Advt

Advt

rupantar-upanyas-story-galpo-parts-19-&-20-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য

 ধারাবাহিক উপন্যাস প্রতি রবিবার

rupantar-upanyas-story-galpo-parts-19-&-20-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য
পর্ব ১৯ ও ২০ (শেষ পর্ব)

ঊনিশ

দু’দিন পর মধ্যরাত্রে বস্তির শেষ মাথায় দু’তিনটা ঘরে আগুন লাগিয়ে সরে পড়ল হারুর ভাড়াটে গুন্ডারা। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠতেই বস্তির লোক বেরিয়ে এল সব। বুঝতে কারও বাকি রইলনা হারুই করিয়েছে কাজটা। ঘড়া, বালতি, ঘটি হাতের কাছে যে যা পেল তাই নিয়ে জল আনতে ছুটল পুকুরে ডোবায়। যারা জল পেলনা হাতের কাছে তাঁরা মাটির ঢেলা ছুঁড়ে দিল আগুনের উপর। খবর পেয়ে দিবাকর ছুটে এল, ততক্ষণে দমকল ডাকা হয়েছে। সেরাতে হাওয়া না থাকায় খান পাঁচেক কুঁড়ে ঘর ভষ্মীভূত করে অগ্নিদেব শান্ত হলেন, কিন্তু মেয়েদের কান্নাকাটি চলল পরের দিন দুপুর পর্যন্ত। শেষে হিসেব করে যখন দেখা গেল ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি নয় এবং কোন প্রাণহানি হয়নি তখন বস্তিবাসীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাদের ঘর পুরেছে তাদের সাময়িকভাবে বস্তির বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল। কমুনিটি সেন্টারের জমান টাকা থেকে বাঁশ টিন বাখারি কিনে পোড়া ঘরগুলির ভিটের উপর নতুন ঘর তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেল দু’তিন দিন পরে। বস্তির কিছু যুবক হারুর দোকান গুঁড়িয়ে দেবার মতলব করছিল। দিবাকর অনেক বুঝিয়ে তাদের নিরস্ত করল।

অবিনাশবাবুকে দিবাকর নিজে থেকে খবরটা দেয়নি। তাঁর শরীরের অবস্থার কথা ভেবেই সে নিজেকে বিরত রেখেছে। কিন্তু লোকমুখে পরের দিন সকালেই তিনি খবরটা পেয়ে গেলেন। উত্তেজিত হয়ে সবার নিষেধ অমান্য করে অবিনাশবাবু গায়ে শালটা জড়িয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। সুধাময়ীর মাথার দিব্যি, কণার কান্নাকাটি, ডাক্তারের কড়া নির্দেশ কিছুই তাকে ঘরে  আটকে রাখতে পারলনা। উপায়ান্তর না দেখে সুধাময়ী বাবলুকে ডেকে বললেন, “ তুই সঙ্গে যা বাবলু, হাত ধরে আস্তে আস্তে হাঁটিয়ে নিয়ে যাস।”

বাবলু দৌঁড়ে গিয়ে রাস্তায় অবিনাশবাবুর হাত ধরল। “ চল বাবা আমি তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।”

অবিনাশবাবু বেশি দূর এগোতে পারলেননা। খবরটা শোনার পর থেকে উত্তেজনায় তার বুকের মধ্যে সেই যন্ত্রণাটা আর ঢিপ ঢিপ শব্দটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বস্তির যত কাছে আসতে লাগলেন ততই ব্যথাটা যেন বেড়ে উঠল। বাবলু দেখল ওর বাবার মুখ ক্রমশই পান্ডুর বর্ণ ধারণ করছে, ঠোঁট আর হাত কাঁপছে। বাবলু ভয় পেয়ে অবিনাশবাবুর সামনে এসে পথ রুখে দাঁড়াল। “ না বাবা আর গিয়ে কাজ নেই, চল আমরা ঘরে ফিরে যাই।”

অবিনাশবাবু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “ নারে, যেতে যে আমাকে হবেই। ওদের এতবড় সব্বোনাশ হয়ে গেল, আমি কী করে ঘরে বসে থাকি বল? আমার একটা দায়িত্ব আছে, কর্তব্য আছে। আর কিছু না হোক একটু সান্ত্বণা তো দিতে পারি ওদের।”

বাবলু দুই হাত প্রসারিত করে বাবাকে আটকে বলল, “ তোমার হাত কাঁপছে বাবা, মুখ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, আমি তোমাকে কিছুতেই যেতে দেবনা বাবা। ওদের কান্নাকাটি শুনলেই আবার তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে, আমি জানি।”

অবিনাশবাবু বাবলুকে নাছোড়বান্দা দেখে বললেন, “ ওরে ও কিছু নয়, দেখবি আমি ঠিক হয়ে যাব। বরঞ্চ আয় আমরা একটু রাস্তার পাশে বসে জিরিয়ে নি।”

বাবলু অবিনাশবাবুকে ধরে রাস্তার পাশে ঘাসের উপর নিয়ে বসাল। অবিনাশবাবুর বুকের ব্যথাটা ক্রমশই বাড়তে লাগল, বুকের মধ্যে হাতুড়ির ঘায়ের মত ঢিপ ঢিপ শব্দ হতে লাগল। যন্ত্রনায় অবিনাশবাবু ধীরে ধীরে বাবলুর কোলে মাথা রেখে ঘাসের উপর শুয়ে পড়লেন।

রাস্তার দু’জন পরিচিত লোককে ডেকে ধরাধরি করে অবিনাশবাবুকে ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে এল বাবলু। ডা. হাজারি এসে অবিনাশবাবুকে পরীক্ষা করে বললেন, “ আরেকটা স্ট্রোক হয়ে গেছে ওনার, এক্ষুণি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে ওনাকে।”

 

কুড়ি

দিন সাতেক পরে হাসপাতাল থেকে একটা স্টেন্ট লাগিয়ে ঘরে ফিরে এলেন অবিনাশবাবু। বিকেলের দিকে চেয়ারে বসে বাবলুকে বললেন, “দেতো বাবা, আজকের কাগজটা একটু দেখি।”

বাবলু খবরের কাগজটা হাতে ধরিয়ে দিলে অবিনাশবাবু দুর্বল হাতে চশমাটা নাকে গলিয়ে কাগজের প্রথম পাতার হেডলাইন পড়তে লাগলেন। একটু পরে দক্ষিণের জানলা থেকে রোদ সরে গেলে বললেন, “ পশ্চিমের জানালাটা একটু খুলে দে বাবলু, ভাল দেখতে পাচ্ছিনা।”

বাবলু একটু ইতস্তত করে বলল, “ ওটা বন্ধই থাক বাবা, আমি বরঞ্চ লাইট জ্বেলে দিচ্ছি।”

অবিনাশবাবু হেসে বললেন, “ শুধু আলো নয়, আমার যে একটু হাওয়াও চাই। ভয় নেই, হারুর দোকানে আর হল্লা হবেনা, ওর ব্যবসা লাটে উঠল বলে, দেখিস তোরা।”

বাবলু জানলার পাশে টুল দাঁড় করিয়ে তার উপর উঠে জানলাটা খুলে দিল। অবিনাশবাবুর অসুস্থতার পর সুধাময়ী জানলাটা খুলতে সবাইকে বারণ করেছিলেন। আজ দেড়মাস পর বাবলু জানলাটা খুলে দিতেই এক ঝলক হাওয়া এসে লাগল অবিনাশবাবুর গায়ে। বাবলু টুল থেকে নেমে এসে বলল, “ হারুর দোকানটা বন্ধ দেখলাম বাবা।”

অবিনাশবাবু বললেন, “ মদ বিক্রি হয়না তো খোলা রেখে কী করবে?” একটু পরে হঠাৎ কী মনে করে বাবলুকে কাছে ডেকে অবিনাশবাবু বললেন, “ যা না একবার আশপাশের দোকানগুলোতে জিজ্ঞেস করে আয়না দোকান বন্ধ কেন। ব্যাটা মরল নাতো? চুপি চুপি যা, মাকে আবার বলিসনা যেন।”

বাবলু নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মিনিট দশেক পর দিগ্বিজয়ী বীরের মত বাবলু ফিরে এসে ঘোষণা করল, “হারু দোকান বিক্রি করে চলে গেছে বাবা। ওখানে এখন মুদির দোকান বসবে।”

অবিনাশবাবু হাসলেন; স্বস্তির হাসি। অনেককাল পরে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলেন তিনি, মনে হল বুক থেকে যেন একটা ভারি পাথর নেমে গেল। অবিনাশবাবু এবার ডাক্তারের আদেশ অগ্রাহ্য করে হাঁক দিলেন, “ ওগো শুনছ, হারু ঘোষ দোকান তুলে দিয়েছে। ও কণা দেখে যা হারু ঘোষ উঠে গেছে।”

সুধাময়ী আর কণা রান্নাঘর থেকে ছুটে এল। সুধাময়ী বলল, “ সে কিগো, পরশুও তো দেখলাম ঝাঁপ খোলা।”

বাবলু বলল, “ খবর নিয়ে এলাম, কালই দোকান বিক্রি করে উঠে গেছে।”

সুধাময়ী গিয়ে খোলা জানলার সামনে দাঁড়ালেন, তারপর ভালভাবে দেখে নিয়ে বললেন, “উঃ কী ভয়ঙ্কর লোক! তোমাকে পঙ্গু করে, বস্তিতে আগুন লাগিয়ে তবে পালাল। আর কিছুদিন থাকলে আরও কত লোকের সব্বোনাশ করত কে জানে।”

অবিনাশবাবু বললেন, “ দিবাকরকে বোলো বস্তির সবাইকে আমার নাম করে যেন কাল মিস্টি খাইয়ে দেয়। মিস্টির টাকা আমিই দেব।”

অবিনাশবাবু চোখ বুঁজে একটু চুপ করে থাকলেন, তারপর বললেন, “ জান সুধা, হারু ঘোষের উপর আমার আর কোন রাগ নেই। ভুল রাস্তায় এসে আমারও ক্ষতি করল, নিজেরও ক্ষতি করল। ভগবানের কাছে প্রার্থণা করি তিনি যেন ওকে সুমতি দেন।”

সুধাময়ী ও কণা রান্নাঘর চলে গেলে অবিনাশবাবু উঠে এসে খোলা জানালার পাশে দাঁড়ালেন। অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল তাঁর পান্ডুর মুখে।

সমাপ্ত 


লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

লেখক পরিচিতি     

 জন্ম এবং শিক্ষা কলকাতায়;কর্মজীবন দিল্লিতে,কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি গল্প সংকলন এবং বাঙলায় চারটি উপন্যাস ও দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি থেকেও ওঁর কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে। দেশ,আনন্দবাজার,সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, পরিচয়, কালি ও কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লেখেন নলিনাক্ষ বাবু দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘ কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।