Advt

Advt

rupantar-upanyas-story-galpo-parts-17-&-18-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য

ধারাবাহিক উপন্যাস প্রতি রবিবার

rupantar-upanyas-story-galpo-parts-17-&-18-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য
পর্ব ১৭ ও ১৮

সতেরো

অবিনাশবাবু ধীরে ধীরে শ্লথ জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়লেন। সকালে উঠে সময় নিয়ে খবরের কাগজ পড়েন। তারপর খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম নেন। সন্ধ্যার দিকে বাবলুকে পড়ান, তারপর রাত ন’টার মধ্যেই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েন। ডা. হাজরাকে অনেক অনুরোধ করে বিকেলে আধঘন্টা পায়চারি করার অনুমতি পেয়েছেন অবিনাশবাবু। বিকেলের দিকে বাবলুর হাত ধরে বাড়ির কাছেই রাস্তায় আস্তে আস্তে পায়চারি করার সময় দেখতে পান হারু ঘোষ গালে হাত দিয়ে দার্শনিকের মত সামনে তাকিয়ে ঠায় বসে আছে। কোনো কোনো সন্ধ্যায় পাঁচ দশ জন খদ্দের হয়, কখনোবা এক আধজন। অবিনাশবাবুকে দেখতে পেলেই হারু মুখ ঘুরিয়ে নেয়। সন্ধের দিকে দিবাকর বা পরাণ এলে অবিনাশবাবু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রশ্ন করেন দৈনন্দিন কাজের। কাকে কোথায় পাঠান হল, হাতের কাজ ক’টা বিক্রি হল, খেলাধুলো ঠিক চলছে কিনা, ক্লাবে হাজিরা বাড়ছে কি কমছে, স্কুলের জন্য সরকারের সাহায্য কবে পাওয়া যাবে ইত্যাদি বলতে বলতে দিবাকরের নাভিশ্বাস উঠে যায়। দিবাকরের করুণ অবস্থা দেখে শেষে কণা বা সুধাময়ী এসে অন্য কথা পাড়েন। দিবাকর তখন হাঁপ ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

একদিন বিকেলে তাপস এল অবিনাশবাবুকে দেখতে। অবিনাশবাবু ঠাট্টা করে বললেন,  শুনলাম আমার ভয়ে তুমি এ পাড়ায় আসা বন্ধ করেছ?”

তাপস প্রতিবাদ জানাল, “ কণা আপনাকে মিথ্যে কথা বলেছে মেসোমশাই। এইতো পুজোর কিছুদিন আগে এসেছিলাম, আপনি বাড়ি ছিলেননা বলে দেখা হলনা।”

অবিনাশবাবু হেসে বললেন, “ তা আমার সঙ্গে দেখা হোক না হোক যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলে তার সঙ্গে দেখা হয়েছেতো, তা’হলেই হল।”

তাপস লজ্জ্বা পেয়ে নখ খুঁটতে লাগল। অবিনাশবাবু এবার গাম্ভীর্যের ভান করে বললেন, “ আমার মেয়েটাকে ভাগিয়ে নিয়ে যাবে সেতো বুঝতেই পাচ্ছি, কিন্তু তার আগে তোমাকে একটু খাটিয়ে নেব। এ ব্যাপারে কোন ছাড়াছাড়ি নেই।”

কণা নিঃশব্দে কখন খাটের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অবিনাশবাবু দেখতে পাননি। কণা বলল, “ হলোত, সেই কথায় বলেনা যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। এবার ঠ্যালা সামলাও।”

অবিনাশবাবু ধমক দিয়ে উঠলেন, “ থাম ছুঁড়ি, তোকে এখনই অত দরদ দেখাতে হবেনা।”

কণা লজ্জ্বা পেয়ে সরে গেল। অবিনাশবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “ তোমার এবার কোন ইয়ার হল তাপস?”

এবার ফিফথ ইয়ারে উঠব,” তাপস ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল।

আর একটা বছর পরেই পাকাপাকি ইঞ্জিনিয়ার কি বলো?”

তা বলতে পারেন।”

কোনো আরকিটেক্টের সঙ্গে পরিচয় আছে?”

তাপস ভেবে বলল, “ আছে, কেন?”

অবিনাশবাবু বললেন, “ কমুনিটি সেন্টারের প্ল্যান তৈরি করতে হবে। দিবাকর এক্ষুণি আসবে,  সব কথা তখনই হবে।”

তাপস বলল, “ কবে নাগাদ চাই?”

অবিনাশবাবু বললেন, “ আমি ঠিক বলতে পাচ্ছিনা। আসুক দিবাকর, ওই সব বলবে। তবে হ্যাঁ টাকা পয়সা কিন্তু দিতে পারবনা আগেই বলে রাখছি। পিওর সোস্যাল ওয়ার্ক।”

তাপস হেসে বলল, “ সেতো বুঝতেই পাচ্ছি। নেহাৎ যদি বিনে পয়সায় করতে রাজি না হয় তবে অল্প কিছু দিয়ে দেবেন।”

অবিনাশবাবু বললেন, “ এক  পয়সাও নয়। তোমাকে যেভাবে হোক বিনে পয়সায় করিয়ে দিতে হবে, মনে থাকে যেন।”

সে সন্ধ্যায় দিবাকর এলে তাপসের সঙ্গে সব কথা পাকাপাকি করে তবে অবিনাশবাবু তাপসকে উঠতে দিলেন।

 

আঠেরো

এক বিকেলে হারু ঘোষ বস্তির ক্লাবে গিয়ে হাজির। দাবা ক্যারাম ফেলে সব হৈ হৈ করে উঠল। আরে হারুদা যে।”

হারু ঘোষ মুখ ভার করে বলল, “ তোরাতো আমাকে ভুলে গেছিস, তাই আমিই নিজে থেকে এলাম। মাঝে মাঝে আসলেতো পারিস দোকানে। মাল না হয় না-ই খেলি গল্প গাছা করতে দোষ কি?”

হারু ঘোষের কথা শুনে সবাই মুখ চাওয়া চাউয়ি করল। অবিনাশবাবুর উপর হামলা হয়ে যাবার পর বস্তিতে হারু ঘোষের সম্পর্কে একটা ভয় এবং ঘৃণা সবার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে। হারু যতই মিস্টি কথা বলুক কারোরই বুঝতে বাকি রইলনা লোকটা বদ মতলব নিয়ে এসেছে। গোপাল বলল, “ কি যে বল হারুদা, তোমাকে ভুলতে পারি? তবে ব্যাপার কি জান? অনেকদিনতো মাল খেয়ে ফূর্তি করলাম এবার একটু ফুটবল, তাস, দাবা এসব খেলারও মজা নি, কি বলো?”

হারু ঘোষ রাগে গজ গজ করতে লাগল, “ শালা যেন গীতার শ্লোক আওড়াচ্ছে। ওই দিবাকর মাস্টার তোদের মাথা খাচ্ছে বুঝত পাচ্ছি। দেখবি তোদের ভোট নিয়ে ইলেকশন জিতে গদিতে বসে তোদেরই লাথি মারবে।”

সবাই একসঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠল। “ কেন মিছামিছি লোকটার বদনাম করছ হারুদা? দিবাকরবাবুর মত লোক এ তল্লাটে একটাও নেই এক অবিনাশবাবু ছাড়া। ইলেকশনেই যদি দাঁড়াবার ইচ্ছে থাকত দিবাকরবাবুর তাহলে অনেক আগেই দাঁড়াতে পারতেন।”

হারু ঘোষ মুখ খিঁচিয়ে বলল, “ আহারে আমার ধম্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির। দুনিয়ার লোক জানে ও ব্যাটা একটা তিলির মেয়েকে ফুসলে বার করে ঘরে নিয়ে এসেছে।”

ননী পোদ্দার বলল, “ কেন মিথ্যে বলছ হারুদা, সবাই জানে দিবাকরবাবু মা মরা একটা অসহায় মেয়েকে বিয়ে করেছে। এরকম উদারতা ক’জনার থাকে?  হারু মুখ ভেংচে বলল,  উদারতা? বলি জাত বলে একটা জিনিষ আছে সেটা মানিস তো?”

সবাই সমস্বরে বলে উঠল, “ না হারুদা, আমরা জাত টাত মানিনে। আমরা মনে করি সব মানুষ সমান।”

হারু আঁতকে উঠে ক্লাবের দরজা পেরিয়ে চৌকাঠের ওপাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর তর্জনী তুলে রেগে মেগে বলল, “ বড্ড বাড় বেড়েছে তোদের, এত বাড়াবাড়ি ভগবান সইবেননা। ওই অবিনাশবাবুর অবস্থা দেখেছিসতো, বেশি বাড়াবাড়ি করলে ওই রকমই হয়।”

হঠাৎ কী মনে করে হারু গলা খাঁটো করে বলল, “ আরে নামাবলি গায়ে দিলেই ধার্মিক হতে হতে হবে তার কোন মানে আছে? কেরাম খেল, ফুটবল খেল, দিবাকর যেসব ভাল ভাল কথা শেখায় সেসব আওড়া। কিন্তু তার জন্য মাল খাওয়া ছাড়তে হবে কেন? শোন, বলিসতো রাত্তিরের দিকে আমি নিজে এসে মাল তোদের ঘরে পৌঁছে দিয়ে যাব। দামও সস্তা করে দেব। কী করি তোরাই এখন লাটসাহেব, তোদের মর্জিমাফিক আমাকে চলতে হবে। কি বলিস?”

আবার সবাই পরস্পরের মুখ চাওয়াচাউয়ি করল, তারপর ননী বলল, “ নাঃ হারুদা সে হয়না। তোমার মাল অনেক খেয়েছি, আর নয়। ও পথে আমরা আর যাচ্ছিনা।”

হারু ঘোষ রাস্তায় নেবে দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “ মরবি তোরা, সব মরবি, এই বলে রাখলাম দেখিস।” হন হন করে হাঁটতে লগল হারু ঘোষ। কমুনিটি সেন্টারের পাশ দিয়ে যাবার সময় খোলা দরজা দিয়ে দেখতে পেল অনেক মেয়ে হাতের কাজ শিখছে। ঘরের মধ্য থেকে সেলাইয়ের মেশিন চলার আওয়াজ আসছে। হারু ঘোষের মনে হল তোপ দাগিয়ে এক্ষুণি গোটা বাড়িটাকে উড়িয়ে দিতে পারলে মনে সে অনেকটা শান্তি পেত। বস্তি পেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়বার আগেই দেখতে পেল মাঠের মধ্যে বস্তির বেশ কিছু ছেলে ফুটবল আর ভলিবল খেলছে। হারু ঘোষ আশায় বুক বেঁধে এগিয়ে গেল খেলার মাঠের দিকে। খেলা থামিয়ে সব হৈ হৈ করে উঠল। “ আরে হারুদা যে!” কেউ কেউ বলে উঠল, “ এসনা হারুদা খেলবে আমাদের সঙ্গে।”

দু’এক মিনিট ওদের সঙ্গে কথা বলতেই হারু ঘোষ বুঝতে পারল এখানেও সুবিধা হবেনা। সবাই বলল, “ না হারুদা, আর নয়। নিজেদের অনেক সব্বোনাশ করেছি। এবার থিতু হয়ে নিজেদের ঘর সংসার গুছোতে হবে, ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে।”

বিদ্যুতস্পৃষ্টের মত ছিটকে মাঠ থেকে রাস্তার উপর চলে এল হারু ঘোষ, তারপর চিৎকার করে শাসাতে লাগল, “ মরবি তোরা, সব মরবি, এই বলে রাখলাম।”

ওর কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল মাঠের চ্যাংড়া ছেলেগুলো।

 ক্রমশ …………

১৯তম পর্ব পড়ুন আগামী রবিবার

লেখক পরিচিতি     

 জন্ম এবং শিক্ষা কলকাতায়;কর্মজীবন দিল্লিতে,কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি গল্প সংকলন এবং বাঙলায় চারটি উপন্যাস ও দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি থেকেও ওঁর কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে। দেশ,আনন্দবাজার,সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, পরিচয়, কালি ও কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লেখেন নলিনাক্ষ বাবু দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘ কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।