হপ্তাখানেক
আগে একদিন অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাস থেমেছিল মাণিকতলা খালপাড়ের কাছে।
সিগন্যালের লাল আলোর কারণে। অমৃত বসেছিল মিনিবাসের জানলার ধারে। বাইরের দিকে চেয়ে।
সিগন্যালে
গাড়ি থেমে যাওয়ার কারণে যেমনটা হয়, উল্টো দিকের পায়ে হাঁটা মানুষ দল বেঁধে রাস্তা পার হচ্ছিল। তাদের মধ্যে
থেকে একজন হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়ে বিহ্বল চোখে এপাশে ওপাশে তাকাচ্ছিল। লোকটির হাত
ধরে জামা গায়ে একটি কিশোরী মেয়ে।
এটা
একটা চেনা দৃশ্য। এমনটা প্রায়ই হয়ে থাকে।
পরিচিত
দৃশ্যটা আজ অমৃতর চোখে একটু অন্যরকম লাগল। থমকে দাঁড়িয়ে পড়া লোকটির মুখটি তার খুব
চেনা মনে হল। সময়ের প্রলেপ পড়েছে সে মুখে। তারপরেও একমুখ দাড়ি গোঁফের জঙ্গলের
আড়ালে ঢাকা মুখটি, অমৃতর চোখে প্রায় একইরকম দেখতে লাগল। অমৃত লোকটির নাম ধরে ডাকল।
সে ডাক
শুনে লোকটি দ্রুত ঘার ঘুরিয়ে বাসের দিকে তাকাল। বাসের জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে অমৃত
আর একবার ডাকা মাত্রই, সিগন্যালের আলো বদল হল।বাস চলতে শুরু করল।
অমৃতের
মনের মধ্যে অস্বস্তি শুরু হল। চৌকো ধরণের চেনা মুখ। লোকটি যদি হেসে হাত তুলে জানান
দিত যে সে অমৃতর ডাক শুনতে পেয়েছে, তাহলে গোঁফ দাড়ির আড়ালে থাকা মুখটির ওপর সারির পাশাপাশি তিনটি ভাঙ্গা দাঁত
অমৃতর নজরে পড়ত। সে একশভাগ নিশ্চিত হোত, পনের বিশ বছর আগে দেখা লোকটিকে সঠিকভাবে আইডেন্টিফাই করতে পেরেছে।
কিন্তু
এ সবের পরেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। লোকটি এখানে কেন? সঙ্গে হাত ধরা কিশোরীটিই বা কে?
গতকাল
আবার অফিস থেকে ফেরার পথে মানিকতলা খালপাড়ের সিগন্যালে বাস থেমে গেল। অমৃত সিট
ছেড়ে উঠে পড়ল। কনডাক্টারের হাতে টিকিটের মূল্য ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত বাস থেকে নেমে
পড়ল।
এই
এলাকাটি অমৃতর চেনা। এ পথেই তার অফিস যাতায়াত। কিন্তু এ রাস্তা সে পায়ে হেঁটে পার
হয়নি কোনদিন। আজই প্রথম। তার ধীর পায়ে হাঁটা এবং তীক্ষ্ণ চোখে বস্তির ঝুপড়িগুলিকে
নজর করা দেখে, যে কেউ
বুঝতে পারবে সে কিছু একটা খুঁজছে। সেটি কোন মানুষ বা বিশেষ কোন বস্তু, আবার অন্য কিছুও হতে পারে।
এ
অঞ্চলটায় অনেক মানুষের ভিড়। বিভিন্ন বয়সের মানুষ। তাদের মধ্যে কমবয়সী কিছু
ছেলেমেয়ে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এ ওর হাত ধরে, কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে রীতিমত হুল্লোড় করছে। যানবাহনের আলোয় স্পষ্ট দেখা
যাচ্ছে পাতলা কুয়াশার মতো ধুলোর আস্তরণে চারপাশ ঢেকে রয়েছে।
অমৃত
পকেট থেকে রুমাল বার করে মাস্কের মতো করে সেটিকে মুখের ওপর জড়িয়ে নিলো।
এই
অঞ্চলটিতে কোন বাসগৃহ নেই। যা আছে সেগুলিকে ছাউনি বা ঐ জাতীয় কিছু বলা যেতে পারে।
দরজা জানলা বলতে কিছুই নেই। পুরনো দরমা, ভাঙ্গা টিন অ্যাসবেসটস এইসব দিয়ে দেওয়াল তৈরি হয়েছে। পলিথিন, ছেঁড়া ত্রিপল, পুরু চটের বস্তা দিয়ে মাথা ঢাকা।
এমন
বামন উচ্চতার ছাউনি অমৃত আগে কোনদিন এত কাছ থেকে দেখেনি। তার ধারণায় এখানে যারা
বাস করে, চেহারার আদলে তাদের
মানুষের মতো দেখতে হলেও, আদিম গুহা মানবের মতো তারা হামাগুড়ি দিয়ে এই ছাউনিগুলির মধ্যে ঢোকে এবং
বেরোয়।
এ যেন
চেনা শহরের মধ্যে অবাক করে দেওয়ার মতো অদ্ভুত এক স্থান। সুন্দর পোশাকের আবরণে ঢাকা
দগদগে ঘায়ের মতো। দেখলে গা শিউরে ওঠে। এড়িয়ে
যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সহনাগরিক হিসাবে অস্বীকার করা যাবে না।
অমৃত
হয়ত একটু অন্যমনস্ক ছিল। খেয়াল করেনি কখন কোন ফাঁকে চার পাঁচটি মাঝবয়সী ছেলে তার
সামনে এবং দুপাশে একটি বূহ্য তৈরি করে তাকে ঘিরে ফেলেছে।
- কি চাই?
অমৃত
ছেলেগুলির মুখের দিকে চেয়ে বুঝতে পারল এদের সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলা যাবে না।
- আমি
একজনের খোঁজ করছিলাম। অমৃত নরম গলায় বলল, তার নাম মাধব হালদার। আমাদের দেশের মানুষ। আমরা মাধব কাকু বলে ডাকতাম।
পুজোআচ্চা করত। ম্যাজিক দেখাতে জানত। গানও গাইত ভাল।
- তাতে
কি হল? রুক্ষ গলায় জানতে চাইল
একটি ছেলে।
- আমি
তাকে দেখেছি । হয়ত এই অঞ্চলে বা আশেপাশে কোথাও থাকে। যদি তোমরা তার খোঁজ দিতে পার, তাই ..........!
- দাঁড়ান।
দাঁড়ান। দ্বিতীয় একটি ছেলে হাত নেড়ে প্রথম ছেলেটিকে থামার ইঙ্গিত করল। তারপর কয়েক
মুহূর্ত চোখবুজে কি যেন ভাবল।
অমৃত
কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই চোখ খুলে ছেলেটি অমৃতকে থামিয়ে দিল, আপনি যে নামটা বলছেন, ওই নামে এখানে কেউ থাকে না। একজন আছে। পুজো
করে। তার নাম মৃত্যুঞ্জয় হালদার। দীপু মালার বাবা। এক মুখ দাড়ি গোঁফ আছে। তাই তো?
- একস্যাক্টলি।
মিলে যাওয়ার আনন্দে অমৃত একটু জোরেই বলে উঠল, মুখটা চৌকো টাইপের। ওপরের সারির পরপর তিনটে দাঁত আধভাঙ্গা। কথা বললে বা
হাসলে পরিষ্কার দেখা যায়।
- আপনি
কি ওদের বাড়ি যাবেন? ছেলেটি জানতে চাইল, সামনে খানিকটা এগিয়ে, বাঁ দিকে ঘুরে, খালের গা ঘেঁসে। যাকে জিজ্ঞেস করবেন মালাদের বাড়ি, সে-ই দেখিয়ে দেবে। এখন হয়ত বাড়িতে নাও থাকতে
পারে। বউ ছেলে মেয়েকে পেতে পারেন।
খালের
ধার ঘেঁসে ঘুপচি ছাউনির মধ্যে মাধব কাকু! কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে ছবিটা
ভাবতেই অমৃত মুষড়ে পড়ল। মন খারাপ হয়ে গেল। হয়ত এমনটা সে দেখতে চাইছে না বলেই।
হাতঘড়ির
দিকে চেয়ে ছেলেগুলির উদ্দেশে বলল, আজ দেরী হয়ে গেছে। আজ আর যাব না। জায়গাটা যখন চিনে গেলাম, একটা ছুটির দিনে হাতে সময় নিয়ে আসব।
(দুই)
বাড়ি
ফিরে অমৃত তার স্ত্রী পর্ণাকে ঘটনাটির সম্পর্কে একটি কথাও বলল না। তার মনের মধ্যে
অনেক প্রশ্ন। সেই প্রশ্নগুলির সত্যতা, কার্যকারণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে এবং সেগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির
উপায় অনুসন্ধানের তাগিদও বোধ করছে। তারপরেও যেন তার চোখমুখে অস্থিরতার কোন প্রকাশ
না ঘটে, সেজন্য পর্নাকে বলল, অফিসে ভারি করে খাওয়াদাওয়া হয়েছে। জলখাবার
খাব না। শুধু এক কাপ চা দাও। আমি আমার ঘরে আলো নিভিয়ে শুয়ে একটু রেস্ট করি।
বিছানায়
শুয়ে দুচোখ বন্ধ করা মাত্রই মাধব কাকুর মুখটা অমৃত স্পষ্ট করে দেখতে পেল। মুখটা
দেখতে সুশ্রী না হলেও, ভাঙ্গা দাঁতের হাসিটায় একটা অদ্ভুত জাদু ছিল। ছোট বড় সকলকেই টানত সে হাসি।
আর এটাও সকলে মানত, মাধব কাকুর হাসির মধ্যে কোন ছল ছিল না।
মফস্বলে
অমৃতর দেশের বাড়ি, যেখানে সে বড় হয়েছে, সেই অঞ্চলে মাধব কাকুদের একটা পারিবারিক পরিচিতি ছিল। বাবা জ্যাঠা কাকারা
সকলে লেখাপড়া জানা মানুষ। সরকারি চাকরি, স্কুল মাস্টারি এই ধরণের পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাদের ছেলে মেয়েরাও মন দিয়ে
স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে। তারা নিচু গলায় কথা বলে। বয়স্কদের সম্মান করে।
পারিবারিক
এই আবহাওয়া এবং পরিবেশের মধ্যে মাধব কাকুই ছিল ব্যতিক্রম। স্কুলের গণ্ডী পেরোতে
পারেনি। জীবনে কিছু করতে হবে, স্থায়ী রোজগারের চিন্তা ভাবনা এসবের কোন চেষ্টাই ছিল না মাধব কাকুর মধ্যে।
পরিবর্তে
বয়োকনিষ্ঠদের সঙ্গে মেলামেশা। পাড়ার যে কোন অনুষ্ঠানে, জান-প্রাণ লড়িয়ে পরিশ্রম করা। যে কোন
মানুষের বিপদেআপদে সবার আগে ছুটে যাওয়া। মাধব কাকু মানে এমনটাই। কিশোরদের মধ্যে
তুমুল জনপ্রিয়তা। তাস, রুমাল, টুপি, দেশলাই বাক্সের ম্যাজিক দেখিয়ে ছোটদের তাক
লাগিয়ে দেওয়া। আর যে কেউ অনুরোধ করা মাত্রই, যেখানে সেখানে বসে চোখ বুজে গান শুরু করা। একেরপর
এক গান গেয়ে যাওয়া – এই সব মিলিয়ে, পরিবারের মধ্যে ব্যতিক্রমী কিন্তু এলাকায়
সবার প্রিয় একটি নাম মাধব হালদার। অমৃতদের মতো কিশোরদের চোখে খোলা মনের রংবাহারি
এক মানুষ।
প্রবীণ
প্রবীণাদের কাছেও মাধব একটি প্রিয় নাম। লেখাপড়ায় জুতসই না হলেও, ইতু, ষষ্ঠী থেকে যে কোন ছোটখাটো পুজোয়, মেয়েদের বারব্রতয় মাধবের তুল্য পুরোহিত মেলা ভার। কোনরকম দাবিদাওয়া নেই।
আচার অনুষ্ঠানে কোন ফাঁক নেই। লেখাপড়া জানা শিক্ষিত মানুষও স্বীকার করত, পুজো ভেদে মাধবের মন্ত্র নির্বাচনে কোন ভুল
নেই। মন্ত্র উচ্চারণেও কোন জড়তা নেই।
মাধব
কাকুর গায়ে লেপ্টে থাকত, হালদার বাড়ির বিহারী কাজের ছেলে রাম-পূজন। দুজনের বয়সও ছিল কাছাকাছি।
রাম-পূজন কয়েকজনের কাছে বেফাঁস বলেও ফেলেছিল, মাধব কাকু নাকি যে কোন দিন বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে। তাকে বলেছে, পাহাড়ে গিয়ে ঠাকুর দেওতার ধ্যান করবে। অনেক
বছর পরে বাড়ি ফিরবে যখন, তখন মাধব কাকুর মাথায় ইয়া লম্বা জটা। দাড়ি ঝুলে বুক ছাড়িয়ে পেট পর্যন্ত
নেমে যাবে। হিন্দিতে বাতচিত করবে।
কলেজ
জীবন শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই দেশের বাড়ির সঙ্গে অমৃতর
যোগাযোগ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে আজ অনেক বছর হয়ে গেল, একরকম ছিন্নই হয়ে গেছে।
অমৃতর
পরিবারের নিকটজনেরা তারই মতো দেশ ছেড়েছে পনের বিশ বছর হয়ে গেল।
চায়ের
কাপ হাতে ঘরে ঢুকে পর্ণা সুইচ টিপে বড় আলো জ্বালল।
অমৃত
বলল, বড় আলোটা নিভিয়ে দাও।
- চা-টা
খাবে তো?
- নাইট
বাল্বের আলো-ই যথেষ্ট।
- তোমার
কি শরীর খারাপ?
- কই না
তো। বলতে বলতে অমৃত বিছানায় উঠে বসল, বলতে পার মন খারাপ।
পর্ণা
উৎকণ্ঠিত গলায় বলল, কেন? কি
হয়েছে?
- এক
কলিগ খুব অসুস্থ। সামনের রবিবার তাকে দেখতে যাব। তার বাড়িতে। সারাদিন তোমায় একা
থাকতে হবে। ফিরতে রাত হতে পারে। হাওড়া থেকে ট্রেনে যাতায়াতে ঘণ্টা পাঁচেকের মত সময়
লাগবে। একটু দেরী হলে চিন্তা কোর না। কোলাপসেবল গেটটায় তালা লাগিয়ে দেবে। সন্ধ্যে
থেকেই বারান্দার আলোটা জ্বালিয়ে রাখবে। যাতে বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারে যে
বাড়িতে তুমি একা আছ।
(তিন)
একে
ছুটির দিন। তায় আবার সাতসকালের ট্রেন এবং আপের মানে হাওড়ার উল্টোমুখো হয়ে ছুটছে।
কামরাটা একরকম ফাঁকাই বলা যেতে পারে। অমৃত বসেছে জানলার ধারে। ট্রেনের গতিমুখের
উল্টোদিকে। এখন আশ্বিনের মাঝামাঝি। বাতাস খুব ঠাণ্ডা না হলেও গা শিরশিরানি আমেজী
ভাব রয়েছে। বহু বছর পরে কলকাতা ছেড়ে আজ একা পথে অমৃত। সে যাচ্ছে তার দেশের বাড়িতে।
যেখানে তার জীবনের অনেকগুলি বছর কেটেছে।
আড়াই
ঘণ্টার মতো সময় লাগল গন্তব্যে পৌঁছতে। ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মে পা রাখা মাত্র
অমৃতর শরীরের মধ্যে অদ্ভুত শিহরণ হল। ঝকঝকে নীল আকাশ। রোদের তেজও তেমন কড়া নয়।অল্প
অল্প হাওয়াও দিচ্ছে।
বহু
বছর পরে আজ অমৃত এখানে আসবে জেনেই যেন প্রকৃতি বরণডালা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
দুচোখ বুজে অমৃত কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হঠাৎই ঝুপ করে নিচু হয়ে মাটিতে
হাত ঠেকিয়ে সে হাত নিজের কপালে ছোঁয়াল। এখন এই মুহূর্তে অমৃতর মনে হচ্ছে পর্ণাকে
সঙ্গে আনতেই পারত। অমৃত যে এসেছে তার প্রিয় একজন মানুষের খোঁজে, এটা জানতে পেরে হয়ত পর্ণারও ভাল লাগত। অমৃত
কেন তাকে সত্যি কথাটি বলেনি, এই সব মান অভিমান ভুলে, পর্ণা তার অচেনা অদেখা মাধব কাকুর খোঁজে, অমৃতর চেয়েও আরও বেশী উৎসাহী হয়ে উঠতে পারত।
স্টেশনের
বাইরে এসে অমৃত খুব অবাক হল। এতটাই যেন সে এই জায়গাটায় আজই প্রথম আসছে। চেনা ছবিটা
আমূল বদলে গেছে। বিশাল পলাশ গাছটি, যার নিচে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো লম্বা দুটি ধাপিতে আগত ট্রেনের অপেক্ষায়
যাত্রীরা বসে থাকত, হকাররা তাদের মালপত্র গোছগাছ করত, বিকালে স্টেশন সংলগ্ন অঞ্চলের বয়স্ক বাসিন্দারা গল্পগুজব করত, সেই গাছটিকে কেটে ফেলা হয়েছে। ধাপি দুটিরও
আর কোন অস্তিত্ব নেই। সমস্ত জায়গাটা জুড়ে দোতলা একটা বিল্ডিং তৈরি হয়েছে। স্টিলের
তৈরি বড় হরফে লেখা – 'বিগবাজার'।
কালুদার
চায়ের দোকানটি অমৃতর নজরে পড়ছে না। আগে যেখানে সার দিয়ে রিক্সা দাঁড়িয়ে থাকত, এখন সেখানে অ্যাডভানস টিকিট বুকিং কাউন্টার।
লম্বা
একটি ঝিল ছিল। যার অপরপারে বিস্তৃত ফাঁকা জমি। সে জমিতে রীতিমত চাষ আবাদ হোত। এখন
সেই জমি জুড়ে সারি সারি হাউসিং কমপ্লেক্স।
সিঁড়ি
বেয়ে নিচে নেমে বেশ খানিকটা পথ হেঁটে এসে তেমাথার মোড়ে অটো স্ট্যান্ড থেকে অমৃত
অটোয় চড়ে বসল। ড্রাইভার ছেলেটিকে বলল, লিচুতলা। জ্ঞানেন্দ্রনাথ বয়েজ স্কুলের সামনে।
নিজের
পাড়াতেও অনেক কিছু বদলে গেছে। জোড়া-পুকুরের মাঝ বরাবর পায়ে চলা সরু একটি মাটির
রাস্তা ছিল। সেটি আর নেই। পুকুরটার অর্ধেকের বেশী অংশ বুজিয়ে সেখানে রাজনৈতিক দলের
অফিস। হনুমান মন্দির। গুমটি তিন চারটি দোকান ঘর। কোলেদের অত বড় ফলপাকুড়ের বাগানটা
সাফ করে সেখানে হাল ফ্যাসানের চমৎকার বসতবাড়ি তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ বাড়িতে চারচাকার
গ্যারেজ ঘর।
অমৃতদের
পৈতৃক বাড়ি তো আগেই বিক্রি হয়ে গেছে। আর এই নতুন ঝাঁ চকচকে বাড়িগুলির মধ্যে বিসদৃশ
দৃষ্টিকটূভাবে দাঁড়িয়ে হালদারদের পুরনো বাড়িটির এক অংশ। বিক্রিত বাকি অংশে জি
প্লাস ফোর হাউজিং কমপ্লেক্স। যার গ্রাউন্ড ফ্লোর জুড়ে ইয়ামা মোটর সাইকেলের শোরুম।
তার গায়ে গা লাগিয়ে একটি বিউটি পারলার।
পুরনো
বাড়িটির অবশিষ্ট অংশটির দিকে চেয়ে অমৃতর খুব কষ্ট হল। স্বজন হারানো কষ্টের মতো।
বাড়িটার শরীর জুড়ে লতাগুল্মের জঙ্গল। দোতলার একটি জানলার গা ঘেঁসে গজিয়ে ওঠা অশ্বথ
গাছের শিকড় দেওয়াল বেয়ে নেমে এসেছে মাটির কাছ বরাবর। শিকড়ের চাপে দেওয়ালের
অনেকখানি অংশ ফেটে গেছে। দোতলার একটি ঘরেরও দরজা জানলা নেই। হয় পরিচর্যার অভাবে
নষ্ট হয়ে গেছে। তা না হলে চুরি হয়ে গেছে। প্লাস্টার খসে পড়েছে। চুন সুরকির
গাঁথনিতে আটকে থাকা নুড়ি ইঁট বেরিয়ে পড়েছে।
নিচের
তলায় একটি পরিবার বাস করে। পথ চলতি কমবয়সী একটি মেয়ে জানাল।
অমৃতর
কৌতূহল বেড়ে গেল। তার হিসেব মতো এমন ভাঙ্গাচোরা বিপজ্জনক বাড়িতে মাধব হালদার ছাড়া
আর কারোর থাকার কথা নয়। কিন্তু তার হদিশ অমৃত পেয়েছে। সে এখন মানিকতলা খালপাড়ের
বস্তির বাসিন্দা। নাম পাল্টে মৃত্যুঞ্জয় হালদার। সেখানে বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘর সংসার
করছে। তাহলে কি অন্য কেউ? কোন জবর দখলকারী?
অমৃত
দরজার কড়া নাড়ল। ভিতর থেকে মেয়েলী গলায় সাড়া পাওয়া গেল, কে?
- নাম
বললে চিনবেন না। অমৃত বলল।
- কি
দরকার?
- দরজাটা
না খুললে বলব কেমন করে?
খুট
করে খিল খোলার আওয়াজ শোনা গেল।
দরজাটি
অল্প ফাঁক করে, মাথায়
ঘোমটা কমবয়সী একটি মহিলা মুখ জানতে চাইল, কাকে খুঁজছেন?
- এ
বাড়িতে কি আপনারা থাকেন?
- হ্যাঁ।
- আপনার
স্বামীকে একবার ডাকুন। আমি দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে আছি।
- কেয়া
হুয়া? কোন আয়া?
পুরুষ
কণ্ঠের এই প্রশ্ন দুটি শুনে অমৃতর বুকের মধ্যে আনন্দের ঢেউ আছড়ে পড়ল। উঁচু গলায়
বলল, রাম-পূজন আমি তোমার গলা
চিনতে পেরেছি। দরজায় এসে দেখ, তুমি আমায় চিনতে পারছ কিনা?
স্যাঁতসেঁতে
ঘরের চৌকির বিছানায় বসে রাম-পূজন অমৃতর দুহাত জড়িয়ে ধরে বলল, বাবুজির কি দয়া। আমায় মনে রেখেছেন। কত বরষ
পর পুরানা আদমির সঙ্গে দেখা হল।
- তোমায়
ভুলব কেমন করে? অমৃত
বলল, তুমি আমার মাধুকাকার
গায়ে জড়িয়ে থাকতে।
- ও আদমি
তো! বলে রাম-পূজন চোখ বুজে কপালে হাত
ছোঁয়াল, সাধু-সন্ত আছে।
- সে এখন
কোথায়? রামপূজনের মুখের দিকে
চেয়ে প্রশ্নটা করল অমৃত।
- মালুম
নেহি। মাথা দুলিয়ে বলল রাম-পূজন, কিন্তু আছে। সাচ বলছি বাবুজি। ধ্যান জপ করছে। কোই দূর দেশমে। উঁচা পাহাড়
নেহি তো নদীকে কিনারে। দেওতা কি দর্শন মিলনে কি পাশ তপস্যা করছে। লোট আয়েগি। জরুর
লোট আয়েগি।
রাম-পূজন
অমৃতর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল পাশের ঘুপচি মতো একটি ঘরে। ধূপের গন্ধে ভরে আছে ঘরের
বাতাস। সুইচ টিপে ঘরের আলো জ্বালল রাম-পূজন।কাঠের সিংহাসনে ফ্রেমে বাঁধানো একটি
ছবি। নানা রংয়ের কাগজ কেটে তৈরি মালা ছবিটিকে চারপাশ দিয়ে ঘিরে রেখেছে।
ধূপদানিতে
জ্বলন্ত ধূপকাঠি। পিতলের ডিসে গুটিকয় এলাচদানা। তার পাশে স্টিলের ঘটিত জল !
দাড়িগোঁফে
ঢাকা হাস্যমুখের একটি ছবি। ওপরের সারির তিনটি দাঁত অর্ধেক ভাঙ্গা। তারপরেও হাসিটি
বড় ইনোসেন্ট।
(চার)
রামপূজনের
বিশ্বাস, তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে
মাধুকাকা তার দেশের বাড়িতে ফিরে আসবেই। আর সেদিন এই ভেঙেপড়া আধখানা বাড়ি মন্দির
হয়ে যাবে।
দূরদূরান্ত
থেকে মানুষ ছুটে আসবে। তখন এটা আর বাড়ি নয়, তীর্থক্ষেত্র হিসাবে গণ্য হবে।
রামপূজনের
কথার কোন বিরোধিতা করেনি অমৃত।
একটা
ট্রেন মিস করার জন্য ঘন্টাখানেকের বেশী সময় ধরে স্টেশনে অপেক্ষা করতে হল অমৃতকে।
বেঞ্চে একা বসে।
বহু
বছর পরে এত দীর্ঘ সময় ধরে নিজেকে একা পেল অমৃত। কিন্তু তার পরেও নিজেকে নির্ভার
চিন্তামুক্ত মনে হচ্ছে না তার।
শত
চেষ্টাতেও কিছু চিন্তাকে মাথা থেকে সরিয়ে ফেলতে পারছে না। তারা আবর্তিত হচ্ছে
মাধবকাকুকে ঘিরে।
অমৃতর
ফেলে আসা জন্মভূমি ! হারিয়ে যাওয়া কিশোর বেলা ! প্রিয় মাধব কাকু ! রংবাহারি যাদুকর মাধব কাকু। অবাক করা মাধব কাকু
!
অজান্তেই
অমৃতর বুকের মধ্যে থেকে গভীর শ্বাস বেরিয়ে এলো।
মাধব
কাকু এখন ঠিক কোথায় !
লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
লেখক পরিচিতি –
লেখালিখির শুরু গত শতকের শেষ দশকে। বাণিজ্যিক পত্রিকার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে
লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি। গল্প সংকলন আটটি এবং তিনটি উপন্যাস।
.jpg)