আজ ১২ই ফাল্গুন নিলাঞ্জনাদির স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার
বিতরণ অনুষ্ঠান । আজকের এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হবেন
ডিস্ট্রিক্ট এডুকেশন অফিসার অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় । সাজো সাজো রব গোটা স্কুল
জুড়ে।
নীলাঞ্জনা দি ও এই স্কুলে সম্প্রতি প্রধান শিক্ষিকা
হিসাবে যোগদান করেছে। স্কুলের মেন গেটের সামনে লাল হলুদ শাড়ি পড়ে বিদ্যালয়ের
ছাত্রীরা হাতে ফুল চন্দন নিয়ে অপেক্ষা করছে অতিথির জন্য। নীলাঞ্জনাদি প্রধান শিক্ষিকা হিসাবে মঞ্চে আগত
অতিথিদের উত্তরীয় দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন একের পর এক। অনুষ্ঠান প্রায় শুরু হয়ে
গেছে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করছে ছাত্রীরা এমন সময়ে স্কুলের গেটে উপস্থিত হলেন
প্রধান অতিথি অনির্বাণ বাবু। ক্ষণিকের
জন্য অনুষ্ঠান থামিয়ে শঙ্খ ধ্বনি ফুল ছিটিয়ে মঞ্চ নিয়ে আনলেন তাঁকে সকলেই।
নীলাঞ্জনাদি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ডিস্ট্রিক্ট
এডুকেশন অফিসার অনির্বাণ বাবুকে উত্তরীয় দিয়ে বরণ করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে
পড়লেন। কারণ আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে এই অনির্বাণ তার প্রিয় অনি ফেলে আসা তার
অসম্পূর্ণ প্রেম । নমস্কার করে একে অপরকে সৌহার্দ্য বিনিময় করলেও অনির্বাণ বাবু ও
সঠিক চিনতে পেরেছে তার হারিয়ে যাওয়া সেই প্রেম নীলাঞ্জনাকে তার প্রিয়
নিলুকে। আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে ফাল্গুন মাসের ঠিক এইরকমই ১২ তারিখে তাদের শেষ
দেখা ও কথা হয় ময়ূরাক্ষী নদীর ধারে বকুল গাছের তলায়। তারপর থেকে আর যোগাযোগ
হয়নি তাদের মধ্যে কোনদিন।
গোটা অনুষ্ঠানে অনির্বাণ ও নীলাঞ্জনার মধ্যে যতবার
চোখাচোখি হয়েছে ততবারই ফিরে গেছে নিজেদের
মতন করে সেই পুরনো দিনের কথায়। নীলাঞ্জনা দির মধ্যে তখন একের পর এক ঢেউ আঘাত
দিয়ে যাচ্ছে তার নরম হৃদয়কে । সেই এলোমেলো চুল,শেভ না করা
দাঁড়ি,দিনের পর দিন স্নান না করে বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে
থাকা জংলি অনি আজ কত পাল্টে গেছে।
মাথার চুল থেকে পায়ের পালিশ করা জুতো পর্যন্ত সবকিছুতেই
স্মার্টনেসের ছাপ। জেলার এত বড় অফিসার
নিশ্চয়ই ভালো অফিসারের মেয়ের সাথে বিয়ে করে আনন্দে জীবন কাটাচ্ছে অনি,এরকম বহু
ভাবনা-চিন্তা চলছে নীলাঞ্জনার মধ্যে। নিলু হয়তো ভালো ছেলের সাথে বিয়ে করে
ছেলেপুলে নিয়ে ভরা সংসার সামলাচ্ছে
অনির্বাণ ও ভেবে চলেছে এইসব কথা সারাক্ষণ।
হেডমিস্ট্রেস নীলাঞ্জনাদির রুমের টেবিলের একদিকে
অনির্বাণ বাবু অপরদিকে নীলাঞ্জনাদি মাঝে চায়ের কাপ।
- 'কেমন আছো?
- ভালো আছি। তুমি কেমন?
- আমিও ভালো আছি '।
অনির্বাণ আর নীলাঞ্জনার মধ্যে প্রায় ২৫ বছর পর কথা হল।
- 'তুমি বিয়ে করেছ
? '
অনির্বাণের উত্তর "না " ,
- কেন ? "কারণ আমি
এখনো সেই জংলি আছি।"
নীলাঞ্জনার বুক শান্ত হল এক গভীর নিশ্চয়তার জন্য । তার
সেই অনি আগের মতনই ভিতর থেকে একই রকম সৎ আছে। '
তুমি নিশ্চয়ই ছেলেপুলে নিয়ে গিন্নি হয়ে গেছো ?'অনির্বাণের
প্রশ্নে মুচকি হেসে নীলাঞ্জনার উত্তর - "না " আমি
এখনো সেই জংলি মানুষটাকে ই খুঁজে বেড়াচ্ছি।"
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি -
অরিজিৎ হাজরা,পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়িতে বসবাস করেন । দীর্ঘ ২১ বছর ধরে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত। নেশা হচ্ছে লেখালেখি এবং তথ্যের অনুসন্ধান করা। একজন প্রাবন্ধিক গল্পকার হিসেবেই বেশি পরিচিত ।
.jpg)