Advt

Advt

hayto-mukhomukhi-story-galpo-by-bimal-gangopadhaya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-হয়ত-মুখোমুখি-গল্প-বিমল-গঙ্গোপাধ্যায়

 

hayto-mukhomukhi-story-galpo-by-bimal-gangopadhaya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-হয়ত-মুখোমুখি-গল্প-বিমল-গঙ্গোপাধ্যায়

বেল বাজানোর অনেকক্ষণ পরে দরজা খুলল দীপা।

অবাক গলায় বলল, শেখরদা আপনি?

এই ভুলটা দীপা প্রায়ই করে। আমার নাম মিহির। শেখর নয়। কে জানে, শেখর, দীপার কোন পুরনো প্রেমিকের নাম কিনা। অন্যবারের মতো দীপার ভুল ভাঙ্গাতে ইচ্ছে হল না।

আমার নাম মিহির না হয়ে, শেখর, সোমনাথ হলেই বা কি এমন ক্ষতি। রামকিংকর, রবিশংকর বা সত্যজিৎ, এইসব নামের সঙ্গে মিশিয়ে না ফেললেই হল।

বললাম, রজত বাড়ি ফিরেছে?

- আজ ওর আসতে দেরী হবে। দীপা বলল,অফিসে মিটিং আছে।

আমি '' বলে ঘুরে দাঁড়ালাম।

-  কিছু বলতে হবে?

ঘাড় নাড়লাম,না। এমনিই এসেছিলাম।

-  শনিবার আসুন। কিম্বা রোববার সকালে।

- দেখি। সাইকেলে চড়ে বসলাম।

মোড়ের মাথায় সাইকেলের গতি কমিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকালাম। দরজা বন্ধ। দাঁড়িয়ে থাকা দূরের কথা। কোনরকম শব্দ না করেই, সাবধানে দীপা দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। আমার মন খারাপ হয়ে গেল।

বন্ধুদের মধ্যে এখনও অব্ধি আমি-ই জেনুইন বেকার। চাকরি পাইনি। ছোটখাটো ব্যবসার চেষ্টা করেছিলাম,পারিনি।

শুনেছি অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী,প্রথম জীবনে কেউ ফেরি করেছে। কেউ ছোট ঘুপচি ঘরে কুঁজো হয়ে বসে খাতা লিখেছে দিনের পর দিন। দু'একজন আবার নাকি পেটি কেরিয়ার হিসাবে জীবন শুরু করেছে। সবই যে মিথ্যে বা অতিরঞ্জিত তা নয়। ব্যবসায় অনেক ঘোরপ্যাঁচ আছে। মিথ্যে আছে। চতুরতা আছে। আবার দূরদর্শিতা আছে। চ্যালেঞ্জ আছে। এ সবের কোনটির মোকাবিলার যোগ্যতা আমার নেই। স্পর্শকাতর মানুষদের জন্য ব্যবসা নয়। আমার তাই হল না।

তার জন্য আমার কোন আফসোসও নেই। নিজস্ব কিছু বাঁধা রোজগার থাকলে ভাল হয়। নিরাপত্তা থাকে। হুটহাট খরচ করার স্বাধীনতা থাকে। এটুকু অগ্রাহ্য করতে পারলে,কোন অসুবিধা নেই।

আমি দিব্যি আছি। সকাল-বিকাল টিউশন করি। পরিযায়ী পাখির মতো ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কখনও কম, কখনও বেশী। সংসারে আমার দুজন। মা আর আমি। মা সামান্য পেনসন পায়। ঠাকুরদার আমলের পুরনো বাড়িতে, মা ছেলের দিন কেটে যায়।

একটাই সমস্যা, তা হল, আমার অবসর সময়গুলোতে গল্প করার সঙ্গী পাই না। সেইজন্য সন্ধ্যার পরে এর ওর তার বাড়িতে হানা দিই। নিখাদ আড্ডা মারার লোভে।

যে সব বন্ধুদের বিয়ে হয়েছে, যেমন রজত, প্রশান্ত, তাদের স্ত্রীরা আড্ডায় যোগ দিলে, জীবনের ঘ্রাণ পাই।

রাতে বাড়ি ফিরে ঘরের কোণে রাখা ঢাকা দেওয়া খাবার একলা বসে খাই। তখন বন্ধুদের স্ত্রীদের মুখ মনে পড়ে যায়।

তখন আমার মা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে বিছানায়। নোনা-খসা দেওয়াল কম পাওয়ারের আলো শুষে নেয়। ঘরটাকে বড় দুঃখী দুঃখী দেখায়। এঁটো হাতে বসে থাকি চুপ করে। একাকীত্বে মানুষ কষ্ট পায়। হীনমন্যতায় আক্রান্ত হয়। অনেক সময় বিকৃত ভাবনাও মনে আসে।

আমার কিন্তু এ সবের কিছুই হয় না। এমনিই বসে থাকি। ভাবি আগামীকালের সন্ধ্যাটি যদি কোন জমাট আড্ডায় কেটে যায়! আমার চাকুরে সু-রোজগেরে কোন বন্ধু এবং তার স্ত্রী, আমার মতো চালচুলোহীনকে তাদের আড্ডার অংশীদার হতে দেয়! আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই।

নিখিলেশদা আমায় বুঝিয়েছিল, যে যেখানে যত সহজ স্বচ্ছন্দ, সে তত প্রিয়, ততটাই ভালবাসার।

হঠাৎ শুনলে কথাগুলো কেমন ভারি ভারি লাগে না! ঠাণ্ডা মাথায় একটু চিন্তা করলে মনে হয়, তাই তো,নিখিলেশদার অমন ঝাঁ চকচকে বাড়ি,কেতাদুরস্ত জীবনযাপন,সুন্দরী বউ,এ সবের মধ্যে আমার মতো কিছুই নেই, বাউণ্ডুলের কোনরকম অস্বস্তি বোধ হয় না। কেমন নিজের মতো করে হুটহাট বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ি।

জোরের সঙ্গে বলি,আগে চা খাব। তারপর কথা শুরু।

কখনও বৌদি বলে,চা খেতে হবে না। গরম পড়েছে। সরবত খাও।

কয়েকদিন না গেলে,বৌদি,নিখিলেশদার বিধবা দিদি অনুযোগ করে,আমাদের ভুলে গেছ নাকি?

যদি বলি,সময়ের অভাব।

পাল্টা ধমক খাই,সাফাই গাইতে হবে না।

তখন ভাল লাগার অনুভূতিতে আমার বুকের মধ্যে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায় সিরসির করে। জল এসে যায় চোখের কোণে। আমি এতটা প্রিয়! এত ভালোবাসা আমার জন্য!

ঝুল বারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে আমি বেশ কয়েকবার ডাকলাম, নিখিলেশদা? নিখিলেশদা?

দরজা খোলার শব্দ পাওয়া গেল খুট করে। নিখিলেশদার দিদির মেয়ে, শ্রাবন্তী বারান্দায় বেরিয়ে এলো, আপনি? কতক্ষণ এসেছেন?

বললাম, মিনিট তিন চার।

- ভেতরের ঘরে ছিলাম, শুনতে পাইনি। হর্ন বাজাননি বুঝি?

শ্রাবন্তী এই ভুলটা প্রায়ই করে। আমার গাড়ি নেই। হর্ন বাজানোর কোন প্রশ্নই ওঠে না।

আমার মনে হয়, মেয়েটি সদ্য কোন ছেলের প্রেমে পড়েছে, যার সুরেলা হর্ন লাগানো গাড়ি আছে। সেই হর্ন মোহন-বাঁশির মতো বিভিন্ন সংকেতে বাজে।

আমার হাসি পেল। কোনরকমে তা চেপে বললাম,

বাড়িতে কেউ নেই?

- কেউ মানে? শ্রাবন্তী চটপট জবাব দিল, এই তো আমি আছি। মা শুয়ে আছে।

- কি হল? শরীর খারাপ?

- না, না। এমনিই।

- মামা, মামী?

- নাইট শোয়ে সিনেমা গেছে।

বললাম, ও। তাহলে আর কি!

- কিছু বলতে হবে মামাকে?

-  না। এমনিই এসেছিলাম।

সাইকেল ঘুরিয়ে তখনও গেট অব্ধি পৌঁছইনি, বারান্দার আলো নিভে গেল পুট করে।

(দুই)

দীপা বা শ্রাবন্তী কাউকেই আমি আমার আসার কারণ বলিনি। দুজনেই কেমন নিঃস্পৃহ আচরণ করল। ব্যাপারটা যদি এমন হয়, রজত দীপা নিখিলেশদা বৌদি শ্রাবন্তী প্রত্যেকেই আমার উপস্থিতিতে ইদানীং অসহ্য বোধ করছে, হাঁপিয়ে উঠছে!

ফাঁকা হাসি, এলোমেলো কথার মুখোস আঁটতে নারাজ! আর তাই দীপা বলে, আসতে দেরী হবে।

শ্রাবন্তী বলে, নাইট শোয়ে সিনেমা গেছে।

সত্যি যদি এমন কিছু হয়!

ভাবনাটা আমার মন খারাপ করে দিল।

আপাতত কিছু দিন আমি কোন পরিচিতের বাড়ি যাব না। তারপরেও যদি কেউ আমার খোঁজ করে, পথেঘাটে দেখা হলে, দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে এসে কাঁধে হাত রেখে বলে, আর আস না কেন? সন্ধ্যেটা বড় ফাঁকা ফাঁকা লাগে।

তখন নিজেকেই নিজে ধমকাব। শুধরে নেব।

কিন্তু আজ এই সন্ধ্যেটা কিভাবে কাটাব?

সাইকেল ঘুরিয়ে লালটুর চায়ের দোকানে এলাম। উল্টোদিকে কৃষ্ণচূড়ার নীচে বাঁধানো ধাপিতে দীপক বাপি অরবিন্দ নীরেনদা। ওরা সবসময়েই কোন না কোন বিষয় নিয়ে গলা ফাটিয়ে তর্ক করছে। অরবিন্দ ডাকল, মিহিরদা, কি খবর?

আমি যে এখানে নিয়মিত আসি না, এলেও কোনরকম তর্কে অংশগ্রহণ করি না, এমনকি ধাপিতে বসি না অব্ধি, 'কি খবর?'-র মধ্যেই যেন তার যাবতীয় ইঙ্গিত।

পায়ে পায়ে এসে ওদের সামনে দাঁড়ালাম। ওরা চারজনই হঠাৎ চুপ করে গিয়ে চোখ সরু করে এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন আমি একজন দাগী আসামী বা ভিন গ্রহের মানুষ।

আকস্মিক নীরবতায় গোপন চ্যালেঞ্জ থাকে, চুপ করে থেকে কে কতক্ষণ উত্তেজনা ধরে রাখতে পারে। কোনরকম স্নায়ু চাপ সহ্য করা আমার ধাতে নেই। হেসে বললাম, সময়ের অভাবে অনেকদিন আসতে পারিনি।

- কি এমন রাজকার্য কর যে সময় পাও না?

- ধাপিতে বসলে জাত যাবে না।

- যার যেখানে ভাল লাগে। বলার কি আছে?

- বিপদে আমরাই আছি।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে এইসব শুনলাম। ওরা চারজন নিজের মতো করে আমাকে নিয়ে লোফালুফি খেলল খানিকক্ষণ। ভেতরে ভেতরে আমি যতই রেগে যাই না কেন, সরবে তা প্রকাশ করতে পারি না। ছোবল মারা দূরে থাক, ফোঁস অব্ধি করতে পারি না। তখন সবাই ভেবে নেয়, আমি শীতকালের সাপ। যেমন খুশি মাড়িয়ে যাওয়া যায়। আমি মনে মনে পালাই পালাই করি। কোনরকমে দূরে সরে যেতে পারলে তৃপ্তি পাই। পালিয়ে যাওয়া মানেই তো আর হেরে যাওয়া নয়। সংঘাত এড়িয়ে যাওয়া। অপছন্দের সঙ্গে, অরুচির সঙ্গে লড়াই না করার মধ্যে অগৌরবের কিছু নেই। বরং অগ্রাহ্য করার মধ্যেই আমি আমার প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পাই।

বললাম, চলি।

সত্যি কি এখন আমার কোথাও যাওয়ার আছে?

সুবীরের কথা মনে পড়ল। হয়ত অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছে। চায়ের কাপ হাতে টি.ভি. দেখতে দেখতে কেবলই ভাবছে, কখন কলিং বেল বেজে উঠবে, টুং টাং। টুং টাং।

সাইকেলের চাকার খসখস শব্দ শুনেই চিৎকার করে বলে উঠবে, মা, মিহির এসেছে। আর এক কাপ চা।

গল্পের তোড়ে হাসির তোড়ে বেখেয়ালি, দেওয়াল ঘড়ির দিকে চেয়ে চমকে উঠবো, ইস! দশটা বেজে গেছে!

সুবীর আমার হাত চেপে ধরবে, জলে পড়ে আছিস নাকি? তারপর আমার দিকে একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিয়ে আদেশের গলায় বলবে, এটা শেষ করে উঠবি।

কিন্তু যদি এর বিপরীত কিছু ঘটে যায়, আজই? যদি সুবীরের মা বলে, অফিস থেকে ফিরে ও বিশ্রাম নিচ্ছে। ডাকতে মানা করেছে।

বা সুবীর উদাসীন হেসে বলে, আমি তো এখনই বেরচ্ছি। বনানীদের বাড়ি যাব।

(তিন)

আজ সন্ধ্যায় কেউ আমার স্বপক্ষে নয়। আজ আমার কোন ইচ্ছাই পূর্ণ হবার নয়। এক একদিন হয় না, সময় হাতে নিয়ে বেরিয়েও ট্রেন ধরা যায় না। হাসিমুখে পোস্টম্যান যে খামটি এগিয়ে দেয়, তার মধ্যে ব্যর্থতার সংবাদ থাকে। কোন প্রিয়জন, 'এই শোন' বলে কাছে ডেকে কাঁধে হাত রেখে ইশারায় ঘাতককে দেখায়।

আলো, শব্দ, মানুষের ভিড়, এসবের থেকে একটু আড়ালে যেতে পারলে, ভাল লাগত। কোর্টের ধারে বিশাল মাঠ আছে। সেখানে চুপচাপ বসে থাকা যায় কিছুক্ষণ। রেল লাইনের পশ্চিম পাড়ে নির্জন রাস্তা আছে। অলস গতিতে সাইকেল চালাতে চালাতে সে রাস্তা ধরে যাওয়া যায় খানিকটা। সুরকী ঘাটের ভাঙ্গা সিঁড়িতে বসে, নদীর জলে চাঁদ তারা আকাশের ছবি দেখা যায়।

কত কি-ই করা যায়।

কেমন অবাক লাগতে লাগল। নির্জনে সঙ্গোপনে কিছুক্ষণ সময় কাটাবার এতরকম আয়োজন আমার চারপাশ জুড়ে।

 

কিন্তু আজ এই সন্ধ্যায় আমি এর কোনখানে যাই! এ যেন ভালর মধ্যে থেকে, ভালর ভাল বেছে নিতে হবে।

সুখানুভূতিতে এক ধরণের শ্রান্তি নিয়ে আসে। তখন মনে হয় ঝুম মেরে বসে, ভালবাসার জাবর কাটি। আমারও তাই হল। মনে হল বাড়ি যাই।

নিস্তব্ধ পুরনো বাড়ির প্রায়ান্ধকার ঘরে আমার অসুস্থ মা সন্ধ্যা থেকেই কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। আসবাববিহীন ঘরটার দরজায় খিল দেয় না মা। প্রতিদিন রাতে বাড়ি ফিরি যখন, মা জানতেও পারে না। আমি মায়ের মাথার কাছে মশারীর বাইরে দাঁড়িয়ে শ্বাস প্রশ্বাসের ক্ষীণ শব্দ শুনি। মায়ের গায়ে পিঠে হাত বুলিয়ে দিই।

ছোট একটি বাগান পেরিয়ে আমাদের ঘর। বাঁশের নড়বড়ে দরজাটা কে যেন খুলে পাশে সরিয়ে রেখেছে। ঘরের দরজাটাও খোলা। হয় কেউ এসেছে।

কিন্তু কে সে? কেউ তো আসে না আমার মায়ের কাছে।

সন্তর্পণে বাগান পার হয়ে, ঘরের ভিতরপানে তাকালাম। প্রতিদিনের মতোই মা একপাশ ফিরে শুয়ে। ঘরের কোণে ঢাকা দেওয়া আমার রাতের খাবার। স্বল্প আলোয় ঘরটা একই রকম দেখাচ্ছে। আঁতিপাঁতি করে খুঁজেও মেঝেতে পায়ের দাগ দেখতে পেলাম না। সিগারেটের ছাই, বড় বড় হরফে লেখা কোন চিরকুট, কিছুই পেলাম না। জানলার বেড়ে পুরনো আমলের টাইমপিস, চৌকির নীচে চাবি-বিহীন টিনের সুটকেস, সেলাইয়ের বাক্স, পানের ডাবর, পিতলে যাওয়া চাদুরে ঘড়া, সব ঠিকঠিক আছে।

আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলাম। তবে কি সত্যি কেউ আসেনি?

দমকা হাওয়া বাগানের নড়বড়ে দরজাটাকে ঠেলে পাশে সরিয়ে দিয়ে, ধেয়ে এসেছিল ঘর অব্ধি। ঘরের মধ্যে এলোমেলো করে দেওয়ার মতো কোন শৌখিন সামগ্রী না পেয়ে, সে হাওয়া এমনিই ফিরে গেছে!

ধীর গলায় ডাকলাম, মা?

জড়ানো গলায় মা সাড়া দিল, হুঁ।

- কেউ কি এসেছিল?

- হুঁ।

চমকে উঠলাম, কে?

- জানি না।

- তবে যে বললে, কে যেন এসেছিল।

- হবে।

- তুমি দেখনি? মা,তুমি বুঝতে পারনি,কেউ এসেছিল।

- হুঁ-উ-উ।

ঘুমের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে মা। শ্বাস পড়ছে নিচু শব্দে। মৃদু হাওয়ায় নোনা ধরা দেওয়ালে ক্যালেন্ডার দুলছে। শব্দ হচ্ছে খসখস।

উড়ন্ত গঙ্গাফড়িং,মেঝেতে দেওয়ালে আলোছায়ার জাফরি তৈরি করছে। এ ঘরে চাঁদের আলো ঢোকে না।

এ ঘরের বাতাসে ঘ্রাণ নিলে ফুলের সৌরভ পাওয়া যায় না।

তবু কি কেউ এসেছিল? কোন মানব বা মানবী?

মুখোমুখি বসে গল্পের সঙ্গী খুঁজেছিল?

একা বসে থেকে থেকে, সে ক্লান্ত অভিমানী, নিঃশব্দে চলে গেছে? ঘরের মেঝে থেকে সতর্কে কুড়িয়ে নিয়ে গেছে, পোড়া সিগারেটের টুকরো, সোয়েটার টিপ, চুলের কাঁটা?

কিন্তু কে সে?

ছেঁড়া কানির মতো চাঁদ আকাশের গায়ে। আবছা ঘষা ঘষা আলো। শুকনো পাতার মধ্যে দিয়ে ইঁদুর ছুটে যাচ্ছে সরসর শব্দে। উঁচু ডালে বসে পেঁচা ডাকছে, দুরগুম দুরগুম।

গাছের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকি জ্বলছে। শব্দহীন টিপটিপ।

গায়ে মাথায় জ্যোৎস্না মেখে বাগান পার হয়ে যদি সেই অপরিচিত ফিরে আসে, আমার খোঁজে, এই ঘরে!

তখন স্নিগ্ধ চন্দ্রাতপে মুখোমুখি বসে আলাপচারিতা হবে আমাদের। কিম্বা ঘর ছেড়ে দুজনে বেরিয়ে পড়ব। নিঃসীম নৈশব্দের মধ্যে আমরা দুজন হাঁটব পাশাপাশি।

খোলা দরজা দিয়ে বাগান পার হয়ে হয়ত সে এখনি আসবে।

আজ সন্ধ্যায় আমি তার ফিরে আসার অপেক্ষায়।

আজ সন্ধ্যায় আমি আমার ঘরেই।

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

লেখক পরিচিতি –

লেখালিখির শুরু গত শতকের শেষ দশকে। বাণিজ্যিক পত্রিকার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে

লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি। গল্প সংকলন আটটি এবং তিনটি উপন্যাস।