ধারাবাহিক উপন্যাস – প্রতি রবিবার
পর্ব – ১৩
তেরো
বেশ কিছুটা দৌড়ে এসে পরাণ বলে কিক্ দিল। নতুন
বলটা উড়ে গিয়ে পড়ল মাঠের মাঝখানে। গোপাল ওপাশ থেকে দৌড়ে এসে পায়ের বদলে হাত দিয়ে
তুলে নিল বলটা। তারপর নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকে চেঁচিয়ে বলল, “ এ যে
দেখছি এক্কেবারে নতুন বল, পরাণদা। বাঃ কী সুন্দর
গন্ধ!”
পরাণ ওপাশ থেকে ধমক দিল, “নে আর
গন্ধ শুঁকতে হবেনা। কিক্ মার।”
গোপাল বল্টা শূণ্যে ছুঁড়ে দিয়ে লুফে নিল। “ যাই
বল দিবাকর মাস্টার লোকটা খুব দয়ালু। দেখ আমাদের জন্য চটপট কেমন নতুন বল নিয়ে
এসেছে। শুনছি ভলি বলও আসবে।”
পরাণ বলল, “ সেকথা
বস্তির লোকরা বুঝলেতো। পই পই করে সব্বাইকে বলে এলাম মাঠে আসতে, দেখো এখনও
কারও পাত্তা নেই। আমি যদি শালা এক আধ দিন গেলাস ছাড়তে পারি, তোরা কেন
পারবিনা। নে, মার।”
মিনিট পাঁচেক গোপাল আর পরাণ ফুটবলটাকে পেটাল
দু’দিক থেকে তারপর গোপাল হঠাৎ বলটাকে পা দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলল, “ নাঃ
জমছেনা পরাণদা। দু’জনে কি ফুটবল খেলা হয়?”
পরাণ এগিয়ে এসে বলল, “ একটা কাজ
করবি?”
“ কি পরাণদা?”
“ চল বস্তিতে যাই, যে শালাকে
ঘরে পাব টেনে বের করব। ছেলে হোক বুড়ো হোক কাউকে ছাড়বনা। বলব শালা ইয়ার্কি পেয়েছ? দিবাকর
মাস্টার আর অবিনাশবাবু নিজেদের গাঁটের পয়সা খরচ করে নতুন বল কিনে দিয়ে গেল এমনি
এমনি? খেলতে হবে সবাইকে, কাউকে ছাড়বনা।”
গোপাল উৎসাহিত হয়ে বলল, “ মন্দ বলনি
পরাণদা, চল একবার চেষ্টা করে দেখা যাক।” বল হাতে নিয়ে গোপাল আর পরাণ ছুটল বস্তির
দিকে।
বেচু
পালের উঠোনে দাঁড়িয়ে বামা হাঁক দিল, “ কইগো
ঠানদি, চটপট বেরিয়ে এস।”
বেচুর বউ অন্নদা রান্না ঘর থেকে চেঁচিয়ে জবাব
দিল, “ আয় বামা ভেতরে আয়। ডালটা নামিয়ে রেখে যাই।”
বামা বাইরে থেকেই চেঁচিয়ে বলল, “ চটপট কর
ঠানদি, সর্দারের বাড়িতে অনেক মেয়েছেলে জড় হয়েছে। কাজ শুরু হল বলে।”
ভেতর থেকে ডালে সম্ভার দেবার ছ্যাঁক ছোঁক আওয়াজ
এল। একটু পরে অন্নদার গলা শোনা গেল। “ কে শেখাচ্ছেরে ঝুড়ি বোনা?”
বামা চেঁচিয়ে জবাব দিল, “ কী জানি
বাপু চিনিনা। কে যেন বলল বেলতলা না কোন বস্তিতে মেয়েরা এইসব কাজ করে। সেখান থেকেই
এসেছে মেয়েছেলেটা। যাই বল লাভ আছে কিন্তু এতে। একদিনে দুটো ঝুড়িও বানাতে পারলে
দুশো টাকা হাতে আসবে।”
অন্নদা শাড়িতে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল। বলল, “ জানিস
তোদের জম্মেরও আগে গাঁয়ে এসব কাজের খুব চলন ছিল। বিয়ের আগে ঘরে ঘরে মেয়েরা ঝুড়ি
বোনা পাটি বোনা এইসব শিখত। আমিও একটু আধটু শিখেছিলাম। তা এদ্দিনে সব ভুলে বসে আছি।
এখন কি আর এসব বোনার বয়স আছে?”
বামা অন্নদার হাত ধরে টেনে উঠোনে নাবাল, বলল, “ দিবাকর
মাস্টার কি বলে জান ঠানদি? বলে শেখার নাকি কোন বয়স নেই।
আর কিছু না হোক তোমার জর্দা-তামাকের পয়সাটা তো উঠে আসবে। সেটাই বা কম কিসের?”
যতীন দাসের খোলা বারান্দায় একটা মোড়ার উপর বসে
একাদশ শ্রেণীর ছাত্র শান্তনু হাঁস ফাঁস করছিল। সামনে মাদুর বিছিয়ে গোটা কুড়ি ছোট
ছোট ছেলে মেয়ে বসে দুলে দুলে অ আ ক খ পড়ছে। শান্তনু লক্ষ করল পিছনের দিকে একটা
ছেলে পাশের মেয়েটার হাতে চিমটি কাটল। মেয়েটা ‘উঃ’ বলে চেঁচিয়ে উঠতেই শান্তনু গর্জন
করে উঠল, “ কেন চিমটি মারলি ওকে? এদিকে আয়, তোকে
দেখাচ্ছি মজা।”
“ শান্তনু দেখছি মাস্টারিটা
ভালই রপ্ত করেছে অবিনাশবাবু, দেখুন কেমন হাতের সুখ করছে।”
শান্তনু পিছনে তাকিয়ে দেখল একটা ঝোলা হাতে করে
দিবাকর আর অবিনাশবাবু পিছনের সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠে আসছেন। ব্যাগটাকে সাবধানে
মাটিতে রেখে দিবাকর বলল, “ নিন অবিনাশবাবু আপনিই বিলি
করুন।”
অবিনাশবাবু প্রতিবাদ করে বললেন, “ না না তা
কি করে হয়, তুমি হল গিয়ে মাস্টার, শিক্ষা
বিতরণের ব্যাপারটা তোমার হাত দিয়েই হওয়া উচিৎ।”
দিবাকর হেসে বলল, “ ঝগড়ায় কাজ
কি অবিনাশবাবু? এখানকার মাস্টারির ভার যখন
শান্তনুর উপর তখন ওকে দিয়েই দেওয়াটাই সব দিক থেকে ঠিক হবে। নাও শান্তনু স্লেট
পেন্সিল বইগুলি তোমার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে প্রত্যেক দিন পড়া আরম্ভ হবার আগে
বিলিয়ে দেবে আর পড়া শেষ হয়ে গেলে ওগুলো ওদের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এক জায়গায় গুছিয়ে
পরাণের বাড়িতে রেখে যাবে।”
বই স্লেটের কথা শুনে ছেলেমেয়েরা সমস্বরে চিৎকার
করতে শুরু করে দিল, “ আমাকে দিন, মাস্টার
মশাই, আমাকে দিন।”
শান্তনু হাত তুলে ওদের বলল, “ সব চুপ
কর। চুপ না করলে কেউ বই পাবেনা।”
বাচ্চারা চুপ করলে শান্তনু দিবাকরকে বলল, “ কিন্তু
স্যার বইগুলো ওদের দিয়ে দিলে ভাল হতনা? বাড়িতেও
কিছুটা পড়তে পারত।”
দিবাকর বাচ্চাদের দিকে এক নজর দেখে নিয়ে বলল, “ না না তা
হয়না শান্তনু। এখানে বেশির ভাগ বাচ্চাই পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে। এদের কাছে বই
এখনো খেলার জিনিষ, দিলেই পাতা মুড়ে ছিঁড়ে ফেলবে
বা পেন্সিল কালি দিয়ে বইতে দাগ মারবে। কাজেই যতক্ষণ ওদের হাতে বই থাকবে তোমার কড়া
নজর রাখতে হবে যাতে কেউ বই না ছেঁড়ে। ওদের তুমি বইয়ের যত্ন করত শেখাবে। কিছুদিন
পরে যখন বই ছেঁড়ার প্রবণতাটা কেটে যাবে তখন ওদের বাড়িতে বই নিয়ে যেতে দেবে।”
শান্তনু তার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বই, স্লেট
পেন্সিল বিতরেণ করতে শুরু করল। প্রত্যেককে বই দেবার সময় সে বলল, “কেউ পাতা
মুড়বেনা বা ছিঁড়বেনা কেমন? পড়া শেষ হলে সবাই এসে আমার
কাছে বই স্লেট জমা করে যাবে।”
দিবাকর শান্তনুর বই স্লেট বিলি করা দেখতে দেখতে
অবিনাশবাবুকে বলল, “ কত টাকা আমাদের তহবিলে রইল অবিনাশবাবু?”
অবিনাশবাবু মনে মনে একটু হিসেব কষে বললেন, “ তা হাজার
খানেক টাকা হবে মনে হচ্ছে।”
“ কুড়িয়ে বাড়িয়ে আরও কিছু টাকা
জোগাড় করে গোটা দুই সেলাই মেশিন কিনে ফেলা যাক কি বলেন?”
“ আমিও সেই কথাই ভাবছিলাম
দিবাকর। কিন্তু ওগুলো রাখবে কোথায়? নিরাকারের
বাড়িতে ঝুড়িবোনার জায়গায়ই ভালভাবে হচ্ছেনা, এখন
সেলাই-এর কাজের জন্য আবার আমাদের জায়গা খুঁজতে হবে।”
“ আমি ভাবছি ননী পোদ্দারের
পুরনো গোয়াল ঘরটা সাফ করিয়ে নিয়ে ওখানেই মেশিন নিয়ে আসব। ঝুড়ি বোনার কাজও ওখানেই
চলতে পারে। ওটাতেই এখন আমাদের কমুনিটি সেন্টারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। এদিকে কাজ
কিছুটা এগোলে সরকারি সাহায্যের জন্য ছোটাছুটি শুরু করা যাবে।”
অবিনাশবাবু বললেন, “ চল তাহলে
ননীকে গিয়ে বলে আসি যাতে ঘরটা কালকের মধ্যে পরিষ্কার করে রাখে।”
দিবাকর বলল, “ চলুন।”
তারপর হঠাৎ শান্তনুকে ডেকে বলল, “ শোন
শান্তনু, যাবার আগে একটু উপদেশ দিয়ে যাচ্ছি। দুষ্টু ছেলেগুলোকে সব সময়ই সামনের
সারিতে বসাবে। যারা পড়াশুনায় কাঁচা বা বেশি লাজুক তাদের দিকে বেশি নজর দেবে। লাঠি
একখানা দরকার মনে করলে হাতে রাখতে পার। কিন্তু ওটা শুধু ভয় দেখাবার কাজেই ব্যবহার
করবে। বাচ্চাদের মারধোর করা আমি পছন্দ করিনা।”
শান্তনু লজ্জা পেয়ে বলল, “ না স্যার, আমি ওদের
কক্ষনো মারধোর করিনা, মাঝে মধ্যে শুধু ধমকে দিই।”
দিবাকর হেসে শান্তনুর পিঠ চাপড়ে বলল, “ ভয় নেই, আমি তোমার
অধিকারে হস্তক্ষেপ করবনা। নাও এবার নতুন বই থেকে পড়াও, আমরা
চলি।”
দিবাকর অবিনাশবাবুর সঙ্গে বেরিয়ে পড়লেন ননী
পোদ্দারের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
ক্রমশ …………
১৪তম পর্ব
পড়ুন আগামী রবিবার
লেখক পরিচিতি –
জন্ম এবং শিক্ষা
কলকাতায়;কর্মজীবন দিল্লিতে,কেন্দ্রীয় সরকারের
বিভিন্ন মন্ত্রালয়ে। গল্প লেখার শুরু ষাটের দশকের শেষ দিকে। বাংলা এবং ইংরেজি দুই
ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন গত পঞ্চাশ বছর ধরে। ইংরেজিতে চারটি উপন্যাস ও একটি
গল্প সংকলন এবং বাঙলায় চারটি উপন্যাস ও দু’টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিসি
থেকেও ওঁর কয়েকটি ইংরেজি গল্প প্রচারিত হয়েছে। দেশ,আনন্দবাজার,সাপ্তাহিক বর্তমান, নবকল্লোল, পরিচয়,
কালি ও কলম(বাংলাদেশ) এবং দিল্লি ও কলকাতার অনেক সাহিত্য পত্রিকায়
গল্প লেখেন নলিনাক্ষ বাবু। দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘
কলমের সাত রঙ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত আছেন।
