সেদিন
ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের জন্মদিন উপলক্ষে আশ্রমে গিয়েছিলাম, সেখানে
প্রতিবছর ঠাকুরের জন্মদিনে তিথি পুজো হয় । পুজো, হোম, পুষ্পাঞ্জলি
হওয়ার পর ভোগ প্রসাদ দেওয়া হয় । প্রাসাদে খিচুড়ি, লাবড়া, চাটনি
ও পায়েস দেওয়া হয় । আমার মতো যারা রামকৃষ্ণ মিশন থেকে দীক্ষিত তাঁরা সবাই এই দিন
অনুষ্ঠানে সম্মিলিত হয়, সকাল থেকে সুন্দর একটা পরিবেশে
ভক্তির আবহে কাটায়, পুজো সমাপন হওয়ার পর ভোগ প্রসাদ
বিতরণ চলছে, আমি ও অনেকে আশ্রমে ঘোরাঘুরি করছি, ঘুরতে
ঘুরতে আমার তখন মায়ের ঐ গল্পটা মনে পরে গেল ।
একবার
মায়ের এক সন্তান এক ঘড়া দুধ নিয়ে অতি দুঃখী মনে মায়ের বাড়িতে এসেছেন, মায়ের
সামনে দুধের ঘড়া ভয়ে ভয়ে নামিয়ে মাকে প্রণাম করে কাঁতর স্বরে বলল, মা
খাটি দুধ পাওয়ার জন্য বেশী দাম দিয়ে আমার
এক বন্ধু এক নিম্ন শ্রেণীর লোকের বাড়ী থেকে দুধ নিয়ে এসেছে, কিন্তু
আসতে আসতে নজরে পড়ল দুধে একটা শুঁকনো মৌড়লা মাছ ভাসছে, দেখেতো মাথায় বজ্রাঘাত হল ।
দুধ ফেলে
দিতে ইচ্ছা করছিল । কিন্তু অনেক চিন্তা ভাবনা করে ফেলে না দিয়ে নিয়ে এসেছি, ভাবলাম
মা যা আদেশ করবেন তাই করব, ফেলতে বললে ফেলব, রাখতে
বললে রাখব । তার বন্ধুর খুব ইচ্ছা ছিল খাঁটি দুধ দিয়ে ঠাকুরের ভোগের পায়েস হবে, মা
একটু মুখে দেবেন, কিন্তু হায় ! সব আশা বাদ পড়ল ।
সব শুনে
মাও দুঃখ পেলেন । বিষণ্ণ মনে বললেন, বাবা ফেলে
দিতে হবে না, ছেলে পুলে আছে তারাতো খেতে পারবে, ঠাকুরের
দুধ লাগবে না । ছেলেটা কত দূর থেকে কষ্ট করে এনেছে । তারপর মা বাড়ীর সবার মতামত
জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, এই দুধ দিয়ে পায়েস করে ঠাকুরের ভোগ
দেওয়া যাবে না ? কেউ কেউ গম্ভীর ভাবে বললেন, তাকি
হয়,
মাছ পাওয়া গেছে দুধের ভীতর, ঐ দুধ তো
ভোগের অযোগ্য হয়ে গেছে ।
এরপর
বাড়ীর গিন্নী ঠাকুরন নলিনি দিদি বাইরে
থেকে এসে বাড়ীর ভীতরে প্রবেশ করতেই মা তাকেও দুধের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলেন । নলিনি
দিদি সব কথা শুনে গলা হাঁকিয়ে হাত বাড়িয়ে তার মুরুব্বিয়ানা ভাল ভাবে ফলাবার রায়
দিলেন । কি হয়েছে দিদিমা দুধের ? কি হয়েছে চাষি বাসির ঘরে
একটা শুঁকনো মাছ পড়ে গিয়েছে, তাকে তুলে ফেলে দেওয়া হয়েছে, দুধের
হয়েছে কি তাতে, ঠাকুরকে কেন দেওয়া চলবে না ? খুব চলবে ! কলকাতার
গোয়ালারা দুধে কত কি মেশায়, কে তার খোঁজ রাখে, সেই
দুধেই তো সব মিষ্টি হয়, পায়েস হয়, ঠাকুর
দেবতাদের ভোগ দেয় সবাই । নলিনি ঠিক বলেছে, কলকাতার
দুধের কি কিছু বিচার আছে ! কত কি মেশায় তাতে ? যখন ঠাকুর
কে দেওয়া যায়, তখন এই দুধও ঠিক চলবে । এতো আরও ভাল দুধ ।
নলিনির যুক্তি পূর্ণ কথায়, মা সায় দিয়ে খুব খুশী ও নিশ্চিন্ত
হয়ে ঠাকুরের পায়েস ভোগের ব্যবস্থা করলেন । ছেলেটা এত কষ্ট করে এত দূর থেকে বয়ে আনা
দুধ দিয়ে পায়েস করে ঠাকুরকে ভোগ দিয়ে সকলকে নিজের হাতে পরিবেশন করে খাইয়ে মায়ের
প্রাণে আনন্দে আর ধরে না ।
লেখিকার অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখিকার পরিচিতি-
জন্ম বিহারের কিশানগঞ্জ । প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর
কিষানগঞ্জেই । আঞ্চলিক বার্ষিক পত্রিকা, ই-ম্যাগাজিন তাৎক্ষনিক ডট কমে অণুগল্প,
ছোট গল্প, প্রবন্ধ লেখালেখি করেন । ওনার প্রথম গ্রন্থ
‘নবরত্ন’(গল্পগুচ্ছ) । বই পড়া, ভ্রমণ ও আধ্যাত্মিকতায় রুচিশীল এবং কুসংস্কার বিরোধী ।
.jpg)