Advt

Advt

rupantar-upanyas-story-galpo-part-14-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য

ধারাবাহিক উপন্যাস প্রতি রবিবার

rupantar-upanyas-story-galpo-part-14-by-nalinaksha-bhattacharya-tatkhanik-digital-bengali-web-bangla-online-e-magazine-রূপান্তর-নলিনাক্ষ-ভট্টাচার্য

পর্ব ১৪

চোদ্দ

সুধাময়ী তাপসের সামনে মিস্টির প্লেটটা রেখে বললেন, “ অনেককাল পর এলে তাপস। তোমার বাবা ভাল আছেনতো?”

তাপস খাটের উপর বসা কণাকে দেখছিল। চমকে উঠে বলল, “ হ্যাঁ মাসিমা ভালই আছেন। ওই মাঝে মধ্যে একটু টান উঠলে কষ্ট পান।”

সুধাময়ী বললেন, “ হাঁপানির কষ্ট চোখে দেখা যায়না। আমার এক মেসোর ছিল। ছোটবেলা আমাদের বাড়িতে কিছুদিন ছিলেন। টান উঠলে কী কষ্টই না পেতেন। আমরা তো ভয়ে কেঁদে ফেলতাম,” দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সুধাময়ী বললেন। “ নাও বাবা মিস্টিটা খেতে শুরু কর। আমি চা নিয়ে আসছি।”

তাপস মিস্টির প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “ এই, আমি কিন্তু এতগুলো খেতে পারবনা। তুমিও নাও” তাপস প্লেট তুলে কণার সামনে ধরল। “ নাও।”

কণা হাত দিয়ে প্লেটটাকে আটকে বলল, “ এই না, আমি খেয়েছি, এটা তোমার জন্য।”

তাপস উঠে এসে জোড় করে একটা মিস্টি কণার মুখে পুরে দিল। মিস্টিটা খেয়ে কণা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “ আহ্‌ কী যে করনা, মা দেখলে কী বলবে বলোত?”

তাপস হেসে বলল, “ কী আর বলবেন? সবই তো জানেন।”

সুধাময়ী চা নিয়ে এলেন। বললেন, “ কই খেলেনা যে বাবা, নাও নাও চটপট খেয়ে নাও। চা ঠান্ডা হয়ে যাবে।”

তাপস একটা মিস্টি মুখে তুলে দিয়ে বলল, “ মেসোমশাইয়ের সঙ্গে এবার আর দেখা হলনা।”

সুধাময়ী হেসে বললেন, “ দেখা হয়নি যে সেটা তোমার ভাগ্য তাপস। দেখা হলেই বস্তি উন্নয়নের কাজে ঠিক টেনে নামাবেন। এইতো সেদিনই কণাকে বলছিলেন, ‘ কিরে তাপস যে অনেকদিন আসেনা, ওকে আসতে বলনা একদিন। এক আধটা কাজ ওকে দিয়ে করাতে হবে।’”

তাপস কণার দিকে তাকিয়ে চোখ বড় করে ভয়ের ভান করল। তারপর সুধাময়ীকে বলল, “ তা আপনারা মহিলারা কী করছেন বস্তি উন্নয়নের জন্য?”

কণা সুধাময়ীর জবাব দেবার আগেই বলল, “ আমাদের দু’জনকে বাবা ছেড়ে দিয়েছে ভাব? মোটেই নয়। আমাকে সপ্তাহে তিন দিন যেতে হয় বস্তির মেয়েদের উলবোনা, এমব্রয়ডারি শেখাতে আর মা যান সপ্তাহে দু’দিন আচার তৈরি করা দেখাতে।”

তাপস বলল, “ তার মানে কাজ কর্ম বেশ ভালই এগোচ্ছে কি বল?”

এবার সুধাময়ী কণার মুখের কথা কাড়লেন, বললেন, “ তা খারাপ বলা চলেনা বাবা। আচার আর বাঁশ বেতের ঝুড়ি ভালই কাটছে। মেয়েগুলো খুব উৎসাহী দেখলাম। সেলাই মেশিন এসে গেলে বাচ্চাদের জন্য প্যান্ট শার্ট তৈরি হবে সামনের মাস থেকে। এখন ছাঁট কাট শেখানো হচ্ছে।”

কণা হঠাৎ বলল, “ জানো মা বোস কাকুর বউ না কাল দুপুরে গিয়ে চুপি চুপি দুটো বেতের বড় ঝুড়ি আর এক শিশি আচার কিনে নিয়ে এসেছে কমুনিটি সেন্টার থেকে।”

সুধাময়ী হেসে বললেন, “ শুধু সুলতা কেন, আগে এ পাড়ার যেসব বউরা বস্তির নাম শুনলে নাকে কাপড় চাপা দিত এখনতো তারাই দেখছি বস্তিতে তৈরি জিনিষের আসল খদ্দের। এরাই না আমাকে কত ঠাট্টা টিটকিরি করেছে ওদের ওখানে যেতাম বলে। এখনতো ওরাও দু’চারজন করে আসতে শুরু করেছে আমার কাছে আচার তৈরি শিখতে।”

তাপস বলল, “ যাই বলুন মেসোমশাই এ বয়সে যা করে দেখালেন তার কোন তুলনা নেই। কিন্তু সেই হারু ঘোষ? আসার সময় দোকানটাতো দেখলাম ঠিকই চলছে।”

সুধাময়ী বললেন, “ চলছে ঠিকই তবে আগের মত আর ভাল চলছেনা। টিকে আছে বলতে পার। ওর যারা খদ্দের ছিল তারাতো বেশির ভাগই এখন খেলাধুলো, কুস্তি, যাত্রা নাটক এইসব নিয়ে মেতে থাকে। বস্তিতে নতুন ক্লাব খোলা হয়েছে, সেখানেই ওরা রাতে জড় হয় তাস, ক্যারাম খেলতে। যারা পড়তে পারে তাদের জন্য কলকাতার বড় বড় লাইব্রেরি থেকে চেয়ে চিন্তে কিছু বইও জোগাড় করা হয়েছে শুনলাম।”

তাপস হেসে বলল, “ আপনি দেখছি মাসিমা অনেক খবর রাখেন।”

সুধাময়ী হেসে উত্তর দিলেন, “ তা না রেখে উপায় আছে বাবা? যে ক’দন্ড বাড়িতে থাকেন ওনার মুখেতো শুধু বস্তি উন্নয়নের কথা। আর কারও কোন কথা বলার সাধ্য আছে ওনার সামনে? শুনতে শুনতে আমাদের সব মুখস্ত হয়ে গেছে। কতবার বলি ‘ বয়স হয়েছে, এত পরিশ্রম সইবে কেন?’ তা কার কথা কে শোনে? উল্টে বলেন কি জান? ‘ যতদিন কাজের মধ্যে থাকব ততদিনই ভাল থাকব। কাজ করা ছেড়ে দিলেই অকর্মণ্য হয়ে পড়ব।’”

তাপস বলল, “ কথাটা কিন্তু মিথ্যে নয় মাসিমা। যারা কাজের মধ্যে থাকেন, তারা শেষ বয়স পর্যন্ত সুস্থ থাকেন। এই দেখুননা আমার বাবার . . .”

বাবলু ছুটে এসে ঘরে ঢুকল। “ একি তাপসদা কখন এলে তুমি?”

তাপস বাবলুর এলোমেলো চুল হাত দিয়ে কপাল থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল, “অনেকক্ষণ। তা তুমি কোত্থেকে?”

স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়েছিলাম, বলেনি বুঝি কেউ তোমাকে?” বাবলু মার দিকে ফিরে বলল, “ মা জল দাও। ওঃ খুব তেষ্টা পেয়েছে।”

সুধাময়ী জল আনতে বেরিয়ে গেলে বাবলু বলল, “ তাপসদা আজ তিনখানা গোল খেলাম। সবকটা গোলকিপারের জন্য।”

কণা বলল, “ এতগুলো গোল খেয়েও যদি পেট না ভরে গিয়ে থাকে তবে রান্নাঘরে গিয়ে রসগোল্লা খেতে পার। মা তোমার জন্য রেখে দিয়েছেন।”

বাবলু রসগোল্লা খাওয়ার ব্যাপারে কোন উৎসাহ প্রকাশ না করে তাপসকে বলল, “ বস্তির মাঠে আজ ভাল ফুটবল ম্যাচ আছে। যাবে দেখতে তাপসদা? ভাল খেলা হবে।”

কণা বলল, “ যাবেতো যাও। বাবলুকে নিয়ে ঘুরে দেখে আস ওদের কান্ড কারখানা, খারাপ লাগবেনা।” তারপর তাপসের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, “ ভয় নেই বাবা ওখানে তোমার জন্য আড়ি পেতে বসে নেই। আজ বাবা কলকাতা গেছেন দিবাকর বাবুর সঙ্গে।”

 ক্রমশ …………

১৫তম পর্ব পড়ুন আগামী রবিবার

লেখক পরিচিতি     

 জন্ম এবং শিক্ষা কলকাতায়;কর্মজীবন দিল্লিতে,কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি গল্প সংকলন এবং বাঙলায় চারটি উপন্যাস ও দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি থেকেও ওঁর কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে। দেশ,আনন্দবাজার,সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, পরিচয়, কালি ও কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লেখেন নলিনাক্ষ বাবু দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘ কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।