এই পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর পারস্পরিক বোঝাপড়া বা ভাব
বিনিময়ের নির্দিষ্ট মাধ্যম রয়েছে। এই ভাব বিনিময়ের মাধ্যমের মধ্য দিয়ে সকলেই
জাতিসত্তার গর্বে গর্বিত থাকে। ভাব বিনিময়ের মাধ্যম যত কোমল ও আন্তরিক হয় ততই তারা
শক্তিশালী প্রাণীজগৎ সৃষ্টি করতে পারে এই জগতে। অপরদিকে জীব শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষও ভাষার মাধ্যমে ভাব
বিনিময় করে থাকে। মানুষ একে অপরের সাথে
যোগাযোগ এবং পৃথিবীর বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলে তার একান্ত আপন মাতৃভাষার মাধ্যমেই।
মাতৃভাষাকে স্বাধীনভাবে গর্বের সাথে প্রতিষ্ঠা করার জন্য
এই পৃথিবীর ইতিহাস দেখেছে ভাষা আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে একুশে ফেব্রুয়ারি বা
উনিশে মে এক ঐতিহাসিক স্মরণীয় দিন। শুধুমাত্র মাতৃভাষার জন্য জীবন বিসর্জন
দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দেয়। ভাষার নবজাগরণে ঘটেছিল পৃথিবীর ইতিহাসে
সেদিন। মাতৃভাষা প্রেমী আপামর জনগণ একুশে ফেব্রুয়ারি ও উনিশে মে -কে প্রতিষ্ঠা
করেছে নিজেদের আত্মসম্মানের হৃদয়ের মনি কোঠায়।
কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে এই বাংলায় সৃষ্টি হয়েছে ভাষার অবক্ষয়।
যে অবক্ষয় বয়ে চলেছে গ্রামীণ সমাজ থেকে শহরের উচ্চ স্তরের ক্ষেত্রেও। স্কুল কলেজ
ক্লাব রেস্তোরাঁ কিংবা খেলার মাঠ সবস্থানেই ব্যবহার হচ্ছে অরুচিকর বাংলা ভাষা ।
পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও অশালীন ভাষা ব্যবহার করছে খুবই সাবলীল ভাবে। এমনকি
বাংলা ভাষার বিকৃতি ঘটিয়ে নিরন্তর চলছে বাংলা সাহিত্য ও । আর সর্বশেষ সংযোজন হল
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের অরুচি কর ভাষার প্রয়োগ। পৃথিবীর
অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষা 'বাংলা ভাষা ' হওয়া সত্যেও আমরা
বাঙালিরা নিজেদের মাতৃভাষাকে সর্বনিম্নস্থরে নামিয়ে এনে এগিয়ে চলেছি বলে দাবি
করি।
সর্বশেষ মাতৃভাষার রিপোর্ট অনুযায়ী আজ প্রমাণিত যে
পৃথিবীর বুক থেকে প্রতিদিন একটি করে ভাষা
অবলুপ্ত হচ্ছে সকলের অজান্তে । এখনো বাঙালিরা সচেতন না হলে আগামী দিনে হয়তো বাংলা
ভাষাও অবলুপ্তির তালিকায় ঠাই করে নেবে একদিন। এমন কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা
অসম্মানিত হচ্ছে যা সকল সচেতন বাঙালিদের ক্ষেত্রে বেশ আশঙ্কার
বিষয়। বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থায় বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রশংসাযোগ্য নয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চশ্রণী পর্যন্ত মাতৃভাষা বাংলায় পড়াশোনার সুযোগ
পেলেও বাংলা ভাষার মান বেশ নিম্নমুখী। শ্রেণীকক্ষে বাংলা ব্যাকরণের পাঠদান এবং
শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা দুটি চিত্রকর্ষক নয়। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক ও
ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পাঠ বিষয়ক ভাব বিনিময় ও বাংলা ভাষার উদারতা বেশ সংকীর্ণ।
এমনকি পাঠদান কক্ষে বাংলা শব্দের প্রকৃত অর্থ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিদেশি ইংরেজি
শব্দের প্রচলন হচ্ছে প্রত্যহ। প্রশ্ন এখানেই যে ছাত্রছাত্রীদের সাথে সাথে শিক্ষক
শিক্ষিকারও বাংলা ভাষার উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কিন্তু ভারতবর্ষের
অন্যান্য ভাষাভাষীর মানুষেরা (বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে) গর্বের সাথে -ঐতিহ্যের সাথে
তাদের মাতৃভাষাকে ধরে রেখেছে নিজ জাতীসত্তায় । মাতৃভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে আরও
একটি বিষয় বেশ চিন্তার আর তা হল পশ্চিমবঙ্গের পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা ইংলিশ
মিডিয়াম স্কুলগুলির বার বাড়ন্ত। এই সমস্ত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলিতে পাঠ্য
বিষয়ে প্রথম ভাষা হিসেবে ইংরেজি এবং দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি ব্যবহৃত হচ্ছে।
সেখানে পশ্চিমবঙ্গে থেকেও বাংলা ভাষার বিষয় রাখা হয় না। এমনকি বাংলা ভাষার
শিক্ষক-শিক্ষিকাও নিয়োগ করা হয় না এই সমস্ত ইংলিশ মিডিয়াম
স্কুলগুলিতে। প্রশাসন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার প্রহসন এবং দ্বিচারিতা এখানেই। একজন
বাঙালি অভিভাবক হয়ে সন্তানদের শৈশব থেকেই
মাতৃভাষার পরিবর্তে বিদেশী ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের জন্য ঠেলে দিচ্ছে নিছক
স্মার্টনেস এর জন্য। হয়তো এমনও দেখা গেছে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছাত্রছাত্রীদের
অনেক অভিভাবকই পশ্চিমবঙ্গের সরকারি বিদ্যালয়-এর শিক্ষক -শিক্ষকতার
কাজে রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের বাঙালি শিক্ষক শিক্ষিকাদের ভাবনা হল যে আমি উচ্চ
বেতনের জন্য চাকরি করব সরকারি বিদ্যালয়গুলিতে আর আমার ছেলে মেয়েরা ভালো
ক্যারিয়ারের জন্য পড়াশোনা করবে ইংলিশ মিডিয়ামে। এটাই মাতৃভাষার জন্য যথেষ্ট
অপমানজনক। কিন্তু আমরা যদি এভাবে একটু একটু করে বাংলা ভাষাকে অবহেলা করি তাহলে
আগামী দিনে বাঙালিদের অন্য ভাষার কাছে পরাধীন হয়ে থাকতে হবে
চিরকালের জন্য। বাংলা ভাষা যদি না থাকে তবে বাঙালিদের
নিজস্বতা বাঙালির অহংকারও নিঃশব্দে বিলীন হয়ে যাবে এই পৃথিবী থেকে ।
ইংরেজ আমল থেকে এখনো পর্যন্ত সরকারি কাজ বাংলার পরিবর্তে
ইংরেজিতে হয়ে চলেছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কাজের ক্ষেত্রে সরকারি আধিকারিকরা
এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণও সরকারি কাজের মাধ্যম হিসেবে ইংরেজি ভাষাকে
বেছে নেয়,যার ফলে ইংরেজি ভাষা না জানা অনেক মানুষেরই সে ক্ষেত্রে অসুবিধার সৃষ্টি
হয়। সরকারি বেসরকারি অফিস আদালত বাস ট্রেন ফেরিঘাট উড়োজাহাজ প্রভৃতি প্রতিটি
ক্ষেত্রে বর্তমানে ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য বেশি। কিন্তু ভারতের সংবিধানে ইংরেজি
ভাষা সংযোগকারী ভাষা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে অবশ্যই আমাদের মনে রাখতে
হবে যে বিশিষ্ট কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যতই খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে সাহেব সেজে
বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিকে তাচ্ছিল্য করে ইংরাজ কবি হওয়ার চেষ্টা করুক না
কেন ,তাঁকে এই বাংলায় ফিরে এসে তাঁর মাতৃভাষা বাংলা ভাষাতেই
তিনি সাহিত্য সৃষ্টি করে বিখ্যাত ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।" রেখো মা দাসেরে
মনে এ মিনতি করি পদে" মাইকেল মধুসূদন দত্তের যে কাতর আবেদন ছিল তা কি
অস্বীকার করতে পারি আমরা ।
বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার অবস্থা খুব একটা
স্বাস্থ্যকর নয়। বাংলা সাহিত্যের অতীতও যদি আমরা পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখা যায়
যে রাজা রামমোহন রায় প্রথম বাংলা শব্দকে সংস্কৃত শব্দ থেকে স্বাধীনভাবে পরিবর্তন
করে বাংলা গদ্যকে পরিবর্তিত রূপ দিয়েছিলেন। খুবই সাধারণভাবে বাংলা ভাষাকে বাংলা
সাহিত্যে প্রচলন করে বাংলা সাহিত্য জগতেরও নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন আপামর বাঙালিদের কাছে।
রামমোহন রায় সাহসিকতার সঙ্গে বাংলা শব্দের গদ্যরূপ দিলেও কখনো বাংলা ভাষার মান
নিম্নগামী হয়নি। পরবর্তীকালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,ঈশ্বরচন্দ্র
বন্দ্যোপাধ্যায়,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের
জগতের দিকপালরা ক্রমান্বয়ে বাংলা ভাষার মানোন্নয়ন ঘটিয়ে বিশ্বের সাহিত্যে বাংলা
সাহিত্য তথা বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গৌরবের সাথে। মাতৃভাষা বাংলাকে
বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাংলা সাহিত্য জগতের গুণীজনদের গভীরভাবে এ বিষয়ে ভাবনার প্রয়োজন আছে বলে মনে
হয়।
বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার এবং বাংলা ভাষার মানোন্নয়নের
জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে সমস্ত রকম সংবাদ মাধ্যমেরও। বর্তমানে বেশিরভাগ সংবাদ মাধ্যমগুলি বাংলা
ভাষাকে এড়িয়ে অন্য ভাষার ব্যবহার করছে প্রতিনিয়ত । কিন্তু বাংলা সংবাদ
মাধ্যমগুলো বাংলার ভাষাভাষী দর্শকদের জন্য যখন সংবাদ পরিবেশন করছে তখন অবশ্যই
ভাষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবার দরকার আছে । খুব দৃঢ়তার সাথে বলা যায় সংবাদ
মাধ্যমগুলি সব থেকে বেশি বাংলা ভাষার অবক্ষয়ের দিকটি তুলে ধরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে
পারে। সংবাদ মাধ্যম বা সাহিত্য কিংবা
নেতৃত্বের পাশাপাশি বাংলা ভাষাভাষী অর্থাৎ বাঙালিভাষী মানুষদেরকে একজোট হয়ে বাংলা
ভাষার রক্ষার্থে সমবেতভাবে প্রচেষ্টা- প্রচার এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করে যেতে হবে
নিয়মিত ।
এই বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা এবং সম্মান রক্ষার জন্য
বাংলাদেশের ঢাকা শহর গর্জে উঠেছিল মাতৃভাষার আবেগে। রক্তক্ষয়ী প্রতিবাদ দেখেছিল
গোটা বিশ্ব জব্বরদের লাল রক্তে রঙিন
হয়েছিল দুই বাংলার বাঙালির মন। ১৯শে মে আসামের শিলচরের আন্দোলন ছিল এই বাংলা
ভাষার জন্যই । বাংলাদেশের বরকত জব্বরদের মতন পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে
দিয়েছিল কমলা ভট্টাচার্যের মতন প্রতিবাদীরাও। আমাদের ভুলে গেলে হবে না সম্প্রতি
কোচবিহারের একটি বিদ্যালয়ের যে মর্মান্তিক
ঘটনা ঘটলো,প্রাণ গেল দুই তরতাজা যুবকের সেটাও ছিল এই বাংলা ভাষার জন্যই।
ইতিহাসের পাতায় এতগুলো ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও আমরা
বাঙালিরা কেন নিজের মাতৃভাষার প্রতি এত উদাসীন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বাঙালিদের
অপমান, বাংলা ভাষার অসম্মান হলেও বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা চুপ করে থেকে যায় । ভেজাল
খাদ্য গ্রহণ করার মতন বিদেশি ভাষার প্রেমে মত্ত বাঙালি তার নিজস্ব কৃষ্টি সংস্কৃতি
এমনকি মাতৃভাষাকেও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে না! এ আমরা কোন ভাবনায় বাস করছি?
সময় থাকতে থাকতে সমবেতভাবে নিজস্ব জাতিসত্তা, নিজস্ব
মাতৃভাষার জন্য ভাবুন। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মেটাতে পারে,আমাদের
সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সমস্ত প্রতিকূলতা এবং রক্ষা করতে পারে আমাদের গর্বের বাংলা
ভাষাকে। মেরুদণ্ড সোজা রেখে মাথা উঁচু করে
বাঙালি ও বাংলা ভাষার গর্বে গর্বিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করতে পারি বৃহত্তর এক বাঙালি
জাতিকে ।।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি -
অরিজিৎ হাজরা,পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়িতে বসবাস করেন । দীর্ঘ ২১ বছর ধরে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত। নেশা হচ্ছে লেখালেখি এবং তথ্যের অনুসন্ধান করা। একজন প্রাবন্ধিক গল্পকার হিসেবেই বেশি পরিচিত ।
.jpg)