Advt

Advt

gariyasi-galpo-story-by-bimal-gangopadhaya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-গরীয়সী-গল্প-বিমল-গঙ্গোপাধ্যায়

gariyasi-galpo-story-by-bimal-gangopadhaya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-গরীয়সী-গল্প-বিমল-গঙ্গোপাধ্যায়

এই আত্মা অজর অমর শাশ্বত এবং পুরানো। শরীরকে হনন করলেও ইনি নিহত না। থেমে থেমে নাটুকে গলায় কথাগুলি বলে ঠাকুর মশাই। চোখ দুটি বোজা। মুখমণ্ডল জুড়ে হাসি হাসি ভাব।

বদ্যিনাথ চাটুজ্যে নিম্নবর্গীয় মানুষজনের মধ্যে ঠাকুরমশাই নামে পরিচিত। অন্যত্র তার পরিচয় তৃতীয় শ্রেণীর পুরুত ঠাকুর। সিকিটা আধুলিটা পেলেই যে যত্রতত্র আচমন করে আসন গ্রহণ করে। তার বাঁধা যজমান নেই। পালপার্বণে বাবুদের মেয়ে বউরা সেদিনের ছোকরা উমানাথকে ডাকে। বদ্যিনাথের কথা তাদের মাথায়ও আসে না। বদ্যিনাথ যে কেবলমাত্র একটিই সংস্কৃত শ্লোক জানে, অজো নিত্য শাশ্বত হয়ং পুরানো। ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।

শ্রাদ্ধ বিবাহ অন্নপ্রাশন, যে কোন অনুষ্ঠানে সে এই শ্লোকটি উচ্চারণ করে একাধিকবার। সঙ্গে সঙ্গে বাংলা তর্জমাও। সম্প্রতি গড়ের ধারের একদল ফচকে ছেলে বদ্যিনাথকে সাইকেল থেকে নামিয়ে 'শাশ্বত' বানান, 'হনন' শব্দের অর্থ এবং 'ইনিটি কিনি' এমনি সব প্রশ্নে জেরবার করে, খেরোর গামছা একখানা, অপুষ্ট দুটি কলা ও শুকনো একটি লেবু তার থেকে কেড়ে নিয়েছে। সঠিক উত্তর দিতে না পারার জরিমানাস্বরূপ। বদ্যিনাথ মোটেই দুগ্ধপোষ্য শিশু নয়। এমন কিছু নির্বোধও নয়। ঘটনার মধ্যে লজ্জার যথেষ্ট কারণ আছে এটুকু বুঝতে পেরে সে সাবধান হয়ে গেছে। গড়ের ধারের পথ দিয়ে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু তাতে তো আর সব রক্ষে হয় না। শেষ রক্ষেও হয় না। পথে ঘাটে বদ্যিনাথের সাইকেলের ঘণ্টি শুনে মানুষজন এখন এমন অবাক বিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকায় যেন এ শহরে সে নতুন আগন্তুক বা কয়েদখানা ফেরত কোন দাগী আসামী। তারক মুদি নাকি দোকানে বসে রসিয়ে রসিয়ে গড়ের ধারের ঘটনাটা আদ্যন্ত গল্প করে। খদ্দেররা হাঁ করে শোনে। টীকাটিপ্পনী কাটে। যার যা কাজ সে তো তা করবেই। বদ্যিনাথ মনকে প্রবোধ দেয়। যে খদ্দেররা তারক মুদির মুখে বদ্যিনাথের হেনস্থার গল্প শুনে চটুল মন্তব্য করে, তারাই আবার চণ্ডীতলার লাইন বাজারে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তারক মুদি কেমন কাপড়ে চোপড়ে একাককার হয়েছে, সেই গল্প করে আসর মাতায়। মুদির পো মুদিই। এক লাইন মন্ত্র আওড়াতে দাঁতকপাটি লেগে যাবে। পথে ঘাটে দেখতে পেয়ে কপালে হাত ঠেকিয়ে কেউ তাকে বলেও না, ঠাকুর মশাই নমস্কার।

বদ্যিনাথকে ঠাকুরমশাই ডাকে কারা? না, জেলে বাগদি খানারখোলের উদ্বাস্তু দিন আনি দিন খাই হেঁটোধুতি খালি গা মানুষগুলি। এইসব মানুষগুলি যেন কালোর কোলে আরও কালো হতেই হবে এমনি গোঁ নিয়ে পৃথিবীতে আসে। ঘটাং-এর মিশকালো বাপের ছায়া পড়ে না মাটিতে। জ্যোৎস্না আর তার মা পাশাপাশি হাঁটে যখন, মনে হয় পোড়া আংরা দুটি কাঠ যেন কোন যাদু বলে মানুষের মতো হাঁটছে। চেহারায় জৌলুস নেই। গলার স্বরে মিষ্টতা নেই। কথাবার্তারও কোনও ছিরিছাঁদ নেই। এই মানুষগুলি তাদের আচার অনুষ্ঠানে বদ্যিনাথকে ডাকে। পায়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে, বাপটো মরেছে। বড়ো খোকার বউ স্বামী-খাকী হইছে। গুঁইরামের মেয়ে বাচ্ছা বিয়োইছে। পাপপুণ্যের হিসেব কইরে আমাদিগে উদ্ধার দ্যান ঠাউরমশাই।

তখন বদ্যিনাথ চোখেমুখে গম্ভীর ভাব ফুটিয়ে তোলে, হবে হবে। ফর্দ করে রাখব। নিয়ে যাস। নিয়ম কানুন সব বলে দোব।

খাঁদনের মায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে বদ্যিনাথ আজ হত্তাকত্তা বিধাতা। আয়োজন যৎসামান্য। খাঁদনের নির্দিষ্ট কোন পেশা নেই। বাঁধা আয়ও নেই। তার বউ আর দুই মেয়ে বাবুদের বাড়ি ঝি-গিরি করে। খাঁদনের বুড়ি মা কাপড়ে চোপড়ে মাখামাখি হয়ে অনেকদিন বেঁচেছিল। শেষের দিকে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সকালকে বলত সন্ধে। মাঝরাতে বায়না ধরত স্নান করবে বলে। ভাতের দলা মুখে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। খাঁদনের মুখে মায়ের বৃত্তান্ত শুনে বদ্যিনাথ বলেছিল, প্রায়শ্চিত্তি করে ফেল খাঁদন। মায়ের দেহ শুদ্ধ হবে। কষ্ট লাঘব হবে। পরের বারে উঁচু ঘরে জন্মাবে।

কথাটা খাঁদনের মনে ধরেছিল। এ কাঠামোয় না হোক, পরের কাঠামোয় তার মা ভাল খাবে। মিলের ধোওয়া শাড়ি পড়বে। বাবুদের বাড়ির কত্তামায়েদের মতো রান্নাঘরের দোরগোড়ায় বসে কাজের লোকদের ফরমাশ করবে। এইসব ভেবে সে তৃপ্তি পেয়েছিল। প্রায়শ্চিত্তিরের খরচ খরচাটুকু জেনে বুঝে নিয়ে সে যখন কী করা যায়, কী করা যায় ছক কষছে, তার মধ্যেই দুম করে মরে গেল মা।

ভীমরতিটুকুর আর সদ্গতি করা গেল না। বদ্যিনাথ বলল, ভালভাবে মায়ের কাজটুকু কর, তাতেও বুড়ি উদ্ধার পাবে। খাঁদন মনমরা গলায় বলল, আবার যদি আমাদের মতো ঘরেই জম্মায়?

দুর পাগল। বদ্যিনাথ হাসল, মন্ত্রের জোর কী জিনিস, জানিস না তো। প্রায়শ্চিত্তিরের ঘাটতিটুকু পুষিয়ে দেবে। তোর মাকে হয়তো এই পৃথিবীতে আর আসতেই হল না। আকাশের চাঁদ তারার মধ্যেই রয়ে গেল।

খাঁদনের পৃথিবীটা ছোট। কিন্তু মাথার ওপর আকাশটা অনেক বড়ো। অসংখ্য তারার ভিড়ে মাকে আলাদা করে চেনা যাবে না ঠিকই, মা কিন্তু ভিড়ের মধ্যে অত উঁচু থেকেও খাঁদনকে দেখবে। খাঁদনের ঘর গেরস্থালীর প্রতি ঠিক নজর রাখবে। তৃপ্তি এবং তার প্রকাশের রকমভেদ আছে। খাঁদনের ক্ষেত্রে তা এইরকম হল, সে ঝপ করে মাটিতে বসে পড়ে বদ্যিনাথের পা দুটি জড়িয়ে ধরল, আপনি মনে কইরলে সব পারেন। চাঁদ তারার মধ্যিই মায়ের একডা বিলিব্যবস্থা কইরে দ্যান।

বদ্যিনাথ প্রথমে সভয়ে পিছিয়ে যাওয়ার ভঙ্গি করল, ছাড় ছাড়। তারপর 'হুঁ' বলে অল্পক্ষণ চোখ বুজে থেকে আস্তে করে বলল, ফর্দটা ঠিক ঠিক মিলিয়ে জিনিস কিনবি। নতুন বাজারের মোড়ে দশকর্মার দোকানটা ভাল, ন্যায্য দাম নেয়।

(দুই)

খাঁদন চেষ্টার ত্রুটি করেনি। জিনিস কিনতে দরাদরিও করেনি। দশকর্ম দোকানের মালিক ফর্দটা হাতে নিয়েই বলেছিল, এ বদু পুরুতের ফর্দ নিশ্চয়ই। খাঁদন ঘাড় চুলকে 'হ্যাঁ' বলাতে দোকানের কর্মচারীটির হাসি শুনতে পেয়েছিল, তোমাদের পুরুত ঠাকুর সকাল থেকে দুবার খবর নিয়ে গেছে।

কথাটা শুনে খাঁদনের ভাল লেগেছে। একে বামুন, তায় পণ্ডিত। হুঁশ এমন মানুষের থাকবে না তো কার থাকবে?

মাটির দাওয়ায় শ্রাদ্ধের আয়োজন করা হয়েছে। আটঘর এক উঠোন। উঠোনে চট টাঙানো হয়েছে। ডেকরেটারের থেকে খানকয় কাঠের চেয়ার, বড়ো একটা শতরঞ্চি ভাড়া করে এনেছে খাঁদন। তার মেয়ে বউ যেসব বাড়িতে কাজ করে, বাবুদের বাড়ির দিদি বৌদিরা দেখা করতে আসবে সব। পাতে বসে তো আর খাওয়ার কথা বলা যাবে না। জল, মিষ্টি দিতে হবে আলাদা করে। সে সবেরও ব্যবস্থা হয়েছে। পাড়ার কমিশনার বিপুলদা আসবে। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে গলির নর্দমা পরিষ্কার করিয়ে দিয়েছে। আজ সকালে আবার একজন লোক এসে নর্দমার ধারে ধারে ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে দিয়ে গেছে। বিপুলদা এখন কোন দিকে আছে, খাঁদন ঠিক জানে না। যে দিকেই থাক, সামনের বারে যাদের হয়ে যে চিহ্ন নিয়ে দাঁড়াবে, খাঁদন তাতেই ছাপ মারবে। বউ মেয়েকেও মারতে বলবে। মা বেঁচে থাকলে বিপুলদার সুবিধেই হোত। চন্দ সুয্যি ওলট পালট হয়ে গেলেও খাঁদনের কথা মা কোনোদিন ফেলত না। বাজারের চৌরাস্তার পাহারাদার হোমগার্ডবাবু আসবে কথা দিয়েছে। খাঁদন মাঝে মধ্যে ভ্যান-রিক্সা চালায় যখন, বাজারের মোড়ে বেআইনিভাবে সেটা রাখার সুবাদে, হোমগার্ডবাবুর সঙ্গে তার ভাব হয়ে গেছে। শেষের দিকে রেটটা বাড়তে বাড়তে এমন জায়গায় চলে গেছিল যে অসভ্য, কুকুরের খিদে, এইসব বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি কথা খাঁদনকে বলতে হয়েছিল। তারপরেও কিন্তু সম্পর্কে কোথাও এতটুকু টোল পড়েনি। কাছা গলায় খাঁদনকে দেখে হোমগার্ডবাবু বলেছিল, কাজের দিন যাব রে খাঁদন। সবাই মিলে না দাঁড়ালে দায় থেকে উদ্ধার হবি কী করে?

এতসব মান্যিগণ্যির আপ্যায়ন করা তো চাট্টিখানি কথা নয়। মায়ের কপালটা ভালো। খাঁদন মনে মনে ভাবে। এত বড়ো পাড়াটায় কজনের মায়ের কাজে এমনিসব ওজনদার লোকজন এসেছে?

খাঁদনের মেয়ে বউ, পিসতুতো ভাইয়ের বউ, রং-কানাই-এর বউ সব লাল পাড় কোরা শাড়ি পরে ঠাকুরমশাইকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কয়েকজন বুড়োবুড়ি এবং খালি গা কয়েকটি শিশুও রয়েছে। বদ্যিনাথ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তাকে ঘিরে এক দঙ্গল কালো মানুষের ভিড়। যেন খাবলা ভর্তি অন্ধকার। ফুলের থালা ফলের থালা কলাপাতায় দুব্বো বেলপাতা আর তুলসিপাতা মাটির সরা আতপ চাল ঠোঙা-ভর্তি তিল প্যাঁকাটির আঁটি পলিথিনের ভাঙা বালতিতে বালি আর আধলা ইট খানকয়। নিকোনো দাওয়াটা ভরে গেছে এমনি সব উপাচারে। জানলার বেড়ে ঠেস দিয়ে দাঁড় করানো মাদুর। একখানা আসন বিছিয়ে তার ওপর রাখা হয়েছে সাদা থান একজোড়া, একটি বড়সড় গামছা, ডোরাকাটা বিছানার চাদর একটি। বদ্যিনাথ ফর্দে ছাতার উল্লেখ করে পাশে লিখে দিয়েছিল ফোল্ডিং। দামটা খাঁদনের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছিল বলে, কিনব না কিনব না করেও শেষমেশ বেতের বাঁটওলা কে. সি. পালের কালো কাপড়ের ছাতা কিনেছে। দোকানদার বোঝাল, রোদ জলে মাথা তো বাঁচবেই, প্রয়োজনে দু চার ঘা মারার কাজেও বেশ জুতসই শক্তপোক্ত।

ছবিতে যেমন দেখা যায়, বদ্যিনাথ সেইভাবে হরধনু ভঙ্গের মতো করে হাঁটুর চাপে ছাতাটি পরখ করে বেশ খুশিই হয়েছে। ভালো জিনিসই কিনেছিস খাঁদন। তবে জানবি এ সবই তোর মায়ের আশীর্বাদ। চোখে ধরা পড়বে না, কিন্তু জানবি আজ তোর মা অন্য কোন রূপ ধরে, চড়ুই পাখিটি হয়ে বা উঠোনের পেয়ারা গাছটার শরীর ধরে আশেপাশেই থাকবে, যতক্ষণ না শ্রাদ্ধশান্তির কাজ শেষ হচ্ছে।

খাঁদনের সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠেছে বদ্যিনাথের কথা শুনে। মা নেই, আবার আছেও। নিজের শরীরটি ছেড়ে গাছ পাখির রূপ ধরে তার নাগালের মধ্যেই রয়েছে। চোখে দেখা যাচ্ছে না। ডাকলে সাড়া পাওয়া যাবে না। শ্রাদ্ধের কাজ শেষ হলে হয়তো হঠাৎই হাওয়া উঠবে সোঁ সোঁ করে। বা পেয়ারা গাছটার শক্তপোক্ত একটি ডাল আচমকা ভেঙে পড়বে হুড়মুড় করে। এ ভিটে ছেড়ে যাবার বেলায় হয়ত এইভাবে জানান দিয়ে যাবে মা। বদ্যিনাথ যদিও বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়েছে খাঁদনের কথা শুনে, সব সময় জানান দিয়ে যাবে, এমন কোন আইন নেই। নিঃশব্দেও চলে যেতে পারে।

বোঝনের কোনও রাস্তা নাই? খাঁদন হতাশ গলায় জানতে চেয়েছে।

আমার চোখে সব ধরা পড়বে। বদ্যিনাথের গলায় ভারিক্কি সুর, হয়তো তোর শরীরটা কেঁপে উঠল থরথর করে। বা কোথাও কিছু নেই দিনমানে আঁধার দেখতে লাগলি। কিংবা কোন কারণ নেই, হাউমাউ করে কেঁদে উঠলি।

খাঁদন যেন সত্যি সত্যি কেঁপে উঠল এইসব শুনে। দু চোখে জল এসে গেল তার। কাপড়ের খুঁটে চোখের জল মুছল। ঠাকুরমশাই বুঝিয়ে বলে না দিলে হপ্তা দুয়েক পরে এমনভাবে মাকে হয়ত মনেই পড়ত না। কথায় বলে, আজ মলে কাল দুদিন হয়। কপাল! খাঁদনের কপাল, আর তার মরা মায়েরও। ঠাকুরমশাই না হয়ে অন্য কোন পুরুত হলে কি আর মায়ের সদগতির এমন সুন্দর বিলি ব্যবস্থা করতে পারত! পুজোপাঠ মন্ত্র আওড়ানো সবই করত, কিন্তু খাঁদনকে কাছে ডেকে গুহ্য ব্যাপারগুলি কখনওই জানাত না।

দেখতে দেখতে উঠোনটা লোক ভর্তি হয়ে গেল। অনিমন্ত্রিতরাও ভিড় করল। খাঁদনের বউ তার স্বামীকে আড়ালে ডেকে বলল, খ্যাপা সোনা, চোর মাতন, ইদিরকেও বলিছ? খাঁদন অসহায়ের মতো মাথা নাড়ল, না তো। পরমুহূর্তেই তার মনে হল 'না' বলাটা ঠিক হল না। তার বউ যেমন মুখরা তেমনি রাগি। রাগ চড়ে গেলে মদ্দা মানুষের দু কাঠি বাড়া। শুভ কাজের দিনে এখনি হয়তো চিৎকার, চেঁচামেচি জুড়ে দেবে। তার সঙ্গে খাঁদনের বাপ বাপান্ত শুরু করবে। সে তাড়াতাড়ি 'আসুক না, খেতি না বললেই হোল' এই বলে অবস্থা সামাল দিল।

সোনার মাথার ঠিক নেই। মতি স্থিরও নেই। এদিক ওদিক দু চার পাক ঘুরে নিঃশব্দে চলেও যেতে পারে। মাতনও তেমন ওস্তাদ চোর নয়। দিনকাল ভাল যাচ্ছে না, হয়ত শুধু খাবার লোভেই এসেছে। দুজনেই পেট পুরে খেলে খাঁদনের ভাল লাগত। আত্মীয় কুটুম্ব মানিগণ্যি মানুষজন পাগল চোর গুণ্ডা ফেরেব্বাজ সব একসঙ্গে জড়ো হওয়া কি কম সৌভাগ্যির কথা!

লোকের ভিড়ে, তাদের চলাফেরা কথাবার্তা আর হাসিতে খাঁদনের ছিরিছাঁদহীন বাড়িটার চেহারাই পালটে গেছে। কে বলবে অন্যদিন এই উঠোনটায় চারটে ছটা হাঁস মুরগি আর অপুষ্ট শরীরের উলঙ্গ কয়েকটি শিশু ঘুরে বেড়ায়। বয়সের ভারে নুজ শরীরের বুড়োবুড়ি উঠোনের এ মাথা থেকে সে মাথায় সরে সরে যায় একটু রোদের লোভে। কখনও দমকা হাওয়ার মতো বেমক্কা কোন ঝগড়ার সূত্র ধরে অশ্লীল খিস্তিখেউড় আর ঝাঁটা লাঠির আস্ফালনে উঠোনটার হাওয়া কাঁপতে থাকে থরথর করে!

সাইকেলে চড়ে স্টুডিয়োর ছোকরাটি হাজির হল একমুখ হেসে। মুহূর্তে তাকে ঘিরে বাচ্চাদের ভিড় জমে গেল। চেয়ারে বসে রুমালে ঘাড় গলার ঘাম মুছল ক্যামেরাম্যান। এদিক ওদিক চেয়ে হতাশ গলায় বলল, কত দেরি হবে খাঁদন? অস্ফুটে 'দা' উচ্চারণ করল। খাঁদনের দু চোখে কৃতজ্ঞতা উপচে পড়ছে, এট্টুস সময় দ্যান।

মিত্তির বাড়ির গিন্নি-মা এলেন, সঙ্গে ফুটফুটে ছোট একটি মেয়ে। সুভাষদা দেখা করে বলে গেল, বিপুলদার আসতে একটু দেরি হবে। থানায় মিটিং করতে গেছে। ঝিল পাড়ার ব্যানার্জি বাড়ির কলেজে পড়া দিদি এল, হাতে মিষ্টির বাক্স আর রজনীগন্ধার মালা নিয়ে। চশমার ফাঁক দিয়ে সরু করে চেয়ে আপন মনেই কিন্তু বেশ জোরে জোরেই বলল, শ্রাদ্ধবাসরে মৃতের কোনও ছবি নেই! মালাটা ইররেলিভেন্ট হয়ে গেল।

কয়লার গোলার দাশু সাহা আক্ষেপ করল, নাম সংকীর্তনের ব্যবস্থা করিসনি খাঁদন! আমাকে যদি একবার বলতিস।

খাঁদনের মন খারাপ হয়ে গেল। মায়ের কোন ছবি নেই। খোল করতালের আওয়াজ নেই। খুঁজলে দেখা যাবে এমনি কত কিছু নেই। অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধির অভাবে যা হয় আর কী!

আঙ্গুলে পৈতে জড়িয়ে চোখ বুজে পুবমুখো হয়ে বসে মন্ত্র আওড়াচ্ছে বদ্যিনাথ বিড়বিড় করে। কোন শব্দ শোনা যাচ্ছে না। কেবল তার দু ঠোঁট নড়ছে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। খাঁদন সকলকে চুপ করতে বলল। ক্যামেরাম্যানকে নিচু গলায়, একখান ফোটো ন্যান না, বড়ো সোন্দর সময়! বলে অনাবশ্যক হাসল একটু। তারপর বউ ছেলে মেয়ে যে যেখানে আছে ইশারায় সকলকে ডেকে ঠাকুরমশায়ের চারপাশ ঘিরে দাঁড়াল। সোনা আর মাতনকেও ডাকল। মিত্তির গিন্নির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কলেজ দিদি অল্প অল্প হাসছিল। ইচ্ছে থাকলেও ওদের ডাকতে খাঁদনের সাহস হল না। এক পাতে বসে খাওয়া যায় না যেমন, একসঙ্গে ছবি তুলতেই বা রাজি হবে কেন?

(তিন)

শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের শেষ পর্বে পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেল। লম্বা করে শ্বাস ফেলে বদ্যিনাথ বলল, শেষ সময়টুকু বড়ো গম্ভীর রে খাঁদন। সমস্ত মনটাকে....! বলে বুকের ওপর আঙ্গুল ঠেকিয়ে দেখাল, এইখানে নিয়ে আসতে হবে। ওফ্! চোখ বুজে মাথা ঝাঁকাল বদ্যিনাথ, তার আগে একটু চা পেলে ভাল হোত।

খাঁদন মন্ত্রমুগ্ধের দৃষ্টিতে বদ্যিনাথকে দেখছিল। বুকে কষ্ট থাকে। ব্যথা বেদনা, তাও থাকে। তা বলে সেখানে মনটাকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে জড়ো করা কি যে সে লোকের কম্ম? সে করুণ গলায় বলল, এ বড়ো কঠিন কাজ। আমার অভ্যেস নাই।

বদ্যিনাথ হাসল, দূর পাগল! তুই পারবি কেন? তোর হয়ে আমাকে এই কাজটি করতে হবে। আত্মার সদ্গতি কি এত সহজে হয় রে?

খাঁদন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। আচমকা বউকে চিৎকার করে ডাকল, ঠাউরমশায়ের চা-টা কি হল? আসন ছেড়ে উঠে একপাশে দাঁড়িয়ে চা খেল বদ্যিনাথ। টুকটাক কথাবার্তা বলল। নিমন্ত্রিতদের খাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে, সেদিকে চোখ পড়তেই হঠাৎ রেগে গেল। হাত নেড়ে বলল, আর একটু পড়ে। আসল কাজটুকু শেষ হতে দাও।

বদ্যিনাথের গনগনে দু চোখের দিকে চেয়ে খাঁদন ঢোঁক গিলল দুবার তিনবার। অনাবশ্যক দৌড়োদৌড়ি করল একটু। খাওয়ার জায়গায় যে কটি পাতা পাড়া হয়েছিল, নিজে হাতেই সেগুলি তুলে ফেলল। বউকে ধমকাল। পাতা ছেড়ে উঠতে নারাজ একটি বাচ্চাকে হ্যাঁচকা টানে তুলে দাঁড় করিয়ে দিল। ভাতের ঝুড়ির সামান্য দূরে বসে দুটি কাক তারস্বরে চিৎকার করছিল কা কা করে। আধলা একটি ইট তুলে কাক দুটিকে তেড়ে গেল। খাঁদনের এই শশব্যস্ততায় বদ্যিনাথ খুশি হল, মাথা গরম করিস না। শেষটুকু শাস্তিতে সেরে ফেল। একটু চুপ করে থেকে বলল, শ্রাদ্ধানাং শাস্তি তপ:।

বদ্যিনাথের কথামত খাঁদন তার সামনে বসল দু হাঁটু মুড়ে। শিরদাঁড়া যথাসম্ভব সোজা করে। গঙ্গাজলে হাত ধুলো। ঠোঁট মুছল। পরনের ধুতির কোনাটুকু পিঠ দিয়ে জড়িয়ে নিল। মুহূর্তে সমস্ত জায়গাটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এমনকি কাক দুটিও আপনা আপনি চুপ করে গেল। বদ্যিনাথ, বল খাঁদন! বলে অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর গলায় বলল,

অজো নিত্যঃ শাশ্বত হয়ং পুরানো।

খাঁদনের ঠোঁট দুটি তিরতির করে কাঁপতে লাগল। শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠল। সে অস্ফুটে কোনরকমে বলল, অজ নিত্য অয়ং......

আবার বল, বদ্যিনাথ আস্তে করে বলল, ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।

খাঁদন বিড়বিড় করল, ন হন্যতে .....।

আমার সঙ্গে বল, অজো নিত্যঃ শাশ্বত হয়ং .....।

বদ্যিনাথ সাবধানে দু চোখ অল্প ফাঁক করে দেখল, চারপাশের সমস্ত মানুষগুলি অবাক বিস্ময়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে। খাঁদনের চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কান্না আটকাবার চেষ্টা করছে কয়েকজন মেয়েমানুষ। ভীত সন্ত্রস্ত চোখে কয়েকটি বাচ্চা তাদের মায়েদের পিছনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখছে বদ্যিনাথকে।

খাঁদন? বদ্যিনাথ নিচু গলায় লম্বা করে ডাকল।

হুঁ। ক্ষীণস্বরে জবাব দিল খাঁদন।

চোখ বুজে মায়ের মুখটা ভাব। তোদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে মা। মনে মনে বল, যেখানেই থাকো মা.....।

খাঁদন প্রথমে অপারগের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। বদ্যিনাথ চাপা কিন্তু নরম গলায় বলল, একবার বল খাঁদন। বড়ো শান্তিতে যাচ্ছে তোর মা। চোখ মেলে তোর মুখের দিকে চেয়ে রয়েছে।

খাঁদন জড়ানো গলায় বলল, যেখানেই থাকো মা.......!

(চার)

আবার বল, যেখানেই থাকো মা.....!

বদ্যিনাথ কি ছাই নিজেই জানত, বিশ্বাসের জোর এতখানি! পরিযায়ী পাখির মতো তা হঠাৎ করে ডানা মেলে উড়তে পারে মনের আকাশ জুড়ে। স্বপ্নেও ভেবেছিল কোনদিন, তার চোখের কোণের শুকিয়ে যাওয়া জল, এমনি করে গাল বেয়ে নেমে আসতে পারে!

সকলে অবাক হয়ে দেখল ঠাকুরমশায়ের গাল বেয়ে চিবুক বেয়ে টপটপ করে জল ঝরে পড়ছে। নিশ্চুপ এমনি সময় বয়ে গেল কিছুক্ষণ। একসময় খাঁদন চোখ মেলে তাকাল। বদ্যিনাথ তখনও নিশ্চল দুচোখ বুজে।

মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে উঠে একটি ছোট ছেলে আঁতিপাঁতি খুঁজেও বিছানায় তার মাকে দেখতে পাচ্ছে না। হ্যারিকেনের ক্ষীণ আলোয় ঘরটার ভুতুড়ে চেহারা। ছেলেটির মদ্যপ বাপ অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ভীত সন্ত্রস্ত ছেলেটি মা মা করে ডাকতে ডাকতে ঘর ছেড়ে দাওয়া থেকে নেমে উঠোনে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। উঠোনের একপাশে কচু আর আসশ্যাওড়ার ঝোপের মধ্যে কে যেন গুমরে কাঁদছে। মাটিতে এলোমেলো পায়ের ছাপ। চাঁদের আলোয় ছেলেটি মায়ের ফুলছাপ ব্লাউজটি দেখতে পেল, ঝোপের গায়ে আলতো জড়িয়ে। কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত ছেলেটি দাওয়ায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল একসময়।

পরদিন তারপরদিন করে কত বছর কেটে গেল। সেদিনের ছোট ছেলেটি তার জীবন উপান্তে পৌঁছে আজও তার মাকে একটিবারের জন্যও দেখতে পেল না।

ভীত গলায় খাঁদন ডাকল দুবার তিনবার, ঠাউরমশাই?

বদ্যিনাথ চকিতে চোখ খুলে চারপাশে তাকিরে প্রথমে কিছুই ঠাওর করতে পারল না। কোথায় সেই ঘর দাওয়া উঠোন আর আসশ্যাওড়ার ঝোপ! চাঁদের ঘষা আলোই বা কোথায়!

ধাতস্থ হতে অল্পক্ষণ কেটে গেল বদ্যিনাথের। তারপর ধরা গলায় থেমে থেমে বলল, বিশ্বাস, বুঝলি খাঁদন, বিশ্বাস রাখবি, মা তোর পাশে পাশেই আছে। সারাজীবন থাকবে। শরীরকে হনন অর্থাৎ হত্যা করলেও ইনি মানে আত্মা নিহত হন না। 

লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

লেখক পরিচিতি –

লেখালিখির শুরু গত শতকের শেষ দশকে। বাণিজ্যিক পত্রিকার পাশাপাশি লিটল ম্যাগাজিনে

লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে আগ্রহ বেশি। গল্প সংকলন আটটি এবং তিনটি উপন্যাস।