনের
জন্য থান্ডারস্ট্রম শো করছে। কীর্তিবাজ বাঙালিরা এখন ঘায়েল। বড় বড় বাতেলা আর বচসা দিয়ে
চায়ে চুমুক দেওয়া ভুলে গেছে। অন্য প্যাকেজে আসা বড় বড় সাহেবদের
বড় বড় পদও উনাদের হয়তো বাঁচাতে পারবে না এখানে। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাগুলো উনারা নিজের হাতে তুলতে পারবেন না হয়তো। বাড়িতে রেখে আসা শ্বাশুড়িদের
সঙ্গে বৌদিরা আর ঝগড়া করতে পারবে না। আমার মতো নায়কের, নায়িকা সন্ধান অধরাই থেকে
যাবে!
সুতরাং বাঁচার শেষ চেষ্টাটা করতেই
হবে। মরার আগে বাঁচার শেষ প্রয়াস। এখানের পাহাড়ে থাকা চিড়িঙ-এর এক বন্ধুকে প্রায় পায়ে
ধরলাম। চিড়িঙ শেষ উপায় হিসাবে ওর নম্বর দিয়েছিল আমাদের। ওর ছোট গাড়িতে করে পাহাড়ে
ঘুরপথে একটা গ্রাম্য পথ দিয়ে নিচে নামা যাবে। বড় গাড়ি ওরাস্তা দিয়ে যাওয়ার
প্রশ্ন নেই। সুতরাং প্যাকেজের বাকি লোকদের না বলে আমরা চিড়িঙ-এর বন্ধুকে অতিরিক্ত পয়সার
লোভ দেখালাম। হোটেল মালিককে বললাম গোপনীয়তা বজায়
রাখতে। অতিরিক্ত একদিন থাকা-খাওয়ার জন্য উনি পয়সাও নিলেন না। ওই বন্ধুর গাড়িতে অমরা একটু
আড়ালে গিয়ে উঠে বসলাম। প্রায় কথা না বলেই আমরা এলাম গোটা
রাস্তাটা। একটা সিগারেটও খেলাম না, চাও না। ফিরলে বাঁচি। প্রায় ছ'ঘণ্টা গাড়ি চালাচ্ছে
ড্রাইভারটা। এখানে স্টিয়ারিং কাটা বেশ কষ্টের। গ্রামের পথ সংকীর্ণ। পাহাড়ি গ্রামের অদ্ভুত, আদিম ও সতেজ রূপকে দেখতেও
ইচ্ছে করছে না আর। গোলাপী বেগুনি রঙের ফুল, বড় বড় বাঁশ গাছ, ঝাউ, কাঠের কুটিরগুলো তখনও ভিজছে। এ কালা বর্ষা শেষ হবে কবে! কোথায় কখন ধ্বস নামবে, তার ঠিক নেই। কোথায় কখন ঝর্ণার উৎপত্তি
হবে,
সেটাও
এরা জানে না। তবুও এই পাহাড়ের মানুষগুলো এখানে
থাকবে। ওদের থাকতে হবে। আমরা পালিয়ে আসব। আমাদের পালাতে হবে, আমরা বাঙালি। অবশেষে গাড়ি গ্যাংটক পৌঁছাল। অর্পণ ভাই বলে উঠল — ‘জয় মা তারা’। আমি পরপর দু’টো সিগারেট জ্বালিয়ে চা’য়ে চুমুক দিলাম। বন্ধু ড্রাইভার অতিরিক্ত
পয়সাও নেয়নি। চিড়িঙ-এর সঙ্গে ওর কি কথা হয়েছিল
আমরা জানি না।
সেদিনই আমরা শেয়ার গাড়িতে গ্যাংটক
থেকে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। বারোশো টাকায়,বেশ সস্তায় আমরা যখন শিলিগুড়ি
পৌঁছালাম তখন রাত অনেক। এতক্ষণ চিড়িঙ-এর কথা আমাদের মনেই ছিল
না। মনে পড়ল সমতলে পা ফেলে। ‘আত্মানং সততং রক্ষেৎ ধনৈরপি দারৈরপি'
বা বাঙালিরা সহজ করে বলবে ’চাচা আপন প্রাণ বাঁচা।’
জলপাইগুড়ির
সমতল স্টেশন থেকে চিড়িঙকে ফোন লাগালাম। আমাদের ফোন এখন সচল—
‘ভাইয়া হাম লোগ পোঁহছ গ্যায়ে।’
এত রাতেও ও আমাদের গলা বুঝতে পারল। অবাক তো!
‘কিধার?’
‘শিলিগুড়ি’
........
ফোনটা ডেড হয়ে গেল। চিড়িঙ কি বলত কে জানে? চিড়িঙ কি ভাবল কে জানে? হয়তো বারোশা টাকাতে ও নিজেই আমাদের পৌঁছে দিত। আমরা যখন গ্যাংটকে এসে একটু
নিরাপদ হয়েছিলাম তখন আর চিড়িঙ-এর কথা মনে পড়ে নি। আরও নিরাপদ হওয়ার তাড়া ছিল
বোধহয়!
যেমন
মনে পড়েনি কাকু-কাকিমা বা বালেশ্বরের ওড়িয়া মেয়েটির কথা। চিড়িঙকে পরের ফোনটা কে করবে? পাহাড় সমতলের দূরত্ব কি
থেকেই যাবে?
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি—
কবি ও কবিতা বিশ্লেষক। প্রাবন্ধিক। লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্র-সমীক্ষা ভিত্তিক গ্রন্থ রচয়িতা। নানা লোকসেবামূলক সংস্থার সদস্য।
.jpg)