উনিশ শতকে বাংলার মাটিতে যে নবজাগরণের ঢেউ শুরু হয়েছিল
রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে, সেই ঢেউ আছড়ে পড়েছিল আরেক মহামানব
ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্কারের প্রবাহে ভারতবর্ষ তথা বাংলার সমাজ
দর্শনে। অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের এক অসাধারণ মানুষ ঈশ্বরচন্দ্র, তাঁর জীবন ছন্দের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত
মানুষের হিতার্থে কাজ করেছেন অকৃপণভাবে । রবীন্দ্রনাথের ভাষায় --
"মাতৃস্নেহ মণ্ডিত দারিদ্র্য চিরকাল সগৌরবে সর্বাঙ্গে ধারণ
করিয়াছিলেন।" বহু প্রতিবন্ধকতা দারিদ্রতার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের দয়ার
সাগর বিদ্যাসাগরের উত্তরণ ঘটলেও তার সমগ্র জীবনকালে প্রতিটি মানুষের সমস্যায় ও
প্রতিকূলতায় দেবদূত হয়ে মানুষের জন্য কাজ করেছেন প্রতিনিয়ত। একাধারে পরিবারের
প্রতি দায়িত্ব পালন বন্ধুদের সাহায্য আত্মীয় অনাত্মীয়দের সহযোগিতা,অপরদিকে বিধবা বিবাহ প্রবর্তন বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ দুর্ভিক্ষ মহামারী
স্ত্রী শিক্ষার প্রসার প্রভৃতি কাজে ব্যয়
করেছেন বহু অর্থ। মানুষের মধ্যেই তিনি খুঁজেছিলেন ঈশ্বরকে।
ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জীবনের শেষ পর্যন্ত
অক্লান্তভাবে কাজ করে গিয়েছেন সমাজের স্বার্থে সমাজ সংস্কারক হিসাবে। যার ফলে
একসময় তিনি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং বহু অপমান সহ্য করতে হয় তাঁকে । ১৮৭৫ সালের
৩১শে মে ঈশ্বরচন্দ্র ২৫ ধারার অন্তিম বিনিয়োগ পত্রে তিনি তাঁর ঋণগ্রস্ত নিয়ে
একটি অভিমত প্রকাশ করেছেন ।এই বিনিয়োগ পত্রের ২৪ নম্বর ধারায় তিনি লিখেছেন--
" যাবত আমার ঋণ পরিশোধ না হয় তাবৎকাল পর্যন্ত এই বিনিয়োগ পত্রের নিয়ম
অনুসারে নিযুক্ত কার্যাদর্শীদের হস্তে
সমস্ত ভার থাকিবেক।ঋণ পরিশোধ হইলে ওই সময়ে যাহারা শাস্ত্রানুসারে আমার
উত্তরাধিকারী থাকিবেন তাহারা আমার সমস্ত সম্পত্তির অধিকারী হইবেন।.... ওই
উত্তরাধিকারীরা বয়:প্রাপ্ত হইলে কার্যাদরশিরা তাহাদিগকে সমস্ত বুঝাইয়া দিয়া
অবসৃত হইবেন ।" বীরসিংহ গ্রামের তাঁর পরিবার এবং অঞ্চলের বহু মানুষকে
সহযোগিতার জন্য মাসহারা পাঠাতেন তিনি । ১২৮০ সালের ২৫ শে পৌষ পিতা ঠাকুরদাস
বন্দ্যোপাধ্যায় কে পাঠানো চিঠি থেকে উল্লেখ পাওয়া যায় - '৮৩ টাকার হুন্ডি
পাঠাইতেছি, নিম্নলিখিত বিনিয়োগ করিবেন । নিজও খরচ পৌষ ৪৫
টাকা, সারদা দেবী ওই সাত টাকা ,মদনের
মাতা ওই আট টাকা, কালিদাস ভট্টাচার্য চার টাকা, নিস্তারিণী পিসি, ১২ টাকা ।' এ
ছাড়া তাঁর প্রিয় ভাই শম্ভু চন্দ্রকে লেখা একটি চিঠি থেকে পৌষ মাসের খরচের তালিকা
জানতে পারি। গ্রাম্যস্থ মাসহারা ৫০ টাকা স্কুল ১২০ টাকা, ডাক্তারখানা
২২ টাকা, গোপাল চন্দ্র ৩ টাকা শ্যামচরণ ৫ টাকা নীলাম্বর
ন্যায়লঙ্কার ৫ টাকা বিন্ধ্যবাসিনী দেবী ১ টাকা হরদাস তর্কালঙ্কার ৪ টাকা রাধামনি
দেবী ১ টাকা হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায় ৩ টাকা ইত্যাদি। এছাড়াও বীরসিংহ গ্রামে প্রতি
বছর শীতবস্ত্র দান করা থেকে দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর সময় খাওয়া-দাওয়ার জন্য প্রচুর
অর্থ ব্যয় করতেন তিনি। শম্ভু চন্দ্র বিদ্যারত্নের লেখা থেকে জানা যায় যে ক্ষীরপাই রাধানগরের
জমিদার বাড়ির বউ ও ছেলেরা তাদের দুরবস্থার জন্য বিদ্যাসাগরের কাছে শরণাপন্ন হলে
তিনি রাজা প্রতাপচন্দ্র সিংহের আত্মীয় কালিদাস ঘোষের কাছ থেকে এবং আরেকজনের কাছ
থেকে ৫০ হাজার টাকা করে প্রায় ১ লক্ষ টাকা ধার নিয়ে তাদের সহযোগিতা করেন। এইভাবে
একটু একটু করে জর্জরিত হতে থাকে ঋণ ভারে। তৎকালীন সময়ে ঈশ্বরচন্দ্রের বন্ধুবান্ধবরা
বহুভাবে তাঁর কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পান, তাদের মধ্যে
মাইকেল মধুসূদন দত্ত অন্যতম। বিদেশে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় যখন মাইকেল স্ত্রী
সন্তান নিয়ে থাকার সময় সমস্যার সম্মুখীন হন,আর্থিক সংকটের
জন্য দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রায় বিপন্ন এমনকি দেশ থেকে টাকা পাঠানো যখন বন্ধ হয়ে
যায় এমন অবস্থায় তিনি নিরুপায় হয়ে চিঠি লেখেন ঈশ্বরচন্দ্রকে। প্রথম চিঠি লেখেন
১৮৬৪ সালের ২রা জুন এবং দ্বিতীয় চিঠি লিখেন ওই বছরের ১৮ই জুন । মাইকেলের
দুরবস্থার কথা জেনে প্রথম চিঠি পাওয়ার পরই ১৮৬৪ সালের ২ রা আগস্ট প্রথম ধাপে প্রায়
দেড় হাজার টাকা পাঠান মাইকেল কে। এরপর সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে তিনি
অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও শ্রীশ চন্দ্র বিদ্যারত্নের কাছে ৩০০০ ও ৫০০০ টাকা ধার
নিয়ে মাইকেল কে পাঠান এবং মাইকেল ও তার পরিবারের আর্থিক সমস্যার সমাধান করে সকলকে
বাঁচার ব্যবস্থা করেন । ১৮৬৪ সালের ১৮ই ডিসেম্বর ঈশ্বরচন্দ্রকে একটি চিঠি লিখেন
কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে এবং চিঠি থেকে জানতে পারা যায় যে মাইকেলকে সাহায্য করতে
গিয়ে যথেষ্ট ঋণগ্রস্ত হয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র । মাইকেল চিঠিতে লেখেন--" আমি
বিলক্ষণ বুঝিতে পারিতেছি যে এ হতভাগার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিয়া আপনি এক বিষম বিপদ
জালে পড়িয়াছেন । কিন্তু কি করি ?
আমার এমন আর একটি বন্ধু নাই যে তাহার স্মরণ লইয়া আপনাকে মুক্ত
করি।"মাইকেল মধুসূদন বিদ্যাসাগরের সমস্ত ঋণ পরিশোধ করেছিল কিনা সে বিষয়ে
গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে। তবে ইন্দ্র মিত্রের 'করুণা
সাগর বিদ্যাসাগরে' লিখেছেন-" মাইকেলের জন্য বিদ্যাসাগর
যত ঋণ করেছেন সব টাকা মাইকেল নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে শোধ করেছেন। বিদ্যাসাগরকে
মুক্ত করেছেন।"
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কাজ হল বিধবা বিবাহ প্রবর্তন । বিদ্যাসাগর গবেষকদের গবেষণা দ্বারা জানা যায় যে
প্রায় ৬০ টির বেশি বিধবা বিবাহের অনুষ্ঠান আয়োজন করেন সম্পূর্ণ নিজে উদ্যোগে
। বিধবা বিবাহের সমস্ত খরচ যেমন পাত্রীর
অলংকার , তৈজসপত্র ,লোক খাওয়ানো প্রভৃতিতে প্রচুর অর্থ খরচ
করেন । এমনকি যেসব বিধবাদের বিয়ের ব্যবস্থা করতেন তাদের মাসিক ব্যয়ভারও বহন
করতেন তিনি । তৎকালীন সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ৬০ টির বেশি বিধবা বিবাহের জন্য খরচ হয় ৮৭
হাজার টাকা । বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করতে গিয়ে বিদ্যাসাগর যে বিপুল পরিমাণ
ঋণগ্রস্ত হয়েছেন সে কথা প্রকাশ করে সহযোগিতার জন্য জনগণের কাছে আবেদন জানান
হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকা। তবে হিন্দু পেট্রিয়টের এই ভাবনাকে বিদ্যাসাগর সমর্থন
করেনি এবং১৮৮৭ সালের ১ লা জুলাই পত্রিকায় লিখেছেন --" I had not and have not
the remotest idea of appealing to the public. I would not have feel it
necessary to remostrate against the agitation
. But the national object for which I am labouring has been so much mixed up
with me personality that I must protest against the move under notice and
request those gentlemen who have initiated it to desist in their efforts."
তবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ঋণগ্রস্ত হওয়ার জন্য
মানসিকভাবে বেশ চাপে ছিলেন। একদিকে তাঁর নিকট বন্ধু-বান্ধবরা কথা দিয়েও কথা
রাখেনি। বিধবা বিবাহের মতন সুদূরপ্রসারী বৃহৎ কর্মকাণ্ডের জন্য প্রচুর অর্থের
প্রয়োজন ছিল কিন্তু কেউ শর্তানুসারে মাসিক বা এককালীন চাঁদা দেয়নি। ফলত
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাঁধে সমস্ত আর্থিক চাপ এসে পড়ে। তাই তিনি মনস্থির করেন
যে পুরনো চাকরিতে পুনরায় ফিরে গিয়ে রোজগার করে সমস্ত ঋণ পরিশোধ করবেন । তার মনের
কথা জানানোর জন্য বিটন সাহেবকে একটি চিঠি লেখেন ---"my dear sir, I change
in circumstances compels me to trouble you with a request to do something for
me if possible. I am in difficulties and
I find it almost impossible for me to put over them without a fresh source of
income. About this time in the last year you were please to ask me whether I
was willing to recenter the public services. I think to expressed my
unwillingness at the time but what was then a matter of choice has now become a
matter of necessity." কিন্তু বিটন সাহেব তৎকালীন সময়ে সংস্কৃত কলেজের কোন
ধরনের ক্ষমতায় না থাকার জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ইচ্ছা পূরণ করতে পারেননি। ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের
সৎ জেদি মেরুদণ্ড সোজা রাখার ব্যক্তিত্ব পুরুষ
।জীবনে যাকে যা কথা দিতেন তা পালন করতেন নিষ্ঠার সাথে। তাই সমস্ত ঋণ পরিশোধ
করার জন্য নিজেই উদ্যোগী হন। তাঁর স্বপ্নের এবং সৃজনশীলতার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র প্রিয়
ছাপাখানাটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ১২৭৬ সালের ২৬ শে শ্রাবণ তার পরম বন্ধু
রাজকৃষ্ণ বাবুকে ও কালিচরণ ঘোষকে সংস্কৃত প্রেসের এক তৃতীয়াংশ চার হাজার টাকা
করে বিক্রি করেন এবং সেই সঙ্গে তাঁর সমস্ত
সম্পত্তি বিক্রি করে সমস্ত ঋণ পরিশোধ করেন। এই প্রসঙ্গে বিহারীলাল লিখেছেন
--" মৃত্যুর পূর্বে দেনা তিনি এক পয়সাও রাখিয়া যান নাই। বিদ্যাসাগর দেনা
করিয়াছিলেন অনেকেরই , দেনা রাখেন নাই কাহারো। পাওনাদার পাওনা ভুলিতেন
বিদ্যাসাগর দেনার কথা ভুলিতেন না।"
ভারতবর্ষ তথা বাংলার যুব পুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
আমাদের দিয়েছেন সৃষ্টিশীল এক সমাজ মানুষের কল্যানার্থে পরিপূর্ণভাবে চেষ্টা
করেছেন নিজের সর্বস্ব বিনিময়ে পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ব্যক্তিত্ব বিরল। ঈশ্বরচন্দ্র
চির প্রতিষ্ঠিত মুক্ত পৃথিবীর সৃষ্টির আনন্দে।
তথ্যসূত্র:---
১.. করুনা সাগর বিদ্যাসাগর-- ইন্দ্রমিত্র ।
২.. পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যাসাগর সংখ্যা ।
৩.. আকাশদীপ-- সম্পাদনা হরগোবিন্দ দলুই ।
৪.. ব্যক্তিগত ঋণ শিকার-- ডঃ সুভাষ রায় ।
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।
লেখক পরিচিতি -
অরিজিৎ হাজরা,পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়িতে বসবাস করেন । দীর্ঘ ২১ বছর ধরে শিক্ষকতার কাজে নিয়োজিত। নেশা হচ্ছে লেখালেখি এবং তথ্যের অনুসন্ধান করা। একজন প্রাবন্ধিক গল্পকার হিসেবেই বেশি পরিচিত ।
.jpg)

