কালীপদ
চক্রবর্তী–র
কবিতা “রিবুট করা প্রেম”-এর রিভিউ লিখেছেন ড. শিবশঙ্কর পাল
জীবন ও সাহিত্যের একটা বড় অংশই হচ্ছে প্রেম। যদিও প্রেমের নানা প্রকার আছে। সে প্রেম প্রকৃতি প্রেম, ঈশ্বর প্রেম, বই প্রেম, ভ্রমণ প্রেম আরও কত কি! সর্বোপরি মানব-মানবী প্রেম। এই প্রেমের আবর্ত-বন্ধনে জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। সাহিত্যের একটা বড় অংশ এই প্রেমের প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ছিল এবং আছে। ভবিষ্যততেও থাকবে। তবে সময়ের স্রোতে প্রেমের ধরন, প্রকারে এসেছে বিবিধতা। মনে মনে প্রেম থেকে, চোখে চোখে, পত্রালাপে, তাম্বূল প্রেরণে, সিঁধ কেটে প্রেম বিনিময়ের সময় কাল আজ অতীত। প্রেমে এসেছে দেহ। সশরীরী উপস্থিতি। বর্তমান প্রযুক্তির সময়ে দূরদর্শনও চলে এসেছে হাতের মুঠোয়।
প্রবীণ অতচ একালের প্রেমবিকাশের রোজনামচার তালুক সন্ধান
রাখেন মাননীয় কালীপদ চক্রবর্তী মহাশয়। 'রিবুট করা প্রেম' তারই
শাব্দিক বয়ান। বেশি করে বললে বলতে হয়, মনস্তাত্ত্বিক
বিশ্লেষণও। মনস্তাত্ত্বিক এই কারণেই যে, প্রেমের দড়িকে
নিয়ন্ত্রণ করে যে মন, সেই মনটাই প্রযুক্তির অঙ্গুলিহেলনে
বাঁধা আছে এখন। বর্তমান প্রেম যে অনেকটা
মেকি, একটা 'ক্লিকে' শুরু ও শেষ হয়, সেটা গুছিয়ে তুলে ধরেছেন অখ্যাত এই
কবি। মনের সংযোগটা হয়েছে ওয়াইফাই কানেকশনের মতো। যা নিমেষে শুরু হয়। ইচ্ছে করলে
নিমেষেই লগআউট হওয়া যায়। পুরোটাই মনের ব্যাপার। আর এই মনটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে প্রযুক্তি।
লম্বা চওড়া ডিসপ্লের ফোন। কাউকে ফোনে
আপনি দেখলেন, তাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠালেন। সে গ্রহণ করলে
আপনার বৈদ্যুতিন প্রেম-প্রস্তাব। শুরু হল ফোনে ফোনে প্রেম।
মাঝে রেস্টুরেন্টে একটা ঠাণ্ডা পানীয় হাতে দেখা হল, কথা হল, পরবর্তী ডেটিঙের স্থান নির্বাচিত হল একালের
যুবক-যুবতীর মধ্যে। অবশ্য এই ধরনের প্রেম বহু মাঝবয়সী, পৌঢ়
পৌঢ়ার মধ্যেও চালু হয়েছে। যেখানে কে কাকে কখন কোথায় দেখা
করবে তা কেউ জানেনা। জানে শুধু ওই ফোন-দুটি। যাইহোক, উত্তর আধুনিক প্রেমের স্বরূপ তুলতে গিয়েও কবি কিন্তু শেষের দিকে একটু থমকে
দাঁড়ালেন। কেন? কেননা যে প্রেমের ভাগ্য নির্ধারণ করে
প্রযুক্তি, যে প্রযুক্তি মনের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে,
সেই মনটাকেই আদতে খুঁজেছেন কবি। আমাদের মনের সত্যি যে চাওয়া,
মনের যে অব্যক্ত প্রেম তাকে কি সার্চ করলেই পাওয়া যায়। কারও মনের
গঠন না বুঝে, বহুদিন আগুনে না পুড়ে সত্যি কি প্রেমকে যাচাই
করে দিতে পারে নানা অ্যাপ। সে ডেটিং অ্যাপ হোক বা হোক ওয়েডিঙ অ্যাপ। কবির সন্ধান
ঠিক ওখানেই। ওখানেই কবির আত্ম-জিজ্ঞাসাও। পক্ষান্তরে এই প্রশ্ন তথাকথিত প্রযুক্তির
দিকেও। যখন কবি আমি,আপনি সকলেই কাকভোরে উঠে মনের সঙ্গে আলাপ
করতে বসি, ফোনটা হাতে নিই তখন সত্যিই তো ফিল্টার করা হাসি,
এডিট করা ছবি-জীবন ছাড়া কিছুই খুঁজে পাইনা। প্রযুক্তি সন্ধানকে সহজ
করে দিতে পারে, কিন্তু মনের সঙ্গে মনের মিলনকে কি
আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে পারে? 'সেদিন চৈত্রমাস, তোমার চোখে দেখেছিলেম আমার সর্বনাশ'ও তো হতে পারে!
বিশেষত এই ফোনের চক্করে পরে। আমরা তো তার বহু উদাহরণও দেখতে পাই খবরের পর্দায়।
পাইনা কি! হয়তো এই ভীতিও কবির কলমে উঠে এসেছে। কিন্তু সেটা এতো নিভৃতে আছে যে,
তাকে চট করে বোঝা যাচ্ছেনা। তবে এই আতঙ্ক যে আছে তা প্রমাণ দিচ্ছে
কবিতার শেষ স্তবকটি। প্রকৃত প্রেমে নেটওয়ার্ক লাগেনা, লাগে
না অ্যাপের সহায়তা। তা তো সহৃদয়-হৃদয় মিলন। নিঃশর্ত আত্মদান, একে অপরে বিলীন হওয়া। 'সে ভোলে ভুলুক কোটি মন্বন্তরে,
আমি তারে ভুলিব না'। আজকের প্রেম যেন 'এহো বাহ্য আগে কহো আর'। চোখের চটকে পথ ভুলে যাওয়া,
অনেকটা ভুল করা। যদিও ব্যতিক্রম থাকতেই পারে, তবে
ব্যতিক্রমকে সাধারণ চরিত্র ভাবাটা হয়তো ভুল। ধরতে গেলে বৈষ্ণব পদাবলী থেকে একালের
কবিতা সবই তো প্রেম। সে প্রেমে কোনও প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়নি। মানের বোধই যথেষ্ট
ছিল। অঙ্ককষে অ্যালগরিদম করে হিসাব ঠিক করা যায়, তা বলে মনের
হিসাবও করে দেবে গণিতের ডিভাইস? মনের গতিপথ কি এডিট করা যায়!
হয়তো করা যায়না। তা করতে পারে শুধু নিজের মন। যার তথ্য স্বয়ং আমরা কেউ সঠিক ভাবে জানিনা। তাই ভোর হলে, নিভু আলো জ্বললে,
রাত এলে মনের বিস্তারে আসে প্রসারতা। একাকীত্বে আসে তন্ময়তা,
মন্ময়তা ও প্রেম। তখনই স্মরণে আসে সে। তখন ফোন ছাড়াই হয় কথার বিনিময়। ভাবমিলন ও প্রেম— 'যাকে কোনও অ্যাপ
চিনতে পারে না,/ কোনও অ্যালগরিদম মুছতে পারে না।'
লেখক পরিচিতি—
কবি ও কবিতা বিশ্লেষক। প্রাবন্ধিক। লোকসংস্কৃতির
ক্ষেত্র-সমীক্ষা ভিত্তিক গ্রন্থ রচয়িতা। নানা লোকসেবামূলক সংস্থার সদস্য।
