ধারাবাহিক উপন্যাস – প্রতি রবিবার
পর্ব – ১৬
ষোলো
সে রাতের ঘটনার পর অবিনাশবাবু আর বাইরে বেরোতে পারলেননা। ডাক্তার হাজারি নিজে থেকে এসে পরের দিন সুধাময়ীকে জানিয়ে গেলেন অবিনাশবাবুর একটা মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেছে। অত্যাধিক খাটাখাটুনিতে শরীরও খুব দুর্বল। প্রেশার চেক করে গম্ভীরভাবে ডা. হাজারি অবিনাশবাবুকে বললেন, “অনেক অত্যাচার করেছেন শরীরের উপর, আর নয়। অন্তত ছ’মাস ঘরের বাইরে পা দেবেননা আপনি। খাওয়া দাওয়া, বিশ্রাম, একটু আধটু বইপত্র পড়া, ব্যস।”
অবিনাশবাবু বললেন, “ তা কি করে
হয় ডাক্তার? আমার যে বাইরে অনেক কাজ পড়ে
আছে।”
ডাক্তার ধমক দিয়ে বললেন, “ চুলোয় যাক
আপনার কাজ। আগে স্বাস্থ্য, তারপর সবকিছু। আমার কথা না
শুনলে আপনাকে জোড় করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেব, মনে থাকে
যেন। এঞ্জিওগ্রাফি করে ওরা স্টেন্ট লাগিয়ে দেবে।”
অবিনাশবাবু ডাক্তারের ধমক খেয়ে কাঁচুমাচু মুখ
করে বসে রইলেন। ডাক্তার চলে গেলে সুধাময়ী এসে মুখ টিপে হেসে বললেন, “ এবার হলোত? কইরে কণা, নিয়ে আয়
দেখি তোর বাপের সেই পুরনো
গীতাখানা।”
কণা ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে পাশের ঘর থেকে পুরনো
গীতাটা নিয়ে এল, তারপর অবিনাশবাবুর হাতে দিয়ে
বলল, “ নাও বাবা, এবার বসে
বসে কর্মযোগ পড় আর রান্নাঘরে মাছ ভাজার শব্দ শোন। পরকালের কাজ হবে। এরপরও যদি সময়
না কাটে তবে বইখাতা রেখে যাচ্ছি, আমার জন্য
মোগল ডাইনাস্টির উপর দু’খানা কোশ্চেনের উত্তর লিখে দিও, কেমন।”
বাবলু বলল, “ আজ বিকেলে
টিভিতে আমরা দু’জনে মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল ম্যাচ দেখব বাবা।”
সব শুনে গোমড়া মুখে অবিনাশবাবু দীর্ঘ নিঃশ্বাস
ফেলে বললেন, “ এর চাইতে হারুর গুণ্ডাটা যদি
একটা হাতও আমার কেটে নিত ভাল হত। উঃ কী শাস্তি দিলিরে বাবা।”
সন্ধের দিকে দলবল নিয়ে দিবাকর এসে হাজির।
সুধাময়ীর সঙ্গে আড়ালে কিছুক্ষণ ফিসফাস করে এসে ডা. হাজারির মত গম্ভীর মুখে দিবাকর
বলল, “ কমপ্লিট রেস্ট, অবিনাশবাবু।”
অবিনাশবাবু আঁতকে উঠে বললেন, “ সে কি
দিবাকর তুমিও দেখি ডাক্তার হাজারির মত ধমক দিতে শুরু করলে। আমার এভাবে ঘরে পড়ে
থাকলে চলবে কি করে? গেঞ্জির মেশিনের ব্যাপারটা .
. .”
দিবাকর অবিনাশবাবুকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “ সব হবে
অবিনাশবাবু, আপনার কিচ্ছু চিন্তা করতে
হবেনা। কাজ আটকে থাকবেনা। পরাণ, গোপাল, ননী এবং
আরও কয়েকজন প্রায় সমস্বরে বলে উঠল, “ আমরা আছি
অবিনাশবাবু।”
অবিনাশবাবু ওদের দিকে মুখ ফেরাতেই পরাণ এক গাল
হেসে বলে উঠল, “ আমি মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি
বাবু।”
অবিনাশবাবু পরাণের হাতটা চেপে ধরে বললেন, “ বাঃ এইতো
চাই, খুব ভালো কাজ করেছ পরাণ। এবার অন্যদেরও ছাড়াও।”
ননী আর গোপাল সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “ আমরাও আর
মদ খাইনা বাবু।”
অবিনাশবাবু মানসিক কষ্ট সাময়িকভাবে ভুলে গিয়ে
খুশিতে সবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “ তোমরা
সবাই এত তাড়াতাড়ি নেশা ঝেড়ে ফেলতে পারবে আমি কখনো ভাবিনি পরাণ।” তারপর দিবাকরের
দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, “ তুমি ঠিকই
বলেছিলে দিবাকর, উদ্দেশ্যহীনতাই মানুষকে
অবক্ষয়ের পথে ঠেলে দেয়। জীবনের একটা লক্ষ থাকা দরকার। একটা মহৎ আদর্শকে আমাদের
আঁকড়ে ধরতে হবে, তবেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব।
দেখ দিবাকর এরা এখন কেমন খেলাধুলো, বস্তি
উন্নয়নের কাজ ইত্যাদি নিয়ে মেতে আছে, মদের
নেশার চাইতে কাজের নেশা কম জোরালো নয়, এরাই কি
তা প্রমাণ করেনা?”
দিবাকর বলল, “ নিশ্চয়ই
করে।” তারপর হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “ আমরা
বরঞ্চ আজ চলি, আপনার বেশি কথা বলা ঠিক
হবেনা।”
অবিনাশবাবু নিজের অসহায় অবস্থার কথা ভেবে আবার
মুষড়ে পড়লেন। শেষে মরীয়া হয়ে বললেন, “ শোন
দিবাকর, মিটিং টিটিংগুলো বরঞ্চ এখন থেকে আমার বাড়িতেই কোরো। অন্তত আমিতো একটু শুনতে
পাব কী হচ্ছে না হচ্ছে।”
দিবাকর গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল, “ তা হয়না
অবিনাশবাবু। মিটিং মানেই উত্তেজনা আর উত্তেজনা আপনার একেবারেই বারণ।”
অবিনাশবাবু আহত স্বরে বললেন, “ আমাকে কি
তোমরা সব কিছু থেকে বাদ দিয়ে দিতে চাও দিবাকর?”
দিবাকর হেসে বলল, “ ছি ছি সে
কি কথা! আপনাকে বাদ দিয়ে আমাদের কখনো চলে? প্রত্যকেদিন
সন্ধ্যায় আমি এসে আপনাকে সব জানাব। দরকার মত আপনার মতামত নেব। আমি না আসি এরা কেউ
না কেউ আপনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে যাবে, আপনি
নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”
দিবাকরের কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে অবিনাশবাবু
বললেন, “ তবে তাই কোরো।”
রান্নাঘর থেকে কণা এসে দিবাকরকে জানাল, “ আপনারা
কিন্তু চা না খেয়ে কেউ যাবেননা, মা জল
বসিয়ে দিয়েছেন।”
একটু পরে চা খেয়ে সবাই বিদায় নিল।
ক্রমশ …………
১৭তম পর্ব
পড়ুন আগামী রবিবার
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি –
জন্ম এবং শিক্ষা
কলকাতায়;কর্মজীবন দিল্লিতে,কেন্দ্রীয় সরকারের
বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই
ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি
গল্প সংকলন এবং বাঙলায় চারটি উপন্যাস ও দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি
থেকেও ওঁর কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে। দেশ,আনন্দবাজার,সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, পরিচয়,
কালি ও কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায়
গল্প লেখেন নলিনাক্ষ বাবু। দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘
কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।
